ছবি: জিপি'র পরিচালনা পরিষদের চেয়ারম্যান সিগভে ব্রেক্কে সদম্ভে গতকাল বলেন: "আমরা টাকা দেব না"।
গ্রামীণ ফোন ১৮ হাজার কোটি টাকা বিদেশী বিনিয়োগের কথা তুলে বার বার অবৈধ ও বাড়তি সুবিধা দাবী করে আসছে। বিটিআরসি’র করানো অডিট প্রতিবেদনটিকে আন্তর্জাতিক মানদন্ডে গ্রহণযোগ্য নয় ইত্যাদি বললেও কোথায় কি ভুল, কি সমস্যা আছে সেটা নিয়ে কিন্তু কথা বলতে শোনা যায় না। তদন্ত প্রতিবেদনটিতে যদি কোন সমস্যা থাকে সেটা স্পষ্ট করুক জিপি কিন্তু তা না করে কোন যুক্তিতে নতুন করে অন্য প্রতিষ্ঠান দিয়ে অডিট করানোর দাবী তুলছে, খালি তো বললেই হবে না যে আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে হয়নি, প্রমাণ করতে হবে যে কোন মানদন্ড অনুসারে কি সমস্যা থাকার কারণে এটি আন্তর্জাতিক মানের হয়নি। তা না করে ১৮ হাজার টাকা বিনিয়োগের দোহাই দিয়ে নতুন করে অডিট করানোর দাবী অগ্রহণযোগ্য। আরেকটি প্রশ্ন হলো তারা ১৮ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করার কথা বলছে কিন্তু বাংলাদেশ থেকে এ যাবত নিয়ে গেছে কত টাকা সেই কথা কিন্তু ভুলেও উচ্চারণরণ করছেনা। বাস্তবে বিনিয়োগের টাকা বহু আগেই তুলে নিয়ে গেছে এদেশ থেকে এখন নিচ্ছে মুনাফা। ফলে এখন আর গ্রামীণ বিদেশী বিনিয়োগকারী হিসেবে নেই, আছে বাংলাদেশ থেকে বছর বছর হাজার হাজার কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা পাচার কারী একটি কোম্পানি হিসেবে। এ বিষয়ে জাহাঙ্গির নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির প্রভাষক মোহাম্মদ লুৎফর রহমান বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন:
"বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে বৃহত্ বিদেশি বিনিয়োগ হয় গ্রামীণফোনে নরওয়ের টেলিনর গ্রুপের মাধ্যমে। ১৯৯৬ সালে লাইসেন্স প্রাপ্তির পরবর্তী বছরেই গ্রামীণফোন তাদের পরিচালন কার্যক্রম শুরু করে। তখন কোম্পানিতে ৬২ শতাংশ মালিকানা ছিল বিদেশি বিনিয়োগকারী নরওয়েজিয়ান কোম্পানিটির হাতে। বাকি ৩৮ শতাংশ ছিল গ্রামীণের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের কাছে। গ্রামীণফোনের উদাহরণটি এজন্যই উল্লেখ করছি, কেননা পরবর্তী সময়ে এটি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ায় সর্বসাধারণের কাছে এর আর্থিক বিবরণী প্রকাশ করতে হয়। তা থেকে আমরা বিদেশি বিনিয়োগের অবস্থার বাস্তব চিত্র অনুুধাবন করতে পারি। গ্রামীণফোনের আর্থিক বিবরণী থেকে আমরা জানতে পারি, ২০০৭ সাল নাগাদ বিদেশি টেলিনর কোম্পানির বিনিয়োগ ছিল ৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর বিপরীতে শুধু ২০০৪ সালে শত ভাগ, ২০০৫ সালে পঞ্চাশ ভাগ, ২০০৬ ও ২০০৭ সালে ষাট শতাংশ নগদ লভ্যাংশ তাদের মূল কোম্পানিতে মুনাফার আকারে নিয়ে গেছে। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় ২০০৯ সালে সরকারের বিভিন্ন মহল থেকে যখন গ্রামীণফোনের ওপর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার চাপ আসতে থাকল তখন ২০০৮ সালে পরিচালনা পর্ষদ প্রতিটি সাধারণ শেয়ারের বিপরীতে চারটি শেয়ার লভ্যাংশ আকারে অনুমোদন করল অর্থাত্ এক লাফে তাদের বিনিয়োগ পাঁচ গুণ করে ফেলা হলো। যদিও একটি ডলারও বিদেশ থেকে কোম্পানিটিতে পুনর্বিনিয়োগ হয়নি! এই অর্থ বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ থেকে আয়কৃত মুনাফা অর্থ। এরপর অনেক গড়িমসির পর মাত্র ১০ শতাংশ নতুন শেয়ার ইস্যুর শর্তে তারা পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হলো। তাও অভিহিত মূল্যের সাত গুণ দাম নির্ধারণ করে। অর্থাত্ বাংলাদেশের মানুষকে উদ্যোক্তাদের সমস্কেলে আসতে হলে ৩৫ গুণ টাকা খরচ করতে হলো। এখন সাধারণ মানুষের প্রশ্ন ১৪ বছরের মাথায় (১৯৯৬ সাল থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত) পৃথিবীর আর কোনো দেশে অথবা কোন ব্যবসায় মূল অর্থ ৩৫ গুণ বৃদ্ধি করে ফেলা যায়?
২০১০ সালের আর্থিক বিবরণীতে দেখা যায়, গ্রামীণফোনের মালিকানার ৫৫ দশমিক ৮ শতাংশ টেলিনর গ্রুপ, ৩৪ দশমিক ২ শতাংশ গ্রামীণের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ৫ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী আর মাত্র ৫ শতাংশ সাধারণ মানুষের হাতে রয়েছে। ২০০৯ সালে কোম্পানিটি ফের নগদ লভ্যাংশের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এ বছর ৬০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়। পরে ২০১০ সালে দু’দফায় মিলে ১২০ শতাংশ এবং সর্বশেষ ২০১১ সালে আর্থিক বছর শেষ হওয়ার আগেই অন্তর্বর্তীকালিন ১৪০ শতাংশ নগদ লভ্যাংশ অনুমোদন করা হয়। এই আড়াই বছরেই ৩২০ শতাংশ অর্থাত্ মূল বিনিয়োগকৃত অর্থ পাঁচ গুণিতক ৩২০ শতাংশ অর্থ উদ্যোক্তা বিনিয়োগকারীরা তুলতে সক্ষম হন। আমার হিসাব মতে, এ আড়াই বছরে মার্কিন ডলারের গড় মূল্য ৭০ টাকা ধরলে প্রায় ৩শ’ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নরওয়েজিয়ান টেলিনর কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। উল্লেখ্য, তাদের এই অর্থ প্রত্যাবাসন কিন্তু কোনো ধরনের বেআইনি নয়। সমস্ত আইন মেনেই বাংলাদেশ সরকারকে প্রয়োজনীয় কর প্রদান করে তারা মুনাফার অর্থ তাদের দেশে নিয়ে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তাই করবে। আমাদের করার কিছুই নেই! শুধু এ বছরের প্রথম ৬ মাসে বিদেশি এ কোম্পানিটি তাদের মুনাফার অংশ বাবদ প্রায় ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার নিয়ে গেছে। যেখানে সারা বছরে সব খাত মিলিয়ে আমাদের দেশে নতুন বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে ৯০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের কাছাকাছি। এ কারণেই সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখা প্রয়োজন, আমরা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য সব বিনিয়োগ খাত উন্মুক্ত করে দেব কি না? পুঁজিবাজারে আরও কিছু বিদেশি বিনিয়োগকৃত কোম্পানির (যেমন- বাটা সু, বিএটিবিসি, রেকিট বেনকিজার, গ্লাক্সোস্মিথক্লাইন ইত্যাদি) আর্থিক বিবরণী ঘেটেও এমন ভয়ংকর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে কোনো কোনো বহুজাতিক কোম্পানি নিয়মিতই ১০০ ভাগ, ২০০ ভাগ এমনকি ৪৫০ ভাগ নগদ লভ্যাংশ উত্তোলন করছে প্রতি বছর। অর্থাত্ প্রতি বছরই তারা তাদের মূল বিনিয়োগকৃত অর্থের দ্বিগুণ/ তিন গুণ অর্থ তাদের মূল কোম্পানিতে প্রত্যাবাসিত করছে।
সূত্র: Click This Link
কাজেই বিদেশী বিনিয়োগ নিয়ে আহ্লাদিপানা বন্ধ করা দরকার নইলে এভাবেই স্বদেশ লুট হতে থাকবে প্রতিদিন প্রতি রাতে।
যে দেশে সামান্য কিছু টাকা-পয়সা চুরি ছিনতাইয়ের অপরাধেই দরিদ্র অভাবগ্রস্থ মানুষকে গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হয়, যে দেশে ক্ষুদ্র ঋণের টাকা আদায় করার জন্য কৃষকের পায়ে আইনের বেড়ি পড়ায় রাষ্ট্র, ঘরের চাল খুলে হলেও সেটাকা আদায় করা হয়, সেই দেশে পাবলিকের হাজার হাজার কোটি টাকা মেরে দিয়ে কর্পোরেটদের সদম্ভে বড় গলায় কথা বলা এবং সেই মেরে দেয়ার টাকার ভাগ থেকে প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় দেশ প্রেমের বিজ্ঞাপন দেয়, কর্পোরেট রেসপন্সিবিলিটির পারাকাষ্ঠা দেখানো- এই সব আর কত সহ্য করব আমরা?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

