somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

এম. এ. হায়দার
কল্পনাই সুন্দর; কল্পনা ইজ ওয়ান্ডারফুলnএকা থাকি, লিখি... লেখার মাঝে নিজেকে খুঁজি। শব্দের শহরে খালি পায়ে হেঁটে বেড়াই... দুনিয়াদারি ভাল লাগে না। ওয়ান্ডারফুল লাগে না। “কল্পনাই সুন্দর, বাস্তবের বেল নাই”- এইরকম একটা ভাব ধরার চেষ্টা করি। বই পড়া আর ল

সৌরভ (ছোটগল্প)

২৭ শে জুন, ২০১৪ সকাল ১০:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



‘আরে মেয়ে, কাঁদছো নাকি?’
নিশি কিছুটা অবাক হয়ে চোখ তুলে তাকায় এবং দেখতে পায় সৌরভ তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। আশ্চর্য ব্যাপার হল যখনি কোন কারণে তার মন খারাপ হয় তখনি ছেলেটা কিভাবে যেন টের পেয়ে যায় আর সময়মত হাজির হয়ে যায়।

নিশি কাঁদছিল না। মুখ কালো করে বসে ছিল তাদের বাসার সামনের খোলা জায়গাটিতে। হঠাৎ সৌরভের উপস্থিতি তার খারাপ লাগে না। এই ছেলেটি তার একমাত্র বন্ধু যার সাথে সে সব কথা খুলে বলতে পারে এবং বলতে ভাল লাগে।

‘আচ্ছা, আমার মন খারাপ হলে তুমি ঠিক টের পেয়ে যাও। তুমি কিভাবে বোঝো, আমার মন খারাপ?’

সৌরভ হাসে। রহস্যময় হাসে। তার চোখের তারা ঝিলিক দেয়। তখনি কিছু বলে না সে।

একটু থেমে বলে,‘আগে বলো, কেন মন খারাপ? কি হয়েছে?’
নিশি তার মন খারাপের কারণ ব্যাখ্যা করে।
শুনে সৌরভ গলা ছেড়ে হেসে উঠে। হা হা হা।

নিশি এক মুহূর্তের জন্য অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে, একটা মানুষ এত সুন্দর করে হাসতে পারে! পরক্ষণে সে কৃত্রিম কড়া গলায় বলে, ‘এই, থামো, হাসবে না, খবরদার!’

‘হাসব না কেন?’
‘আমি বলেছি, তাই হাসবে না। আমি কষ্ট পাচ্ছি আর তুমি কিনা হাসছো!’
‘হাসব না তো কি করব? এত অল্পতে মানুষ কাঁদে?’
‘আমি কাঁদছি না। মন খারাপ করে বসে আছি।’
‘এত অল্পতে কেউ মন খারাপ করে?’
‘আমি পরীক্ষায় ফেল করেছি আর তুমি বলছো এত অল্প!!’
‘অবশ্যই এত অল্প! এমন না যে, তোমার এক বছর লস যাচ্ছে। শুধু একটা সাময়িক পরীক্ষায় মাত্র একটা সাবজেক্টে ফেল করেছো। তাও আবার ফিজিক্সে। ও তো অনেকেই ফেল করে। হতেই পারে এরকম...’
‘না, এরকম হতে পারে না। অন্য অনেকে আর আমি এক না। আমার এরকম হবার কথা ছিল না। পরীক্ষাও মোটামুটি ভাল হয়েছিল। স্যারটা ইচ্ছে কোরে নাম্বার কম দিয়েছে। একটু এদিক-ওদিক হলেই পুরো নাম্বার কেটে রেখেছে। ... আমি এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না যে আমি ফেল করেছি।’
‘তাহলে তো স্যারটা ভীষণ পাজি।’
‘ভীষণ!!’
‘আরও অনেকে নিশ্চয়ই ফেল করেছে?’
‘অনেকেই...কিন্তু তারপরও...’
‘তারপর আর কিছুই না। প্রাইভেট পড়ানোর জন্য দু’-একটা স্যার এরকম করেই থাকে। দোষটা স্যারের উপর দিয়ে গেল।’
‘সেটা তুমি বুঝতে পারলেও বাবা তো আর বুঝছে না।’
‘বকা-ঝকা করেছে নাকি?’
নিশি মাথা নীচু করে বলে, ‘হুঁ।’
‘এইজন্যে এত মন খারাপ?’
‘হুঁ।’

হা হা হা। সৌরভ শব্দ করে হেসে উঠে।

‘আবার!! তুমি আবার হাসছো!’
‘হাসব না?’
‘কেন হাসছো?’
‘তুমি খুব বোকা একটা মেয়ে, এইজন্য হাসছি।’
‘আমি বোকা মেয়ে?’
‘হ্যাঁ।’
‘কেন তোমার এরকম ধারণা হল?’
‘বাবা একটু আদর করে বকা দিলেই কেউ কখনো কাঁদে?’
‘আমি মোটেও কাঁদছি না। আর বাবাও আমাকে আদর করে বকা দেয় নি, যথেষ্ট কড়া করে বকা দিয়েছে।’
‘বাবা-মা কখনো বকা দিলে মন খারাপ করতে হয় না। কারণ তাঁরা যখন বকা-ঝকা করেন, তখন তা করেন সন্তানের প্রতি ভালবাসা থেকে। তাই ধমক দিলে সন্তানের উচিত আনন্দ পাওয়া। “কেউ তোমাকে খুব ভালবাসছে”- চিন্তাটা আনন্দদায়ক না?’

নিশি অকারণে লজ্জিত হয়, ‘হুঁ।’

সৌরভ বলে, ‘এমন একটা সময় আসবে যখন বাবা-মা কেউ বেঁচে থাকবে না। তখন ছোটো-খাটো একটা অন্যায় করে খুব ইচ্ছা করবে তাঁদের ধমক শুনতে।...আচ্ছা নিশি, তুমি কি তোমার বাবার উপর মন খারাপ করেছো?’
‘কিছুটা।’
‘এরকম আর কক্ষনো করবে না। বাবা-মার উপর কখনো মন খারাপ করতে নেই।...তোমার বাবাও তোমাকে ধমকানোর পর থেকে অনেকখানি অপরাধবোধে ভুগছেন। তাঁর শুধু মনে হচ্ছে যে, তোমাকে এত বকা-ঝকা করাটা ঠিক হয় নি। এই মুহূর্তে উনারও কিন' মন খুব খারাপ।’
‘তুমি কিভাবে জানো?’
‘আমি বুঝতে পারি।’

নিশি কি বলবে ঠিক বুঝতে পারে না।

সৌরভ বলে, ‘এখন তোমার আর তোমার বাবার মাঝে একটা অস্বসি-কর কুয়াশার পর্দা ঝুলে আছে। যেটা দূর করা প্রয়োজন।’
‘সেটা কিভাবে দূর করা যাবে?’
‘ছোটবেলায় বাবার মন খারাপ থাকলে তুমি কি করতে?’
‘আমি বাবার গালে চুমু খেতাম।’
‘এখনও তাই করবে। তোমার বাবা মন খারাপ করে ওপাশের বারান্দায় বসে আছেন; এখনই যাও।’
নিশি বলে, ‘যাও! কি সব আবোল-তাবোল কথা যে তুমি বলো! এখন বড় হয়ে গেছি না!’
‘আচ্ছা যাও, তাহলে চুপি চুপি গিয়ে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরবে। আমি দূরে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটি দেখব। যা বললাম, তা করবে। যাও।’

নিশি চলে যেতে পা বাড়ায়। সৌরভ বলে, ‘তার আগে শোনো, তোমার মন কি এখন কিছুটা ভাল হয়েছে?’
‘হ্যাঁ।’ নিশি বলে। ‘তোমাকে দেখলে কেন যেন মন ভাল হয়ে যায়।’
‘কারণটা কি বলো তো?’
‘কি কারণ?’
‘আজকে না। অন্য আরেকদিন বলব।’
সৌরভ হাসে। রহস্যময় হাসে। তার চোখের তারা ঝিলিক দেয়। আর সেই চোখের দিকে তাকিয়ে নিশির হঠাৎ একটা অসংযত চিন্তা মাথায় আসে। তার প্রবল ইচ্ছে হয়, সৌরভ নামের এই ছেলেটি তাকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরুক আর বলুক- আমি আছি,আমি আছি, নিশি। তোমার কোন কষ্ট নেই।

নিশি মনে মনে অত্যন্ত লজ্জিত বোধ করে। এ ধরনের একটা ভাবনা কিভাবে তার মাথায় আসল! সে দ্রুতপায়ে সেখান থেকে সরে আসে।

***

শওকত সাহেবের মন খুব খারাপ। তিনি বারান্দায় বসে উদাস চোখে অনির্দিষ্ট দিকে তাকিয়ে আছেন। তার একমাত্র মেয়ে নিশি। একটু আগেই তিনি খুব কড়া ভাষায় নিশিকে ধমক দিয়েছেন। উচিত হয়নি, কাজটা মোটেও উচিত হয় নি।

অত্যন্ত শান্ত-শিষ্ট স্বভাবের মেয়ে নিশি। মা মারা গেছে খুব ছোটবেলায়। হয়তো তা অপূরণীয়, তবে শওকত সাহেব সাধ্যমত চেষ্টা করেছেন, নিশিকে মায়ের অভাব বুঝতে না দিতে। কোন ভাই-বোন নেই, মেয়েটা একা-একা থাকে। কে জানে, হয়তো স্কুলেও ওর সেরকম বন্ধু-বান্ধব নেই। থাকার কথা নয়। নিশি খুব চুপচাপ প্রকৃতির।

বিষয়টা খুব গুরুতর কিছু নয়। প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ফিজিক্সে ফেল। এই রেজাল্ট দিয়ে কিছু আসবে-যাবে না। শওকত সাহেব এসবই সাত-পাঁচ ভাবছিলেন এবং ক্রমেই নিজের উপর বিরক্ত হচ্ছিলেন, মেয়ের সাথে এমন করার জন্য। মেয়েটা নিশ্চয়ই খুব মন খারাপ করেছে। ডেকে একটু আদর করে দিলে হয়। কিন' এভাবে কড়া কথা বলার পর এখনই সেটা করা যাচ্ছে না। কি করা যায়?

হঠাৎ তিনি অনুভব করেন যে নিশি তাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরেছে। শওকত সাহেবের হঠাৎ করে কেন যেন কান্না পেয়ে যায়। তিনি নিশির মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, ‘তুই কি আমার কথায় খুব কষ্ট পেয়েছিস?’
‘না, না, কষ্ট পাব কেন?’
‘মন খারাপ করিস নি তো?’
‘একটু অবশ্য মন খারাপ হয়েছিল। কিন্তু এখন ঠিক হয়ে গেছে। একটা জিনিস আমি আগে জানতাম না কিন্তু এখন জানি।’
‘কি জিনিস?’
‘সেটা হচ্ছে যে, বাবা-মা যখন সন্তানকে বকা-ঝকা করেন, তা করেন ভালবাসা থেকে। তাই তখন মন খারাপ করতে হয় না। আনন্দ পেতে হয়।’
‘এই কথা তোকে কে বলেছে?’
‘সৌরভ বলেছে।’
‘সৌরভ কে?’
‘একটা ছেলে। আমার ভাল বন্ধু।’
‘তোর ভাল বন্ধু আছে?’
‘হ্যাঁ। আমার একটাই ভাল বন্ধু। আশ্চর্য ব্যাপার কি জানো, বাবা? ওকে যখনই দেখি, আমার মন ভাল হয়ে যায়। তুমি কি ওকে দেখতে চাও?’
‘হ্যাঁ।’

বারান্দার সামনে যে খোলা জায়গাটা তার এককোণে সৌরভ দাঁড়িয়ে আছে।
নিশি দেখে যে ও মিটিমিটি হাসছে।

‘ঐ তো বাবা, দূরে দাঁড়িয়ে আমাদের দেখছে’, নিশি আঙুল নির্দেশ করে। ‘এই তো, হাসছে।’

শওকত সাহেব নির্দেশিত দিকে তাকান।
কিন্তু কাউকেই দেখতে পান না।

নিশি বাচ্চা মেয়েদের মত উৎসাহী গলা করে বলে, ‘ঐ যে বাবা, ঐইইই। বাবা, দেখতে পাচ্ছো না?’

- : শেষ : -
৫টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

=কিছু তৃপ্তি দেরীতেও আসে না=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:০২

জানুয়ারী শেষের পথে। নতুন বাড়ীতে একমাস হয়ে গেল। এখনো গুছানো হয়নি। প্রতিদিনের নিয়ম কানুন অনেকটা পাল্টে গেছে। সকালে অফিসে আসার সময় এত তাড়াহুড়া বাপরে বাপ। রেডি হয়েও কাজ করি। ঘর... ...বাকিটুকু পড়ুন

বুঝে বলুন, হুজুর!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৭ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৪৪




শরীয়া আইন প্রয়োগ করতে শরীয়া আইন জানা বিচার বিভাগ, সামরিক বাহিনী আর প্রশাসন দরকার। বাংলাদেশে শরীয়তী এতো সরকারী মানুষ কি আছে? আর, শরিয়া প্রয়োগ করার জন্যে যদি একটি রাষ্ট্রের... ...বাকিটুকু পড়ুন

প্রিয় প্রফেসর ইউনুস সাহেবের নিকট খোলা চিঠি ( কাল্পনিক)

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৮ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:২৬


মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা,
অন্তর্বর্তী সরকার,
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ

বিষয়: পে কমিশন বাস্তবায়ন ও সামষ্টিক অর্থনীতি পুনর্গঠনে একটি বিকল্প সামাজিক প্রস্তাব।

আসসালামু আলাইকুম। একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবে আপনার শাসন আমল কেবল আইয়ুব খানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রলয়ংকরী সুনামি এবং প্রপাগান্ডা: সাধারণ মানুষ হয়ে উঠেছে উগ্র ইসলামপন্থি শক্তির হাতিয়ার

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২৮ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:৩১


"আমাকে গুম করেছিল হিটলার, গোরিং বা গোয়েবলস নয়। করেছিল সাধারণ মানুষই। প্রতিবেশী মুদি দোকানদার, দারোয়ান, ডাকপিয়ন, দুধওয়ালারাই এই কাজ করেছিল। তারা মিলিটারির পোশাক পরল, হাতে অস্ত্র নিল - আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

জনতার “হ্যাঁ”, দালালের “না”

লিখেছেন বাকপ্রবাস, ২৮ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:১২

যতই বলুন “হ্যাঁ”,
চাঁদাবাজরা শুনবে না;
তাদের প্রিয় “না”—
অভ্যাস তো বদলাবে না।

যতই বোঝান “হ্যাঁ”,
বুঝতে তারা চাইবে না;
অনিয়ম আর দুর্নীতি
ছাড়তে তো রাজি না।

বলছে সবাই “হ্যাঁ”,
তবু তাদের “না”;
লুট-সন্ত্রাস না থাকলে তো
তাদের জীবন চলেনা ।

গণভোটে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×