আমদের এই সৌরজগতে ৯ টি গ্রহ এবং ১৬২ টি উপগ্রহ রয়েছে। এই গ্রহগুলো নিজ নিজ কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। সূর্যের সবচেয়ে কাছের গ্রহ থেকে শুরু করে এই ৯ টি গ্রহ যথাক্রমে বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস নেপচুন এবং প্লুটো। এই নয়টি গ্রহের মধ্যে পৃথিবীই একমাত্র গ্রহ যা জীবনধারণের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে।
আসুন জানার চেষ্টা করি গ্রহগুলো কিভাবে নির্দিষ্ট কক্ষপথে থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ শক্তি এবং গ্রহের ঘূর্ণন শক্তির মধ্যে সাম্যতা গ্রহটিকে তার নিজ অক্ষে থাকতে সাহায্য করে। সূর্যের শক্তিশালী আকর্ষণ বল গ্রহটিকে নিজের দিকে আকর্ষণ করে, একে বলা হয় কেন্দ্রমুখী বল। আর ঘূর্ণায়মান গ্রহের বহির্মুখী বল এই আকর্ষণ শক্তির বিপরীত দিকে ক্রিয়া করে। একে বলা হয় কেন্দ্রবিমুখী বল। এই দুটি বল পরস্পর সমান এবং বিপরীত দিকে ক্রিয়াশীল বলে গ্রহটি একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে। যদি গ্রহের এই কেন্দ্রবিমুখী বল কিছুটা কম হতো অর্থাৎ গ্রহের ঘূর্ণন গতিশক্তি কিছুটা কম হতো তবে এটি সমানভাবে সূর্যের আকর্ষণ শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করতে পারত না। সূর্য গ্রহটিকে নিজের দিকে আকর্ষণ করতো। ফলে গ্রহটি ক্রমাগত ক্ষুদ্রতর ব্যাসার্ধের কক্ষপথে পরিভ্রমণ করে একসময় সূর্যের সাথে মিশে যেত। আবার যদি গ্রহের ঘূর্ণন গতিশক্তি বেশী হত তবে এর কেন্দ্রবিমুখী বল সূর্যের আকর্ষণ বল হতে বেশী হত। ফলে সূর্য থেকে গ্রহটির দূরত্ব বাড়তে থাকত। ক্রমাগত বৃহত্তর ব্যাসার্ধের কক্ষপথে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে করতে একসময় গ্রহটি সূর্যের আকর্ষণ শক্তি ছিন্ন করে মহাশূন্যে হারিয়ে যেত। তাই কোনো গ্রহকে তার নির্দিষ্ট কক্ষপথে থেকে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে হলে গ্রহটির উপর সূর্যের আকর্ষণ শক্তি এবং গ্রহটির কেন্দ্রবিমুখী বল সমান হতে হবে। অর্থাৎ সূর্য থেকে দূরত্বের উপর নির্ভর করে গ্রহটিকে একটি নির্দিষ্ট গতিতে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে হবে। অন্যথায় গ্রহটি হয় মহাশূন্যে হারিয়ে যাবে নাহয় সূর্যের সাথে মিশে যাবে। এই সাম্যতা আমাদের পৃথিবীর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদি এই দুটি বলের মধ্যে সাম্যতা না থাকত অর্থাৎ পৃথিবী যদি একটি নির্দিষ্ট গতিতে পৃথিবী সূর্যকে প্রদক্ষিণ না করত তবে পৃথিবীতে প্রানের অস্তিত্ব থাকত না। তাহলে প্রশ্ন এসে যায় বিগ ব্যাং যদি একটি কাঁকতলিয় ঘটনা হয় তাহলে বলের এত সূক্ষ্ম এবং সঠিক সাম্যতা কিভাবে আসে?
নক্ষত্রবিদ্যা থেকে জানা যায়, আমাদের সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলোর সৌর ব্যবস্থার উপর আমাদের পৃথিবীর নিরাপত্তা এবং ব্যবস্থা নির্ভরশীল। বৃহস্পতি গ্রহ এর একটি চমৎকার উদাহরণ। আমাদের সৌরজগতে এই গ্রহটির নির্দিষ্ট অবস্থান পৃথিবীর সৌর ব্যবস্থার সাম্যতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নক্ষত্র গতি বিদ্যার গননার মাধ্যমে পাওয়া গেছে যে, বৃহস্পতির বর্তমান অবস্থান সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহগুলোকে তাদের নির্দিষ্ট কক্ষপথে থাকতে সাহায্য করে। বৃহস্পতি গ্রহের মতো বৃহৎ গ্রহ অন্যান্য সৌর ব্যবস্থায়ও পাওয়া গেছে। কিন্তু সেসব গ্রহ তাদের নিজ সৌর ব্যবস্থায় এতটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না। ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির নক্ষত্র বিজ্ঞানের প্রফেসর পিটার ওয়ার্ড একে এভাবে তুলে ধরেন “All the Jupiters seen today are bad Jupiters. Ours is the only good one we know of. And it’s got to be good, or you’re thrown out into dark space or into your sun”
পৃথিবীর উপর বৃহস্পতি গ্রহের কার্যকারিতা এতোটাই যে যদি এই গ্রহটি না থাকত তবে পৃথিবীতে প্রানের সৃষ্টি হতে পারত না। বৃহস্পতি গ্রহের সৃষ্ট চুম্বকীয় ক্ষেত্র উল্কা এবং ধূমকেতুগুলোর গতিপথ বদল করে আমাদের পৃথিবীর সৌর ব্যবস্থায় প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করে এবং পৃথিবীকে এসব উল্কা এবং ধূমকেতুর লক্ষ্যবস্তু হওয়া থেকে রক্ষা করে।
বৃহস্পতি গ্রহের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজের কথা উল্লেখ করেন নক্ষত্রবিদ জর্জ ওয়েদারহিল তার “How Special Jupiter Is” আর্টিকেল এ। তিনি বলেন “Without a large planet positioned precisely where Jupiter is, the earth would have been struck a thousand times more frequently in the past by comets and meteors and other interplanetary debris. If it were not for Jupiter, we wouldn't be around to study the origin of the solar system.”
গবেষণার মাধ্যমে জানা গেছে যে পৃথিবী এবং এর উপগ্রহ চন্দ্রের মধ্যে যে সৌর ব্যবস্থা বিদ্যমান তা সৌরজগতের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই দুটির অনুপস্থিতিতে বৃহস্পতি গ্রহের আকর্ষণ শক্তি শুক্র ও বুধ গ্রহের স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করত। এই আকর্ষণ শক্তি এই দুটি গ্রহের মধ্যে দূরত্ব ক্রমান্বয়ে কমিয়ে আনত। ফলে একসময় বুধ সৌর জগত হতে ছিতকে যেত এবং শুক্র গ্রহের কক্ষপথ পরিবর্তিত হতো। বিজ্ঞানীরা আমাদের সৌরজগতের কম্পিউটার মডেল তৈরি করে দেখতে পান যে গ্রহ গুলোর মধ্যকার এই order এবং সামঞ্জস্যতা যা বিলিয়ন বছর ধরে রয়েছে তা গ্রহগুলোর সঠিক ভর এবং অবস্থানের কারনেই সম্ভব হয়েছে। যদি এই order, ভর বা অবস্থানের কিছুটা পরিবর্তন হতো তবে আমাদের সৌরজগত ও পৃথিবীর অস্তিত্ব থাকত না।
The Astronomical Journal এর ১৯৯৮ সালের নভেম্বর মাসের সঙ্কলনে বলা হয় ‘Our basic finding is nevertheless an indication of the need for some sort of rudimentary "design" in the solar system to ensure long-term stability”
অন্যকথায়, এই সৌরজগত এবং এর ব্যবস্থা মহান আল্লাহতায়ালা মানুষের বসবাসের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য সৃষ্টি করেছেন । তিনি কোরআনে বলেছেন “তিনি তোমাদের কল্যাণের জন্য রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্রকে বশীভূত করে রেখেছেন এবং সমস্ত তারকাও তাঁরই হুকুমে বশীভূত রয়েছে। যারা বুদ্ধিবৃত্তিকে কাজে লাগায় তাদের জন্য রয়েছে এর মধ্যে প্রচুর নিদর্শন। (আন নাহল। ১২)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



