আমাদের সবার ভেতর মন নামে একটা অদ্ভূত জিনিষ আছে- যা দেখা যায় না,ছোঁয়া যায় না,অথচ সময়-অসময়ে সেটি খারাপ হয় আর আমরাও সেটা বুঝতে পারি। এখন এই মাত্র যা হলো,তাতে মন ভেঙেচুরে যাওয়ার কথা। আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করলাম,আমার কিছু-ই হচ্ছে না।বউ পাশে বসে কাঁদছে। একবার বলতে চাইলাম-কাঁদার কী আছে? বললাম না।কেঊ কাঁদলে তাকে কাঁদতে দিতে হয়।আমি না হয় অনুভূতি বুঝতে পারছি না। যে বুঝতে পারছে তাকে বাঁধা দিব কেন?
বিয়ে হয়েছে বেশিদিন হয়নি। টেনেটুনে ছয় মাস হবে। নতুন কোন খেলনা পেলে ছোট্ট বাচ্চারা সবকিছু ভুলে যেমন সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে - আমি এখনো তাকে নিয়ে সেভাবেই ব্যস্ত আছি। আজ রাতে চাইনিজ খেতে যাওয়ার কথা।বিয়ের আগে অনেকবার গিয়েছি,এখনো যাই- যেতে ভালো লাগে,রেস্টুরেন্টের আলো-আধাঁরিতে বউ এর শ্যামলা মুখের মিষ্টি হাসি দেখে এখনো মুগ্ধ হই।
বন্ধুরা বিয়ের আগে সাবধান করেছিল। বিয়ে করলে নাকি জীবন শেষ হয়ে যায়-কত কিছু-ই না বলেছিল। অথচ আমার জীবন শুরু হলো বিয়ের পর।
বিয়ের দু’মাস পড়ে অফিস থেকে ফিরে দেখলাম,বউ কাঁদছে।সমস্ত দুনিয়া নিমিষে শূন্য হয়ে গেল। আমার মা অসুস্থ-তাও খেয়াল রইল না। বিয়ের আগে একজনের সাথে প্রেম ছিল তার।তার কথা মনে হয়েছে,তাই…। বেড টেবিলের পাশে টিস্যু পেপারের বাক্স থেকে একটা টিস্যু এগিয়ে দিতে ভুল হয় না আমার।স্বামী হিসেবে আমি দায়িত্ববান।আজ তাকিয়ে দেখি টিস্যু পেপার সেখান থেকে গায়েব।
আগেই খেয়াল রাখা উচিত ছিল।এই প্রথমবার দায়িত্বে অবহেলা করার জন্য নিজের উপর রাগ হয়-প্রচন্ড রাগ।
বিয়ের দ্বিতীয় দিন,বঊ এসে বলে-এই ছোট বাসায় থাকতে আমার খুব সমস্যা হচ্ছে।ছোট থেকে এই আলো-বাতাসহীন বাসায় আমি বড় হয়েছি।হোস্টেলে থাকতে পারতাম না।ক’দিন পর পর বাসায় ছুটে আসতাম।সেই বাসায় যে বঊ এর সমস্যা হতে পারে আমার মাথায় আসেনি কখনো।কিন্তু আসা উচিত ছিল।
আমরা দ্রুত বাসা বদলাই।মা-বাবা,আপত্তি করেননি।শৈশব,কৈশোর,যৌবন কাটিয়ে দেয়া বাসা পেছনে রেখে আসতে বিন্দুমাত্র খারাপ লাগেনি।বউ এর ইচ্ছে বলে কথা।নিজেকে আসলে তখন মনে হচ্ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্বামী।ছোট ছোট খারাপ লাগাগুলো নিয়ে ভাবার সময় কিংবা ইচ্ছে কোনোটাই ছিল না।
আজ যখন নমিতার চোখে জল,তাকিয়ে দেখতে ভালো লাগছে না-ধীর পায়ে বের হয়ে আসি।এখন কিছু বলতে গেলে সে আবার রাগ করতে পারে।
বাইরে বের হয়ে দেখি মাতাল করা জোছনা উঠেছে আজ।
শহুরে হাওয়ায়,শহুরে পথে গ্রামীন জোছনা। মনে হচ্ছে হলুদ সরীষা ক্ষেতের মাঝে দাঁড়িয়ে আছি। আশপাশ দিয়ে কোন গাড়ি ছুটে যাচ্ছে না।নীরবতাকে খানখান করে দিয়ে কেঊ বেরসিকের মতো হর্ণ বাজাচ্ছে না।শহরের মানুষজন মনে হয় আজকাল বেশ রসিক হয়ে পড়ছে। নমিতাকে ডেকে নিয়ে আসতে ইচ্ছে করছে।বাড়ির সামনের কোলাহলহীন রাস্তায় দু’জন মিলে জোছনাস্নান করার সাধ তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে আমাকে গ্রাস করে ফেলল।
আমার চিন্তাকে ব্যর্থ প্রমান করার উদ্দেশ্য নিয়েই হয়তোবা হর্ণ বাজাতে বাজাতে হলুদ ট্যাক্ক্সি ক্যাব এসে হাজির।হলুদ ক্ষেত নিমিষেই হয়ে গেল হলুদ ক্যাব।গ্রামীণ জোছনাকে গপ করে গিলে ফেলল শহুরে রাক্ষস।আমি তবু ঠাঁই দাঁড়িয়ে।
বাড়িতে ফিরতে ইচ্ছে করছে না।প্রতিদিন-ই ফিরি,আজ নাহয় নাই ফিরলাম।একটা রাত নিজের মতো করে কাটিয়ে দিই।কী নিয়ে মন খারাপ হলো-তাও মনে পড়ছে না।বয়স এখনো ত্রিশের কোটা পার করেনি।ভুলো মন নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি।যদি সবকিছু ভুলে যেওয়া যেত!মা-বাবা কেমন আছে?দিব্যি ভুলে বসে আছি।
বাসার সামনের রাস্তা পার হয়ে চৌরাস্তা এসে দাঁড়িয়ে যাই।ঠিক কোনদিকে গেলে-আমার সেই আলো-বাতাসহীন বাসায় চলে যাওয়া যাবে?টের পেলাম ঠিক পেছনেই দু’টো নেড়ি কুকুর জিভ বের করে ফোঁস ফোঁস শব্দ করতে করতে এগিয়ে আসছে।তারাও কী আমার মতো বাড়ির পথ ভুলে গেছে?
এই যে,কুকুর কোথায় যাবেন?
কুকুর দু’টো একসঙ্গে জিভ নাড়ে।তাদের লালা গড়িয়ে পড়ে আমার পায়ের ঠিক কাছে এসে।
জিভ বের করা কী তাদের কোন ভাষা?আমিও জিভ বের করি।আচমকাই কুকুর দু’টো বিকট স্বরে স্বরে ঘেঊ ঘেউ করতে করতে পালিয়ে যায়।কিছুদুর পথ তাদের পেছনে জিভ বের করে দৌড়াতে থাকি।
চৌরাস্তার মোড়ের কোন একটি রাস্তায় ঢুকে পড়েছি।চাঁদের আলো আবার এখানে হাজির তার সমস্ত উজ্জ্বলতা নিয়ে।জোনাক পোকার দল দেখতে পাই।মিটিমিটি করে জ্বলছে আর নিভছে।চারপাশে ধূ-ধূ বালুচর জোছনায় ভেসে যাচ্ছে।এ আমি কোথায় এলাম?
অনিশ্চিত যাত্রায় নিশ্চিন্তভাবেই পা বাড়াই।নমিতা কী এখনো কাঁদছে?মা’র কাছে যেতে চেয়েছিলাম।যাওয়া হলো না।আবার কবে বাসা থেকে বের হতে পারব এভাবে?সারাদিন অফিসে বসের দৌড়ানি খেয়ে বাড়িতে এসে আমার পুতুলের মতো নমিতাকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যেতে হয়।
দু’পা ভেঙে আসে।স্কুলের বার্ষিক প্রতিযোগিতাড়য় একবার একশ মিটার দৌড়ে প্রথম হয়েছিলাম।আর কোন দৌড়ের খেলায় আমি শেষ পর্যন্ত হতে পারিনি।দীর্ঘদিনের অনভ্যাসবশত-খুব সম্ভবত আমার পা আর চলে না।নিজের অজান্তেই লুটিয়ে পড়ি।
২।।
পরদিন সকালে সম্বিৎ ফেরত পাওয়া মাত্র বাসার দিকে পা বাড়াই।রাতের হাওয়ায় সব অচেনা লাগলেও ভোরের আলোয় পথ চিনে বাড়ি ফিরতে অসুবিধে হয় না।
বাড়ির সামনে অনেক ভিড়।অনেক মানুষ।আরে,মা এসেছে দেখছি।আমার নিরুদ্দেশের খবর পেয়ে চলে এসেছে?
ভীড় ঠেলে সামনে এগোতে বেশ কষ্ট হয়।
নমিতা এখনো ঘর ভাসিয়ে কাঁদছে।ওর সামনে সাদা কাপড়ে ঢাকা একটি দেহ।বুক কেঁপে ওঠে।তবে কী নমিতার পুরোনো প্রেমিক মারা গিয়েছে?তাহলে,মা এলো কেন?নাহলে,নমিতা কাঁদবে কেন?
আবার মা’কে দেখতে পাই।কি করলি বাপ্পী?এটা তুই কী করলি?
আমি কিছু করিনি,মা!কেউ ফিরেও তাকায় না আমার দিকে।
বিদ্যূৎ চমকের মতো কাল রাতের দৃশ্যগুলো একে একে ভেসে উঠল চোখের সামনে।
নমিতা খুব বুক ব্যথা করছে।
ঢং করতে হবে না।
ঢং করছি না।
আর কিছু বলতে পারিনি।খুব সম্ভবত শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ফেলেছিলাম।তারমানে দেহটা আমার?নমিতা আমার জন্য কাঁদছে?বিয়ের পর থেকে ওর পুরোনো প্রেমিককে নিয়ে হা-হুতাশ দেখতে দেখতে ক্লান্ত-আর নমিতা এখন আমার জন্য কাঁদছে?আমি আনন্দে লাফ দিয়ে উঠি।মা বাড়িতে এসেছে।নমিতা কোন কটু কথা বলছে না।আকাশ ছোঁয়ার সাধ জাগে আমার।
মরে গেলে তবে মানুষের স্মৃতি তবে ধূসর হয়ে যায়।নাহলে কাল রাতের কথা এভাবে ভুলে গেলাম কেন?
যে মন কারণে-অকারণে খারাপ হতো,নিজের মৃত্যু সংবাদে তাকে এতটুকু বিচলিত হতে দেখি না।
আমি গিয়ে আমার খাটে বসি। নিজের কবর দেখার জন্য নীরবে অপেক্ষা করতে থাকি। হয়ত কিছুক্ষণ পর সব ভুলে যাবো। কিন্তু আমার মন প্রাণ চাচ্ছে-গত রাতের কথা যেন কখনো না ভুলি। যে রাতে মাতাল করা জোছনা ছিল,যে রাতে আমার বঊ এর চোখে ছিল জল,যে রাতে আমার দুঃখিনী মা তার কাপুরুষ ছেলের অবহেলা থেকে চিরমুক্তি পেয়েছিল।
নমিতা তখনো কাদঁছে। আনন্দের কান্না নাকি শোকের-স্পষ্ট বুঝতে পারিনা। মরে গেলে বোধহয় বোঝার ক্ষমতাও লোপ পেয়ে যায়।
(পূর্বে প্রকাশিত।নাম পরিবর্তিত এবং সংশোধিত)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

