||চতুর্থ পর্ব||
-----------
অগাস্ট ১৯ ২০০৬, রাত সাড়ে দশটা
খাবার টেবিলে সাধারণত রিপা আর রাশেদ পাশাপাশি বা সামনাসামনি বসেনা। টেবিলের এক কোণে খুব কাছাকাছি মুখোমুখি হয়ে বসে। রাশেদ খাওয়ার সময় প্রচুর কথা বলে, রিপাও মোটামুটি চালিয়ে যেতে পারে। প্রতিদিনই খাবার টেবিলে দুজনে 'আজ কি ঘটল' সে ফিরিস্তিটা দেয়, তারপর এটাসেটা কথা চলে। বিয়ের আগে রাশেদ ভাবত বন্ধুবান্ধবদের সাথে না হয় এটা-সেটা হাল্কা-ভারী নানারকমের প্রসঙ্গ নিয়ে অনেক কথা বলা যায়, আড্ডায় একদল মানুষ থাকায় কিছুটা সময় চুপ করে থাকাও যায়; কিন্তু বিয়ে করার পর দুজন মানুষ যখন অনেক সময় একসাথে থাকবে, তখন কি নিয়ে এত কথা বলবে! বিয়ের ব্যাপারে রাশেদের উৎকন্ঠাগুলোর (সব ছেলেমেয়েরই বিয়ের পর কি হবে এই নিয়ে উৎকন্ঠা থাকে) মধ্যে অন্যতম ছিল এই কথা বলার সাবজেক্টটা কি হবে তা নিয়ে। অথচ সংসার শুরু হবার দুমাসের মাথায়ই রাশেদ দেখেছে, কথা ফুরোয়না। হিসেব করে দেখলে দেখা যাবে তেমন কিছু নিয়েই কথা হয়নি, কিন্তু কিভাবে যেন কথার মাঝেই সময় কেটে যায়।
রিপার আজ নিজের খাওয়ার চেয়েও রাশেদ কি খাচ্ছে সেদিকে মনোযোগ বেশী। রাশেদ ইদানিং শাকসব্জি তরকারী খেতে পছন্দ করে, কাজের চামে মানুষ নিরামিষাশী হয় কিনা রিপা জানেনা, তাও আজ সে অন্ততঃ বারো পদের তরকারী দিয়ে নিরামিষ রান্না করেছে। সাথে আছে গরম গরম বেগুন, আর গুড়ো মাছের ভর্তা। রাশেদ বেশ আরাম করেই খাচ্ছে আজ, অফিসের কথাবার্তাও বলছে এটাসেটা। প্রতিদিনই অফিসের বস ইকবাল হোসেনকে কিছু গালমন্দ করে বউয়ের সামনে, আজও ইকবাল হোসেনের 'এ্যাঁ' নিয়ে কিছুক্ষণ মুন্ডুপাত চলে।
ইকবাল হোসেনের প্রসঙ্গ আসতেই রিপার মনে পড়ে যায় আজকের ঠিক করে রাখা কথা।
রিপা জিজ্ঞেস করে, রাশেদ, তোমার এই কাজের চাপ কবে শেষ হবে? তুমি কিন্তু ভীষণ শুকিয়ে গেছ!
রাশেদ চোখ তুলে তাকায়, কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যায়। মনে মনে ভাবে, আর কত মিথ্যে দিয়ে চালাবে। নাহ আজ সত্যি কথা রিপার কাছে ভেঙে বলতেই হবে।
কি হলো? কথা বুঝছনা নাকি? রিপার অনুযোগে রাশেদের ঘোর ভাঙে।
ভাত আর বেগুনভাজা ডলতে ডলতে বলে, এটা তো স্পেসিফিকালি বলা যায়না, রিপা।
ডেডলাইনটা কবে সেটা তো জান, নাকি? রিপা খানিকটা উত্তেজিত।
আসল ডেডলাইনতো অনেক দূরে, কিন্তু এর মাঝে বেশ কিছু ফেইজ আছে, প্রত্যেক ফেইজেই ডেডলাইন আছে। শুনো, ডেডলাইনও ব্যাপারনা, প্রত্যেক ফেইজেই ব্যাস্ততা আছে, আবার রিলাক্সড সময়ও আসবে। রাশেদ মাস্টারী ভঙ্গিতে বলার চেষ্টা করে।
রিপা হতাশভাবে তাকায়, ক্ষীণ স্বরে বলতে থাকে, তার মানে এভাবেই চলতে থাকবে, তোমার আমার জীবন?
আরে নাহ, রাশেদ আশ্বস্ত করার সুরে বলে, এবারই তো পুরোপুরি আমার নিজের প্রজেক্ট সাকসেসফুল হতে যাচ্ছে; তখন ইকবাল হোসেনের আমাকে গুনে চলতে হবে, বুঝেছ। তখন আর যখন তখন 'এ্যাঁ' বলে হাসতে পারবেনা।
ওমা! সামান্য একটা 'এ্যাঁ' তো দেখছি তোমাকে ভালই হিট করেছে। নাহ, তোমার ইকবাল হোসেনের কাছ থেকে আমার কিছু টিপস লাগবে। রিপা হাসতে হাসতে বলে।
আর বোলোনা, আমি লোকটার উপর খানিকটা বিরক্ত। বিজনেস ছাড়া কিছুই বোঝেনা। এই যে পাঁচমাস আগে দশটা নিউ ফেইস ঢুকল অফিসে, আমাদের উচিত ছিলনা একটা ফান ট্রিপ করা? ইয়াং ছেলেপুলে, জান দিয়ে কোডিং করে যাচ্ছে, আর ওদের জন্য কোন রিক্রিয়েশনের ব্যবস্থা নাই। আরে বাবা, ভাল বেতন দিলেই কি সব নাকি? রাশেদ আবার সেই প্রতিদিনকার প্যাচালে চলে যাচ্ছে। ব্যাপারটা হঠাৎ রাশেদ নিজেই টের পায়, থামিয়ে দেয়। কারণ আজ তার রিপার সাথে সিরিয়াসলি কথা বলতেই হবে।
রিপাও হতাশ বোধ করে, সেই আগের মত অবস্থা। কোনভাবেই সিরিয়াসদিকে নেয়া যায়না প্রসঙ্গ। চাইলে রিপা সরাসরি প্রসঙ্গটা এনে কথা বলা শুরু করে দিতে পারে, কিন্তু সে চাচ্ছে কথার ফ্লোতেই কথা পাড়া যাবে। কিন্তু রাশেদের সেই প্রতিদিনকার বসকে বকাবকি আবার শুরু হয়ে গেলেই বিপদ। তাকেও কিছুক্ষণ 'হ্যাঁ, হুঁ' করে তারপর উঠে যেতে হয়। আধবয়েসী এক বুড়োর বদনাম শোনার ব্যাপারে কারই বা এত আগ্রহ থাকবে!
রিপা একটু জোর করেই প্রসঙ্গটা জটিল করে তোলে; রাশেদকে খানিকটা খোঁচা দিয়েই বলে, প্রতিদিনই বাসায় এসে বসকে বকো, আর সকালে গিয়ে তারই ফরমাশ খাটো। এত রাগ থাকলে তাকে বলোনা কেন? তুমি সবকিছু লুকোতে চাও কেন, রাশেদ? আরেকটু ওপেন হওয়া যায়না?
রাশেদ চমকায়। হঠাৎ ধক করে ওঠে বুকের ভেতর, খানিকটা সন্দেহ হয় রিপা কি জেনে ফেলল? অথচ রাশেদতো কবীর ছাড়া আর কাউকেই এখনও বলেনি রোগের কথা, বাকী যারা জানে তারা সবাই ডাক্তার নার্স। রাশেদ একটু নিজেকে ডিফেন্ড করার ভঙ্গিতেই বলে, কেন? আমি কি লুকাই রিপা? বসকে তো আর মুখের উপর বলা যায়না 'আপনি আমাকে এত খাটান কেন।' আচ্ছা বাদ দাও এসব কথা; ইকবাল হোসেনের প্রসঙ্গ টেনে আমি ঝগড়া করে একটা সুন্দর সন্ধ্যা নষ্ট করতে চাইনা।
হাহ! সুন্দর সন্ধ্যা। রাত বাজে এগারোটা আর ওনার সন্ধ্যা শুরু, তাও তো দশ মিনিট পরেই নাক ডাকাতে শুরু করবেন। রিপার অভিযোগ অনুযোগ মেশানো কণ্ঠ।
রাশেদ হতাশ হয়ে বলে, আহা সেইতো ঝগড়ার দিকেই যাচ্ছে! আচ্ছা এসব বাদ দাও, আজকে ফিরতে ফিরতে কি মনে হলো সেটা তোমাকে বলি।
রাশেদ তার মাস্টারপ্ল্যানমতো এগুনোর জন্য প্রস্তুতি নেয়। একদম প্ল্যানমতো প্রসঙ্গও টানে।
রিপা আশ্বস্তভাবে বলে, কি হয়েছে?
রিপার চোখেমুখে কৌতুহল।
নাহ, বিশেষ কিছু না, তুমি যেভাবে ইন্টারেস্টেড হয়ে গেলে তেমন কিছুনা। দেখলেই তো, আমি ট্যাক্সিতে ফিরলামনা? তো পুলিশ কলোনীর পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছিলাম তখন আমার ট্যাক্সিটা একটা রিক্সার সাথে একদম গায়ে গা ঘেঁষে ফোঁস করে চলে গেল, রিক্সাটা উল্টে পড়ল বোধহয়, আমার ট্যাক্সিওয়ালা দেখলাম আর ফিরেও তাকালনা। পালানোর মতো করেই ছুটে বেরিয়ে এল বড় রাস্তায়।
উফ! রিপা চোখ কুঁচকে তাকায় রাশেদের দিকে। আশ্বস্ত স্বরেই বলে, তোমার কিছু হয়নিতো?
আরে, নারে বাবা। হলে তো এখন হাসপাতালের বেডেই কাতরাতাম। বলে রাশেদ হাসে।
একটু দম নিয়ে রাশেদ বলে, তখন ফিরতে ফিরতে মনে হলো ইস আমি যদি রিক্ষায় থাকতাম, তাহলে এর চেয়ে আরেকটু বিপজ্জনক কোন এক্সিডেন্ট হয়ে তো মরেও যেতে পারতাম।
হা হা হা, রিপা শব্দ করে হেসে ওঠে। শোন রিক্সা এক্সিডেন্টে কেউ মরে বলে তো কখনও শুনিনি! রাশেদকে মশকরার সুরে বলে যায় রিপা, বড়জোর তোমার কনুইয়ের চামড়া ছিলবে, তাও যদি হাফহাতা শার্ট পরো, হি হি হি।
রাশেদ হতাশ হয়ে দেখে প্রসঙ্গ হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। সে শেষ চেষ্টা করে, মরিয়া হয়ে বলে,
রিপা আমি কিন্তু সিরিয়াসলিই ভাবছিলাম। এই যে দেখো এক্সিডেন্ট তো হতেই পারে তাইনা?
হ্যাঁ, পারে। কিন্তু তার জন্য ... রিপা এখনও রাশেদের বোকাবোকা চিন্তায় মজা পাচ্ছে, তার মাথা থেকে ঠিক এই মুহূর্তে আজরাতে রাশেদের সাথে কি নিয়ে কথা বলবে সেটা উধাও হয়ে গেছে।
রাশেদ প্রচেষ্টা চালিয়ে যায়, বলে, হ্যাঁ, দেখো। এক্সিডেন্টে ধরো মরে যাওয়াও অস্বাভাবিক না।
এতটুকু বলে রাশেদ দম নেয়, রিপার প্রতিক্রিয়া দেখে। রাশেদ বুঝতে পারে রিপা এখনও বুঝতে পারছেনা কথা কোনদিকে যাচ্ছে।
রাশেদ বলে যায়, তখন হঠাৎ মনে হলো, এই যে আমাদের বিয়ে হলো মাত্র সাতমাস, এখন যদি আমি হঠাৎ করে মরে যাই তাহলে তুমি কি করবে?
রিপা এখনও হাসছে, ঠাট্টা করে বলে, তোমার ইকবাল হোসেন যেভাবে তোমাকে খাটাচ্ছে, তাতে তো সেই সম্ভাবনাই বেশী। ব্যাপারনা, আমি তখন খুব ইয়াং আর হ্যান্ডসাম দেখে কাউকে বিয়ে করে ফেলব আবার, তবে অবশ্যই ইকবাল হোসেনের অধীনে কেউ না, হি হি হি।
রাশেদ হঠাৎ মাথা নীচু খাবার প্লেটের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে বলে, তাহলে তো ভালই হতো।
এই পাগলা! রিপা আদুরে গলায় বলে, তুমি কি আসলেই সিরিয়াসলি নিয়েছ? কি বোকা রে বাবা!!
রাশেদ মুখ তুলে তাকায়, তার দুই চোখ ভরা শুধুই অশ্রু। সেই অশ্রুর এক-দুফোঁটা গড়িয়ে গড়িয়ে ভাতেও পড়ে। অসহায় এক আকুতি চোখেমোখে নিয়ে রাশেদ রিপার চোখেচোখ রেখে বলে,
রিপা, আমার ক্যান্সার হয়েছে, স্টমাক ক্যান্সার।
কি!! কি বলছ এসব!!!
রিপার চিৎকার রাতের আঁধারকে এক রহস্যময় অবয়বে ঢেকে ফেলে। রাস্তার মোড়ের নেড়ি কুত্তাটার 'কুঁই' 'কুঁই' ডাকগুলো হঠাৎ খুব স্পষ্ট হয়ে কানে বাজে।
দুটো মুখ বিহবল হয়ে তাকিয়ে থাকে পরস্পরের দিকে কতক্ষণ, সে সময়টা যেন ঘন্টা, মিনিট, সকেন্ডে হিসেব করবার মতো নয়। অনন্ত এক সময়ের চাদর চারপাশের সবকিছুকে হঠাৎ করেই আবৃত করে ফেলে, এমন ক্ষণগুলোতে পৃথিবী সম্ভবত আবর্তন বন্ধ করে দেয়, একটু থেমে দম নেয়, একটু থেমে দম দেয়।
(... চতুর্থ পর্ব চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে জুন, ২০০৭ দুপুর ১২:৪৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



