১)দু’টো সমান্তরাল পাতের উপর দিয়ে রেলগাড়ি চলে, একজন ড্রাইভার থাকে, ইঞ্জিন থাকে, অনেকগুলো বগি থাকে, বগির ভেতর হাত-পা ওয়ালা কিছু মানুষ থাকে; সেই মানুষগুলোর কেউ কথা বলে, কেউ ঘুমোতে থাকে, কেউ জানালা দিয়ে তাকিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে চলমান ধানক্ষেত দেখে আর কেউ উদাস একটা ভঙ্গি নিয়ে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে থাকে।
আমি একজনকে একদম-ই অন্যরকম এক রেলগাড়িতে চড়তে দেখেছিলাম কিংবা হয়ত আমি নিজেই চড়েছিলাম। নিজেকেই অন্যকেউ মনে করেছিলাম। আমার সাথে এই ব্যাপারটা প্রায় ঘটে। নিজের বাসা মনে করে অন্যের বাসায় চলে যাওয়া খুব নিত্ত-নৈমিত্তিক ঘটনা। সেই ট্রেনটিতে আমি ছিলাম নাকি এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি।
২)চিটাগাং থেকে ঢাকা যাচ্ছি। সেটা আমি প্রতি সপ্তাহেই যাই, এই সপ্তাহেতেও যাচ্ছি। তবে এবার স্লিপিং বুথে, সাথে অচেনা এক মধ্যব্যয়স্ক মানুষ। মানুষটির হাতে কালো একটি ফুল। চেহারায় বিশেষত্ব নেই, তবে ফুল থাকার কারণেই দ্বিতীয়বার তাকাতে বাধ্য হলাম। আমার তাকানো দেখে লোকটি মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, কালো গোলাপ- আমার বাগানের। কালো গোলাপ বাগানে পাওয়া যায়, জানতাম না। সাহিত্যে ব্ল্যাক ম্যাজিকের উপরকরণ হিসেবে কালো গোলাপের চল আছে বলে জেনেছিলাম, শুনেছি ল্যাবরেটরীতে নাকি বিজ্ঞানীরা তৈরী করছেন- তাই বলে বাগানে পাওয়া যাবে? আর একজন বিশেষত্বহীন মানুষ সেটা নিয়ে ঘুরবে? যাই হোক যতটা চমকে ওঠার কথা অতটা না চমকে না গিয়ে খুব দ্রুত নিজের ভাবনায় ডুবে গেলাম। কিছুক্ষণের ভেতর ট্রেন চলতে শুরু করল। ট্রেনে উঠেছি ট্রেন চলবে এটাই স্বাভাবিক। একসময় বাসায় পৌছাবো, সারারাত নির্ঘুম কাটানো নাফিসা দরজা খুলে দেবে, হাত-মুখ ধুয়ে এরপর নাস্তা খাবো- সিক্যুয়েল অনুসারে তাই ঘটবে, ঘটে আসছে। আজ কেন জানি, একটু ভয় ভয় লাগছে। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসল আবার। হেসে যা বলল, তা আমার হেসে উড়িয়ে দেওয়ার কথা। কিন্তু ওড়াতে পারলাম না। আসলে ওড়ানোর ব্যাপারগুলোতে আমি চিরকাল-ই অজ্ঞ। ছোট থাকতে বন্ধুরা ঘুড়ি ওড়াতো, আমি দেখতাম হাঁ করে তাকিয়ে। এখনো আমার লোকটার কথা শুনে মুখ হাঁ হয়ে গেল।
অবাক হচ্ছেন? সত্যি বলছি কিছুক্ষণ পর ট্রেনটি অন্ধ হয়ে যাবে।
মানে?
আপনি ভুল প্ল্যাটফর্মে এসে ভুল ট্রেনে উঠে পড়েছেন। আপনার এখানে থাকার কথা ছিল না।
কথা শেষ না হতে হতেই ট্রেন একটা ঝাঁকি দিয়ে থেমে গেল।
কথাশূন্য আমি চুপচাপ বসে লোকটির দিকে তাকিয়ে আছি। পা নড়ছে না। আজ ট্রেনে ছিনতাই হয়েছে কথাটা মাথায় আসতে লোকটা বলে উঠল, আপনি ভুল ভাবছেন। আমি আর আপনি ছাড়া এখানে কোনো যাত্রী নেই। আমার না খেয়ে মারা যাওয়ার কথা ছিল। তারপর অন্ধ ট্রেন, আমাকে অন্ধ পথে অন্ধ কোনো দেশে নিয়ে যাবে। আমি বড় পাপী।
বোধজ্ঞান হারিয়ে ফেললে যা হয়, আমারো এক-ই অবস্থা। বুঝে গেছি কিংবা মনকে কেউ বুঝিয়ে ফেলেছে যা হচ্ছে সব- সত্য।
আমার আর কিছু বলার থাকে না।
৩)
কতক্ষণ থেমে ছিলাম জানি না। হুঁশ ফিরল তখন যখন দেখলাম, লোকটি আমার হাত কেটে ফেলেছে। বৃষ্টির মতো ঝুমঝুম করে রক্ত পড়ছে। লোকটি সেটি খাচ্ছে। কপকপ করে শব্দ হচ্ছে। খুব সম্ভবত আমি মরে গেছি। তাই ব্যথা পাচ্ছি না।
আপনার রক্তটা সস হিসেবে দারুণ। খেয়ে দেখবেন?
আমি মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি দেই। লোকটি পরম মমতায় আমার বাইসেপ্স এর টুকরো রক্ত দিয়ে মাখিয়ে মুখে ঢুকিয়ে দেয়। মা’র কথা মনে পড়ে যায়। ছোটবেলায় কত আদর খাইয়ে দিত। আজ আবার কতদিন পর কেউ একজন আমাকে কিছু একটা খাইয়ে দিল। আনন্দে আমার চোখে পানি চলে আসে। দেখি, লোকটিও কাঁদছে।
কী হলো, আপনি কাঁদছেন কেন?
আপনার আনন্দ দেখে ভাই। আপনার বুকের মাংসটা আরো মজার হবে। ঐটাও খাইয়ে দিব।
ঘন্টাখানেক পর আমি এবং লোকটি মিলে সম্পূর্ণ আমাকে খেয়ে ফেলি।
৪)
আমি হয়ত মরে গিয়েছিলাম কিংবা এখনো মরে আছি, হয়ত সে রাতে স্বপ্ন দেখেছিলাম কিংবা এখনো স্বপ্নের ভেতরে আছি। এর যেকোনো কিছুই হতে পারে। এখন অবশ্য নিজের মাংস খাওয়ার স্মৃতি নিয়ে দিব্যি বেচে আছি। নাফিসা অবশ্য নেই। আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। অচেনা কারো হাত ধরে । তাকে বাঁধা দেইনি। অফিসে আমার জায়গায় অন্য কারো প্রমোশন হয়ে যায়। আমি কিছু বলিনি। বাস ধরতে ভুল করে ফেলি। কখনো কখনো ভুল প্ল্যাটফর্মে চলে যাই। অন্ধ ট্রেনের দেখা আর পাই না। আসলে পাওয়ার দরকার-ই পড়ে না। জীবনটা অন্ধ, পৃথিবী অন্ধ, বন্ধুর ছদ্মবেশে আসা মানুষ অন্ধ, আমি নিজেও অন্ধ। কিন্তু মাঝে মাঝে হঠাৎ নিজের বুকের মাংস খাবলে খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ২:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



