somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিস্ময়কর চীন

২০ শে মে, ২০০৯ বিকাল ৩:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

[{লেখাটি http://taiyabs.com থেকে ধার করা}]

লেখকঃ ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্র সচিব। কলাম লেখক।

১৯৪৯ সালে গণচীনের অভ্যুদয় এবং অতঃপর সময়ের চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে দেশটির অব্যাহত অগ্রযাত্রা আমাদের সমকালীন ইতিহাসের একটি বিস্ময়কর অধ্যায়। সাড়ে চার দশক আগে, ১৯৬২ সালের শুরু থেকেই দেশটিকে বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন অবস্থানে দেখার ও জানার সুযোগ আমার হয়েছে। ১৯৬২ সাল থেকে একজন তরুণ কুটনীতিক হিসেবে সেই দেশে তিন বছর কর্মরত ছিলাম; ষাটের দশকের শেষে ছিলাম ইসলামাবাদে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চীন বিভাগের পরিচালক। সেই সময়ে কর্মসুত্রে বহুবার চীন সফর করেছি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সহগামী হিসেবে বিভিন্ন দেশ সফরকালীন বিশেষ করে ১৯৭৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশন চলাকালীন সব প্রচারমাধ্যম এড়িয়ে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমরা চীনা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পরোক্ষভাবে নিয়মিত সংযোগ রাখতে সক্ষম হয়েছিলাম।
পররাষ্ট্রসচিব হিসেবে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়ন ছিল আমার দায়িত্ব আর আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। সরকারি আমলা হিসেবে অবসর নেওয়ার পর, সাধারণ পর্যটক হিসেবে কখনো আমন্ত্রিত অতিথির মর্যাদায় এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা আর অনুগামী হিসেবে চীনকে কাছে থেকে দেখেছি। সময়ের এই সুদীর্ঘ ব্যাপ্তির মধ্যে দেখেছি দুর্ভিক্ষের করাল গ্রাস থেকে বেরিয়েই ভারতের সঙ্গে চীনের সীমান্তযুদ্ধ, অতঃপর সফল পারমাণবিক বিস্ফোরণ; দেশের সমাজব্যবস্থা উথাল-পাতাল করা সাংস্কৃতিক বিপ্লব, অতঃপর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল সংস্কার সাধন; মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে তিক্ততা আর সংঘাত, অতঃপর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংস্কার-উত্তর গণচীনের বলিষ্ঠ উপস্থিতি; আর সবকিছুর মধ্যে অবিশ্বাস্য গতিতে উন্নয়নের পথে দেশটির অগ্রযাত্রা। বিস্ময়কর চীন!
চলতি বছর, অর্থাৎ ২০০৮ সালের চীনের ঘটনাবলি দেশটির সামগ্রিক বিবর্তনের ধারাবাহিকতারই একটি প্রতিচ্ছবি। ২০০৮ সালের মে মাসে সিছুয়ান প্রদেশে ভয়াবহ ভুমিকম্প, অতঃপর বেইজিংয়ের সফলতম বিশ্ব অলিম্পিক; বিষাক্ত মেলামাইনমিশ্রিত দুষিত গুঁড়ো দুধ উৎপাদন, বাজারজাতকরণ আর রপ্তানির গ্লানিকর কেলেঙ্কারি, অতঃপর মহাশুন্যে চীনের নভোচারীদের সফল বিচরণ; এ হলো মূলত চীনের এই বছরের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি অভিজ্ঞতা।
ঢাকার বাংলাদেশ-চীন গণমৈত্রী সমিতির সদস্য হিসেবে বেইজিংয়ের বহুল প্রচারিত ঐতিহ্যবাহী দৈনিক পিপলস ডেইলি পত্রিকার পক্ষ থেকে এক সপ্তাহের চীন সফরের আমন্ত্রণ চীনের এ বছরের ঘটনাবলি সম্পর্কে নিবিড়তর জ্ঞান লাভের সুযোগ এনে দিল। আমন্ত্রিত পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদলে আমি ছাড়া আরও ছিলেন বাংলাদেশ-চীন গণমৈত্রী সমিতির সভাপতি প্রবীণ ব্যাংকার আনোয়ারুল আমিন, সাহিত্যিক, কবি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সাবেক অধ্যাপিকা ড. রাজিয়া খান আমিন; সাবেক ব্যাংকার, শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী ওবায়েদুর রহমান খান এবং ব্যাংক কর্মকর্তা কাজী আনিসুল কবির। তাঁদের মধ্যে আনোয়ারুল আমিন কার্যসুত্রে চীনে কাটিয়েছেন সুদীর্ঘ সাতটি বছর, চীনের নেতা তেং শিয়াও পিংয়ের সংস্কার (বাংলাদেশের রাজনীতির বর্তমান ‘সংস্কার’ ব্যবহূত অর্থে নয়!) যুগের প্রত্যক্ষদর্শী তিনি, চীনব্যাপী সফরের তাঁর রয়েছে বিপুল অভিজ্ঞতা; রাজিয়া খান আমিন পেশায় শিক্ষক, স্বনামধন্য সাহিত্যিক, চীনের সঙ্গে যাঁর প্রত্যক্ষ পরিচয়ের সুত্রপাত আশির দশকের প্রথম ভাগে, যখন তিনি ছিলেন বাংলাদেশ থেকে চীনে আমন্ত্রিত লেখকদের একজন, অতঃপর যিনি চীন সফর করেছেন বহুবার আর ওবায়েদুর রহমান খান যাঁর রয়েছে ব্যবসায়ী হিসেবে চীন সফরের পূর্ব অভিজ্ঞতা। প্রথমবারের মতো চীন সফরকারী ছিলেন আমাদের কনিষ্ঠতম সহযাত্রী কাজী আনিসুল কবির। আমাদের দলে ছিল প্রবীণ আর নবীনের প্রীতিদায়ক সংমিশ্রণ।
আগ্রহ-উদ্দীপক এ সফরটির ধারাবাহিক বর্ণনার প্রচেষ্টা এই নিবন্ধটিতে নেই। চীনের ঘটনাবহুল একটি বছরের আলোকে দেশটিতে সফরকালে আহরিত কিছু ধারণাই এখানে ব্যক্ত করব। প্রথমেই প্রয়োজন রয়েছে আমাদের আমন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় তুলে ধরার।
পিপলস ডেইলি চীনা ভাষায় বেইজিংয়ের রেনমিন রিবাও দৈনিক সংবাদপত্রের শিরোনামেরই ইংরেজি অনুবাদ। রেনমিন রিবাও চীনের সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা, বর্তমান প্রচারসংখ্যা ২৩ লাখ ৪০ হাজার। অন লাইন রেনমিন রিবাও দিনে গড়পড়তা ১০ লাখ লোক পড়ে থাকে। ৪০০ সাংবাদিককে নিয়ে রেনমিন রিবাও-এ কর্মরত আছেন ১০ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। পত্রিকাটি চীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান মুখপত্র এবং ১৯৪৯ থেকেই বেইজিং থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। বেইজিং শহরের কেন্দ্রেই পত্রিকাটির হেড অফিস; সাংবাদিক ও অন্য কর্মীদের জন্য রয়েছে পত্রিকার নিজস্ব আবাসিক এলাকা। আমাদের চীন সফরে পত্রিকাটির উষ্ণ আতিথেয়তা শুধু বেইজিংয়েই নয়, উপভোগ করেছি সাংহাই ও কুনমিংয়েও। রেনমিন রিবাও-এর সুবাদেই আমরা সাংহাইয়ের দৈনিক পত্রিকা জি ফাং (যার প্রথম প্রকাশ চীনের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন) এবং কুনমিংয়ের য়ুনান পত্রিকাগোষ্ঠীর সাংবাদিক আর কর্মকর্তাদের সঙ্গে মিলিত হয়েছি।
বেইজিং থেকে সাংহাই আর কুনমিং সফরে আমাদের সহগামী হলেন আমাদের আমন্ত্রণকারী রেনমিন রিবাও অর্থাৎ পিপলস ডেইলি পত্রিকার আন্তর্জাতিক বিভাগের পরিচালক উ চাং শেং। ষাটোর্ধ্ব এ ব্যক্তি চীনের একজন খ্যাতনামা সাংবাদিক−তাঁর সহকর্মীদের শ্রদ্ধার পাত্র। আমাদের সফর যাতে আরামদায়ক হয় তার প্রতি তাঁর ছিল শ্যেনদৃষ্টি। বিভিন্ন চলতি বিষয়ে তাঁর মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গি বস্তুনিষ্ঠ এবং আগ্রহ-উদ্দীপক। যেমন−জর্জিয়ার প্রশ্নে চীন কেন রাশিয়াকে খোলাখুলি সমর্থন দিচ্ছে না, আমার এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, ‘দেখুন, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ক সম্ভাবনাময়, কিন্তু জটিল। একটি ঘটনায় ঝট করে কিছু বলে অবস্থাকে আমরা ঘোলাটে করতে চাই না। তা ছাড়া চীনের অঙ্গনেও তো আমাদের সমস্যা রয়েছে (তিব্বত আর সিংকিয়াং)। চীনের উচিত সাবধানতা অবলম্বন করা।’ আমার চেয়ে বয়সে কম হলেও তিনিও যথেষ্ট প্রবীণ। কিন্তু আমি কখনো ভুলব না যে চীন সফরের সময় আমার হাতের ট্রলি ব্যাগটিকে তিনি নিজে বয়ে বেড়িয়েছেন! আমাকে নিবৃত্ত করতে গিয়ে বলেছেন, ‘দেখুন, বয়সে আমি আপনার চেয়ে ছোট। আপনি আমাকে ট্রলি ব্যাগটি নিতে দিন।’ চীনের নাটকীয় অর্থনৈতিক অগ্রগতি তাদের ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধে এখনো আঘাত হানেনি। উ চাং শেং ছাড়া আমাদের সঙ্গে সর্বক্ষণ ছিলেন জাং পেই, পিপলস ডেইলির এশিয়া বিভাগের তরুণ কর্মী। আমাদের সফর ফলপ্রসু করে তুলতে সহায়তা করাই ছিল তাঁর প্রধান দায়িত্ব। অত্যন্ত কর্তব্যবোধ রয়েছে তাঁর কাজকর্মে, দক্ষ চটপটে এবং আমাদের মতো প্রবীণপ্রধান একটি দলের দেখাশোনা করার জন্য তাঁর রয়েছে অপরিসীম ধৈর্য। বয়স্কদের সীমাবদ্ধতা আর দাবি-দাওয়া তো বেশিই হয়ে থাকে।
চীনের খাওয়াদাওয়া স্বাদে, বর্ণে, গন্ধে আর বৈচিত্র্যে অতুলনীয়। চীনের কুনমিংয়ে আমাদের বিদায়ী নৈশভোজের মেন্যুটি সঙ্গে নিয়ে এসেছি। তাতে ছিল ছয় প্রকার ঠান্ডা এবং চার রকম গরম, প্রারম্ভিক (স্টার্টার) ডিশ দিয়ে খাওয়ার সুচনা হলো। আর তারপর? তার যেন আর ‘পর’ নেই। মাছের দুই প্রকার ‘শাসিম’, মুরগির গোশতের মন্ডের সঙ্গে সামুদ্রিক প্রাণী ‘স্কেলপ’, বাদামি সসের সঙ্গে ভাজা গলদা চিংড়ি, আবালনি সসের মধ্যে গরুর স্টেক, মুরগির মাংস আর ভাজা মাশরুম, ভাপা পেশি আর চিংড়ির ডিম, মাশরুমের গুঁড়ি আর ধনে, ভাপানো ম্যান্ডারিন মাছ আর মরিচ, ব্যাঙের ছাতা, মিষ্টি আলু আর নুডলস স্যুপ। চীনা খাবারের অভিনবত্ব তুলনাবিহীন। তবে মনে হলো চীনা মেন্যুতে কিছুটা পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগছে। বহির্বিশ্বের কিছু গ্রহণযোগ্য খাবার তাতে ঠাঁই পাচ্ছে। একাধিক ভোজসভায় কিছু জাপানি পদ, যেমন−‘শাসিম’ আর ‘স্টেক’ পরিবেশিত হলো−আগে যা দেখা যেত না। চীনাদের পানীয় পান কিছুটা হ্রাস পেয়েছে বলে মনে হলো, সিগারেটও। মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভুতির প্রতি তারা বিশেষ নজর দেওয়ার চেষ্টা করে। যেমন−বেইজিংয়ের হোটেলে লক্ষ করলাম যে লেখার টেবিলের ড্রয়ারে কিবলার দিকনির্দেশনা রয়েছে। তবে এ ব্যবস্থাটি আমাদের জন্য নির্ধারিত কামরাগুলোয় ছিল কি না, তা যাচাই করা হয়নি।
কুনমিংয়ে আমরা ছিলাম সরকারি অতিথি ভবনে। সেখানে আমাদের খাবার খেতে হয়েছিল একটি বিশেষ কামরার নিভৃতে, ডাইনিং হলে নয়, কারণ সেখানে হালাল খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না। এমনকি আমাদের খাবার বাসনপত্রে আরবি অক্ষরে ‘হালাল’ শব্দটি লেখা ছিল। বাণিজ্যিক হোটেল রেস্তোরাঁয় (কেবল মুসলমান রেস্তোরাঁ ছাড়া) এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা আছে বলে মনে হয়নি। দুবাই ক্লাব সাংহাইয়ের একটি অভিজাত রেস্তোরাঁ। মালিক তার একজন অস্ট্রেলিয়ান তরুণ মিলিওনিয়ার, যিনি রেস্তোরাঁর একজন সহকারীর ভাষায় তাঁর নিজের জেট বিমানে বিশ্বময় ঘুরে বেড়ান। সেই রেস্তোরাঁটির নামকরণ করা হয়েছে আরব পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য। প্রবেশদ্বারে রয়েছে কাবা শরিফের ছবি এবং আরবি হরফে ‘আল্লাহ’ আর ‘মোহাম্মদ’ লেখা একটি বড় ফ্রেম। তরুণ অস্ট্রেলীয় উদ্যোক্তা সাধারণ আরব পর্যটকদের অভ্যাস সম্পর্কে জ্ঞাত আছেন বলেই মনে হলো! চীনা খাবারে কার্বোহাইড্রেট কম আর প্রোটিনের মাত্রা বেশি। তাই ‘ফাস্ট ফুড’ এখনো চীনে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। আমেরিকানদের মতো মেদবহুল চীনাদের সংখ্যা কম−সাংহাইয়ের মতো সচ্ছল উচ্চমধ্যবিত্তের মধ্যেও।
চীনারা অতিথিপরায়ণ। অবশ্য ঔৎসুক্য প্রকাশ চীনা চরিত্রের পরিপন্থী। তবে এটা নিশ্চিত যে বাংলাদেশের মতো দেশ এখন চীনের আগ্রহের কেন্দ্র থেকে কিছুটা দুরেই সরে গেছে। চীনের লক্ষ্য এখন সুদুরপ্রসারী। অতএব, যোগাযোগব্যবস্থার ফলে আগের চেয়ে অনেকটা কাছে এলেও চীনকে মাঝেমধ্যে কিছুটা দুরেরই মনে হলো।
মেলামাইন মিশ্রিত গুঁড়ো দুধের কেলেঙ্কারি নিয়ে চীনারা খুবই বিব্রত। অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তাঁরা জানালেন। মুক্তবাজার অর্থনীতির এই কুফলটি পুরো দেশকে যেন নাড়া দিয়েছে। চীনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী এর জন্য প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। পদত্যাগ করেছেন মন্ত্রীপদমর্যাদার ‘কোয়ালিটি কন্ট্রোল’ কর্মকর্তা। প্রায় ৩০ জনকে এ বিষয়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ সাজা হলো মৃত্যুদন্ড (ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে)। ৫৪ হাজার চীনা শিশু এই বিষাক্ত দুধের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে, যার মধ্যে চারজনের মৃত্যু ঘটেছে। তবে চীনের খাদ্য পরিদর্শন দপ্তর আনুষ্ঠানিকভাবে এমন ঘোষণা করেছে, প্রায় ২৪টি শহর থেকে ৭৫টি ব্র্যান্ডের দুধ পরীক্ষা করে তারা এখন নিশ্চিত যে এখন আর বিষাক্ত দুধ বাজারে নেই। চীনারা নিশ্চয়তা প্রদান করে যে এমনটি আর হবে না এবং দোষীদের যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে, এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ আছে বলে আমার মনে হয়নি।
এসবের মধ্যে চমক সৃষ্টি করেছিলেন সেচুয়ান প্রদেশের চাং ডু নামের এক মা। তাঁর বুকে তাঁর তিন মাসের সন্তানের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দুধ রয়েছে বলে তিনি দিনে ৪৪ ডলারের বিনিময়ে নবজাত একটি শিশুর দায়িত্ব নেবেন বলে ঘোষণা করেন। কিন্তু খদ্দের তার জোটেনি! যেহেতু চীনে একটির বেশি সন্তান লাভ আইনবিরোধী−তাই শিশুদের প্রশ্নে চীনা মা-বাবারা খুবই স্পর্শকাতর। ‘আপনার কতজন ছেলেমেয়ে?’ এ প্রশ্নটি চীনে অবান্তর। সঠিক প্রশ্ন হবে, ‘আপনার সন্তান ছেলে না মেয়ে?’
আমাদের সফরকালে দুষিত দুধের বিব্রতকর ঘটনার গ্লানিকে বহুলাংশে হ্রাস করল চীনা নভোচারীদের সেনচৌ-৭ নভোযানে সফল মহাকাশ যাত্রা এবং প্রথমবারের মতো তাদের একজন, জাই জিগাংয়ের মহাকাশে বিচরণ। জাই জিগাং মহাকাশ থেকে ধরার ধুলায় অবতীর্ণ হয়ে বললেন, ‘আমি আমার মাতৃভুমির সাফল্যে গর্বিত।’ যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পর চীন পৃথিবীর তৃতীয় দেশ এই গৌরব অর্জন করল। তাদের মাতৃভুমির তরফ থেকে এই তিনজন নভোচারীকে কৃতজ্ঞতা আর ধন্যবাদ জানালেন প্রেসিডেন্ট হু চিন থাও এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন চিয়া পাও। তার কয়েক দিন আগেই এই দুই নেতা গুঁড়ো দুধ কেলেঙ্কারির জন্য সবার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন। সাফল্য আর ব্যর্থতা−দুই ক্ষেত্রেই চীনের নেতারা রয়েছেন তাঁদের দেশবাসীর পাশে। সাফল্যে উল্লাস প্রকাশের সঙ্গে মিশে আছে চীনাদের গভীর নীরব দেশপ্রেম আর গর্ববোধ। তাঁদের অতীতকে তাঁরা বিচার করেন বর্তমানের সাফল্যের মাপকাঠিতে। একটি অভিজ্ঞতা ভুলবার নয়। মহাকাশ অভিযানে চীনের সাফল্যের পরদিনই আমরা সাংহাইয়ে একটি ঐতিহাসিক ভবন দেখতে গিয়েছিলাম। ক্ষুদ্র এ ভবনটিতে ১৯২১ সালের ২৩ জুলাই চীন কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম জাতীয় কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়েছিল গোপন অনাড়ম্বরতায়। আমাদের ভবনটিতে যাওয়ার দিনে চীনের পত্রপত্রিকায় ব্যানার হেডলাইন ছিল চীনা নভোচারীদের নিয়ে। ইংরেজি দৈনিক China Daily-তে ছিল আবেগাপ্লুত শিরোনাম, ‘Bringing dream from the stars’−তারকারাজি থেকে স্বপ্ন ছিনিয়ে আনা। সেদিন সাংহাইয়ে ঐতিহাসিক সেই ভবনটির সামনে দেখলাম এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে আছেন সেই দিনের চীনা একটি দৈনিক সংবাদপত্র তুলে ধরে। যাতে ছবি রয়েছে মহাশুন্যে চীনের নভোচারীর জাতীয় পতাকা আন্দোলিত করার−দাঁড়িয়ে রয়েছেন নীরব অহংকারে। চীনের জাতীয় পতাকা চাঁদের বুকে শোভা পাবে−সেই স্বপ্নটির বাস্তবায়নই এখন চীনের মহাকাশ লক্ষ্য, যা তারা ২০২০ সালের আগেই অর্জন করার আশা রাখে।
হাজারো প্রতিকুলতার মধ্যে চীন ২০০৮ সালের অলিম্পিক অনুষ্ঠিত করল। প্রথমত ছিল মানবসৃষ্ট প্রতিকুলতা। চীন যাতে সুষ্ঠুভাবে অলিম্পিক অনুষ্ঠিত করতে না পারে, তা নিয়ে কিছু কিছু পাশ্চাত্য মহলে চেষ্টার অন্ত ছিল না। প্রথমে চীনের মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হলো, তিব্বত সমস্যায় ইন্ধন জোগানো হলো, সিংকিয়াংয়ে অসন্তোষ ছড়িয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা হলো। বেইজিংয়ের পরিবেশ স্বাস্থ্যকর নয়, সেই প্রচারণাও চলল বিভিন্ন দেশের প্রতিযোগীদের অলিম্পিকে অংশ নিতে নিরুৎসাহ করার জন্য−কিন্তু সব প্রচেষ্টাকে বিফল করে চীন ২০০৮ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত করল বিশ্বের সফলতম অলিম্পিক। বেইজিংয়ে স্টেডিয়ামগুলো নির্মিত হলো রেকর্ড সময়ে। চীন দেশে যেকোনো বস্তুর নামকরণে কাব্যিক ব্যঞ্জনা থাকে। এমনকি রাজনৈতিক স্েলাগান তৈরিতেও। বিভিন্ন মতামত প্রকাশের স্বাধীনতার দাবি প্রকাশ করা হয়েছিল এই ভাষায়−‘প্রস্কুটিত হোক শত পুষ্কপ’ (Let a thousand flowers blossom), দ্রুত উন্নয়ন প্রচেষ্টা হলো ‘বিশাল অগ্রমুখী উল্লম্ফন’ (Great Leap Forward), খাবার মেন্যুতে হাঁসের তন্দুরি হূদযন্ত্র হলো ‘অগ্নিস্পর্শী হংস হূদযন্ত্র’ (Flame trached duck hearts)। মনে পড়ে ২০০৩ সালে ইয়াংজি নদীর বাঁধ দেখতে গিয়ে একটি হোটেলে ছিলাম, যার নাম ‘উন্নীলিত পিচফুল’ (Peach blossom Hotel)। কাব্যিক নামকরণের সেই ধারাবাহিকতায় যুক্ত হলো বেইজিং অলিম্পিকের জন্য নির্মিত প্রধান স্টেডিয়ামগুলো, যেমন−‘পাখির নীড়’ (Birds Nest) অথবা ‘তুষার প্রকোষ্ঠ’ (Ice Cubicle)। বেজিংয়ে উল্লিখিত স্টেডিয়াম দুটি দেখলাম, দর্শকদের জন্য তখনো উন্নুক্ত ছিল না বলে দেখতে হলো বাইরে থেকেই−ব্যতিক্রমধর্মী চোখজুড়ানো স্থাপত্য।
কিন্তু চীনের অলিম্পিক প্রচেষ্টায় সবচেয়ে বড় আঘাত হানল প্রকৃতি। ২০০৮ সালের ১২ মে অর্থাৎ বেইজিংয়ে অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা উদ্বোধনের মাত্র তিন মাস আগে সেচুয়ানের ভয়াবহ ভুমিকম্প। তাতে নিহত আর নিখোঁজ হলেন প্রায় ৯০ হাজার মানুষ। আহতের সংখ্যা তিন লাখ। প্রায় ৫৩ লাখ আবাসগৃহ এবং ভবন ধুলিসাৎ হলো, পানি সরবরাহ হলো বিঘ্নিত, কৃষিক্ষেত্রে লাগল চরম আঘাত, হাজারো স্কুল-কলেজ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। চীনের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ ভুমিকম্পগুলোর অন্যতম এই ভুমিকম্পকে কিন্তু চীনারা বেইজিংয়ে তাদের অলিম্পিক প্রস্তুতির ওপর আঘাত হানতে দিল না। একদিনের জন্যও ব্যাহত হলো না অলিম্পিক প্রস্তুতির তাবৎ কর্মকান্ড। বিশ্ব অলিম্পিক অনুষ্ঠিত করাকে একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে চীন নিয়েছিল। মানুষের একাগ্রচিত্ততা আর সংকল্পকে স্তিমিত করতে ব্যর্থ হলো ভয়াবহ এই প্রাকৃতিক দুর্যোগটি। অলিম্পিকের পদক তালিকায় শতাধিক স্বর্ণ, রৌপ্য আর তাম্রপদক অর্জন করে, প্রথমবারের মতো ১৯৬৮ সালে অলিম্পিকে অংশগ্রহণকারী গণচীন, যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়ার চ্যালেঞ্জ উপেক্ষা করে অধিকার করল প্রথম স্থান।
বেইজিং অবস্থানকালে অলিম্পিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় চীনের প্রযুক্তির সাফল্যের একটি নিদর্শন দেখলাম। ২০০৮ সালের ‘অলিম্পিক টর্চ’টি উদ্ভাবন করেছিল বেজিংয়ের অদুরে অবস্থিত বিশ্ববিখ্যাত লেনভো (Lenovo) কম্পিউটার কারখানাটি। ঐতিহ্যবাহী চীনা ‘স্ক্রোলের’ ডিজাইনের অলিম্পিক শিখা বহনকারী টর্চটি উদ্ভাবন করতে মাসের পর মাস পরিশ্রম করতে হয়েছে প্রকৌশলীদের। শিখা বহনকারী এই টর্চটির নাম ‘Cloud of Promise’ (সম্ভাবনার বারিবাহ)। ঘণ্টা দুয়েক ধরে আমরা ঘুরে দেখলাম বিশ্বখ্যাত এই কম্পিউটার কারখানাটি। ১৯৮৫ সালে মাত্র ১১ জন প্রকৌশলী উদ্যোক্তা নিয়ে নাতিবৃহৎ একটি প্রকোষ্ঠে হয়েছিল এর যাত্রা শুরু। ফেরার পথে কুনমিংয়ে দেখলাম মঞ্চে শত শত শিল্পীর সমন্বয়ে একটি বিচিত্রানুষ্ঠান। চীনা সংস্কৃতিকে তুলে ধরা একটি আধুনিক নৃত্যনাট্য। উপস্থাপনায়, ‘Dynamic Yunnan Culture Industry Development’−‘গতিশীল য়ুনান সংস্কৃতি বাণিজ্য উন্নয়ন গোষ্ঠী।’ Culture Industry−‘সংস্কৃতি বাণিজ্য’ শব্দটির ব্যবহার এর আগে কখনো দেখিনি। ঐতিহ্য আর আধুনিকতার সমন্বয়ে বিস্নয়কর চীন।
কুনমিং থেকে ফেরার পথে প্লেনে দেখা হলো বাংলাদেশের সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক আমিনুল ইসলাম বুলবুলের সঙ্গে। তিনি তিন বছরের একটি চুক্তিতে চীনে ক্রিকেটের প্রসারের দায়িত্বে রয়েছেন। ‘খাল কেটে কুমির আনছেন না তো?’ তাঁকে আমার জিজ্ঞাসা।
জবাবে তিনি যা বললেন, তার নির্যাসে বলব, ‘বাংলাদেশ কেন, ক্রিকেটজগৎ সাবধান!’
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শিক্ষা খাতে শুরু হয়েছে তারেক রহমান ম্যাজিক

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১১:২৯


রাজনীতির মাঠে ক্ষমতার হাতবদল যেমনই হোক না কেন, সাধারণ মানুষের আসল নজর থাকে জীবনের মৌলিক জায়গাগুলোতে। আর একটি দেশের ভবিষ্যৎ বদলে দেওয়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো শিক্ষা ব্যবস্থা।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এমন কেন?

লিখেছেন তাই-ফি, ০৯ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৪৪

একটা গল্প দিয়ে শুরু করা যাক।

শেষ বিচারের পর নরকে শাস্তি ভোগ করছে পাপীরা। বিশাল বিশাল তেলের ড্রামে তাদের একবার ডুবিয়ে আবার ভাসিয়ে তোলা হচ্ছে। প্রতিটি ড্রামের সামনে একজন করে পাহারাদার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×