মসজিদের কাজ নিছক নামাযের আয়োজন নয়। সুললিত কন্ঠে কোরআন পাঠের আয়োজনও নয়। সে কাজ যে কোন গৃহ, যানবাহন এমন কি উম্মূক্ত ময়দানেও সম্ভব। ফলে এত শ্রম ও অর্থব্যয়ে মসজিদের নির্মান কেন? মুসলিম জনপদে মসজিদের নির্মান কেন অপরিহার্য – সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে মসজিদের গুরুত্ব বুঝতে হবে। নইলে সম্পূর্ণ বিষয়টি অর্থহীন ও গুরত্বহীন মনে হবে। মদিনায় হিজরতের পুর্বে নবীজী (সাঃ) ও তাঁর সাহাবাগণ মসজিদের অভ্যন্তরে নামায আদায়ের সুযোগ পাননি। মক্কায় অবস্থিত আল্লাহতায়ালার শ্রেষ্ঠ ঘরটি তখন কাফের শত্রুদের হাতে অধিকৃত। তারা সেখানে মূর্তি রেখে পুজা করতো।ফলে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীনের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার যে মহান লক্ষ্য নিয়ে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) তাঁর শিশু পুত্র ইসমাঈল (আঃ)কে সাথে নিয়ে যে ক্বাবা ঘর নির্মান করেছিলেন সেটি তার মূল লক্ষ্য থেকেই বিচ্যুত হয়। তখন আল্লাহর দ্বীনের আদি ঘরটি ব্যবহৃত হত আল্লাহর দ্বীনের দুষমনিতে। ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রবিপ্লবের পথে এটি ছিল বড় রকমের বাধা।
কিন্তু নবীজী (সাঃ) ছিলেন সে লক্ষ্যে অবিচল। মদিনায় হিজরত সে বাধা দূর করে দেয়। মদীনায় পৌঁছেই তিনি প্রথম যে কাজে হাত দিলেন সেটি নিজের বাসগৃহ নির্মান নয়। রুটিরুজীর তালাশও নয়। বরং মসজিদের নির্মান। অথচ সে সময় তার সমগ্র দেহ-মন জুড়ে ছিল মক্কা থেকে মদিনা সফরের গভীর ক্লান্তি। সে ক্লান্তি ছিল ৭ দিন ব্যাপী পাহাড়-পর্ব্বত ও ধূসর মরুভূমি অতিক্রমের। ছিল রক্তপিপাসু কাফের সন্ত্রাসীদের লাগাতর তালাশের মুখে তিন দিন অন্ধকার গুহা-বাসের পেরেশানি। কিন্তু সে গভীর ক্লান্তি বা পেরেশানি নিয়ে তিনি কালক্ষেপন করেননি। বরং প্রচন্ড উদ্যোম নিয়ে মসজিদ গড়ায় হাত দিলেন। কিন্তু মসজিদ গড়ায় সেদিন কেন এত তাড়াহুড়া ছিল সে প্রশ্ন আজ ক’জন মুসলমানের? অথচ নবীজীবনে এবং সে সাথে ইসলামের ইতিহাসে সেটাই হল অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, পরবর্তীতে এ মসজিদ মানবজাতির ইতিহাসই পাল্টে দেয়। মদিনার বুকে এটিই ছিল আল্লাহর দ্বীনের প্রথম ইন্সটিটিউশন। সেখান থেকে জন্ম নেয় মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দরতম ও শ্রেষ্ঠতম সভ্যতা -যার কোন তুলনা সমগ্র ইতিহাসে নাই।মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত শুধু মুসলিম ইতিহাসে নয়, সমগ্র মানব ইতিহাসেও গুরুত্বপূর্ণ মাইল ফলক। কারণ, ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের পথে যাত্রা শুরু হয় এ হিজরত থেকেই। নবীজী (সাঃ)র মদিনায় আগমনের দিনটি থেকেই শুরু হয় হিজরী সাল গণনা। দিনটিকে এভাবে শুধু সম্মানিতই করা হয়নি, দিনটির গুরুত্বও বুঝানো হয়েছে।
ইসলামী রাষ্ট্রবিপ্লবের লক্ষ্যে অপরিহার্য হল এমন মানুষের নির্মান যারা আল্লাহতায়ালার দ্বীনের ব্যাপার জ্ঞানবান এবং প্রচন্ড দাযিত্বশীল হল দ্বীনের বিজয় সাধনে। জ্ঞান থেকেই আসে দায়িত্বপালনের চেতনা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালার ঘোষণা হল, একমাত্র জ্ঞানী ব্যক্তিরাই আমাকে ভয় করে। অর্থাৎ আল্লাহভীরু হওয়ার জন্য জ্ঞানী হওয়াটাও জরুরী। কিন্তু সে জ্ঞান সৃষ্টির জন্য জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানও চাই। সে জ্ঞানসৃষ্টি না হলে সমাজে আল্লাহভীরু মানুষের সৃষ্টি অসম্ভব হয়ে পড়ে।আর সেটি না হলে অসম্ভব হয়ে পড়ে দ্বীনের প্রতিষ্ঠা বা বিজয়। নবীজীর (সাঃ)র যুগে মসজিদে শুধু নামাযই হত না, জ্ঞানচর্চাও হত। অপর দিকে কোরআনের জ্ঞান গভীর না হলে নামাযে গভীরতা আসে কতটুকু? জ্ঞানের গভীরতা ও নামাযের গভীরতা একত্রে উঠানামা করে। জ্ঞান বাড়লে যেমন নামাযে একাগ্রতা বাড়ে তেমনি অজ্ঞতায় বাড়ে গাফলতি। ইসলামে তাই শুধু নামায ফরয করা হয়নি, বরং নামাযের আগে জ্ঞানার্জন ফরয করা হয়েছে। তাই নামাযে একাগ্রতা বাড়ানোর লক্ষ্যে লাগাতর ও গভীরতর জ্ঞানচর্চাও চাই। তাই জ্ঞান-বিতরণ শুধু জুম্মার খোতবাতে সীমাবদ্ধ হলে চলে না, সে জ্ঞানের বিতরণ হতে হয় প্রতিদিন সকাল সন্ধায়। নবীজী (সাঃ) মসজিদে নববীর জায়নামাযে বসে সেই কাজটিই আজীবন করেছেন। মুসলিম ইতিহাসে এতবড় সফল বিশ্ববিদ্যালয় আর কোন কালেই নির্মিত হয়। মসজিদে নববীর সে জায়নামায থেকে যতজন জ্ঞানীব্যক্তি তৈরী হয়েছেন, সমগ্র মুসলিম ইতিহাসে আজও তারা সর্বাধিক গর্বের। সে মাপের জ্ঞানী ব্যক্তি নবীজী (সাঃ)র ওফাতের পর আজ অবধি সৃষ্টি হয়নি। সৃষ্টি হয়নি সে মানের নামাযীও।ফলে সে আমলে কয়েক লাখ মুসলমানের হাতে বিশাল ভূ-খন্ড জুড়ে ইসলামি রাষ্ট্র নির্মিত হলেও আজকের প্রায় দেড় শত কোটি মুসলমান সেটি ভাবতেও পারে না। পরবর্তী কালের মুসলমানদের ব্যর্থতা অনেক। তবে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ইসলামি রাষ্ট্র নির্মানে ব্যর্থতা। এবং এ ব্যর্থতার মূল কারণ, মুসলিম বিশ্বের মসজিদগুলো মসজিদে নববীর মডেলে গড়ে উঠেনি। ইঞ্জিন অচল হলে গাড়ী সামনে এগুয় না। মুসলিম সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে সে ইঞ্জিনটি হল মসজিদ। ফলে মসজিদ সক্রিয় না হলে ব্যক্তি, সমাজ বা রাষ্ট্র কোন কিছুই দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় সামনে এগুয় না। তখন নেমে আসে প্রচন্ড স্থবিরতা। সমগ্র মুসলিম বিশ্বে আজ সে স্থবিরতাই পাথরের ন্যায় ভর করে আছে।
মহান নবীজী (সাঃ) বলেছেন, “নামায মোমেনের মীরাজ।” প্রশ্ন হল, মীরাজের অর্থ কী? মীরাজ হল নবীজী (সাঃ)র আসমান জগতের উচ্চমার্গে আরোহন। পৃথিবীর সীমাবদ্ধতা ডিঙ্গিয়ে তিনি মহাকাশে গিয়েছিলেন এবং সেখানে তিনি অজানা সত্যজ্ঞান পেয়েছিলেন। পৌঁছতে পেরেছিলেন মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে। স্বচোখে দেখতে পেয়েছিলেন জান্নাত-দোযখ। পেয়েছিলেন অন্যান্য নবীদের সাক্ষাৎ। সাধারণ মানুষের পক্ষে সে মীরাজ অসম্ভব। তবে যেটি সম্ভব সেটি হল আল্লাহর সাথে মোমেনের ঘনিষ্ট সম্পর্কের স্থাপনা। আর সেটি গড়ে উঠে নামাযের মাধ্যমে। এবং সেটি একনিষ্ট ইবাদতের পাশাপাশি ইসলামী ইলমের বরকতে। ইসলামি পরিভাষায় সে জ্ঞানই হল মারেফত। সে মারেফত যাতে সাধারণ ঈমানদারদের মাঝেও সৃষ্টি হয় সে জন্য মীরাজের রাত্রে নবীজী (সাঃ)কে নামাযের বিধান দিয়ে এ দুনিয়াতে ফেরত পাঠানো হয়। নামায হল আল্লাহতায়ালার সাথে মোমেনের বাঁধন। এটি দেয় আল্লাহর সান্নিধ্য লাভে গভীর ধ্যানমগ্নতা। হাদীসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি নামায থেকে গাফেল হল তার গলা থেকে আল্লাহর রশি ঢিল হয়ে গেল। মোমেনের জীবনে নামায তখনই মীরাজে পরিণত হয় যখন সেটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে (সাঃ)র নির্দেশিত পথে হয়। তাই একাকী ঘরে বসে নামায পড়লে সেটি মীরাজ হয় না। কারণ সেটি নবীজী (সাঃ)র সূন্নত নয়। এমন নামাযে মহান আল্লাহর সাথে মজবুত সম্পর্কও গড়ে উঠে না। অথচ মহান আল্লাহর মিশনের সাথে একাত্মতার স্বার্থে তাঁর সাথে রুহানী সম্পর্কটাও মজবুত হওয়া জরুরী।
ইসলামে নামায পড়া ফরয। আর জামায়াতে নামায আদায় ওয়াজেব -তথা ফরযের কাছাকাছি। বোখারী শরিফের হাদীসে বলা হয়েছে, জামায়াতে নামায পড়ার সওয়াব একাকী নামায আদায়ের চেয়ে ২৭গুণ অধিক। আর সে সওয়াব আরো অধিক যদি সে নামায মসজিদের জামায়াত আদায় হয়। নবীজী(সাঃ)র কাছে মসজিদে জামায়াতে শামিল হওয়াটি নিছক সওয়াব হাসিলের বিষয় নয়। মসজিদের জামায়াত থেকে দূরে থাকাটি তাঁর কাছে শাস্তিযোগ্য অপরাধ রূপে গণ্য হয়েছে। আর সে শাস্তিটি তিনি দিতে চেয়েছেন তাদের ঘরবাড়ী জ্জালিযে দিয়ে। মসজিদ থেকে দূরে থাকার জন্য এর চেয়ে কঠোর হুশিয়ারি আর কি হতে পারে? এ বিষয়ে হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্নীত হাদীসটি হল নিম্মরূপ। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, “ যাঁর হাতে আমার জান তাঁর কসম! আমি মনস্থ করেছি, আমি জ্বালানি কাঠের সংগ্রহে নির্দেশ দিব। তারপর নামায আদায়ের নির্দেশ দিব। নামাযের ইক্বামত বলা হবে এবং লোকদের ইমামতি করার জন্য কোন একজনকে নির্দেশ দিব। এরপর আমি নামাযে অনুপস্থিত লোকদের বাড়ী যাব এবং বাড়ীগুলো জ্বালিয়ে দিব।” -সহীহ আল বোখারী।
মসজিদে জামায়াতে নামায পড়ার প্রতি সাহাবাদের আগ্রহ এতটাই গভীর ছিল যে কোন মসজিদের জামায়াতে নামায পেলে তাঁরা অন্য মসজিদে ছুটতেন। এরূপ ছুটাছুটির প্রতি কদমে রাখা হয়েছে প্রচুর সওয়াব। হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণীত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, কোন ব্যক্তি যখন ভাল ভাবে ওজু করে মসজিদের দিকে বের হয় এবং একমাত্র নামাযের জন্যই বের হয় তখন তার প্রতিটি কদমে পদমর্যাদা বৃদ্ধি পায় এবং মাফ করে দেওয়া হয় তার একটি গুনাহ। নামায পড়ে যতক্ষণ সে জায়নামাযের উপর অবস্থান করে ফেরেশতাগণ তার জন্য ততক্ষণ এই বলে দোওয়া করে, “হে আল্লাহ! তাকে তোমার রহমত দান কর, তার প্রতি অনুগ্রহ কর।” – সহীহ আল বোখারী। মোমেনের মর্যাদা এভাবে আল্লাহর ঘরে দিনে পাঁচবার ছুটাতেই বাড়ে, নিজ ঘরে বা পীরের দরবারে ধ্যানে বসাতে নয়। মহান আল্লাহতায়ালা নেকী বা রহমত বিলি করেন তাঁর নিজ ঘর মসজিদ থেকেই, পীরের খানকাহ থেকে নয়। ফেরেস্তারাও তাঁদের জন্য আল্লাহর দরবারে দোয়া করেন। হাদীসে বলা হয়েছে,“যতক্ষণ সে মসজিদে নামাযের অপেক্ষায় থাকে ততক্ষণ তার জন্য নামাযের সওয়াব লেখা হয়। অপেক্ষাকালীন সে সময়টুকু ধরে সে মহান আল্লাহর মেহমান।”
আল্লাহর দ্বীনের প্রতিষ্ঠায় অংশগ্রহণ সে ব্যক্তির পক্ষে অসম্ভব যার মধ্যে আল্লাহর যিকর বা স্মরণই নেই।আল্লাহর স্মরণশূণ্য এমন ব্যক্তির মাঝে তখন যেটি সব সময় স্মরণে থাকে সেটি হল ব্যক্তি, গোষ্ঠি, বর্ণ, জাতি,দল বা ফেরকাগত স্বার্থ চেতনা। আল্লাহর দ্বীনের বিজয়-ভাবনা তার কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়। সমাজ বা রাষ্ট্র জুড়ে পবিত্রতা প্রতিষ্ঠার আগে ইসলাম চায় ব্যক্তির চেতনায় পবিত্রতা। চায় চেতনায় আল্লাহর দ্বীনের বিজয়ের নিরবিচ্ছিন্ন ভাবনা। এবং সেটি সম্ভব অবিরাম যিকরের মাধ্যমে। পবিত্র কোরআনের ভাষায়, নামায নিজেই সেই যিকর তথা আল্লাহর স্মরণ। প্রতিদিন ৫ বার মসজিদে নামাযে হাজির হওয়াতে মোমেনের জীবনে সে যিকর বা স্মরণ গভীরতর হয়। মানব জীবনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের কারণ দারিদ্র্য নয়, স্বাস্থ্যহীনতাও নয়। বরং সেটি আল্লাহরর যিকরশূণ্যতা। আল্লাহর যিকর তথা স্মরণ বিলুপ্ত হলে লোপ পায় আল্লাহর ভয়। মানুষ তখন পাপকর্মে লিপ্ত হয় এবং জাহা্ন্মামের পথযাত্রী হয়। আর নামায আল্লাহর সে স্মরণকেই মোমেনে মনে সব সময় জাগ্রত রাখে। তবে আল্লাহর যিকরের অর্থ শুধু তাঁর নামে তাসবিহ পাঠ নয়, বরং ঈমানদারের প্রতি আল্লাহতায়ালার আহব্ন ও সে আহবানের প্রতি নিজস্ব দায়িত্বের স্মরণ। ঈমানদারের প্রতি মহান আল্লাহর আহবানটি এসেছে এভাবেঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর সাহাযকারী হয়ে যায়।” –সুরা সাফ। আরো বলা হয়েছে, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য কর তবে আল্লাহও তোমাদেরকে সাহায্য করবেন। এবং তোমাদের পদযুগলকে মজবুত অবস্থায় প্রতিষ্ঠিত করবেন।” -সুরা মুহাম্মদ। প্রশ্ন হল, মোমেন আল্লাহর সাহায্যকারি হবে কোন কর্মে? সে বিষয়েও সুস্পষ্ট ঘোষণাট এসেছে পবিত্র কোরআনে। সেটি হল আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ। বলা হয়েছে, “তোমরা সংখ্যায় কম হও বা অধিক হও, বেরিয়ে পড় আল্লাহর রাস্তায় এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর নিজেদের জানমাল দিয়ে। সেটিই তোমাদের জন্য কল্যাণকর যদি তোমরা বুঝতে।” –সুরা তাওবাহ। এখানে বিশাল বাহিনী গড়া বা সমরসজ্জা গড়ে তোলার অপেক্ষায় বসে থাকার অবকাশ নেই। প্রশ্ন হল, মোমেন কেন আল্লাহর রাস্তায় বের হবে এবং কেনই বা জিহাদ করবে। তাদের সে লড়ায়ে লক্ষ্য বা এজেন্ডা কি? সেটি হল মহান আল্লাহর উদ্দেশ্য ও এজেন্ডার সাথে পরিপূর্ণ একাত্মতা। আল্লাহর লক্ষ্য অর্জনে আল্লাহতায়ালার পূর্ণ সাহায্যকারি হয়ে যাওয়া। মহান রাব্বুল আলামিনের স্বঘোষিত সে লক্ষ্যটি হল, “সকল ধর্ম,মত ও মতবাদের উপর আল্লাহর সত্যদ্বীনের (বিশ্বব্যাপী) পরিপূর্ণ বিজয়।–সুরা সাফ। মহান আল্লাহর এ এজেন্ডার সাথে একাত্ম হওয়ার চেয়ে মোমেনের জীবনে আর কোন গুরুত্বপূর্ণ বা মহৎ এজেন্ডা, ব্যবসা-বাণিজ্য বা কাজকর্ম কি থাকতে পারে? থাকতে পারে কি নাযাতের ভিন্ন পথ? আল্লাহর আযাব থেকে মৃক্তির উপায় যে ঘরে বসে নিছক তাসবিহ পাঠ নয় বা নিছক নামায-রোযার মাঝে ইবাদত-বন্দেগীকে সীমাবদ্ধ করা নয় বরং সেগুলির সাথে জিহাদের পথে নিজের জানমালের পরিপূর্ণ বিণিয়োগ -সে বিষয়ে মহান আল্লাহতায়ালা কোনরূপ অস্পষ্টতা রাখেননি। বলেছেন, “হে ঈমানদারগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসার কথা স্মরণ করিয়ে দিব যা তোমাদেরকে জাহান্নামের কঠিন আযাব থেকে মুক্তি দিবে? সেটি হল, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর বিশ্বাস কর। এবং জানমাল দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ কর।” -সুরা সাফ। মহাল আল্লাহর আরো ঘোষণা দিয়েছেনঃ “তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল অবশ্যই থাকতে হবে যারা ন্যায়কর্মের আদেশ দিবে এবং অন্যায়কে রুখবে। এবং তারাই হল সফলকাম।” -সুরা আল ইমরান।
আর যেখানেই অন্যায়কে রুখার প্রচেষ্ঠা সেখানে জিহাদ অনিবার্য। কারণ ফিরাউন-নমরুদ-আবু লাহাব-আবুজেহেলের মত সমাজের অন্যায়কারিরা কখনই সমাজে অন্যায়ের চর্চা বন্ধ হতে দিতে রাজী নয়। কারণ এমন অধর্মই তাদের ধর্ম। দুর্বৃত্তিই তাদের সংস্কৃতি। সে অধর্ম ও দুর্বৃত্তি রুখতে গেলে সংঘাত অনিবার্য। তাই যে সমাজে মুসলমানের বসবাস আছে অথচ ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা জিহাদ নাই সেটি নিতান্তই অভাবনীয়। সেটি কোন জ্বলন্ত আগুণে উত্তাপ না থাকার মত ব্যাপার। ন্যায়ের স্থলে অন্যায়-অধর্মকে সয়ে যাওয়ার রীতি নবীজী (সাঃ)র সময় যেমন ছিল না, মুসলিম সমাজে আজও সেটি থাকতে পারে না। এটি মুসলমানের মৌলিক দায়িত্ববোধ ও দায়িত্বপালনের বিষয়। এমন দায়িত্ববোধের কারণে প্রতিটি মুসলমান তাই আমৃত্যু সৈনিক। এবং প্রতিটি মুসলিম জনপদ্ই হল সদাজাগ্রত সেনানীবাস। আর মসজিদ হল সে সেনানীবাসের হেডকোয়ার্টার। মসজিদের ইমাম হল স্থানীয় কমান্ডার। মুসলিম সৈনিক পায় সেখানে আধ্যাত্মিক প্রশিক্ষণ। পায় জ্ঞান। পায় প্রাত্যহীক কমান্ড। পায় তার নিজ কর্তব্য ও দায়িত্ব পালনে প্রত্যহ ৫ বার তাগিদ। কোন সৈনিক যদি সেনানীবাসের প্রতিদিনের মহড়ায় হাজিরা না দেয় তাকে কি সৈনিক বলা যায়? বিনা কারণে হাজিরা না দিলে সৈনিক জীবনেরই অচিরেই অবসান ঘটে। কারণ যে ব্যক্তি প্রশিক্ষণেই অনুপস্থিত সে রণাঙ্গণে শত্রুর সম্মুখে দাঁড়াবে কোন বলে? তেমনি অবস্থা মুসলমানেরও। যে ব্যক্তি তার মহল্লার মসজিদে নামাযে হাজির হয় না তাকে কি মুসলমান বলা যায়? হাদীসে তাই বর্নীত হয়েছে, “পর পর তিন দিন যে ব্যক্তি জুময়ার নামাযে অনুপস্থিত থাকে সে ব্যক্তি মুসলমান নয়। সে মুনাফিক।”
আগের ন্যায় আজও রাষ্ট্র জুড়ে প্রচুর আবু জেহেল-আবু লাহাব আছে। রাষ্ট্রনায়কদের মঞ্চে প্রচুর নমরুদ-ফিরাউনও আছে। মুসলিম দেশে দেশে রোমান-পারসিকদের ন্যায় সাম্রাজ্যবাদী জালেমদের প্রচন্ড আগ্রাসনও আছে। এসব দুর্বত্তদের কারণে শুধু যে আফগানিস্তান, ইরাক,ফিলিস্তিন, কাশ্মির, চেচনিয়া, মিন্দানাও, আরাকান জ্বলছে তা নয়, প্রতিটি মুসলিম দেশেও অধর্ম,অনাচার, অশ্লিলতা ও দুর্বৃত্তি আজ সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু যেটি নাই সেটি হল, মুসলমানদের মাঝে অন্যায়ের প্রতিরোধ বা উৎখাতের প্রচেষ্ঠা। নেই আল্লাহর আইন শরিয়ত প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। অথচ মসজিদে ছেয়ে গেছে প্রতিটি মুসলিম জনপদ। সেখানে ৫ বার আযান ও জামায়াতে নামায ঠিকই হচ্ছে।, কিন্তু যেটি হচ্ছে না তা হল নামাযীদের মাঝে আল্লাহ ও তার হুকুমের স্মরণ এবং সে হুকুম-পালনের প্রস্তুতি। নামায হয়েছে যিকর শূণ্য। নামাযীর চেতনা হয়েছে জিহাদে আগ্রহশূণ্য। মসজিদের দেওয়াল ঘেঁষে পাপাচার জমে উঠলেও নামাযীদের মাঝে প্রতিরোধের জজবা জাগে না। দেশের আইন-আদালতে শরিয়তে বিধান পরিত্যক্ত হলেও তা নিয়ে মুসল্লীরা প্রাতিবাদে রাস্তায় নামে না। ইমাম সাহেবের খোতবাও সে বিষয়ে নিশ্চুপ। তিনি ব্যস্ত নবীদের কিসসা শুনাতে। কিন্তু আজকের মুসলমানদের কী করণীয় তা নিয়ে তার ভাবনা নেই। দিক-নির্দেশনা বা হেদায়েতও নেই। কিছু করারও চেষ্টা নেই। বড় জোর জোর দেওয়া হয় বেশী বেশী দোয়া বা তাসবিহ পাঠে। কিন্তু দোয়া ও তাসবিহের বাইরেও নবীজী যে জিহাদে নেমেছেন, বাতিলের উৎখাতে যে অস্ত্র ধরেছেন তা নিয়ে কোন নসিহত নাই। নবীজী(সাঃ)র সূন্নত এভাবেই পদদলিত হচ্ছে মসজিদের মিম্বর থেকে। মুসলমানেরা এক কালে রাজা দাহিরের অধর্ম ঠেকাতে হাজার মাইল দূরের সিন্ধু দেশে ছুটে এসেছিলেন। অথচ মসজিদের ইমাম সাহেব ও তার মুসল্লীরা মহল্লার গলিতে নেমে সূদ-খোর, ঘুষখোর, জিনাকারী, সন্ত্রাসী, শরিয়ত-প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধবাদী দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদদের বাধা দিতে রাজী নন। এমন দুর্বৃত্তদের হাতে মার খেয়ে নবীজী (সাঃ) দাঁত হারিয়েছেন এবং প্রচন্ড আহত হয়েছেন। হাজার হাজার সাহাবা প্রাণ হারিয়েছেন। অথচ ধর্মের লেবাসধারীদের এসব ইমাম এ মুসল্লীরা দুর্বৃত্তদের গালী খেতেও নারাজ। তারা সমাজের দুর্বৃত্তদের কাছে শত্রু হতে চান না। কিন্তু প্রশ্ন হল, ইসলামের স্বঘোষিত শত্রুদের সাথে এমন সম্পৃতির নীতিতে কি মহান আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়া যায়? মুসলমানের লক্ষ্য তো শুধু মহান আল্লাহর কাছে প্রিয় হওয়া। সমাজের দুর্বৃত্ত রাজনীতিবিদ, সশস্ত্র সন্ত্রাসী, শরিয়তের বিরুদ্ধবাদী বুদ্ধিজীবীদের কাছে গ্রহনযোগ্য হওয়া নয়। অথচ মসজিদের ইমামদের কাছে প্রতি মুহুর্তে যেটি স্মরণীয় গণ্য হচেছ সেটি হল দেশের ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তির কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়া –সে শক্তি যদি শরিয়ত প্রতিষ্ঠার প্রবল প্রতিপক্ষ হয় তবুও।
মসজিদের ইমামতি যখন চাকুরিতে পরিণত হয় তখন এর চেয়ে বেশী কিছু কি আশা করা যায়? চাকুরি শুধু অর্থমুখিই করে না, চাকর-সুলভ দাস মানসিকতাও গড়ে। অথচ ইমামের কাজ তো নেতৃত্ব। দায়িত্ব তো কমান্ডারের। এমন চাকর-সুলভ মানসিকতায় কি নেতৃত্ব বা কমান্ডারের কাজ চলে? হযরত ওমর (আঃ) এবং হযরত আলী (রাঃ)এর মত মহান সাহাবীদের কোন তেমন ধন-সম্পদ ছিল। সংসার চালাতে তাঁরা মদিনার আনসার জমিতে বর্গাচাষ করতেন। অনেক সাহাবী ভেড়া চড়াতেন। কেউবা বা ইহুদীর ঘরে পানি টানতেন। এমন কাজে তাদের সম্মানহানি হয়নি। বরং স্বনির্ভরতা বেড়েছে। বাড়েনি দাসত্ব। অথচ আজকের ইমামেরা চাকুরির চেয়ে সম্মানজনক কোন কাজই খুঁজে পাননি। চাকুরী বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে তারা দাসত্ব করছেন মসজিদ কমিটির। এমন দাস ইমামেরা ইসলামের মৌলিক শিক্ষার প্রচারের ক্ষেত্রে শুধু নিরবতা নয়, এমন কি বিরুদ্ধাচারণেও রাজী। অথচ নবীজী (সাঃ)র যুগে ইমামতি কোন চাকুরী ছিল না। যে আসনটিতে নবীজী স্বয়ং বসেছেন সে আসনে বসা চাকুরী হয় কি করে? এটি ছিল মহৎ ইবাদত। ছিল নবীজী (সাঃ)র মহান সূন্নত। ছিল আপোষহীন পবিত্র জিহাদ। আর ইবাদতে বা জিহদে তো মূল দায়বদ্ধতা ও জবাবদেহীতা থাকে একমাত্র মহান আল্লাহর কাছে। মসজিদ কমিটির মেম্বরদের কাছে নয়। নবীজী (সাঃ) আমলে একমাত্র তারাই সমসজিদ নির্মান করত ও মসজিদের ইমাম বা খাদেম হত যারা নিজেরা শরিয়তের পূর্ণ অনুসারি ছিল। এবং সে শরিয়তি বিধানের প্রতিষ্ঠায় আপোষহীন ছিল। এবং এ লক্ষ্যে তারা লাগাতর জিহাদ লড়তেও প্রস্তুত ছিল। কিন্তু আজকের যুগে হচ্ছে উল্টোটি। মসজিদ কমিটির সদস্য এমন ব্যক্তি যে ব্যক্তি তার কর্ম জীবনে পদদলিত করছেন শরিয়তের বিধান। অনেকে ঘুষ খাচ্ছেন, সূদ খাচ্ছেন এবং সূদ দিচ্ছেনও। রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন দলের সদস্য যাদের মূল শত্রুতা ইসলামের শরিয়তি বিধানের বিরুদ্ধে। দেশ জুড়ে মসজিদ গড়ে উঠছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক বা নিছক নামায পড়ার প্রয়োজনে। কোথাও বা সেটি বিশেষ কোন পীর সাহেবের বা মৌলানা সাহেবের নিজস্ব ফেরকা বা মাযহাব বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে। সমাজে বা রাষ্ট্রে ইসলামের বিজয় বা শরিয়ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নয়। ফলে শুরু থেকে মসজিদে অধিকৃত হয়ে আছে তাদের হাতে যারা ইসলামের চিহ্নিত শত্রু বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠায় অনাগ্রহী বা অঙ্গিকারহীন। ফলে এমন অধিকৃত মসজিদ সমাজে বা রাষ্ট্রে দ্বীনের বিজয় বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা আনবে কী করে? মসজিদ নিজেই তো শত্রুর অধিকার মূক্ত নয়। ফলে এমন মসজিদের সংখ্যা দশগুণ বা শতগুণ বাড়লেও কি ইসলামের বিজয়ের সম্ভাবনা আছে? বাংলাদেশের একটি জেলায় যত মসজিদ আছে খোলাফায়ে রাশেদার সময় সমগ্র মুসলিম জাহানে তা ছিল না। কিন্তু সে মসজিদগুলোই মুসলমানের বিজয় বাড়িয়েছিল। শরিয়তির প্রতিষ্ঠাও নিশ্চিত করেছিল। অথচ বাংলাদেশে ঘটছে উল্টোটি। দেশে যতই বাড়ছে মসজিদের সংখ্যা ততই বাড়ছে ইসলামের পরাজয়। তিন শত বছর আগেও বাংলাদেশে শরিয়তী আইনে বিচার হত। অথচ আজ সেটি অপসারিত। ৫০ বছর আগে এত দূর্নীতি ছিল না। অথচ আজ দেশ দূর্নীতিতে বিশ্বরেকর্ড গড়ছে। লক্ষ লক্ষ বাতি জ্বেলেও দেশ থেকে যদি অন্ধকার কমানো না যায় তবে সে বাতিগুলোকে কি বাতি বলা যায়? তেমনি দেশে লক্ষ লক্ষ মসজিদ গড়েও যদি ইসলামের বিজয় বা শরিয়তের প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করা না যায় তবে সে মসজিদগুলোকে কি বলা যাবে?
সংগ্রহীত...

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



