# একটি ঘর, খুব বেশি বড় নয়। এখন সভাকক্ষের মতো করে সাজানো হয়েছে। পাঁচটি সারিতে,পাঁচটি করে চেয়ার। সামনে বড়সড় টেবিল। পেছনে ঝুলছে ক্যালেন্ডার। সেখানে তারিখ ঝুলছে গতমাসের। জানালা আছে কিন্তু এখন বন্ধ। বিশাল পর্দা নামানো। ঘরে চলছে এসি। তাদের কেউ এসির ঠান্ডা বাতাসে অনভ্যস্ততার দরুণ কাঁপছে। তাদের হাত-পা শুকিয়ে আসছে। তবু, তারা অপেক্ষা করছে।
দুজন বিশালদেহী নিরাপত্তা কর্মী ঘোরাফেরা করছে। তাদের মাথায় কালো টুপি। আপাতদৃষ্টিতে তাদের কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে হচ্ছে না।
বড় টেবিলের ওপাশটা খালি। কেউ এসে বসবেন সেখানে। সবাই তার জন্য অপেক্ষা করছে।
একদম সামনের সারিতে বসে আছে নবদম্পত্তি। তারা খুনসুটি করছে। ছেলেটা কিছু একটা বলছে আর মেয়েটা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ছে। তাদের পাশেই বয়স্ক এক লোক। দেখেই বোঝা যাচ্ছে ব্যবসায়ী। হাতে টাইটানের দামী ঘড়ি, সেঞ্চুরী থেকে বানানো স্যুট। তিনি পাশের দম্পত্তির দিকে তাকিয়ে প্রশ্রয়ের হাসি দিলেন। হয়ত তার সদ্য প্রয়াত স্ত্রীর কথা মনে করে কিংবা আসন্ন নতুন বিয়ের কথা চিন্তা করে। এক কিশোরকে দেখা যাচ্ছে, উদাস দৃষ্টি মেলে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এই তাকিয়ে থাকার ভেতরে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কিছু লুকিয়ে আছে।
এভাবে ভিন্নভিন্ন ভাবে ভিন্ন পচিঁশজন মানুষ তাদের সময় পার করছিল, যদিও তাদেরকে কেউ বাধ্য করছে না, ইচ্ছে করলে চলে যেতে পারে, এমনকি যাতায়াতের টাকা দিয়ে দেওয়া হবে ; তারপরেও লোকজনের চলে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
আমি তাদের মতো একজন। অপেক্ষায় আছি আমিও। আজ এখানে একটি আবিষ্কারের কথা বলা হবে, বলা হবে আবিষ্কারের পেছনের গল্প। তবে আলোচনা সভায় জ্ঞানী মানুষ না, আমার মতো সাধারণ কিছু মানুষকে আহবান জানানো হয়েছে; কেন, তার পেছনে কোনো কারণ খুঁজে পাইনি। আমাদের নাকি বিশেষ প্রক্রিয়ায় লটারির মাধ্যমে বাছাই করা হয়েছে। অথচ শেষ কবে লটারির টিকেট কিনেছিলাম, হাজার চেষ্টা করেও মনে করতে পারি না। ছোট থাকতে কিনতাম খুব। কখনো পেতাম না। এখন বড় হয়ে গেছি, আর লটারি কেনা হয় না। তবে, এবার জিতেছি; আসলে কি জিতলাম সেটাই বুঝতে পারছি না।
#
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমাকে অবাক করে দিয়ে আমার বয়সী একটি ছেলে এসে খালি চেয়ারটিতে গিয়ে বসল।
আপনাদের অপেক্ষায় রাখার জন্য দুঃখিত, ছেলেটি আন্তরিকতার সঙ্গে বলল বলে মনে হলো। আর এই একটি কথাতেই ছেলেটিকে আমার ভালো লেগে গেল। কত বড় বিজ্ঞানী, তারপরও কি সুন্দর করে এসেই ক্ষমা চাইল। মানুষ যেন সুযোগ পেয়ে কথার ঝাঁপি খুলে দিল। আমাদের কেন ডেকেছেন কিংবা আমরা আসতে পেরে সত্যি আনন্দিত, আমিও বললাম ইতিহাসের সাক্ষী হবো ভাবতেই গর্বে বুক ফুলে উঠছে।
ছেলেটি আমাদের কল-কাকলি থামার জন্য সময় দিল। তারপর মৃদু হেসে বলল, এবার আমরা মূল কথায় আসি। প্রথমে আপনাদের একটা গল্প শুনতে হবে। গল্পের মাঝে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। সবাই রাজি? সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো আমরা মাথা ঝাঁকাই।
আলোকিত রাত।
অন্ধকার না থাকার জন্য যা প্রয়োজন-জোছনা কিংবা শহুরে বাতিগুলো যা রাতখোর মানুষদের তুমুল শত্রু সেগুলো কিছুই সেখানে ছিল না। ছোট ছোট কিছু পোকা, যাকে আমরা জোনাকি নামে চিনি তারা উড়ছিল, সংখ্যায় নিতান্ত কম; তাই তাদের ভেতরে অভিপ্রায় থাকলেও তাদের পক্ষে এই ব্রিজ রাত দু’টোর দিকে আলোকিত করে রাখা সম্ভব ছিল না।
তবু ব্রিজভরা মৃদু আলো। নিচে নদী, দূরে জাহাজ আর ব্রিজে দাঁড়ানো একটি লোক। ক’জন যুবক ব্রিজ থেকে নেমে একটু নীচে, যেখানে নদীর ছোট ছোট ঢেউ এসে কখনো আছড়ে পরে-সেখানে বাড়ি থেকে পালিয়ে চুপচাপ বসে ছিল। মশার কামড় খাচ্ছিল, পোকা-মাকড় গা বেয়ে বেয়ে চুম্বন দিয়ে যাচ্ছিল তাদের। ঠিক তখন-ই সবাইকে ভীষণভাবে অবাক করে দিয়ে আলো জ্বলে উঠেছিল, কিছুটা চাঁদের আলোর মতো কিন্তু ব্যাপ্তীময় নয়। পদার্থের মতো নির্দিষ্ট কিছু আকার-আয়তন দখল করে কেবলমাত্র ব্রিজটাকে আলোকিত করে রেখেছিল। যুবকেরা দেখতে পেয়েছিল, ব্রিজ এর ঠিক মাঝামাঝি জায়গাতে একজন লোক রেলিং এর উপর বসে আছে। তার মুখে সিগারেট। আয়েশ করে টানছে সেটা। তাদের ভয় পাওয়া উচিত ছিল। কিন্তু সিগারেট টানতে দেখে সিগারেট খাবার তৃষ্ণা ঘায়েল করে ফেলছিল।
যুবকদের ভেতর সবচেয়ে ভীতু ছেলে রায়হান। সেই এগিয়ে গিয়েছিল সবার আগে। সে শেষ সিগারেট খেয়েছিল সাত ঘন্টা আগে। তখন সিগারেট দেখে তার আর হুঁশ ছিল না। পেছন পেছন আসছিল বাকি তিনজন। যত কাছে যাচ্ছিল, ভয় কমতে শুরু করেছিল। চোখেমুখে তখন বিস্ময়। তারা কোথাও কোনো আলোর উৎস দেখতে পাচ্ছিল না। লোকটি নিশ্চিন্তমনে রেলিং এ বসে পা দোলাচ্ছিল।
ডাক দিবি না কাছে যাবি? তারা একে অপরকে জিজ্ঞেস করে।
তারা হৈ হৈ করে ডাকে। লোকটি ফিরেও তাকায় না। তারা আলোর বৃত্তে ঢুকে যায়।
যান্ত্রিক জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে কিংবা বলা যেতে পারে শ্রদ্ধা করার মতো কিছু খুঁজে না পেয়ে, বেঁচে থাকার জন্য ট্র্যাডিশনাল ধারাকে অস্বীকার করে চার বন্ধু মিলে বাড়ি থেকে বের হয়ে পড়েছিল। অনেকটা যেদিকে দু চোখ যায়, সেদিকে চলে যাওয়ার মতো ব্যাপার। যুবকদের ভেতরে ভেতরে বাসার জন্য একটু খারাপ লাগছিল, ওরা চোখের জল লুকাচ্ছিল, আবার ড্যামকেয়ার ভাব দেখিয়ে বলছিল আমরা মুক্ত হয়েছি, এটাই বড় কথা। মুক্তি বলতে আসলে কীসের মুক্তি; কাজ করার নাকি ঘুরে বেড়াবার, নাকি মরে যাবার অথবা বেঁচে থাকার কিছুই তাদের জানা ছিল না।
তারা যেই মুহূর্তে আলোবন্দী হলো এমন কিছু একটা ঘটতে শুরু করেছিল, যা জাগতিক কোনো কিছু দিয়ে ব্যাখ্যা করার মতো ছিল না। রায়হান পাশে দাঁড়ানো, অর্কের দিকে মুখ হাঁ করে তাকিয়ে ছিল। মৃদু সেই আলো অর্কের ভেতরে অনেকটা প্রজেক্টরে দেখার মতো কিছু ছবি কিংবা চলমান দৃশ্যাবলি তৈরী করছিল
কোনোমতেই ফোকাস করতে পারছিল না রায়হান । একটার পর একটা ছবি এসে সরে যাচ্ছিল। অর্ক তাকিয়ে ছিল, ওর পাশে স্বচ্ছের দিকে। সেখানেও ছিল এক-ই দৃশ্যের ছায়া।
ওরা ভাবত, একে অপরকে ওরা খুব ভালোভাবে চেনে। তবে এই ধারনাটি যে কিছুক্ষণের ভেতর বদলে যাবে,সেটা জানা ছিল না।
এগুলা কি হচ্ছে? সব তোর দোষ। রায়হানকে উদ্দ্যেশ্য করে অর্কের বলা কথাটুকু বিভাজনের রেখা টেনে দিয়েছিল। রায়হান স্বভাবসুলভভাবে ক্ষেপে গিয়ে অর্কের কলার চেপে ধরেছিল। বাকি দুজন ওদের ছাড়ানোর চেষ্টায় ব্যতিব্যস্ত ছিল। ওরা সিগারেট তৃষ্ণা ভুলে গিয়েছিল, দাঁড়িয়ে ছিলো কিংবা ঝগড়ারত ছিলো আলোবন্দী হয়ে। ঠিক তখন-ই যুবকেরা সচেতন হয়, কারণ অস্থির চিত্রগুলো যা তারা ফোকাস করতে পারছিল না, তাদের কিছু একটা বলতে চাচ্ছিল।
রায়হানকে দেখা যাচ্ছে, কলেজ গেটের সামনে ধূমপানরত অবস্থায়। অর্ককে দেখা যাচ্ছে চা পানরত অবস্থায়।
কোথাও চলে যেতে ইচ্ছে করে। অর্ক রায়হানকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে।
রায়হান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে আমারো। তারপর তারা কিছুক্ষণ কথা বলে। অর্কের ভেতর চলতে থাকা এই দৃশ্যগুলোর দিকে আঠা দিয়ে আটকানো দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে ছিল বাকি তিনজন।
এইটা তো, বাড়ি থেকে পালানোর কয়েকদিন আগের কথা।
হুম,রায়হান মাথা ঝাঁকিয়েছিল। স্বচ্ছ আর ইবু চুপচাপ দাঁড়িয়েছিল। রেলিং এ বসে লোকটি তখনো পা দোলাচ্ছিল।
দৃশ্যে তখন পরিবর্তন। রায়হানের সেখান থেকে প্রস্থান।
অর্ক তখন একটা গালি দিল। গালি দিয়ে বলল, শালা বড়লোকের পোলা। এখন ভাব ধরতে আইসে। একদিন চান্স পাইলে তোর সব হাতায়া নিমু।
ব্রিজে পিনপতন নিঃস্তবদ্ধতা নেমে এসেছিল। অট্টহাস্যে নীরবতা ভাঙল। তখন যুবকেরা দেখতে পায় আলোর উৎস। লোকটি হাসছিল আর তার শরীর থেকে বিচ্ছুরিত হচ্ছিল আলো।
এইসব অতিপ্রাকৃত ব্যাপার-স্যাপার নিয়ে তারা আর মাথা ঘামাচ্ছিল না। অর্ক দাঁড়িয়ে ছিল মাথা নিচু করে। স্বচ্ছ আর ইবু ভীত- যদি তাদের গোপন কথাগুলো ফাঁস হয়ে যায়!
সিগারেট কিংবা যাবতীয় তৃষ্ণাগুলোর প্রতি তারা মোহ হারিয়ে ফেলেছিল। পালিয়ে আসার সার্থকতা খুঁজে পাচ্ছিল না। ধীরে ধীরে তারা ব্রিজ থেকে নেমে গিয়ে ঠিক আগের জায়গায় গিয়ে বসল।
অন্ধকার রাতে, অমাবস্যা রাতের ব্রিজ যেমন থাকার কথা তেমন হয়ে গিয়েছিল আবার। আলো, লোক কিংবা সিগারেট কিছুই ছিল না। কেবল ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিল একটি ভাঙা ল্যাম্পপোস্ট#
ছেলেটির গল্প বলার ভেতর বেশ নাটকীয় দৃষ্টিভঙ্গি আছে। আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। যেহেতু নিজে লেখালেখি করি, তাই গল্প শুনতে আমার ভালো লাগে। মনে মনে গল্পটার ব্যাখ্যা দাঁড় করাবার একটা চেষ্টা চালাই। অপার্থিব আলো এসে তাদের মনের কথা বলে দিচ্ছে, ব্যাপারটা বাস্তবে স্বাভাবিক না হলেও পরাবাস্তব জগতে ওমন হতেই পারে। বাকি দর্শকদের কিছুটা হতবিহবল দেখাচ্ছে, আবিষ্কারের সাথে এই গল্প মেলাতে পারছে না কেউ, আমিও না। তবে পরবর্তী দৃশ্যের অপেক্ষায় আছি।
ছেলেটির মুখ যথারীতি হাসি হাসি। আপনারা হয়ত ভাবছেন, এখানে ডেকে এনে আপনাদের গল্প শোনানোর কী প্রয়োজন? সুতোয় বাঁধা পুতুলের মতো সবাই একসাথে মাথা ঝাঁকায়।
আমরা এমন একটা যন্ত্র আবিষ্কার করেছি, যা দিয়ে মানুষের মনের কথা বোঝা যাবে। সবাই নড়েচড়ে বসে।
ঠিক এই গল্পের ছেলেগুলোর মতোই আপনারা কাছের মানুষদের দৃষ্টিভঙ্গি জেনে যাবেন।
চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। নবদম্পত্তি একটা লাফ দেয়। বৃদ্ধকে কিছুটা হতাশ দেখায়; হয়ত জীবনের শেষ প্রান্তে এসে এই প্রাপ্তি তাকে আশান্বিত করতে পারে না। আমি আশ্বানিত হই,আমার সামনে পুরো জীবন পড়ে আছে। সেই অমনোযোগী কিশোরটিকেও দেখি মনোযোগী হতে।
কিন্তু একটা সমস্যা আছে।
আমাদের কেন এখানে ডাকা হয়েছে, সেটা আমাদের কাছে পরিষ্কার ছিল না। কিন্তু আমাদের সবার মনেই যন্ত্রটা হাতে পাবার জন্য একটা ইচ্ছে একলাফে হিমালয় ছুঁয়ে গেছে। তাই, লোকটা কী সমস্যার কথা বলতে চায়, আমরা ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। হৈ-চৈ চলতে থাকে। বিভিন্ন ধরনের কথা উড়তে শুরু করে এই ঘরের সীমানায়………….আমাদের কী এটা এখন দেয়া হবে?......আমাদেরকেই কেন দেওয়া হবে?........আমরা দেখতে চাই, আমরা তাড়াতাড়ি দেখতে চাই.........আনছেন না কেন?
এর ভেতর আমিও কিছু একটা বলি । উত্তেজনায় নিজের কণ্ঠ, নিজের কাছেই অচেনা লাগে, এত কথার ভীড়ে নিজের কথাও আলাদা করতে পারি না।
আপনারা থামুন, আমাদের বলতে দেন।
আমরা থামি।
ছেলেটি বলতে থাকে, আমাদের কাছে মাত্র তিনটা যন্ত্র আছে, দেওয়ার মতো। আমরা দেখতে চাই, আপনাদের মতো সাধারণ মানুষ এটা পেলে কী করে? এজন্য আপনাদের খুঁজে আনা, এমন কাউকে যাদের জাগতিক লোভ-লালসা কম কিংবা নেই।
ছেলেটার কথা শুনে আমি নিজের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে যাই। আসলেই তো, আমার জাগতিক লোভ-লালসা নেই। বিয়ে করিনি, কাউকে ঘুষ দেইনি, অন্যায় করিনি, রাজনীতি থেকে দূরে। আজকালকা্র যুগে আমার মতো ভালো মানুষ কে আছে? তবে এই মুহূর্তে যন্ত্রটা পাবার জন্য তীব্র একটা লোভ, আমাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। মেলাতে পারছি না নিজেকে। ধীরে ধীরে নিজেকে স্থির করে, ছেলেটির কথার দিকে মনোযোগ দিতে চেষ্টা করি।
তিনটা যন্ত্র আপনাদেরকেই দিব । তবে, তাদেরকেই দিব যারা তাদের সবচাইতে প্রিয় জিনিষ আমাকে দিয়ে যেতে পারবেন।
আমার প্রিয় জিনিষ কী? আমি আমার উপন্যাসের পান্ডুলিপি দিয়ে আসি।
বৃদ্ধ দিয়ে আসে ফাকা চেকবুক।
অনেকে, অনেক কিছু দিয়ে আসে।
নবদম্পত্তি একে অপরকে দান করে আসতে চায়। বলে, যন্ত্র পেলে তোমাকে লাগবে না। মেয়েটির চোখে তখন অবাক দৃষ্টি। সেই দৃষ্টিতে লোভ এসে যায়। সে বলে, তুমি কী ভাবছ তোমাকে আমার লাগবে?
আমি মনে মনে হাসি। যাক বাবা, কোনো মানুষের কারবার নেই। একটা পান্ডুলিপি দিয়েছি, আরেকটা লিখব।
কিশোর ছেলেটি লোকটার কানে কানে এসে কিছু বলে আমরা শুনতে পাই না। লোকটার মুখে নেমে আসে আধাঁর। সবাই সবকিছু দিয়ে যাবে, তাহলে কেমনে হবে?
শুধু একজন নারী বসেছিলেন, চুপচাপ।
আপনি কিছু বলছেন না যা?
আমার তো দেয়ার কিছু নেই। আমার যন্ত্র লাগবে না।
আমরা সবাই ঘুরে নারীটির দিকে তাকাই। বিশেষত্বহীন চেহারা, গালে বয়সের ছাপ। এমন কথা যে কেউ বলতে পারে, আমাদের ধারনা ছিল না। অনেকেই ফিক করে হেসে ফেলে।
আপনার কাছে কিছু নেই?
কিশোরটিকে দেখিয়ে বলে, আমার ছেলে আছে। আমার ছেলের সাথে পৃথিবীর কোনো সম্পদের তুলনা চলে? খুব ভালো ছেলে আমার।
কিছুক্ষণের জন্য পুরো ঘর চুপ হয়ে যায়।
নীরবতা ভাঙে কিশোর ছেলেটির কথায়। যন্ত্র আবিষ্কারক পক্ষের ছেলেটিকে সে বলে, আমি তো পাচ্ছি, একটা যন্ত্র?
ছেলেটি নীরবে মাথা ঝাঁকায়।
আমি ক্ষেপে উঠি। আমাদের কী হবে?
অন্যরা ক্ষেপে ওঠে,আমরা কেন পাব না?
কে জানি বলে, এ তো কিছুই দিল না।
হৈ-হুল্লোড়ের মাঝখানে ছেলেটি বলল, ও ওর মা’কে বেচে দিয়েছে।
মা’র মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি অবিকল আমার মায়ের মতো চেহারা।
#
আমরা সেখান থেকে চলে এসেছিলাম, আমি সেখান থেকে চলে এসেছিলাম। আসলে মানুষ চিনতে হলে যে যন্ত্রের প্রয়োজন হয় না, বুঝে গিয়েছিলাম।
বহুদিন বাড়ি যাই না। মহাখালী বাস-স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি। বিস্মিত হয়ে লক্ষ্য করলাম, কোন পথে বাড়ি ফিরতে হয়, কোন বাসে ফিরতে হয় মনে নেই।
একজনকে জিজ্ঞেস করতেই বলল, আরে রংপুর তো গাবতলী থেকে যাইতে হয়। মাথা খারাপ নাকি, আপনার?
হেসে ফেলি আমি। হাসা ছাড়া আর কিছুই করণীয় ছিল না আমার।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে আগস্ট, ২০১১ রাত ২:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


