somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কেন আমি চাই/চাই না তসলিমা নাসরিন ফিরে আসুন

২৮ শে নভেম্বর, ২০০৭ রাত ১০:৪১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বড় একটা টু বি অর নট টু বি কোয়েশ্চেন। তসলিমা ফিরবেন কি ফিরবেন না এই প্রশ্নেই শুধু দেশের মানুষ দুই ভাগ হয়ে যেতে পারে। এ ভবিতব্য যেন কোনো লেখকের নয়, যেন কোনো রাজনীতিকের। অথবা যেন তসলিমা কোনো দালাইলামার মতো কোনো এক ধর্মীয় নেতা। না তসলিমাকে নিয়ে কোনো লেখার ইচ্ছা ছিল না। প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে তাকে নিয়ে এত লেখা হয়েছে। তাকে নিয়ে এত বৃথা বাক্য ব্যয় হয়েছে যে অনেক তসলিমা মিলিয়ে তার দায় শোধ করতে পারবেন না। কিন্তু সত্য হলো একজন তসলিমাকে নিয়েই সেটা হয়েছে। আর সেটাই হয়তো তার প্রাপ্য। আমি সত্যিই জানতাম না তসলিমাকে নিয়ে আমার কোনো মত আছে কি না। অভ্যাসমতো আউটলুক ম্যাগাজিনের সাইটে ঢুকেছিলাম আজ। খুশবন্ত সিং, অরুন্ধতী রায়, লেয়লা শেঠ, শ্যাম বেনেগাল, বিজয় টেন্ডুলকার, গিরিশ কারনাড, সায়ীদ নাকভি সহ বেশ কয়েকজন বিবৃতি দিয়েছেন যে, তসলিমাকে ভারতে থাকতে দেয়া হউক। এদের অনেকেই আমার প্রিয় বুদ্ধিজীবী। ভারতে থেকেও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এদের অনেকেই কথা বলতে পারেন। লড়তে পারেন বলে এদের কথার আলাদা মূল্য শুধু আমাদের কাছে নয়, অনেকের কাছেই আছে। এরা যখন বললেন, তসলিমাকে ভারতে থাকতে দিন তখনই মনে হলো আমাদেরও কিছু বলার আছে।
তসলিমা আমার ছোটবেলায় প্রিয় হয়ে ওঠা লেখক। কলেজে থাকতে নিয়মিত তখনকার সাপ্তাহিক যায়যায়দিনে তার কলাম পড়তাম। তার কথাগুলো ভীষণ প্রভাব ফেলতো মনে। কিন্তু কি এক অদৃশ্য তাড়নায় দেখলাম তার লেখাগুলো ক্ষুরধার হওয়ার বদলে পাগলপারা হয়ে উঠলো। বিতর্কিত থেকে বিতর্কিততর লেখক হতে চাইছিলেন মনে হয় তিনি। বাসায় যায়যায়দিন বন্ধ হলো। আমি গোপনে নির্বাচিত কলাম কিনে পড়লাম। কবিতা কিনে পড়লাম। উপন্যাস পড়লাম ধার নিয়ে গোপনে। তখন পড়া একটা লাইন এখনও আমার মাথায় ঘোরে : বালিকারা যে খেলাটি খেলবে বলে পৃথিবীতে সন্ধ্যা নামে তার নাম গোল্লাছুট। তসলিমা লিখেছিলেন। তখন মনে করতাম তসলিমাই বাংলাদেশের একমাত্র নারী লেখক, অন্যেরা সব লেখিকা। এখনও অনেকটা তাই মনে করি। তার পালিয়ে যাবার দিনগুলোর কথা মনে আছে। দাগী সন্ত্রাসীর মতো তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন। ভারত হয়ে। এভাবে বাংলাদেশের সন্ত্রাসীরা ওয়ারেন্ট হলে বারতে চলে যায়। মনে হয়েছিল, এই দেশ যেন মুক্তবুদ্ধি চর্চার কোনো জায়গা নয়। এ দেশ যেন একটা অপমানের দেশ।
ধীরে ধীরে বোঝার চেষ্টা করেছি। হুমায়ূন আজাদ, আহমদ শরীফ, আরজ আলী মাতুব্বর যদি দেশে থেকে যেতে পারেন, তবে তসলিমা কেন পারেন না? এই প্রশ্নের উত্তর আমি জানি না। তিনি নারী বলে? নাকি তার আশ্রয়-প্রশ্রয় আছে বলে? দুইটাই সত্য হয়তো আরও সত্য আছে। লজ্জার মতো কোনো আবর্জনা আমার প্রিয় একজন লেখক লিখতে পারেন এটা আমি ভাবতেই পারি না। তবে ধর্মের সমালোচনা করার ব্যাপারটা তখন আমি সমর্থনই করেছিলাম। আরও পরে বুঝতে পেরেছি, ধর্মের এই আক্রমণাত্বক সমালোচনা ধর্মের ব্যবহারকে চেঞ্জ করে না। ধর্মের রাজনীতিকে দুর্বল করে না। তাকে ফুলিয়ে তোলে ফাঁপিয়ে তোলে। ধর্মকে আক্রমণ করে কোনো লাভই হয় না। ধর্মের সম্মানীয় মানুষগুলোকে অপমান করলে কেউই আর অপমানকারীর কথা শুনতে চায় না। তখন কথা শোনে বিজেপি, কথা শোনে বিদেশী স্বার্থের লোকজন। মনে আছে, তখন কী রমরমা ছিল বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের আর ভারতে হিন্দুপন্থীদের। তসলিমা সেই ব্যবহৃত হতে শুরু করলেন। তসলিমা হলেন বিদেশে বাংলাদেশের সমাজ, ধর্ম, রাজনীতির এক চলমান ও নেগেটিভ রাষ্ট্রদূত। তিনি যেখানেই গেলেন সেখানেই বললেন, আমরা খারাপ। আমাদের সমাজ খারাপ, আমাদের ধর্ম ব্যবস্থা খারাপ। সেই দেশের মতো দুর্ভাগা দেশ আর নেই। যে দেশের ভিন্নমতাবলম্বী লেখককে বের করে দেয়া হয়। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে আমরা দেখেছি। যে দেশের নির্বাসিত লেখক আছে তার দুর্নাম কাটতে একশ বছর লাগে। তবুও কাটে না।
আমাদেরও দুর্ভাগ্য। তসলিমা বিদেশে আছেন। ভারতে আছেন। বহু দেশ ঘুরে বিনে স্বদেশী ভাষা যখন তার মনের আশা মেটেনি তখন তিনি কলকাতায় এসেছেন। তার প্রিয় দাদাদের কাছেপিঠে থেকে সাহিত্য চর্চা করেছেন। আর পুরনো যে কাজ, ইসলামের সমালোচনা সেটাই সমানে করে গেছেন। দাদারা বলেছে, ভালো ভালো। কিন্তু দাদাদের দেশেও ভাইলোগ আছে। তারাও এসপার ওসপার কিছু করে ফেলতে পারে। ফলে, তসলিমা ভারতে থাকবেন কি থাকবেন না সেটা নিয়ে ভারত কেঁপে গেছে। এখনও কাঁপছে। একজন নির্বাসিত লেখককে আশ্রয় দেয়া যে কোনো সভ্য রাষ্ট্রের কর্তব্য। একজন ফেরারি রাজনীতিককে আশ্রয় দেয়া যে কোনো রাষ্ট্রের কর্তব্য যদি তিনি কোনো ক্রাইম করে না থাকেন। সে দিক থেকে ভারতের মানুষ ভাল কাজ করেছেন। কিন্তু ভারতে বহু আধিপত্যবাদী শক্তি শুধু বাংলাদেশের ওপর একটা মানসিক চাপ বজায় রাখতে তসলিমাকে রেখেছেন। তাকে দেখিয়ে আমাদের ছোট করার কাজ করেছেন। এরাই রাখার মালিক। ফলে, মতাদর্শিক উদারতার কারণে আশ্রয়দান আর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধানের আশ্রয়ের মধ্যে পার্থক্যটা আমাদের বুঝে উঠতে হবে।
কিন্তু সবার আগে যে কাজটা করতে হবে সেটা হলো, তসলিমাকে ফিরিয়ে আনতে হবে। আমি জানি না, তার বিরুদ্ধে মামলা আছে কি না। তাকে ধর্ম অবমাননার জন্য ক্ষমা চাইতে হবে কি না। অথবা তিনি এই পোড়ার দেশে ফিরতে চান কি না আদৌ। তার সঙ্গে আলাপ হতে পারে, আলোচনা হতে পারে। আলাপ আলোচনা ছাড়া তাকে দেশে আনলে যে কোনো সরকার পড়ে যাবে। দেশে সংঘর্ষ হবে। কোনো সরকারের শুভানুধ্যায়ীরই উচিত না তসলিমাকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দেয়া। তারপরও আমরা চাই, এই সরকার বা কোনো গণতান্ত্রিক সরকার তাদের সুবিধাজনক সময়ে তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা শুরু করুক। যে রাজনৈতিক পক্ষগুলো তার বিরুদ্ধে তাদের সঙ্গে কথা বলুক। তার বিরুদ্ধে মামলা থাকলে আদালতে তার নিষ্পত্তি হবে। কিন্তু বাংলাদেশের একজন লেখক কেন ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেবে? জঙ্গি হুজুরদের বোধোদয় হতে হবে। এটা বাংলাদেশের জন্য কত বড় একটা লজ্জার বিষয় এটা বুঝে ওঠার ক্ষমতা তাদের অর্জন করতে হবে। তসলিমা ও হুজুর এই দুই প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বোধোদয়ের অপেক্ষায় আমাদের হয়তো আরও অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে।
৫৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×