আমি বরাবরই ঘুরাঘুড়ি করতে পছন্দ করি সেটা দেশে হোক আর বিদেশেই হোক, জঙ্গল, পাহাড়, সাগর, নদী যাই হোক। সেদিন হঠাৎই যাওয়ার প্রোগ্রাম হয়ে গেল। আমার এক দুস্ত রুবেল অফিস ট্যুর এ খাগড়াছড়ি যাবে, আমাকে ফেন করে জানতে চাইল যাব কি-না। আমিতো শুনেই একপায়ে খাড়া। যাই হোক তুমুল বৃষ্টি মাথায় নিয়ে খাগড়াছড়ির উদ্দেশ্যে রাত ১১:২০ এ কলাবাগান কাউন্টার থেকে সৌদিয়া পরিবহনে চড়লাম। বৃষ্টি বিঘ্নিত হওয়ায় গাড়ী কিছুটা ধীর গতি। আগেই জেনে নিয়েছিলাম সাধারণত সকাল ৬ টা সাড়ে ৬ টার মধ্যে গাড়ী খাগড়াছড়ি পৌঁছায় কিন্তু বৃষ্টির জন্য ২/১ ঘন্টা সময় বেশী লাগবে সাথে যদি পাহাড়ী ঢল অথবা পাহাড় ধস যোগ হয় তাহলে তো কথাই নেই। ভোর ৪:৩০ আমরা মিরেরসরাই পৌঁছলাম। উল্লেখ্য মিরেরসরাই থেকে চট্রগ্রাম এবং খাগড়াছড়ির রাস্তা আলাদা হয়ে যায় এবং সে রাস্তায় ঢুকার কিছুক্ষণপর থেকেই পাহাড়ী এলাকা শুরু হয়, গাড়ী তখন শুধু উপরেই উঠতে থাকে। যেহেতু তখনো অন্ধকার তাই সেখানে বাস ১ ঘন্টার বিরতি দিল কারণ অন্ধকারে বৃষ্টিভেজা রাস্তা বিপদজনক, শান্তি বাহিনী এবং সাথে স্থানীয় ডাকাতের ভয়ও আছে। ডাকাতরা রাস্তায় গাছ ফেলে রাস্তা বন্ধ করে বাস ডাকাতি করে। কিছুটা আলো ফোটার পর ৫:৩০ এ দিকে আবার যাত্রা শুরু হল। ড্রাইভারের পেছনের সিটটা আমার তাই সামনে এবং ডান/বাম স্পষ্টই দেখতে পাচ্ছিলাম। যেদিকেই তাকাই শুধু বিশাল পাহাড় আর পাহাড় মাঝে মাঝে পাহাড়ী নদী। কখনো একদিকে পাহাড় আরেকদিকে কয়েক হাজার ফুট গভীর খাদ। শিহরণ জাগানো এক অন্যরকম অনুভূতি। গাড়ী একবার খাড়া উপরে উঠে আবার খাড়া নীচে নামে। আর একেকটা বাঁক চোখে না দেখলে বলে বুঝানো কঠিন। তবে রাস্তা খুব ভাল, এখনো কিছু স্থানে রাস্তার কাজ চলছে। চড়াই-উৎড়াই পার হয়ে সকাল ৭:৩০ মিনিটে আমরা আমাদের প্রাথমিক গন্তব্য এবং আগে থেকেই বুকিং করা খাগড়াছড়ি পর্যটন মোটেলে পৌঁছলাম। উল্লেখ্য পর্যটন মোটেলটি শহরের বাইরে এবং মোটেল থেকে শহরে যেতে ১৫/- রিক্সা ভাড়া লাগে। ফ্রেশ হয়ে, নাস্তা করে হালকা রেস্ট নিয়ে শহরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। কর্মসূত্রে পরিচয় হল সাবেক স্থানীয় এমপির ভাতিজা মাসুদ এবং তার বন্ধু বাবলুর সাথে ফলাফল ২টা মোটর সাইকেল ফ্রিতে পেয়ে গেলাম। এখন আর আমাদের পায় কে? সময় স্বল্পতার কারনে আশে-পাশে ঘুড়ে সেদিনের মত বিরতি দিয়ে পরবর্তী দিন রিছাং ঝর্ণা এবং আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র যাওয়ার প্রোগ্রাম ঠিক করে সন্ধ্যায় মোটেলে চলে এলাম। উল্লেখ্য সন্ধ্যার পর মোটেল থেকে বের হওয়া বিপদজনক তাই টিভি দেখে, গান শুনে বাকী সময়টা পার করতে হল। সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরী হতে হতে আমাদের মোটর সাইকেল চলে এল, আমরা যাত্রা করলাম আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্রের উদ্দেশ্যে কিন্তু আলুটিলা পৌঁছে গেটের চা দোকানে চা খেতে খেতে ঠিক করলাম আগে রিছাং ঝর্ণা দেখব এবং ফেরার পথে আলুটিলায় ঢুকব। উল্লেখ্য দুটি স্থানই একই পথ ধরে যেতে হয়। আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র শহর থেকে ৮ কিঃমিঃ এবং রিছাং ঝর্ণা ১১ কিঃমিঃ দূরত্বে তাই দূরেরটাই আগে দেখার সিন্ধান্ত হলো। বলে রাখা ভাল খাগড়াছড়ি এসে বৃষ্টির ব্যাপারে আমার এক নতুন অভিজ্ঞতা হলো। দিনে-রাতে ৩০-৪০ বার বৃষ্টি নামে আবার থামে আবার নামে। সবই ৫মিঃ/১০মিঃ এর বৃষ্টি, এই সময়ে নাকি এরকমই হয়। বৃষ্টির কারণে বড় ক্যামেরা নেয়া সম্ভব হয়নি। নিচের সবগুলি ছবিই মোবাইল ক্যামেরা দিয়ে তুলা হয়েছে। আমরা রিছাং এর কাছাকাছি পৌঁছে মাসুদ এর পরিচিত রবিন্দ্র দা নামে এক লোকের বাড়ীতে উঠলাম। এর মধ্যে রোদ-বৃষ্টি সবই আমাদের উপর দিয়ে অনবরত পার হয়ে যাচ্ছে। আমাদের সাধের ক্যামেরা, মোটর সাইকেল, মানিব্যাগ, জুতা ইত্যাদি রবিন্দ্রদার জিম্মায় রেখে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রিছাং এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। কারণ এর পর আর কোন বাড়ী নেই এবং মোটর সাইকেল নেওয়ারও কোন রাস্তা নেই, খাড়া পাহাড় বেয়ে শুধু নামা আর নামা। রওয়ানা হওয়ার আগে সে গুড়-মুড়ি দিয়ে নাস্তা করালো এবং জোঁকের হাত থেকে বাঁচতে যত্ন করে সবার পায়ে কেরাসিন তেল মেখে দিল তাই আমরা নিশ্চিন্ত হয়ে রিছাং এর উদ্দেশ্যে পা বাড়ালাম।
চলবে................

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

