ভস্ম হই। মৃত্যুর চুমু আমার কপোল ছুঁয়ে যায়। বেঁচে উঠি আবার। নতুন দিনের আশায়। বেঁচে উঠি বারবার।

নাড়ীর বাঁধন
২৭ শে জানুয়ারি, ২০০৭ দুপুর ২:৪২
দেশে যাবার আগে ভাবছিলাম মার কোলে শুয়ে থাকব, মায়ের হাতে ভাত খাব, জড়িয়ে ধরে আকুল হয়ে কাঁদব, আরও কত কি। শেষে দেশে যাবার ঠিক আগমুহর্ুতে সেমিষ্টার শেষের পরীক্ষা, রিসার্চের ধুন্দুমার চাপ এসব কাটিয়ে প্লেনে ওঠার আগ পর্যন্ত আমার দুদিনের ঘুম বকেয়া হয়ে গেল। জার্নির পুরোটা সময় ঘুমাতে ঘুমাতে গেলাম। দেশে গিয়ে মার সাথে কি করব ভুলেই গেলাম।
চৌত্রিশ দিন দেশে ছিলাম অথচ একদিনও মায়ের হাতে ভাত খাইনি। একদিনও জড়িয়ে ধরে মা বলে কাদিনি। কেবল হরতালের কল্যানে তিনদিন সারাদিন বাসায় ছিলাম মায়ের সাথে। আমি বসে বসে ল্যাপটপে কাজ করি, মা এসে পাশে বসে থাকে। বসে থাকে কিন্তু কিছু বলে না। আমি স্বভাব বসত ইগনোর করে যাই। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল হল আরে, মা বাবাকে তো সময়ই দেয়া হয়নি। শেষে মায়ের কোলে শুয়ে আমি, মা আর বাবা টিভি দেখলাম কিছুক্ষন। আমার সোনালী মুহর্ুত্ব বালির মত হাতের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়...
এবারে শ্বাশুড়ী আম্মাকেও মিস করেছি অনেক। বিভিন্ন অনুষ্ঠান আর হরতাল, অবরোধে তাকেও সময় দেইনি একদমই।
প্রথম বার আসবার মত কষ্ট লাগেনি এবার। আসবার আগেরদিন দুপুরে খেতে বসেছি। মা ভাত বেড়ে দিচ্ছে। হঠাৎ মনে হল মায়ের সাথে এটাই আমার শেষ দুপুর। বুক ভেঙ্গে কান্না চলে আসল।
আসবার দিন সকালে খুব কষ্ট শুরু হল যখন আমার ভাই তার ঘুমন্ত মেয়েটাকে এনে আমার কোলে দেয়। মা কাঁদছে। আমার স্ত্রী কাঁদছে। কাঁদছে ভাইয়ের স্ত্রী, ভাই, বোন, খালারা। দূরে দাঁড়িয়ে কান্না চাপছে আমার বাবা। গলার কাছে দলাটাকে চেপে জোড় করে ভিতরে ঠেলে দিয়ে বকা দিলাম, এতো কান্নার কি আছে?
এয়ার পোর্টে গিয়ে দেখলাম নতুন নিয়ম করেছে। মালপত্রের সাথে আর ঢুকতে দেয়া হয়না আত্মীয় স্বজনকে। আমার ছোটকাকা বিমানে কর্মরত বিধায় ঢুকতে পারলেন। মালপত্র চেক ইন করতে গিয়ে দেখি চেকইন ব্যাগেজ আন্ডার ওয়েট কিন্তু ক্যারিঅন ওভার ওয়েট। সব ঠিকঠাক করতে করতে দেরী হয়ে গেল। ফিরে গিয়ে আর শেষ দেখা হল না সবার সাথে। এয়ারপোর্টের ভেতর থেকে ফোনেই বিদায় নিলাম।
সব ঝামেলা সেরে যখন বোর্ডিং করেছি প্লেনে তখন হঠাৎ মনটা খারাপ হতে শুরু করল। আমার শৈশব, আমার বেড়ে ওঠা, আমার নাড়ীর বাঁধন সব কিছু ফেলে সীট বেলটের সাথে নিজেকে বেঁধে পাঠিয়ে দিচ্ছি দূরদেশে। প্লেন দৌড়াচ্ছে, গতি বাড়ছে। ছোট ছোট জলাশয় গুলো পেছনে ফেলে ছুটে যাচ্ছে প্লেন। আস্তে আস্তে ছোট হতে শুরু করল মানুষ, বাড়ীঘর, মানচিত্র। সবকিছু ঝাপসা হতে শুরু করল। আহ, চোখে কিছু পড়ল নাকি বাইরে বড্ড বেশী কুয়াশা...?
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০ | বিষয়বস্তুর স্বত্ত্বাধীকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
অতিথি বলেছেন:
আর কষ্টটা ঠিক সেই মুহর্ুতে রিয়েলাইজ করলাম যখন দেখলাম আর চাইলেও বেরুতে পারব না তখন। তুমি কত দিন ছিলা? 1 সপ্তাহ?
অরূপ বলেছেন:
10দিন..
মাশীদ বলেছেন:
আহা তোর লেখাটা পড়ে মনটা খারাপ হয়ে গেল। দেশ থেকে প্রথমবার যেবার আসলাম সেবার খুবই মন খারাপ ছিল। তোরা জানিস। গ্রুপ মেইলে তার অনেক নমুনা রেখেছি। এক সেমেস্টার পরে আম্মা এসে থেকে গেল দু'সপ্তাহ। তারপর থেকে ভাল থাকার শুরু। এরপর দেশ ছাড়ার এক বছর পরে দেশে গেলাম আবার। তবে সেবার আসার পরে মন খারাপ আগের মত তীব্র ছিল না। ততদিনে বিদেশও বাড়ি হয়ে গেছে। আরেকটা বড় ব্যাপার হয়তো আমি দেশের অনেক কাছে আছি। প্রায় এক টাইম জোন আর গত বছরেও মা-বাবা একবার ঘুরে গেছেন। আর এস এম এস, ওয়েবক্যামে প্রায় প্রতিদিন মা'র সাথে চ্যাট তো আছেই। আহা টেকনোলজি! আগের দিনে যারা বিদেশে যেত তারা জানি ক্যামনে টিকে থাকত! তারপরেও মন খারাপ হয় হুটহাট। ইচ্ছে করে চলে যাই আবার। দেখি, সামনেই হয়তো যাব।
অতিথি বলেছেন:
দুরত্বের লিমিটেশনটাও বড়। তোরা চাইলেই চলে যেতে পারবি ঢাকায়। আমরা চাইলেও যেতে পারবো না। সময়, টাকা, পয়সা, সুযোগ সব ঠিক হওয়া লাগবে।তবু তোর জন্য সমবেদনা।
মাশীদ বলেছেন:
আমার এখানের কাজ প্রায় শেষ। এখন চলে যাবার সময়। এখন উলটা সিঙ্গাপুরের জন্যই মন কাঁদে। এখানের দেশী-বিদেশী বন্ধুগুলো, যারা আমার ফ্যামিলির মত ছিল এ দু'বছর, ওদের ছাড়তে খুবই খারাপ লাগছে। এখানের বাংলাদেশীদের কমিউনিটিটাও খুব ভাল ছিল। I had a blast here. আজিব দুনিয়া রে।
অতিথি বলেছেন:
আজ আবার আমি আমার ভেতরে আবেগ আছে অনুভব করলাম। চোখে প্রায় পানি জমে গিয়েছিল।আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা উলটো। মা দেশে ফেরার আগে ভেবেছি কতোকিছু করবো। কিন্তু অপদার্থ আমি কিছুই করতে পারছি না।
অমিত বলেছেন:
ভালই..সবাই মা বাবাকে দেশে রেখে বাইরে যায়, আর আমি মা বাবাকে বিদেশে রেখে দেশে চলে গিয়েছিলাম। দেশটাকে খুব মিস করি।এত বছরের স্মৃতি, সব কিছুর সংগে নিজেকে রিলেট করতে পারা, এইরকম অনুভূতি তোএইখানে হয় না, কখনো হবেও না...
অতিথি বলেছেন:
মৃন্ময়, মন খারাপ করবেন না। তবে অল্প কিছু হলেও সময় দিন মাকে। মায়েদের প্রত্যাশা বেশী থাকে না।
অতিথি বলেছেন:
অমিত তোমার উলটো অভিজ্ঞতার কথা লেখ। তোমার ঘটনাগুলো থেকে পাবার মত অনেক কিছু পাব মনে হচ্ছে।
অতিথি বলেছেন:
সাড়ে তিন ব্যর হইলো...
অতিথি বলেছেন:
বছর
অতিথি বলেছেন:
লেখাটা এত চমৎকারভাবে আবেগের সাথে বিন্যাসিত যে পুরো মেসেজটা সার্থকভাবে পাঠককে কনভে করা গেছে।
অতিথি বলেছেন:
ধন্যবাদ আপনাদের
অতিথি বলেছেন:
আগে চোখে পড়ে নি লেখাটা। এক কথায় চমৎকার। মা.মু. দেশে যাই নি আজ প্রায় আড়াই বছর। মাঝে মাঝে মনে হয় গুল্লি মারি সব। নিকুচি করি। মা-বাবা কি আজীবন থাকবে? যে কটা দিন আছেন তারা, সে কটা দিন কি তাদের সাথে কাটানো উচিত নয়?
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...














ফেরাটা বড় কষ্টের..