অন্যান্য সাধারণ সন্ধ্যার মতো ছিল সেদিনের সন্ধ্যা। সূর্য সবে ঘুমোতে গেছে সারাদিনের ক্লান্তি শেষে। আকাশ জুড়ে মেঘের কালচে চাদর। হঠাৎ করেই একজন বন্ধু আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, দোস্ত একটা গল্প বল। অপ্রস্তুত হয়ে বলি, ধুর ব্যাটা! গল্প বলা যায় নাকি, লিখা দিতে পারি; কালকেই একটা গল্প লিখছি।
কী বালের রাইটার হইলি? একটা গল্প বলতে বললাম, এত বাহানা করস ক্যান?
আঁতে ঘা লাগে, ঠিক কোন গল্পটা বলব, বুঝে উঠতে পারি না; তাই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি, চারপাশ থেকে টিপ্পনীর ঝড় শুরু হয়ে যায়।
ক’দিন আগে আমরা বন্ধুরা মিলে সিলেট গিয়েছিলাম বেড়াতে। যাওয়ার সময় ট্রেনে এক বিষণ্ণ চেহারার বিশেষত্বহীন লোককে একটানা শুধু জানালা দিয়ে তাকিয়ে জার্নি পার করতে দেখেছি। ওনার পাশে ছিল এক রুপবতী তরুণী। তাই আপাতদৃষ্টিতে বিশেষত্বহীন এই লোক দীর্ঘক্ষণ আমাদের ঈর্ষার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, আমরা তার বিভিন্ন খুঁত বের করতে থাকি; নাকটা একটু বোঁচা, মুখ থ্যাবড়ানো ইত্যাদি, ইত্যাদি। শালা,পাশে বসতে পারলে কাজ হতো, আজ- অনেকেই ঠিক এইভাবে ভাবতে থাকে।
আমি সুযোগ বুঝে কথাটা তুলি। তোদের ট্রেনের লোকটার কথা মনে আছে?
সবাই মুখ দিয়ে বিচিত্র একটা শব্দ করল, যার মানে হচ্ছে, আছে। আমি বললাম, ওই লোকের গল্প বলব তোদের।
গল্প শুরু করার আগে একটা চরিত্রের প্রয়োজন হয়, আকাঙ্খিত চরিত্র পেয়ে গিয়ে কোনো নাম খুঁজে না পেয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকি; লোকটির সাথে মানানসই নাম কী হবে? ভাবতে ভাবতে পেয়ে যাই।
বিস্তীর্ণ আঁধারে ছুঁয়ে থাকা গ্রামগুলো, যত্ন আর ভালোবাসায় গড়ে ওঠা ফসলি জমিগুলো হুঁশহুঁশ করে পাশ কেটে বেরিয়ে যাচ্ছে। সেদিকে চুপচাপ তাকিয়ে আছে আনিস। চাকরি থেকে ক’দিনের জন্য পালিয়ে সিলেট ঘুরতে যাচ্ছে। নিত্যদিনের ব্যস্ততা থেকে একটু দূরে যাওয়া। ট্রেন যত দূরে যাচ্ছে আনিসের মন ধীরে ধীরে ভালো হতে থাকে। মনে হচ্ছিল ট্রেনে ওঠা মাত্র বসের ফোন আসবে; আনিস, একটা কাজ পড়ে গেছে, তাড়াতাড়ি চলে আসো।
হঠাৎ চোখ আটকে গেল আনিসের। জানালা দিয়ে মাথা বের করে বাইরে তাকালো। কালো কুচকুচে আঁধারে চেনা বৃক্ষের অচেনা ছায়ার ফাঁক গলে সে দেখতে পেল একটি কাকতাড়ুয়া দাঁড়িয়ে আছে অলস ভঙ্গিতে দু হাত ছড়িয়ে, যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমোচ্ছে। মনে হতে পারে, এত আঁধারে কীভাবে সে দেখতে পেল সেই কাকতাড়ুয়াকে? প্রশ্নটা আনিসের মনে আসামাত্র সে খেয়াল করল মশাল হাতে অর্ধনগ্ন এক লোক কাকতাড়ুয়ার পায়ের কাছে চুপচাপ বসে আছে; ঠিক তারমতোই নিঃসঙ্গ।
এত রাতে এই লোক এখানে কী করছে? আমরা একটু দূরেই হইচই করছিলাম, এগুলো কিছুই দেখিনি। আনিস একবার এদিকে তাকিয়ে আবার চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেল।
হয়ত লোকটা কিছু ফেলে গিয়েছিল, সেটা খুঁজতে এসেছে। কী ফেলে যেতে পারে? কৃষকের জীবন সম্পর্কে ধারণা কম থাকায়, সে খুব বেশি কিছু ভাবতে পারেনা। তবে তার মাথায় ঠাশ করে আঘাত করে যে সে প্রায় রাতে ছাদে গিয়ে এভাবে নির্ঘুম রাত কাটায়। হয়ত অফিসে কাজের চাপ কিংবা দাম্পত্য জীবনের অশান্তি অথবা শৈশবের কোনো দুঃখমাখা স্মৃতিতে আক্রান্ত হয়ে রাতের ঘুম ঘুমিয়েই থাকে দূরে কোথাও গিয়ে, তখন সে ছাদে যায়, তারা দেখে, মেঘ দেখে, আকাশ দেখে, ফাঁকা সড়কে প্রিয় কোনো ছবি আঁকে।
এমন হতে পারে লোকটি তার বউ এর সঙ্গে ঝগড়া করে চলে এসেছে, মন খারাপ করে বসে আছে। আনিস নিজেই খারিজ করে দেয় সেই যুক্তি। ঝগড়া হলেই বা মাঝরাতে কেন সে কাকতাড়ুয়ার সামনে এসে বসে থাকবে? একে একে যখন কোনো উত্তর খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয় হতাশ হয়ে পড়ে তখন আমরা বন্ধুরা মিলে গান গাচ্ছিলাম, ‘ আমার যমুনার জল দেখতে কালো’। আমরা জানতাম না, এই বিশেষত্বহীন লোকটি আমাদের গান নিয়ে ভাবতে থাকবে এবং আমাদের উচ্ছ্বাসের কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা করবে, তার কাছে মনে হবে, রাতের আঁধারে বসে থাকা লোকটির ন্যায় আমাদের আনন্দ কোনো অর্থ বহন করে না। আনিসের চরিত্রের এই দিকটি আমাদের সামনে উন্মোচন করে দেয় যে, আনিস কখনোই খুব বন্ধুবৎসল ছিল না কিংবা তার এখনো কোনো বন্ধু নেই।
আনিস ভাবতে চেষ্টা করে, সে কখনো এভাবে বন্ধুদের সাথে গান গেয়েছে কি’না, হইহই করতে করতে বেড়াতে গিয়েছে কি’না; যথারীতি তাকে ব্যর্থতা মেনে নিতে হয় এবং তখন তার নিজেকে মনে হয় অলস রাতের কাকতাড়ুয়া যে শুধু দাঁড়িয়েই থাকে কিন্তু কিছু বুঝতে পারেনা।
ভাবনা ট্রেনের মতোই ছুটতে থাকে, কোথাও স্থির হয়না।
আখাউড়া স্টেশনে যখন ট্রেন এসে থামে তখন আমাদের ভেতর কেউ কলা খেয়ে খোসাটি বাইরে ছুড়ে মারে। রেললাইনের ঠিক উপরে গিয়ে পড়ে। সেটা দেখে আনিসের মনে হয় কোনো মানুষ- টোকাই হবার সম্ভাবনা বেশি হয়ত কলার খোসায় স্লিপ খেয়ে পড়ে যাবে, দুই স্লিপারের মাঝে তার পা আটকে যাবে এবং সেই মুহূর্তে কোনো ট্রেন এসে তাকে জীবন-যন্ত্রনা থেকে রেহাই দিবে। এটা ভেবে আনিসের মন প্রসন্ন হয়ে ওঠে, সে কাকতাড়ুয়ার কথা ভুলে যায় এবং আসন্ন দুর্যোগের কথা ভেবে হেসে ফেলে, ঠিক সেই মুহূর্তেই আবার আমাদের ট্রেন চলতে শুরু করে এবং আনিসকে উপলব্ধি করতে সাহায্য করে যে, এটা স্টেশন এবং এখানে ঐ ধরণের দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে; আনিস আবার বিষণ্ণবোধ করে। সুতরাং আমরা খুব স্পষ্ট করেই বুঝতে পারি, আনিসকে আমরা যত সহজ-সরল ভেবেছিলাম সে আদৌ ওমন নয় বরং তার ভেতরে একটি হিংস্র সত্ত্বা লুকিয়ে আছে।
আমরা এবার পাশের সুন্দরী যাত্রীর দিকে চোখ ফেরায়। লাল সালোয়ার কামিজ পরিহিত তরুণীকে ট্রেনের হালকা লাল আলোতে লাল পরীর মতো লাগছে, এমন কথা কেউ কেউ বলছিল, যদিও তাদের কেউ কখনো পরী দেখেনি তারপরেও এই লাল পরীর সান্নিধ্য পেতে তারা অস্থির হয়ে ওঠে এবং বিস্মিত হয়ে খেয়াল করে তার পাশের যাত্রীটি কোনো কথাই বলছে না। মহিলাটি চোখ বন্ধ করে আছে, ঘুমোচ্ছে কি’না বোঝা যাচ্ছে না।
আমরা ক্রমাগত গালমন্দ করে যেতে থাকি লোকটিকে। আনিস সেই মুহূর্তে পাশের সিটের সহযাত্রীর উপস্থিতিতে বিরক্ত হচ্ছিল, হাত-পা ছড়িয়ে বসতে পারছিল না দেখে একবার তার ইচ্ছে হয় ধাক্কা দিয়ে তাকে ফেলে দিতে, যদিও সে তেমন করতে পারেনা। এতে করে বোঝা যায়, আনিস একটু উদাস, হিংস্র স্বভাবের হলেও তার ভেতর ভদ্রতা আছে, তাই সে নিজের ভাবনাতেই ডুবে থাকে।
স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে আনিস মেয়েদের পছন্দ করে না। হয়ত সে করে কিন্তু বিবাহিত বলে পাত্তা দেয় না কিংবা সে এতটাই অপছন্দ করে যে বিয়েই করেনি। তারচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সে মেয়েটির কনুই এর ধাক্কা খায় এবং তার ভেতরের হিংস্র পশু জেগে ওঠে, সে ধমক দিয়ে বসে, সমস্যাটা কী তোমার?
আমাদের অবাক করে দিয়ে, মেয়েটি বলে, রাগ করো না। তুমি ভাবো, আমি ঘুমোবো, পৌছানোর আগে ডেকে দিও।
আমরা তৎক্ষনাৎ বুঝতে পারি, এই সুন্দরী আসলে লোকটির বউ; বিশ্বাস করতে না পেরে এক বন্দু গান শুরু করে দেয়, ঘরে ঘরে এক-ই নারী, সারা জাহান এক-ই নারী, নারী চেনা ভীষণ দায়গো...
এবার লোকটি উঠে দাঁড়ায় আর রাগান্বিত স্বরে আমাদের বলে, স্টপ দিস ননসেন্স।
অচেনা এই চুপচাপ, বিশেষত্বহীন আনিসের ব্যবহার আমাদের অবাকের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় কিন্তু আমাদের আনন্দ-উল্লাস বন্ধ করতে পারেনা। আমরা বুঝতে পারি, মানুষ চেনা সহজ নয়; চিরচেনা তথ্যটি আমরা নতুন করে উপলব্ধি করতে পারি।
আনিসের মতোই বিশেষত্বহীন আমার এই গল্পটি শেষ হয়ে যায়, আমরা আড্ডা শেষে যে যার বাড়ির দিকে ফিরতে থাকি। কেউ খেয়াল করেনা ফেরার পথে পাহাড়ের গা বেয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাকতাড়ুয়া, সে যেমন নিশ্চুপ থেকে কাক তাড়াতে ব্যস্ত, আমরা ঠিক তাই নিশ্চুপ থেকে জীবন চালাতে ব্যস্ত; উদ্দেশ্যহীন পথ চলা, কাক তাড়ানো কাকতাড়ুয়া আমাদের দেখে মুচকি হাসে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

