somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পরিচয়খেকো ব্র্যান্ড

১৯ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৩:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের ছোটসময়ে ওয়াকম্যান ছিল এক স্বপ্নের মতো বস্তু। মনে আছে ক্লাশ থ্রিতে যখন পড়ি, তখন কিংবদন্তী গোলকীপার মহসীনের ভাগ্নে ক্লাশে ওয়াকম্যান নিয়ে এল, ওর মামা কোথায় জানি খেলতে গিয়ে কিনে নিয়ে এসেছিল। সেই ওয়াকম্যান নিয়ে আমাদের সেকি উত্তেজনা! এখন থেকে ক্লাসে বসে গান শোনা যাবে, মিঠুনের 'আই এ্যাম আ ডিস্কো ড্যান্সার' গানটা তখন সুপারহিট।আমরা ক্লাশের পড়াশোনা বাদ দিয়ে, ব্যাগের পেছনে মাথা গুঁজে ওয়াকম্যানে শুনি 'আই এ্যাম আ ডিস্কো ড্যান্সার, জিন্দেগি মেরে গানা ...', আর খুব ধীরে ধীরে মাথা দোলাই যেন স্যার বা ম্যাডামদের চোখে না পড়ি। এমনি ছিল সেই ওয়াকম্যান ফিভার।
একসময় সেই ওয়াকম্যানের পথ ধরে পোর্টাবল সিডিপ্লেয়ার আসল, যার নাম কিভাবে যেন হয়ে গেল সিডিম্যান। এমনকি এই "সিডিম্যান" শব্দটা না জানার জন্য বন্ধুদের কাছে হাসির পাত্রও হতে হলো আমাকে এক আড্ডায়, সবার এমনভাব যেন যন্ত্রটা বের হবার সাথেসাথেই শব্দটাও ডিকশনারীতে ঢুকে গেছে। তো, বছরকয়েক আগে যখন এমপিথ্রি প্লেয়ার বেরুলো, আমি এক বন্ধুকে জিজ্ঞেস করলাম, 'কিরে এটাকে কি এখন থেকে এমপিথ্রি-ম্যান বলা হবে নাকি?'

ব্র্যান্ড কিভাবে একটা বস্তুর আইডেন্টিটিকেও গ্রাস করে ফেলে, ভাবলেও অবাক লাগে। ওয়াকম্যান কোন যন্ত্রের সাধারন পরিচয়কে বোঝায় না, যেমনটা বোঝায় রেডিও, টিভি বা ব্যাটারী -- এই শব্দগুলো। 'ওয়াকম্যান' হলো সনি'র তৈরী পোর্টাবল মিউজিক প্লেয়ারের ব্র‌্যান্ড নেইম। যেমন সনির টিভির ব্র্যান্ড নেইম ছিল ট্রিনিট্রন। অথচ আমরা কেউ বলিনা যে "আমাদের একটা ট্রিনিট্রন আছে", যদিও "আমার একটা ওয়াকম্যান আছে" বলাটাই যেন স্বাভাবিক। বেশী চলতে চলতে বা একচেটিয়া বাজার দখল করে ব্র্যান্ডনেইম খুব সহজেই যন্ত্রের মূল পরিচয়টাকেই খেয়ে ফেলে। তবে এখানে একটা ইন্টারেস্টিং ফ্যাক্টর কাজ করে, যেটা হলো ব্র্যান্ডনেইমভ্যালু শুধু দ্রব্য না, মাঝেমাঝে জন্মদাতা কোম্পানীকেও ছাড়িয়ে যায়। যেমন, "আজকে একটা প্যানাসনিকের ওয়াকম্যান কিনেছি" বা "তোশিবার ওয়াকম্যানটা দেখতে চাল্লু" এসব কথা শুনে কারও খটকা লাগেনা, যদিও ওয়াকম্যান শুধু সনিরই হবার কথা!

যেমন ওয়াকম্যানের পর হালের ক্রেজ আইপড। এখনও পুরোপুরি হয়নি, তবে কয়েকবছরের মাথায়ই হয়ত আমরা শুনব, "স্যামসংয়ের নতুন আইপডটা ফাটাফাটি" -- জন্মদাতা এ্যাপল আর তার সন্তান "আইপডকে" নিজের ঘরে আটকে রাখতে পারবেনা।

যেমন আরেকটা উদাহরন দেয়া যায়, 'হোন্ডা'। এখনও সম্ভবত বাংলাদেশে হোন্ডা/হুন্ডা/হন্ডা এসব শব্দের একটাই মানে -- মোটরবাইক। তাও একটু পোসপাসওলা গুলো। সাধারন স্লোস্পিডের মপেড গুলোও ব্র্যান্ডের নামে পরিচিত হয়ে গেছে, সেগুলোকে দেশে 'ভেসপা' বলে ডাকা হয়। ইটালিয়ান এই কোম্পানীর বানানো মপেডগুলো দেশে এতবেশী এবং একচেটিয়া চলে যে, ভেসপা নিজেই মপেডের প্রতিশব্দ হয়ে গেছে। আর ক্রাইসলারের জীপের ব্যাপারটাতো এমনই হলো যে, জীপ নিজেই শব্দ হয়ে ডিকশনারীতে উঠে গেল। এয়ার জীপ, লুনার জীপ, জীপ হকি -- আরো কত শব্দ! যদিও আমাদের কাছে "পুলিশের জীপ" শব্দটা সবসময়েই আতংকের ছিল। এখন সম্ভবতঃ র‌্যাবের জীপ সেটাকে প্রতিস্থাপন করে ফেলেছে।

শুধু যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রেই না, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার্য জিনিসপত্রের ক্ষেত্রেও এরকম ব্র্যান্ডের আগ্রাসন লক্ষণীয়। ইদানিং অবশ্য তেমনটা দেখা যায়না, কারণ নিত্যব্যবহার্য কোন এক পণ্যের একচেটিয়া বাজার আছে এমন কোম্পানী খুবই কম। তবে একসময় ছিল যখন এ্যান্টিসেপটিক বলতে লোকে 'ডেটল'কেই বুঝত, বিকেলের খেলা শেষে বাসায় গিয়ে হয়ত মাকে বলতাম, "আম্মা খেলতে গিয়ে হাঁটু ছিলে গেছে, একটু ডেটল লাগিয়ে দেন।" অথবা মা বাবাকে বলত, "জেট শেষ হয়ে গেছে, নতুন এক প্যাকেট নিয়ে আইসেন।" হ্যাঁ, কাপড় ধোয়ার গুড়া পাউডারকেও মানুষ জেট বলেই জানত। আচ্ছা, এরকম কি আরো আছে?

তবে ব্র্যান্ডের এই দিগ্বিজয়ী খেলায় মনে হয় সবচেয়ে বড় তাসের বাড়িটা মেরেছে গুগল। সম্ভবতঃ পৃতিবীর অনেক ভাষতেই এটা এখনএকটা শব্দ হয়ে গেছে, যার মানে হলো ইন্টারনেটে কিছু সার্চ করা। আমরা এখন খুব সহজেই বলি, "গুগুলাইয়া দ্যাখতো অমুক জিনিস নিয়া কি কি লেখা আছে?" এখনও হয়ে যায়নি, তবে অচির ভবিষ্যতেই আমরা শুনব ছোট্ট মেয়েটি মাকে হয়ত বলছে, "আম্মু আমার হোমওয়ার্কের খাতাটা পাচ্ছিনা, একটু গুগল করে দাওনা।"

যদিও ঠিক ব্র্যান্ড বলা যায়না, তবে কাছাকাছি ধরনের আরেকটু ঘটনা ঘটে গেছে পৃথিবীতে। হ্যাঁ, আর কিছুদিন পরেই যিনি দেখা দেবেন, সেই সান্টা ক্লজ। বড়দিন উপলক্ষে যে সান্টাক্লজ বাড়ী-বাড়ী গিয়ে বাচ্চাদের ভাল হয়ে বছর কাটানোর জন্য পুরস্কার হিসেবে উপহার দিতেন, তিনি এখন শুধু রাতের বেলা "জিঙ্গল বেল, জিঙ্গল বেল" বাজিয়ে বাচ্চাদের বিছানার পাশে চুপচাপ উপহার রেখেই চলে আসেননা, তাঁখে এখন দোকান পাট, শপিং মল, রেস্তোরা সবখানেই দেখা যায়। আর তাঁর হাত থেকে উপহার হোক আর ম্যালা পয়সা খরচ করেই হোক, এটা সেটা নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহটাও এখন আর শুধু বাচ্চাদের মাঝে সীমিত নেই। ছেলেবুড়ো সবাই সান্টার ভক্ত। কেজানে, হয়ত অলরেডী এমন দিন চলে এসেছে যে, "বড়দিন কি?" জিজ্ঞেস করলে অধিকাংশেই বলবে, " কেন? সান্টার জন্মদিন!" তারপর আপনি যদি আবার বেড়ে বলে বসেন যে, "নারে ভাই, এটা হলো ইয়েস বা জিসাস ক্রাইস্টের জন্মদিন", তখন হয়ত দেখা যাবে আপনাকেই প্রশ্ন শুনতে হচ্ছে, "জিসাস ক্রাইস্ট? সে আবার কে?"
১৩টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×