১।
নভেম্বর ৫, ২০১০
সকাল ৮ টা থেকে আজ একটানা ক্লাস হচ্ছে। আর ক্লাস নিচ্ছেন ইউনিভার্সিটির জুনিয়র এক প্রফেসর। জুনিয়র হলেও তার পড়ানোর স্টাইল, দক্ষতা, সাবলীলতা দেখার মত। কোন কাজেই তার কোন না নেই। প্রচন্ড পরিশ্রমী এবং উদ্দ্যমী এক তরুণ হিসেবে ইতিমধ্যেই ইউনিভার্সিটির সবার মধ্যমণিতে উনি পরিণত হয়েছেন। অন্য সব সিনিয়র টিচারের থেকে তাই তাকে সবচেয়ে বেশি পছন্দ স্টুডেন্টদের।
প্রায় জনা পঞ্চাশেক ছাত্র ছাত্রী টিচারের ক্লাসে। উনি সমানে লেকচার দিয়ে যাচ্ছেন। হাসি তামাশা ও চলছে মাঝে মাঝে। কিন্তু এসবে আমার মন নেই। আমার মন এখন হাওয়ায় উড়ে বেড়াচ্ছে। পাখির মত ডানা মেলে উড়ছে অবরিত। সাদা মেঘের ভেলায় ভেসে ভেসে পার হচ্ছি নীল আকাশ।
গত ২ সপ্তাহ ধরে আমার এই অবস্থা। না পারি কাউকে কইতে আবার না পারি সইতে। বাসায় এসে একা একা বিড়বিড় করে কথা বলি। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আচড়াই। বার বার ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ি ধরে দেখি। উফ! এভাবে আর কতদিন! Do something buddy!!
আমার এই অবস্থার জন্য দায়ী আমার ক্লাসের এক মেয়ে। তার নাম অহনা। সবার ভিরে তাকেই আমার সবথেকে আলাদা লাগে যেন! কেন যে লাগে, তা আমি নিজেও জানি না! আমাদের ক্লাসে ৫০ জন ছাত্র/ ছাত্রীর মধ্যে আমি, সে আর একটি ছেলে ছাড়া বাকি সবাই বিদেশী। হয়ত এ কারণেই তাকে আমার আলাদাভাবে ভাল লাগে। কি জানি বাপু! বুঝি না কিছুই।
২।
ডিসেম্বর ১২, ২০১০
সাধারণত এই সময়ে ইউনিভার্সিটি ভ্যাকেশন চলে। ফাইনাল পরীক্ষার পর হাতে সময় পাওয়া যায় প্রায় ২০ / ২৫ দিনের মত। এই সময়ে অনেকে দূরে কোথাও ঘুড়তে যায়। কিংবা দেশে যায় পরিবার পরিজনের সাথে দেখা করতে। এই সময়ে আমারো হোস্টেলে থাকার কথা নয়। কিন্তু আমি এইবার থেকে গেলাম কি মনে করে যেন! কেন জানি কোথাও যেতে মন সায় দিচ্ছে না। আমার সবকিছুতেই কেন যেন একটা অনিহা কাজ করে।
উফ! ক্ষুদা লেগেছে খুব। কিছু খাওয়া দরকার। ফ্রীজ খুলে পেলাম আমের জুস আর চিকেন পিজা। বের করেই খাওয়া শুরু করে দিলাম।
গোগ্রাসে গিলছি আর টিভিতে খেলা দেখছি বাংলাদেশ এবং জিম্বাবুয়ের। বাংলাদেশ ভাল খেলছে আর তাই মনটাও ভাল।
হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠলো। এই সময়ে কে আসলো এটা মনে করেই তার মুন্ডুপাত করে দরজা খুললাম। আর সামনে যা দেখলাম তা বিশ্বাস করতে আমার ২ মিনিট দেরি হল। আমার সামনে অহনা দাঁড়িয়ে। এটাই প্রথম তার আমার বাসায় আসা। অবাক না হয়ে কোন উপায় ছিল না।
৩।
অহনা আমাকে নিয়ে বের হয়েছে শপিং করতে। তার অনেক কেনাকাটা আছে তার। একা শপিং এ যেতে তার নাকি ভাল লাগে না। তার সব বান্ধবীরা গিয়েছে যে যার বাসায়। অহনা যায় নি। রয়ে গিয়েছে এখানে। সামনে ক্রিসমাস এর বন্ধ আছে। এ সময়ে কিছু কেনাকাটা তো করতেই হবে।
সেদিন ওর সাথে বের হয়ে বুঝতে পারলাম ও অনেক ভদ্র, শান্ত মেয়ে। তবে খুবই ইন্টিলিজ়েন্ট এবং বাহিরের জগতের উপর তার জ্ঞান অনেক। আমি সেদিন তেমন কোন কথা বলার সুযোগ পায় নি। শুধু অপলক নয়নে অহনার কথা শুনে যাচ্ছিলাম। মনে হচ্ছিল এভাবে যদি সারাজীবন ধরেও সে কথা বলে যায় আমার কোন আপত্তি নেই।
ওর কথার প্যাচে পরে মাঝে মাঝে এমনও হয়েছিল আমি রাস্তার পিলারের সাথে ধাক্কা খেয়েছি বেশ কয়েকবার। পথ চলবো নাকি তার মিষ্টি মধুর কথা শুনবো। আমি যে ব্যাথা পেয়েছি সেটা অহনা বুঝতেও পারে নি। কারণ ও কথা বলা শুরু করলে আর থামতে চায় না। আশেপাশে কি হচ্ছে তার কোন খবর থাকে না।
সেদিনের মত আমরা শপিং শেষ করে যে যার মত বাসায় চলে গেলাম।
৪।
সকাল ১০ টা ১০ মিনিট
কোন কাজ না থাকায় এবং গত রাতে দেরি করে ঘুমাতে যাওয়ার ফলে ঘুম থেকে সকালে উঠতে দেরি হল আমার। যখন ঘুম ভাংলো তখন মনে পরে গেল আজকে আমার জন্মদিন। যেহেতু দেশে নেই আর তাই কিছু করারও নাই তেমন। কি আর করা! হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হয়ে নাস্তার টেবিলে বসতেই মোবাইল বেজে উঠলো।
অহনা ফোন দিয়েছে।
আমিঃ হেলো
অহনাঃ শুভ জন্মদিন
আমিঃ (অবাক হয়ে) তুমি জানলে কি করে আজ আমার জন্মদিন?
অহনাঃ জানলাম। এটা কোন ব্যপার হল (রহস্যের হাসি হেসে)
আমিঃ আমি সারপ্রাইজড! অনেক ভাল লাগলো।
অহনাঃ এইসব ফরমালিটি ছাড়ো তো।
আমিঃ তা, বল। আজকে কি প্লান?
অহনাঃ তোমার সাথে সারাদিন ঘুরবো আজ।
আমিঃ ......। ঠিক আছে।
আরো কিছুক্ষণ কথা বলে, প্লান ঠিক করে ফোন রাখলাম।
৫।
দুপুর ৩ টা ২০ মিনিট,
আমরা এখন বসে আছি একটা রেস্টুডেন্টে। ঘন্টা দুয়েক ঘোড়াঘুড়ির পর তারপর এখানে এসেছি। যদিও রেস্টুডেন্ট সিলেক্ট করার দায়িত্ব ছিল অহনার কাধে। আমাকে অবাক করে দিয়ে কোথা থেকে জানি একটা কেক নিয়ে হাজির হল ওয়েটার। আমাদের সামনে কেক রেখে ওয়েটার চলে যাওয়ার পর অহনাকে জিজ্ঞেস করলাম এর রহস্য। অহনা আমাকে হাস্যজ্জল মুখে জানালো এখানে আগে থেকেই সে কেক অর্ডার দিয়ে রেখেছিল।
ওর প্রতিটা পদঃক্ষেপ আমাকে নতুন করে ভাবতে সাহায্য করছিল। কেন জানি অদ্ভুত এক ভাললাগায় নিজেকে মনে হল যেন হারিয়ে ফেলেছি। রেস্টুডেন্ট এ বসেই শুনলাম ওর পরিবারের কথা। ওর নিজের কথা। ওর কলেজ জীবনের কথা।
আমার পলকহীন চোখ বার বার ওর চোখের দিকে তাকিয়ে এক অপরূপ আবেশে মন প্রাণ জুড়িয়ে দিচ্ছিল। অহনার প্রতিটা কথা যেন সুমধুর কোন সুর হয়ে আমার কানে বাজছিল।
বিশেষ করে অহনা আজ নীল শাড়ি পরে এসেছে। এতটা সুন্দরী তাকে আর কখনো লাগে নি। ওর দিক থেকে চোখ ফেরাতে কেন জানি মন চাইছিল না।
আমার মনের অবস্থা হয়ত অহনা বেশ ভালভাবেই পড়তে পারে। আর তাই সে হয়ত অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয় লজ্জায়।
৬।
১২ই আগস্ট, ২০১১
এভাবে ধিরে ধিরে অহনাকে আমি মনের গভীর থেকে ভালবেসে ফেলেছিলাম। সেটা হয়ত আমার আচরণেও প্রকাশ পেত। অহনা আমাকে কিছু বলতো না। তবে আমি যে তাকে কিছু বলতে চাইতাম সেটা সে ভালমতই বুঝতে পারতো। কোন এক অজনা শংকায় মন কেপে উঠতো বার বার। তাই জানাতে পারি নি তাকে এখন ও আমার মনের কথা। যদি সে না করে! যদি আমাদের এতদিনের মধুর রিলেশন নষ্ট হয়ে যায়!
মোবাইল বেজে উঠলো।
আমিঃ হেলো
অহনাঃ কেমন আছো?
আমিঃ ভাল, তুমি?
অহনাঃ (কিছুক্ষণ চুপ থেকে) হ ম ম, ভাল।
আমিঃ কি হয়েছে? কোন প্রব্লেম?
অহনাঃ .........।। কই না তো।
আমিঃ তুমি বাসায় আছো?
অহনাঃ হ ম ম।
আমিঃ তাহলে আসছি এখন ই।
ফোন রেখে মেন্টালি প্রিপারেশন নিতে থাকলাম অহনাকে ভালবাসার কথা বলার জন্য। এভাবে দেরি করলে আর চলবে না।
৭।
বিকেল ৫ টা,
অহনা আর আমি সোফায় মুখোমুখি বসা। কারো মুখে কোন কথা নেই। কি আজব একটা ব্যপার! আজ অহনাকে একেবারেই আলাদা লাগছে। হয়ত সারারাত ঘুমাতে পারে নি বেচারি।
আমি নিজে থেকেই শুরু করলাম কথা।
আমিঃ কোন কথা বলছো না যে?
অহনাঃ ............। এই তো আর কি!
আমিঃ তোমাকে মানে আমি আসলে ............। কথা
অহনাঃ (আমার দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে) কি হয়ছে? এরকম তোতলাচ্ছো কেন?
আমিঃ আসলে না মানে......।।
অহনাঃ (মাথা নিচু করে আছে)
আমিঃ (মনে সাহস সঞ্চয় করে) আসলে......।। আমি তোমাকে...। ভালবাসি।
অহনাঃ (কিছুক্ষণ চুপ থেকে) তোমার আর কিছু বলার আছে?
আমিঃ (নিশ্বাস দ্রুত হচ্ছে) না, তেমন নাই।
অহনাঃ এদিকে আস একটূ
আমি ভয়ে ভয়ে তার সামনে যেতেই সে হুট করে বসা থেকে উঠে আমাকে জোরে এক চড় বসিয়ে দিল। আর বললো -
অহনাঃ এই কথাটা বলতে তোমার এতটা মাস লাগলো?
আমি গালে হাত দিয়ে একবার অহনার দিকে আর একবার অন্য দিকে তাকাতে লাগলাম।
অহনাঃ তুমি যে আমাকে ভালবাস সেটা আমি ক্লাসের দিনগুলোতে টের পেয়েছিলাম। দেখেও না দেখার ভান করেছিলাম। পরে তোমার সাথে যখন মিশতে শুরু করি তখন থেকেই তোমাকে ভাল লেগে যায় আমার।
“মুই তোরে ফুস ফাং”
আমিঃ (বেশ অবাক হয়ে) এই কথার মানে কি?
অহনাঃ আবার কি থাপ্পর খেতে চাও?
এই বলেই সে হাসতে লাগলো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



