somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্ট্যান্ড বনাম জিপিএ-৫

২৭ শে মে, ২০০৯ সকাল ১০:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের সময় প্রতিবছরই যে স্কুলগুলো খুব ভালো রেজাল্ট করতো, দেখা যেত যে তাদের প্রথম দুই তিনজন ছাত্রের নাম সারা ঢাকার ছেলেদের মুখে মুখে। তেমনি এক নাম শুনতাম ক্লাস নাইন থেকে, সবাই জানে এই ছেলেটি আমাদের ব্যাচে বোর্ডের পরীক্ষায় প্রথম হবে। ছেলেটি প্রায় কিংবদন্তীতে পরিণত হয়েছিলো, এবং সেসময় প্রতিবছরই এরকম কয়েকজন কিংবদন্তীর জন্ম হতো। যেমন শোনা যেত যে ছেলেটির রাফখাতা সের দরে বেচে একশো টাকা পাওয়া গেছে, সে যুগে একশো টাকা বিরাট ব্যাপার, দশ-বারো কেজি চাল কেনা যায়। আর কাগজ মনে হয় ফেরিওয়ালারা একটাকা কেজিতে কিনতো।

কিংবদন্তী হয়ে যাওয়া এই ছেলেটিকে দেখার খুব সাধ ছিলো, একই কলেজে ভর্তি হবার সুযোগ পাওয়ায় ছেলেটির সাথে পরিচয় করতে পারলাম। ছেলেটির নাম উল্লেখ করিনি এজন্যই যে ছেলেটিকে জানার পর আমি খানিকটা আহত হয়েছিলাম। যে এক্সাইটমেন্ট নিয়ে আমি এই কিংবদন্তীর সাথে পরিচিত হয়েছইলাম, তাকে তেমন ইম্প্রেসিভ কিছু মনে হয়নি। টিপিকাল ভালো ছাত্রদের মতো ভীষন গোছানো, কিছুটা উন্নাসিকতার কারণে সবার সাথে মন খুলে কথা না বলতে পারার দোষযুক্ত -- এরকম খুব সাধারণ একটি ছেলে। তখন ইন্টারমিডিয়েটে ঢাকা কলেজে পড়া মানে সবচেয়ে ভালো রেজাল্টের নিশ্চয়তা, এসএসসি'র ভালো রেজাল্ট তাও দু'চারটা প্রতিষ্ঠান ভাগাভাগি করতো, কিন্তু এইচএসসির ভালো রেজাল্ট প্রায় একচেটিয়া ঢাকা কলেজের ছিলো; সে কারণেই সারা দেশ থেকে ব্রাইট আর মোটিভেটেড প্রচুর ছেলে এসে ভর্তি হতো ঢাকা কলেজে। ফলে এই কলেজেই পরবর্তীতে এমন অনেকের সাথে পরিচয় হয়েছে যাদেরকে কথাবার্তায়, চিন্তার ক্ষমতায় বা অন্যান্য আঙ্গিকে আমার ঐ কিংবদন্তী ছেলেটির চেয়ে অনেক বুদ্ধিদীপ্ত আর চৌকস বলে মনে হয়েছে।

এই উদাহরণটিকে ব্যতিক্রম ভাবা ঠিক হবেনা, কারণ অনেকের সাথেই কথা বলে দেখেছি, এরকম ঘটনা প্রত্যেক ব্যাচেই কমবেশী আছে। যেমন, আমাদের ব্যাচেই বুয়েটে যারা ভর্তি পরীক্ষায় সবচেয়ে ভালো করলো মানে এক থেকে দশের মধ্যে থাকলো তাদের মধ্যেও অনেক ছাত্র-ছাত্রী ছিলো যারা বোর্ডস্ট্যান্ডই করেনি! এমনকি যে ছেলেটি প্রথম হয়েছিলো সেও। একইসাথে এটাও বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, বুয়েট ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম হওয়া সেই ছেলেটির মতো এত ব্রিলিয়ান্ট ছেলে আমি আর মাত্র একজনকে দেখেছি এখন পর্যন্ত। বোর্ডস্ট্যান্ড বা বোর্ডের পরীক্ষায় খুব ভালো করতে হলে খুব গুছিয়ে নোট করে তোতাপাখীর মতো পড়তে হয়, প্রশ্নের উত্তর লেখার কায়দা আয়ত্ত্ব করতে হয়, গণিতের প্রশ্নের উত্তরে কোন কোন লাইনের পাশে অপ্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা লিখতে হবে -- এসব আয়ত্ত্ব করতে হয়। এগুলোর মাধ্যমে যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাড়তি নাম্বার যোগ হতো, তাই দেখা যেতো যে একটা ছাত্রকে তার সমমানের আরেকজন ছাত্রের চেয়ে দশ-বিশ নম্বর বেশী পাইয়ে দিয়ে স্ট্যান্ড/স্টারের তারতম্যে ফেলে দিচ্ছে। কাজেই বোর্ডস্ট্যান্ড ঘোষনা করে প্রথম বিশজনকে যে আলাদা করে ছেঁকে দেখানো হয় বা ছেঁকে রাখা হয়, সেটা আদতে কোন কাজে আসেনা; কারণ, আসলেই কাজে আসার কোন কারণ নেই।

বরং বোর্ডস্ট্যান্ড করা বোশজনের মধ্যে অনর্থক কিছু প্রাইডের তৈরী হয়, তারা নিজেদের হিরো ভাবতে শুরু করে, যেটা পরবর্তীতে একটা বিরাট সমস্যারও জন্ম দিতে পারে। কখন সমস্যাটা হয় সেটা ব্যাখ্যা করি। টিনএজে একেকজন মানুষের নিজের সম্ভাবনা নিয়ে অসীম আশাবাদ থাকে, বিশেষ করে যারা সেসময়ে হিরোর সংবর্ধনা পায় আশপাশ থেকে, তাদের বেলা তো সেটা প্রায় বিশ্বজয়ী পর্যায়ে চলে যায়। যে যত দ্রুত বুঝতে পারে তত ভালো, তবে মোটামুটি বয়েস বাইশ থেকে পঁচিশের কাছাকাছি গেলে সবাই ধীরে ধীরে নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে বুঝতে শুরু করে; স্বপ্নগুলো একে একে মৃত্যুবরণ শুরু করে। এরকম একটা সেটব্যাকের ফেইজ প্রত্যেকটা মানুষই পার করে। সেই সেটব্যাকই তাকে নিজের পরবর্তী পথ নির্ণয়ে সাহায্য করে।

উপরোক্ত "সেটব্যাক" -- এটার একটা যন্ত্রণা আছে। টিনএজ বয়েসে নিজের অলীক স্বপ্নগুলো যত বেশী সীমানা ছাড়ায়, সেটব্যাকের সময় যন্ত্রণাটাও তত বেশী হয়। আমার মনে হয়, বোর্ডস্ট্যান্ড টাইপের উপাধি গলায় ঝুলিয়ে দিয়ে অল্প কিছু ছেলে-মেয়েকে অযথা সেটব্যাকের সময় বেশী কষ্ট পাবার উপক্রম করা হয়। একই সাথে কাছাকাছি ক্যালিবারের অনেক সংখ্যক ছেলেমেয়েদের স্বপ্ন দেখার স্কোপকে দমিয়ে দেয়া হয়। যেমন একটা উদাহরণ দেয়া যাক। কিছুদিন কোচিং সেন্টারে খাতা দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি (শিক্ষকরা হয়তো আরো ভালো বলতে পারবেন) যে, একই খাতা একই ব্যক্তি ভিন্ন সময়ে দেখলে মার্কিংয়ে প্লাস মাইনাস ১/২ এর হেরফের হতে পারে। যদি প্লাস-মাইনাস দুই হয়, তাহলে ভাবুন, এই মাত্র ইংরেজীর যে খাতাটিকে আপনি ১০০ তে ৭৫ দিলেন, সেটি হয়তো আগামীকাল দেখলে আপনি ৭৭ দিতেন, আবার আগামী পরশু দেখলে ৭৩ দিতেন। মানে, এক সাবজেক্টে একই লেখায় ৪ নম্বরের কম-বেশী হতে পারে। ১০ সাবজেক্টে এটা হতে পারে ৪০!! আরো সহজ করে বললে, শিক্ষকের খাতাদেখাজনিত এরর মার্জিন যদি প্লাস-মাইনাস ২ হয়, তাহলে ১০০০ এর পরীক্ষায় ৪০ নম্বরের হেরফের হতে পারে, মানে আপনার যদি একচুয়াল যোগ্যতা থাকে ৮৫০ পাবার, তাহলে আপনি ৮৩০ও পেতে পারেন, ৮৭০ও পেতে পারেন। অর্থাৎ, পরিসংখ্যানগতভাবে বললে , ৮৫০ পাবার মতো যোগ্যতাওয়ালা ৪০ জন ছাত্রের মধ্যে একজন ৮৩০ পাবে অথচ আরেকজন ৮৭০ পাবে। আমাদের সময়ে দেখা যেতো ২০ নম্বর বেশী পেয়ে একজন পত্রিকায় ছবি ছাপাচ্ছে, আর কম পেয়ে একজন মায়ের বকা খাচ্ছে, শালার লাইফে কি আছে ভেবে সিগারেট ধরাচ্ছে।

এই যে পরিসংখ্যানকে অবজ্ঞা করে অল্প সংখ্যক ছাত্রছাত্রীকে হিরো বানানোর টেন্ডেন্সী আগে ছিলো, সেটা আদতে একই ক্যালিবারের অসংখ্য ছেলেমেয়ের মোটিভেশনই নষ্ট করে দিতো। একটা হিসেব করা যাক, একটা ক্লাসে ১০০ জন ছাত্র-ছাত্রী আছে, এদের মধ্যে অন দ্য স্পট পরীক্ষা নিয়ে সেরা একজন নির্বাচন করবেন। দেখা যাবে যে রোল নং ১ থেকে ৫ এর (এমনকি এটা ১ থেকে ১০ও হতে পারে) যে কেউই সেরা হতে পারে। তাহলে কি বলা যায়না যে, স্কুল পর্যায়ে মোটামুটি টপ ৫% থেকে ১০% ছেলেমেয়ের ক্যালিবার একই রকম? সেক্ষেত্রে এদের সবাইকে চিহ্নিত করাটা কি, ঐ বিশ-পঁচিশজনকে চিহ্নিত করে অযথা সেলিব্রিটি বানানোর চেয়ে বেটার না?

অনেকে জিপিএ-৫ এর সংখ্যা বেশী দেখে হতাশ হচ্ছেন। কিন্তু দেখুন, ৬০ হাজার সংখ্যাটা অনেক শোনালেও এটা ১০ লাখ ছাত্র-ছাত্রী থেকে ছেঁকে নেয়া ৬০ হাজার, মানে মোট সংখ্যার ৬%। এদের যে করো দ্বারাই যেকোন কিছু হওয়া সম্ভব -- এই বিশ্বাসটা দীর্ঘদিন বোর্ডস্ট্যান্ডের কুহেলিকা দেখে আসা আমাদের কাছে মেনে নিতে কষ্টকর হলেও এটা ফ্যাক্ট! এরা দেশের টপ ৬% -- এসএসসি পাশ করেছে ৭০%, তাদের টপ ১০% এরা। এর চেয়ে ডিটেইলড যোগ্যতা বিশ্লেষণের দরকার কি?

একইসাথে এই গ্রেডিং সিস্টেম বাচ্চাদের মনের মধ্য থেকে অপ্রয়োজনীয় প্রতিযোগিতাপূর্ণ মনোভাব দূর করবে বলেও আমি মনে করি। আগে যেখানে দুই নম্বর বেশী পাওয়া বন্ধুকে এসিড মেরে চোখ ঝলসে দেয়ার মতো পাশবিক হয়েছিলো কোন কিশোর, সেখানে এরাই এখন গলাগলি করে হাঁটবে আর ভাববে, "আমরা তো একই রকম, আমাদের কোন ভেদ নাই"।
প্রশ্ন আসতে পারে, কলেজ ভর্তি নিয়ে। কিসের ভিত্তিতে কলেজ ভর্তি করাবেন, তাইতো? কেন? একটা এ্যাডমিশন টেস্ট নিতে দোষ কি?
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মে, ২০০৯ সকাল ১০:১৫
৫১টি মন্তব্য ৪৩টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×