খুব শীত আজকে তাইনা?
লোকটা হাঁটতে হাঁটতে একদম আমার পাশে এসে বললো। তারপরে একইসাথে হাঁটতে থাকায় তারে এড়ানো গেল না। তাই বললাম - হ্যাঁ, ভীষণ।
নিউজিল্যান্ডে এখন শীতকাল মাত্র শুরু হইতেছে এবং দিন অনেক ছো্ট। আমাকে আদিব কুইন স্ট্রিটের মাথায় নামায়ে দেয় ভোর ছটায়, সেখান থেকে আমার অফিসে আসতে ১৫ মিনিট লাগে হেঁটে।
রাস্তাঘাট অন্ধকার থাকে তখনও আর অপরিস্কার। গাড়ীও কম, মানুষ প্রায় চোখেই পড়েনা শুধু রাস্তায় বেঞ্চে দুই একজন ঘুমায়, আর কিছু মাতাল বসে ঢোলাঢুলি করে, তাদের ছাড়া। এদের সবাইকে আমার ভয় লাগে। আর ইদানিং টিনএজারদের মধ্যে ফ্যাশান হইছে বড় সাইজের জ্যাকেট গায়ে দিয়ে মাথায় হুড তুলে রাখা। কারো মুখ চোখ দেখা যায় না। মাঝে মাঝে বিভিন্ন বারের সামনে এদের জটলাও থাকে। অন্ধকারে সবাইরে তিনকোনা মাথাওয়ালা ভুতের মতন লাগে, তাছাড়া একা হাঁটতে থাকলে কোন দলের সামনে পড়লে এমনিতেই একটা অসস্তি তো থাকেই।
ইত্যাদি কারণে আমি মনে মনে সুরা পরতে পরতে হাঁটি। আর নিজের হার্টবিট মাঝে মাঝে নিজেও শুনতে পাই। এমন সময় এই লোকের পাল্লায় পড়লাম। এত কাছে হাঁটতেছিল যে তার আর আমার মধ্যের বাতাস চলাচল টের পাচ্ছিলাম।
- আমি শীতের চোটে গ্রীনলেন থেকে হেঁটে হেঁটে আসছি। বললো সে।
আমি অবাক হলাম, গ্রীনলেন থেকে সিটি সেন্ট্রালে গাড়ীতে আসতেই লাগে ১৫/২০ মিনিটের মতন। হেঁটে আসলে ১ ঘন্টা অন্তত লাগার কথা, বা তার চেয়ে বেশী।
- বাহ! আপনার ব্যায়াম হইল অনেক। আমার কফি না খাইলে হবে না এখন।
- চলেন রাস্তা পার হই। ওইপাশের ফুটপাথে একটা মেয়ে ঘুমায়, স্যালি, ওর সাথে আলাপ করে আসি। চিনেন ওকে?
- না, অনেককে ঘুমাতে দেখি, আমি কখনও আলাপ করি নাই।
- ওই যে গীটার আছে একটা, গান গায়।
- ও আচ্ছা, হতে পারে। এরা রাস্তায় ঘুমায় শীত লাগে না?
- তা লাগে। আমিও তো রাস্তায় ঘুমাই, গ্রীনলেনে। অবশ্য চাইলে সরকারী শেলটারেও ঘুমাতে পারি, কিন্তু রাস্তাই ভালো।
হায় হায়, এতক্ষন আমি রাস্তার পাগলের সাথে কথা বলতেছি!আরচোখে আশেপাশে দেখলাম আর কেউ আছে নাকি। রাস্তা মেরামত হচ্ছে, কিছু লোক কাজ করতেছে সেখানে, বেশী বিপদ হইলে চিতকার দেয়া যাবে। আপাতত হাসিমুখে কথা বলাই ভালো।
-ওহ্ আচ্ছা। তো বৃষ্টি আসলে কই যান?
- কোন শপিং সেন্টারে ঢুকি, অথবা ম্যাকডোনাল্ডে। যাওয়ার অনেক জায়গা আছে।
- আর বিছানাপত্র কই রাখেন আপনার?
- বিছানা আপাতত কিছু নাই। গতবছর কম্বল পাইছিলাম শীতের সময়, ওইটা সামারে রেললাইনে ফেলে দিছি, তাই তো এতদূর হাঁটলাম, আর ঘুমাতে পারছিলাম না, এমন শীত! আচ্ছা, আমি যাই এখন, ওইদিকে একটা ছেলে ঘুমায়, ওর সাথে আলাপ করে আসি।
হাফ ছাড়লাম। অবশ্য অনেক কৌতুহল ছিল, ওইগুলা মিটলো না। পরে হবে কোনদিন। একই শহরে কত পরতে পরতে থাকে মানুষ, আমি শুধু একটা লেয়ার জানি। যে যেমনে থাকে সেইটাই স্বাভাবিক মনে হয়, হয়তো।
এদের দেখলে ভয় লাগে কেন? কি ভাবতেছে জানি না তাই? নাকি সবসময় অপেক্ষাকৃত উপরের শ্রেনীর মানুষেরা নীচের শ্রেনীর লোকদের ভয় পায়? এই ভয় আবার একদম বেশী বড়লোকরা পায় না বোধহয়। কে জানে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


