কথায় আছে, ঝড়ে বক মরে ফকিরের কেরামতি বাড়ে। কথাটার মর্তবা এতদিন বুঝি নাই। এক্ষণে বুঝিলাম। ফকির ইলিয়াস সামহয়ারে একটা পোস্ট দিছেন আন্দাজ ও সাহিত্য নামে। পোস্টাটা দেরিতে আমার নজরে আসে। ফলে দেরিতেই বুঝলাম ফকিরের কেরামতি কী জিনিশ। সব পোস্ট তো পড়া হয় না। এই পোস্টটাও না পড়ার দলেই ছিল। পইড়া দেখলাম মহার্ঘ্য জিনিশ। আমারে উদ্দেশ্য কইরাই মূলত দিছে। অন্তত ব্লগে দিছে আমারে উদ্দেশ্য কইরা। ফলে, অভ্যাসবশত জিগাইলাম ওনারে। উনি একখানা লিঙ্ক আর একখানা কৌতুকময় কমেন্ট ধরায়া দিলেন। ভাল লাগলো। তাইলে পাগলের সুখ শুধু মনে মনে না। বাস্তবেও।
ফকির বাবু বিখ্যাত কলামিস্ট। হিলারিরে ভোট দেন আবার আওয়ামী লীগ যাতে ভোটে জেতে সেইজন্য বাংলাদেশের পত্রপত্রিকায় লেখালেখিও করেন। সে লেখালেখি এই লেখার বিষয় নয়। বিষয় হইলো, উনি আমারে মানে দেবেশ রায়ের প্রবন্ধে উল্লেখিত কতিপয় ব্যক্তিকে নিয়ে ব্লগের পাশাপাশি বহুল প্রচারিত দৈনিক সংবাদেও একখানা কলাম ফরমাইয়াছেন। ব্লগের পোস্ট ও কলামের উষ্মা ও অযুক্তির প্রকোপ দেইখা মনে হইলো পৃথক পোস্ট দিয়া ব্যাপারটার প্রতিবাদ করি। ব্লগে কে যে কারে কোন কারণে কোন দিক দিয়া আক্রমণ করে বুঝা বড় ভার। তবে মনে পড়ে, ছক্কা হাজি তাবিজের কথা প্রথম কইছিলো। কইছিলো, আমি নাকি দেবেশ রায়ের লেখা তাবিজ বানায়া ঘুরতেছি। ফকির ইলিয়াস ছক্কার কাছ থেকে তাবিজের আইডিয়াটা মারছেন বলে মালুম হইতেছে। তবে তর্কের খাতিরে বলতে গেলে বলতে হয়, হাজির চেয়ে ফকিরেরই বেশি অধিকার তাবিজ বিতরণের।
যাই হোক ফকির আমার গলায় তাবিজ ঝুলাইয়া দেওয়ার আগে পরে কিছু কথা লেখছেন। সে কথা নিয়া পরে আলোচনা হইবে। আপাতত তাবিজ নিয়া কথা।
দেবেশ রায়কে এবার বাংলাদেশে আনছে ছায়ানট। তিনি এইখানে সমকালীন কথাসাহিত্যের ওপর বক্তৃতা দিছেন লোক পত্রিকার আয়োজনে। সে আয়োজনটির অনেক ত্রুটি আছিল। ফলে, তাৎক্ষণিকভাবে মঞ্চে উইঠা আমি এগুলার প্রতিবাদ জানাইছি। বলছি, দেবেশ রায়ের ওপর বাংলাদেশে গত দশবছরে যেখানে একটা প্রবন্ধ লেখা হয় নাই সেইখানে তারে দিয়া তরুণদের ওপর লেখানো বা বক্তৃতা দেওয়ানো আমি সমর্থন করি না। তাতে আয়োজকরা ব্যাজার হইছেন। ফকির বাবার বাংলাদেশ কানেকশন ভাল উনি আমার কথাটা যাচাই কইরা নিতে পারেন। এই বাদ প্রতিবাদের পরও আমি সমকালীন বাংলা সাহিত্যের সেরা নভেলিস্ট তাকেই মনে করি। আনন্দবাজারীদের নয়। দেবেশ রায়ের প্রবন্ধের বক্তব্যের সঙ্গে আমার দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও আমি সেটাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছি সেইটা দেবেশ রায়ের বইলা। ফলে, সেইটা গুরুত্ব সহকারে আমার সম্পাদিত পাতায় ছাপার তাগিদ অনুভব করেছি এবং ছেপেছি। আমার পাতার গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলো বছরভর আমি ব্লগে শেয়ার করি। তারই ধারাবাহিকতায় ব্লগে সেই লেকাটা পোস্ট করছি। দুর্ঘটনাক্রমে আমি গল্প লিখি। আমার জানা মতে, ভাল লিখি। ফলে, দেবেশ রায়ের প্রবন্ধে আমার কথা আছে। তবে মোটামোটি নেগেটিভলি তিনি আমার কথা উল্লেখ করছেন। তাতে আমি খুশী হই নাই। আমি মনে করছি উনি আমার অধিকতর ভাল গল্পগুলা পড়তে পারতেন। কাহিনী এইখানে শেষ। এখন ফকির বাবা কেন এই লেখারে তাবিজ বানাইয়া আমাদের গলায় ঝুলাইলেন?
ঘটনা ঘটছে অন্যখানে। সম্প্রতি নেপালের মাওয়িস্ট নেতা প্রচন্ডর একটা সাক্ষাৎকার পড়তেছিলাম। সেইখানে ইনডিয়ার সঙ্গে নেপালের সম্পর্ক নিয়া তিনি কিছু কমেন্ট করছেন। ব্যাখ্যা করছেন ইনডিয়া মানে শুধু সেখানকার শাসকদের আধিপত্যবাদ না। ইনডিয়া মানে সেখানকার বহুমাত্রিক গণতন্ত্রে বিকশিত রাজনীতির নানা ধারা। শেষ কথা ইনডিয়ার জনগণ।
আমি অহরহ আধিপত্যবাদী ইনডিয়ার বিরোধিতা করি। এই কাজটা ইনডিয়ার বহু মানুষ করে। তারা চায় না, ইনডিয়া প্রতিবেশীদের ওপর তার আধিপত্যবাদী নীতি বজায় রাখুক। চায় না, ইনডিয়া আমাদের সিকিমের মতো গিলে খাক। ভুটানের মতো করদ করে রাখুক। আমরা ইনডিয়ার আধিপত্যবাদী নীতি পছন্দ করি না। যে কোনো দেশপ্রেমিক মানুষ সেটা করেন। ফকির বাবার, জ্ঞাতার্থে বলি, দেবেশ রায় ইনডিয়ার নাগরিক হলেও তিনি আগাগোড়া সকল আধিপত্যবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও চাপানো নীতির বিরোধিতা করে এসেছেন। ফলে, তিনি আধিপত্যবাদী ইনডিয়ার প্রতিনিধি হইতে পারেন না। ইনডিয়ার আদিপত্যবাদী নীতির বিরোধিতা করা আর দেবেশ রায় বা অরুন্ধতী রায়ের লেখা প্রকাশ করার মধ্যে বিরোধ যারা দেখতে পায় তাদের মতো নির্বোধ খুঁজে পাওয়া ভার।
সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমি সচরাচর আনন্দবাজার গোষ্ঠীর অনুপ্রবেশমূলক মানসিকতার বিরোধিতা করি। বই-টিভি চ্যানেল সংস্কৃতির যেমন তেমনি বাণিজ্যেরও বিষয়। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আধিপত্যবাদী অংশটি আমাদের টিভি চ্যানেলগুলো সেখানে দেখাতে দেয় না। আর বাংলাদেশে তাদের টিভি চ্যালেনগুলোর একটা বন্ধ করেন। দেখবেন, ফকির ইলিয়াসদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। বাংলাদেশের সাহিত্যের একজন সদস্য ফকির। তার অজানা থাকার কথা নয়, বাংলাদেশের বই নিয়া পশ্চিমবঙ্গে বিক্রেতা ও আমদানীকারকদের অনীহার কথা। তারা আমাদের এখানে বই পাঠাতেই বেশি উৎসাহী। কিনেত চান না একটাও। বই আসার বিরুদ্ধে নই আমি। ফকির যদি কোথাও দেখাইতে পারেন তাইলে ভাল হয়। কোনো বইয়ের পথই রুদ্ধ করতে চাই না আমরা। কিন্তু, কেউ রুদ্ধ করলে তার প্রতিবাদ করতে চাই। বাংলাদেশে শুধু বই রফতানিতেই আনন্দবাজার সহ পশ্চিমবঙ্গে প্রকাশকরা তৃপ্ত নন। তারা আমাদের প্রকাশনা শিল্পে সোজাসুজি ডুকে পড়তে চান। এইখানে উৎপাদন করে পশ্চিমবঙ্গে বই বাজারজাত করতে চান। আমাদের একুশে বইমেলা দখল করতে চান। আমি এইটার বিরোধিতা করি। কিন্তু ফকির বাবা কী বলেন দেখেন। আমরা নাকি ভাষা-সংস্কৃতির আদান-প্রদানে বাধা দিচ্ছি। কোথায় দিচ্ছি? তিনি একটা জাতীয় দৈনিকে কারো নাম উল্লেখ না করে এই যে দেবেশ রায়ের প্রবন্ধে উল্লেখিত কাউকে কাউকে দোষারোপ করলেন তার পুরোটাই ফকিরের উর্বর মস্তিস্কপ্রসূত। কোনো তথ্য প্রমাণ না দিয়ে এইভাবে কথা বলে তিনি প্রবন্ধে উল্লেখিত সব গল্পকারকেই অপমান করেছেন। বস্তুত তিনি দেবেশ রায়ের আন্দাজের কথা বলতে গিয়ে নিজেই আন্দাজের ফাঁদে পড়েছেন। সে আন্দাজ শুধু আন্দাজ না স্রেফ মিথ্যাচার।
এখন আমি চাই তিনি তার বক্তব্যের সপক্ষে কিছু তথ্য প্রমাণ হাজির করুন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


