somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইউননান প্রদেশে একটি হুই জাতির গ্রাম

২০ শে আগস্ট, ২০০৮ সন্ধ্যা ৬:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইয়ুন নান প্রদেশের থুং হাই জেলার না কুও থানায় নাচিয়াইং নামে একটি হুই জাতির গ্রাম আছে । নাচিয়াইং গ্রামের ইতিহাস সুদীর্ঘকালের। এখানে ৪ শোরও বেশি ইমামসহ বহু সুধী ব্যক্তির উদ্ভব হয়েছেন । এদের মধ্যে আছেন চীনের বিখ্যাত আরব ইতিহাস বিষয়ক পন্ডিত, ইউনেস্কোর আরব সংস্কৃতি বিষয়ক শারজাহ্ পুরস্কার জয়ী পেইচিং বিদেশী ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর নাচুং এবং নামকরা অনুবাদক নাস্যুন প্রমুখ । এই গ্রাম এখনও ইসলাম ধর্ম ও মুসলমানদের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্যে ভরপুর ।
প্রতি দিন এই গ্রামের মসজিদ থেকে নামাজ পড়ার জন্য আজান প্রচার করা হয় । নাচিয়াইং গ্রামে মোট ৭ শোরও বেশি হুই জাতির পরিবারের সদস্যরা বসবাস করেন । নাচিয়ারেই নামে একজন বৃদ্ধের বয়স ৭০ বছরেরও বেশি । তিনি সংবাদদাতাকে বলেন , এই গ্রামে বসবাসকারীরা সুখী জীবন কাটাচ্ছেন এবং গৌরব বোধ করেন । কারণ ,যারা এই গ্রামে থাকেন , তারা সবাই ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদের বংশধর ।
১২৯০ সালে নাকুও থানা প্রতিষ্ঠিত হয় । তার বয়স ৭ শো বছরেরও বেশি । শাসন করার জন্য নাসুরু নামে একজন কর্মকর্তাকে এই থানায় পাঠানো হয় ।

বৃদ্ধ নাচারেই বলেন , নাসুরু নামে এই কর্মকর্তা ছিলেন ইসলাম ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা হজরত মোহাম্মদের অনুসারী । তার ৪টি ছেলে ছিল । তিন ছেলে তার সঙ্গে ইউননানের পাহাড়ী অঞ্চলের একটি স্থানে বসবাস করতে স্থানান্তরিত হয়েছে । ফলে এই জায়গা ধীরে ধীরে একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে । বর্তমানে গ্রামটিকে নাচিয়াইং গ্রাম বলা হয় । এই গ্রামের মুসলমানদের মধ্যে খাওয়া দাওয়া , বিয়ে ও শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে এখনও স্বকীয় রীতি-নীতি ও বৈশিষ্ট্য বজায় রয়েছে । এ প্রসঙ্গে নাচিয়াইং গামের মসজিদের ইসলাম ইনস্টিটিউটের প্রধান মা চিয়ান খাং বলেন , নাচিয়াইং গ্রামে অতিথিদের দাওয়াত করার ব্যাপারে সাদাসিধা আয়োজন করা হয় । কোন অপচয় করা হয় না । সাধারণতঃ ৮ ধরনের ব্যঞ্জন বন্দোবস্ত করা হয়।

নাচিয়াইং গ্রামে গ্রামবাসীদের বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যাপারে মুসলমানদের প্রগাঢ় ঐতিহ্য ও বৈশিষ্ট্য রয়েছে । এই গ্রামে তরুণ-তরুণীদের বিয়ের আগে বাগদান অনুষ্ঠান আয়োজনের প্রয়োজন । নইলে তাদের প্রেমকে অন্যায় বলে মনে করা হয় । বাগদান ঐতিহ্যবাহী আচার ব্যবহার অনুযায়ী আয়োজন করা হয় । তার পর তরুণ-তরুণীরা নিশ্চিন্তভাবে প্রেম করতে সক্ষম হবে । বিয়ের জন্য বাগদানের বেশি সময় লাগবে । সাধারণতঃ দু' থেকে ৫ বছর , এমন কি ৮ বছর পর্যন্ত লাগবে ।
বিয়ের অনুষ্ঠানকে আনন্দ ও অন্তরঙ্গ পরিবেশ আরো বৈচিত্র্যময় করে তোলার জন্য অতিথিরা বরবধূর ওপর মিষ্টি আলো , ডিম ও সয়াবীনের মন্ডা নিক্ষেপ করেন । এতে ভবিষ্যতে বরবধূর সুখী দাম্পত্য জীবন নিশ্চিত হয় । বিয়ের অনুষ্ঠানে বরবধূর ব্যবহার্য পোষাক প্রসঙ্গে নাচিয়াইং মসজিদের ইসলাম ইনস্টিটিউটের প্রধান মাপ চিয়ান খাং বলেন , বিয়ের অনুষ্ঠানে বধূর অধিক ফ্যাশনের পোষাক পরা উচিত নয় । ঐতিহ্যবাহী ও ভদ্রতাপূর্ণ পোষাক পরতে হয় । যদি বধূ পাগড়ী না পরে , তাহলে মসজিদের ইমাম বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজির হবেন না ।

সংবাদদাতারা নাচিয়াইং গ্রামের মুসলমানদের বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পর্কে যাতে আরো বেশি জানতে পারেন , সেজন্য মা চিয়ান খাং সংবাদদাতাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যবহার্য বধূদের পরা পোষাকের ভাড়া দোকানে নিয়ে যান । এই দোকানে নানা রকম বৈচিত্র্যময় ও রঙবেরঙের বিয়ের অনুষ্ঠানে ব্যবহার্য বধূদের পোষাক দেখা যায়। এতে পরিপূর্ণভাবে সংখ্যালঘু জাতির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে ।

এই দোকানে পাগড়ীসহ মালয়েশিয়া , সিংগাপুর ও সৌদি আরব থেকে আমদানীকৃত নানা রকম পোষাক পাওয়া যায় । এই দোকান মুসলিম সংস্কৃতির রূপ লাভ করেছে । এটা ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম বিশ্বাসের চাহিদার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ ।

নাচিয়াইং গ্রামে দু'টি মসজিদ আছে । নাচিয়াইং মসজিদ পুরুষদের এবং নারী মসজিদ নারীদের নামাজ পড়ার জন্য ব্যবস্থা করা হয় । নামাজ পড়ার জন্য গ্রামের বয়স্ক , শিশু ও অল্পবয়সীরা মুসলমানদের লম্বা পোষাক ও টুপি পরে কিঠ সময় মসজিদে যান ।

নাচিয়াইং মসজিদ তৈরী হয় ২০০৪ সালের ২রা অক্টোবর । তার মেঝের আয়তন ১০ হাজার বর্গ মিটার । মসজিদে ৭২ মিটার দীর্ঘ চারটি মিনার আছে । উপাসনার বড় ভবনে ৩ হাজার নামাজী নামাজ পড়া যায় । এটাও ইউন নান প্রদেশের বৃহত্তম মসজিদ । নাচিয়াইং মসজিদের ইসলাম ইনস্টিটিউটের প্রধান মা চিয়ান খাং বলেন , এই মসজিদ এই গ্রামের গ্রামবাসীদের সাহায্যের অর্থ ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয়েছে । মসজিদ নির্মাণ খাতে ২ কোটি ইউয়ানেরও বেশি খরচ করা হয়েছে ।

প্রথমে এই মসজিদ নির্মাণের জন্য রক্ষণশীল পদ্ধতিতে ডিজাইন করা হয়েছিল । পরে মালয়েশিয়ার ডিজাইন অনুসারে পুরানো ডিজাইনের সংস্কার করা হয়েছে । নতুন ডিজাইন অনুযায়ী মসজিদ সমৃদ্ধ আরব বৈশিষ্ট্যে ভরপুর হয়ে উঠেছে ।

নারী মসজিদ নাচিয়াইং গ্রামের পুরানো মসজিদ ছিল । নতুন মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজনে পুরানো মসজিদকে আড়াই শো মিটার পূর্বে সরিয়ে নেয়া হয়েছে । তা নারীদের নামাজ পড়ার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে । এখন গ্রামের দুটো মসজিদে যার যার সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য দেখা দিচ্ছে ।

সংবাদদাতারা নারী মসজিদের প্রাচীন ও ভদ্রতাপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের জন্য খুব মুগ্ধ হলেন । সিনচিয়াং থেকে আগত একজন উইগুর নারী মুসলমান মা স্যু ইউন সংবাদদাতাদের বলেন , তিনি ইউন নানের মসজিদ পরিদর্শনের জন্য এই গ্রামে এসেছেন । সিনচিয়াংয়ে মসজিদ উইগুর জাতির স্থাপত্যশৈলীতে তৈরী । হুই জাতির রীতি-নীতি পাওয়া যায় না । তিনি গ্রামের নারী মসজিদে আরবী ভাষা ও ধর্ম বিষয়ক কোর্স পড়াচ্ছেন ।

নাচিয়াইং গ্রামের মুসলমানরা ইসলাম ধর্মের নিয়ম-বিধি , আচার ব্যবহার ও চীনের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির প্রভাবে সুষম ও সুখী জীবন কাটাচ্ছেন । তারা আরো সুন্দর জন্মভূমি গড়ে তোলার জন্য পরিশ্রমীভাবে প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন ।

৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×