------
আমার পাকি প্রফেসর নিতান্তই পাজি। প্রথম প্রথম যখন আমি তার রিসার্চ এসিসটেন্টশীপ নেইনি, তখন আমাকে ভুলানোর জন্য কি ভাল ব্যবহার! এখন ভুরু কুঁচকে ছাড়া কথা বলে না। দু বছরের মাস্টার্স করতে আড়াই বছর কাটিয়ে দিলাম প্রায় কিন্তু এখন ডিফেন্সের নাম মুখেই আনছে না শালা।
আজকে দুপুরে আমি ও গৌরভ ল্যাবে কাজ করছি তো সে এসে খুব মিষ্টি কথা শুরু করল। তারপর একফাঁকে টুক করে জানাল যে তার ছাত্র দরকার আমরা যেন আমাদের পরিচিত কেউ থাকলে জানাই। তার যে ছাত্র দরকার তা আমরা জানি। কেননা সব ছাত্র এসে পালিয়ে যায় তার কান্ড কারখানা শুনে। গত আড়াই বছরে আমিই এক মাত্র বলদ জুটেছে তার কপালে।
তবু মুখ ফুটে যখন আমাদের কাছে জানিয়েছে তাই আমি তার এই ফ্যাক্টগুলো লিখে সঙ্গে দুইটা ভালো (!) গুনও - ১। বেশ কিছু পেপার পাবলিশ হবে হয়ত ২। ফান্ডিং নিয়ে সমস্যা হবে না - জানালাম আমার বন্ধুদের গ্রুপে।
আমি ভেবেছিলাম কেউ হয়ত রাজি হবে না। বা হলেও সে আমাদের বন্ধুর বন্ধু জাতীয় দূরের কেউ হবে। অথচ আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার বেশ পরিচিত দুজন এক্সক্লাসমেট আধা ঘন্টার মধ্যে সিভি সহ মেইল করেছে! আমি এতটাই অবাক হয়েছি যে কি বলব!
আমার ল্যাবমেট ইন্ডিয়ান ছেলে গৌরভকে বললাম। গৌরভ হেসে বলে, 'মানুষ সবসময় নিজের বর্তমান অবস্থাকে সবচেয়ে খারাপ মনে করে। তার মনে হয় আমি খুব কষ্ট করে হলেও সব কাজ করে ফেলব, সবার চেয়ে সেরা হয়ে দেখাব - তাহলে আর আমাকে আটকে রাখবে না।'
আমি ঘরে ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম, তাহলে সবার শেষ গন্তব্য কি আমেরিকা?
ঘটনা ২
------
আরো কয়েক মাস আগে ফিরে যাই। এক ছেলে ইমেইল করেছে ইন্ডিয়া থেকে। সে আইবিএম ইন্ডিয়াতে চাকুরী করছে। এখন আমাদের ইউনিভার্সিটিতে আসতে চায় মাস্টার্স করতে। আমার কি যে মেজাজ খারাপ হল! ছাগল নাকি!
সবার শেষ গন্তব্য কি তাহলে আমেরিকা?
ঘটনা ৩
-------
বছর খানেক পিছে ফিরে যাই। আমার আম্মার স্কুল বান্ধবী সোনালী ব্যাঙ্কে কর্মকর্তা পদে চাকুরী করেন। স্বামীও কিসে যেন ভালো চাকুরী করেন। বড় মেয়ে ডাক্তারী পড়ছে। ছোট মেয়েও ভালো রেজাল্ট করছে। সবকিছু ছিমছাম।
তারপর কি মনে করে তারা ডিভি ফরম পূরণ করলেন। এবং ভাগ্যবশত (!) লটারী জুটে গেল তাদের। ৩০/৪০ বছরের শেকড় ছিঁড়ে চলে এলেন আমেরিকা। মেয়েটার ডাক্তারী পড়া শেষ হয়েছে কিনা জানি না। এতটুকু হলফ করে বলতে সামাজিক মর্যাদা আগের মত পাচ্ছেন না।
তাহলে সবার শেষ গন্তব্য কি আমেরিকা?
ঘটনা ৪
-------
আরেকটু পিছনে থাকালাম। আড়াই বছর আগের কথা। আমি পাশ করে ফেলেছি। ভাবছিলাম বুয়েটেই ঝাড়ু দেয়ার চাকরী পেয়ে যাবো। ভাগ্যের ফেরে আটকে গেলাম।
শুরু করলাম চাকুরী খোঁজা। যেখানে কম্পিউটার সায়েন্স থেকে ডিগ্রী নিয়ে বিশ হাজারে চাকুরী শুরু করে সেখানে আজিজ টেক্সটাইল অফার করল আট হাজার। আজিজ সাহেব দ্বিতীয় ইন্টারভিউয়ে বলল, 'ফুলাটারে দেখে তো বদ্রই মনে অয়। তো দিয়ে দাও যা চায়। কাম কিন্তু বাল করে করবা।' দশ হাজারের সে অফার নিয়ে মানিকগঞ্জে যাইনি আর।
শেষে ঢাকায় প্রোগ্রামার হিসেবে চাকরী করতে করতে কোন রকম জিআরই। ফলশ্রুতিতে এডমিশন হল কিন্তু ফান্ডিং হল না। ডেসপারেট আমি হাতের কাছে যে প্রফেসর পেলাম তাকে আঁকড়ে ধরে একবুক স্বপ্ন পাঁজা করে স্কাই হারবার এয়ারপোর্টে নামলাম।
সেই স্বপ্নের ধর্ষন দেখি প্রতিদিন। তবু চুপ করে থাকি। পার করতে থাকি দিনগুলি। কেননা আমি জানি, সবারই শেষ গন্তব্য এই আমেরিকা।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে মে, ২০০৭ দুপুর ১:১৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



