উপক্রমণিকা
ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় একদা বাচ্চাছেলেদের মাথা খাওয়া বক্তাদের কথা কইছিলেন। ওনার ভাষায় এনাদের নাম- ছেলেখেকো বক্তা। শূন্যদশকের শুরুতে, বলা যায় পুরা নব্বই দশক জুড়ে আরেক ধরনের বক্তার খুব দেখা পাওয়া যাইতো। সংক্ষেপে এনাদের বলা যায় চ্যালেঞ্জ খেকো বক্তা। এনারা একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ খেয়ে তা মোকাবেলা করার জন্য ব্যতিব্যস্ত আছিলেন। কথা শুনে মনে হইতো, একবিংশ শতাব্দির চ্যালেঞ্জ না জানি কী বস্তু। এর জন্য প্রস্তুত না হলে ভবিষ্যত কতই না অন্ধকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল আর দশটা বছরের মতো একবিংশ শতকের প্রথম দশটা বছরও চলে গেল। কাব্য করে বললে বলতে হয় নীরবে নিভৃতে চইলা গেল। মাঝখান থেকে হারিয়ে গেল একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ কথাটাই। অথচ বহুল কথিত সেই চ্যালেঞ্জের মধ্যেই বসে আছি আমরা।
কথা ঠিক যে, সময়ের বদল বছরের হিসাবে হয় না। যুগান্তর বলে কয়ে আসেও না, যায়ও না। যুগ চলে গেলে নতুন যুগ আসে। কিন্তু যুগান্তর ঘটে না। তবু সময়ে বড় একটা অংশ যখন চলে যায় তখন নতুন কালের কিছু আভাস ইঙ্গিত মেলে। একটা দীর্ঘ দশকে নতুন কিছু অবশ্যই ঘটে। তৃতীয় সহস্রাব্দের শুরুতে পুরনো সহস্রাব্দগুলোর মূল্যায়নের ঘটা পড়ছিল। সময়ের এক প্রান্তে দাঁড়ায়ে পুরা প্রান্তরের দিকে পাখির চোখে তাকানো মনে হয় তুলনামূলকভাবে সহজ।
শ্রীমদ্ভদভাগবত গীতায় আছে, জলমগ্ন স্থানে কূপ খোঁড়া যায় না। তেমনি সময়ও। অতীতের মূল্যায়ন সহজ। কিন্তু যে সময়ে আমরা থাকি, যে সময়ের প্রতিটা পল আমাদের যাপন করতে হয় ভাল-মন্দ সহকারে, তার মূল্যায়ন অনেক কঠিন। তবু মূল্যায়নের রেওয়াজ চলে আসছে। ইউরোপীয় সময়ের ধারণায়, সঠিকভাবে বললে সময় সম্পর্কে সেমেটিক ধারণায় পৃথিবীর শুরু ও শেষ আছে। ইউরোপীয় চৈতন্য থেকে পাওয়া সময়ের চেতনা আমাদের বিশেষ প্রভাবিত করছে গত আড়াইশ বছর। ফলে বছরের শুরু ও শেষ বলে একটা বদ্ধমূল ধারণা নিয়ে আমরা নানা হিসাব নিকাশ করে অভ্যস্ত হয়া উঠছি।
কিন্তু ভারতবর্ষীয় সময়ের ধারণায় শুরু ও শেষ নাই। এইখানে সময় বৃত্তাকারে ঘুরে, অনেকটা স্পাইরাল রেখায় ফিরে ফিরে আসে। বুঝা যায় ভারতবর্ষের লোকেরা সময়ের পূর্বাপর মূল্যায়নের ধারণা আরব ও ইংরেজ থেকে ধার করছে। এখন সময় সম্পর্কে যে ধারণাগুলা আমরা লালন-পালন করতেছি তা মোটাদাগে ইউরোপকে আমরা কতটা নিতে পারছি তারই আণ্ডাবাচ্ছা।
যাই হউক, এইখানে একবিংশ শতাব্দির প্রথম দশক নিয়া কিছু কথা জমানোর বাসনা নিয়া বসছি। উপক্রমণিকায় সময় নিয়া তর্ক করলে চলবে না। বরং বিষয়ে ঢুকি সময় থাকতে।
এতকাল দশকটিকে আমরা বলে আসছি শূন্য দশক বা একবিংশ শতকের প্রথম দশক। প্রথমে কিছু দোনামোনা থাকলেও শূন্য দশক নামটাই চালু হয়ে গেছলো। ওই নামেই দশটা বছর মোটামুটি কাইটা গেল। শূন্য দশক নামে দশটি বছর চলে গেলেও ইংরেজিতে একে কী বলা হয় তা জানতাম না। কিছুদিন আগে ব্রিটেনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায় এক দশকের সেরা সিনেমার একটা লিস্ট ছাপা হইছে দেখলাম। সেখানেই Noughties কথাটা পড়লাম। nought মানে শূন্য। নটিজ হলো শূন্য দশক। ২০০০ এর শূন্য শাসিত বছরগুলো নিয়ে ইন্টারনেটের বিদ্যাসাগর কী বলে জানতে চাইলাম। উইকিপেডিয়া বলছেন, দশকের শুরু হইছে ১ জানুয়ারি ২০০০ আর শেষ হচ্ছে ৩১ ডিসেম্বর ২০০৯। অর্থাৎ ২১ শতকের শুরুর দশক অর্থাৎ তৃতীয় সহস্রাব্দের শুরুর দশকটি চলে যেতে লেগেছে।
আমাদের দেশে দশকের হিসাব বিশ্বের অন্য জায়গার মতোই হওয়ার কথা। শূন্য দশকের লেখক কবিরা আরেকটা বছর পাইলে ভাল করতেন। কিন্তু সময় ও নদীর স্রোত কাহারো জন্য বসিয়া থাকে না। পাকাপাকিভাবে শূন্য দশক চলে গেল।
শূন্য দশকের সবচেয়ে বড় ঘটনা কী?
কোন ব্যাপারটা গত দশ বছরে আমাদের হাজারবার ভাবাইছে, চিন্তায় ফেলে দিছে? অনেকেই একমত হবেন, গত দশ বছরে দুনিয়ার নায়ক আছিল সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধ (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাষ্ট্রের সেনাশাসিত দুনিয়া ও জর্জ বুশ) ও ইসলাম (আল কায়েদা, রাষ্ট্রবিহীন বিদ্রোহী, ওসামা বিন লাদেন)। কারো কাছে ইসলাম নায়ক, কারো কাছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র বনাম সোভিয়েত ইউনিয়ন মেরুকরণের জায়গায় ইসলাম বনাম যুক্তরাষ্ট্র মেরুকরণটা কেমনে জায়গা কইরা নিল, এইটা চিন্তার বিশেষ খোরাক হইতে পারে।
এখন অনেকেই বলেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতন্ত্র হইলেও আদতে সাম্রাজ্যবাদই আছিল। তবু, পূর্ব ইউরোপ, আফগানিস্তান বাদে বিশ্বের বহু দেশের মাইনষের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতন্ত্রের কেবলা আছিল। কাল্পনিকভাবে হইলেও গরীব মাইনষের বৈশ্বিক মতাদর্শের কেন্দ্র মস্কোয় ছিল একটা সময়। নব্বইয়ের দশকের শুরু ও আশির দশকের শেষে আগে বার্লিন ওয়ালের পতন, সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের পতনের মধ্য দিয়া রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত দুনিয়া যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরে ঠেকে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার বিপর্যয় মতাদর্শ হিসেবে সমাজতন্ত্রের গ্ল্যামার কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হইছে। সোভিয়েত-ভিত্তিক মতাদর্শের পশ্চাদপসারণের মধ্য দিয়া যে শূন্যতা তৈরি হইছিল, রাতারাতি যুক্তরাষ্ট্র ও আল কায়েদা মিলে সেই শূন্যতা পূরণ করছিল। তাই এই দশকের সবচেয়ে বড় ঘটনা বলতে, টুইন টাওয়ারে ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার কথাই বড় কইরা লিখে রাখতে হয়। অভিনব এই বিমান হামলার মধ্য দিয়া যুক্তরাষ্ট্র এক অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করছিল। কিন্তু সেই শত্রু দৃশ্যমান হইছিল আফগানিস্তান দেশে।
এই সময়ের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং যুদ্ধ ইরাক আক্রমণ। ধরনের দিক থেকে দেখলে ইরাক স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার পেন্ডিং আইটেম। কিন্তু ওয়ার অন টেররের মতাদর্শের আওতার মধ্যে কেমনে ইরাক ধীরে ধীরে চইলা আসলো এইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণের বিষয় হইতে পারে।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ক্রমে আওতা বড় করতেছে। পাকিস্তান ইতিমধ্যে আইসা পড়ছে। বাকীরা ধীরে ধীরে আসতেছে।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ নিয়া বুদ্ধিজীবীদের মতাদর্শিক সংকট বিশেষ আগ্রহের জিনিশ হইতে পারে। আগে নব্বই দশক পর্যন্ত বুদ্ধিজীবীদের বড় একটা অংশ চিন্তা করতেন যে, ধর্মীয় প্রতিক্রিয়াশীলতা ও পুঁজিবাদী প্রতিক্রিয়া দুই জিনিশ থেকে তাদের রক্ষা করবে সমাজতন্ত্র। প্রগতিশীলতার আশ্রয় সমাজতন্ত্রই। কিন্তু সমাজতন্ত্র পিছু হটার পর প্রগতিশীলতা যুক্তরাষ্ট্রে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের মধ্যে আত্মীকৃত হইছে। কারণ ধর্মের সঙ্গে বিরোধ পুঁজিবাদের সঙ্গে বিরোধের চাইতে বড় হয়া গেল। প্রগতিশীল শিক্ষিত মধ্যবিত্তদের মধ্যে খুব কম লোকই আছে যারা ইসলাম কেন্দ্রীক ধর্মযুদ্ধকে ন্যায্য মনে করছেন। ফলে, এই দল আপনাআপনি সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের অংশ হয়া গেছেন। মন চাক বা না চাক ইরাক আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যায় হস্তক্ষেপে সমর্থন যোগাইছেন। প্রগতিশীল মধ্যবিত্তদের ক্ষুদ্র অংশ ইসলামের পক্ষে দাঁড়াইছে। বাকীরা সংশয়ে আছে। সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ও জঙ্গি ইসলামের দোটানায় জেরবার হয়ে সমাজের চিন্তাশীল একটা অংশের বিকাশ হইছে এই দশ বছরে।
দুনিয়ায় মেলা ঘটনা ঘটছে। নেপালে মাওবাদীদের সীমিত বিজয় হইছে। ভারতে মাওবাদীরা নতুন কৌশলে যুদ্ধ শুরু করছে। ইরান দ্বিতীয় বিপ্লবের দিকে আগাইতেছে। লাতিন আমেরিকায় আমেরিকা বিরোধী সরকারগুলোর প্রাধান্য তৈরি হইছে। আমেরিকায় ওবামা জিতছে। চীন ও ইনডিয়া নতুন শক্তি হিসাবে আসতেছে। জলবায়ু নিয়া দুনিয়া চিন্তায় পইড়া গেছে। বার্ড ফ্লু, সোয়াইন ফ্লু হইছে। সুনামী, ঝড় বন্যা জলোচ্ছাস হইছে। জলবায়ু উল্টাপাল্টা ঘটনা ঘটাইতেছে। কিন্তু মূল ঘটনা নানা নামে নানা পরিচয়ে নানা আদর্শের জঙ্গি বনাম যুক্তরাষ্ট্র ও তাদের সহযোগীদের আক্রমণ।
সংক্ষেপে বলিতে গেলে
বাংলাদেশের কথা সংক্ষেপে বলিতে গেলে এইখানে সবচেয়ে বড় ঘটনা স্বৈরতন্ত্র থেকে স্বৈরতান্ত্রিক গণতন্ত্রের মধ্যে প্রত্যাবর্তন। গত দশ বছরের মধ্যে আটবছর গণতন্ত্র আছিল কাগজে কলমে। কিন্তু বড় ঘটনা গণতন্ত্রহীনতার দুই বছর। বাংলাদেশের মতো দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা, দুর্নীতি অপশাসন এবং এর ফলে ধেয়ে আসা বিদেশী শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ এবং হস্তক্ষেপের জন্য বাংলাদেশের সেনাবাহিনীকে ব্যবহারের যে নজির পাওয়া গেছে ২০০৭-২০০৮-এ তা দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল। সুশীল সমাজ নামে পরিচিত বুদ্ধিজীবী ও বিদ্বৎসমাজ এইখানে এমবেডেড বুদ্ধিজীবীতার যে নতুন ইতিহাস তৈরি করছেন তাও হিস্ট্রির অংশ হওয়ার যোগ্য। এই দশকের শুরুতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছিল শেষেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। বাংলাদেশে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি তার সমুদয় খারাপ জিনিশ নিয়া এই দশকে তৃতীয় প্রজন্মে ঢুকছে। কিন্তু বাহিরের গণতন্ত্র কিছু ঘটনা ঘটাইছে, সংবাদপত্র, টেলিভিশনের বিকাশ হইছে। ইন্টারনেট মাধ্যমে কিছু অগ্রগতি হইছে। বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল নিয়ন্ত্রক হয়া উঠছে ব্যবসায়ীরা। রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করেছে তারা।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের তুমুল আবহের মধ্যে বাংলাদেশেও জঙ্গিবাদের বিস্তারের একটা আশঙ্কা দেখা দিছিল। বেশ কিছু বোমাহামলাও হইছে। মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছিল। কিন্তু দশক শেষে এসে দেখা গেল, এইখানকার জঙ্গিবাদ আসলে মূলধারার রাজনৈতিক দল বা শক্তির আশ্রিত জিনিশ। কর্তারা বলেন, নিয়ন্ত্রিত জঙ্গিবাদ। জঙ্গিবাদের মতো ইসলামপন্থী রাজনীতিও এইখানে গতদশবছরে উল্লেখযোগ্য কোনো সাফল্য দেখাইতে পারে নাই। বরং তারা ক্রমান্বয়ে পিছু হটতেছে।
গণতন্ত্রের লেবাসে স্বৈরতন্ত্র কার্যকর থাকায় রাষ্ট্র বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, অন্যায় অপারেশন এইগুলাকে আশ্রয় প্রশ্রয় দিছে। প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিকাশের রাস্তায় নানা অপঘাত ঘটছে। প্রাকৃতিক বিপর্যয়, শিল্পকারখানা বন্ধ, পরিবেশ বিপর্যয়, ব্যবসার প্রধান্য, ব্যবসাকেন্দ্র, শপিংমলের বিকাশ, মঙ্গা, সমাজের নানা প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিকায়ন কতকিছুই না ঘটছে বাংলাদেশে। তবু বাংলাদেশে এই দশবছরের মূল সুর বা মূল ঘটনা যদি বলতে হয়, তবে তাকে সংক্ষেপে গণতন্ত্রে ফেরার চেষ্টা হিসাবে আখ্যায়িত করতে হয়।
বলে রাখা ভাল
এই লেখাটা একটা অশ্বডিম্ব প্রসব করতে যাইতেছে। আমি অবশ্য একটা ডিম চিন্তা কইরাই আগাইতেছিলাম। উপক্রমণিকাটা লিখছিলাম বাইরের খোলস হিসাবে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি খোলসের নিচের হালকা পর্দা। দেশের পরিস্থিতি কুসুমের বাইরের সাদা আবরণ। এইবার কুসুম অর্থাৎ সাহিত্য প্রসঙ্গ। মোটাদাগে গত দশবছরের চিন্তাশীলতার একটা রূপরেখা আঁকার একটা চেষ্টা করতে গিয়া কয়েকটা বিষয় চোখের সামনে ধোঁয়া বিতরণ কইরা যাইতেছে।
এই দশ বছরে পুরানা পাঠচক্র-কেন্দ্রিক-বিশ্ববিদ্যালয়-ভিত্তিক চিন্তাশীলতা ক্ষয়ে আসতেছিল প্রথম থিকাই। পাঠচক্রভিত্তিক প্রকাশনা, কবি লেখক চিন্তাশীল মানুষগুলোর প্রকাশনার শেষ চেষ্টাগুলাও এই দশকের শেষে আইসা স্তিমিত হয়া গেছে।
মূলধারার প্রকাশনা হিসাবে সাময়িক পত্র তেমন প্রকাশিত হয় নাই। তার বদলে যে জিনিশটার বিশাল প্রসার ঘটছে তার নাম দৈনিক পত্রিকা। দৈনিক পত্রিকা সাময়িকপত্র, সমাজসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে অনেক কিছুর ভূমিকা কান্ধে তুইলা নিছে। আর গত দশ বছরে যদি দৈনিক পত্রিকার প্রভাবের কথা এক কথায় বলতে হয় তবে সংক্ষেপে প্রথম আলো শব্দ দুইটা উচ্চারণ করা যথেষ্ট হবে। চিন্তা, সাহিত্য ও মতাদর্শের প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রথম আলোকে পাঠ করলে- এসময়ের নতজানু, সুশীল, মেধাহীন বুদ্ধি ও সাহিত্যজীবীতার একটা ছবি ফুটে উঠবে। প্রথম আলো দশকের শুরু থেকে সাহিত্য ও বুদ্ধিজীবীতার একটা গতিমুখ স্থির কইরা দিছিল, মূলধারার চিন্তা সেইদিকে ধাবিত হইছে। সেই আকার ধারণ করছে। প্রথম আলোর সমস্যাই সংক্ষেপে সেই সাহিত্য ও চিন্তার সমস্যা।
বই প্রকাশের ক্ষেত্রে একটা বড় পরিবর্তন ঘটছে। অনুবাদ, বস্তাপচা সাহিত্য, জনপ্রিয় বই, রচনাবলী এইসব অবলম্বন কইরা প্রকাশনা জগৎ ফুলে ফেঁপে উঠেছে। পরিস্থিতি এমন যে, দৈনিকে লেখা প্রকাশের চাইতে বই প্রকাশ সহজ হয়া উঠছে।
ইলেট্রনিক মিডিয়া মানে টেলিভিশনের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে কলামিস্টরা বলামিস্ট হয়া উঠছেন। কলামলেখকরা হয়া উঠছেন কথকে। টক শোর হোস্ট আর গেস্টকেই সমাজে সবচেয়ে বড় বিশ্লেষক ভাবার দিন চইলা আসছে।
ইন্টারনেটের বিকাশের মধ্য দিয়া, অপেক্ষাকৃত তরুণ সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা সেইখানে আশ্রয় নিয়াছেন। এই দুনিয়ায় প্রত্যেকেই লেখক, প্রকাশক ও পাঠক। নতুন এই অভিজ্ঞতার সামনে বুদ্ধিজীবীতা টাসকি খায়া গেছে।
মাধ্যমের কথা গেল। এইবার সম্প্রচারিত বস্তুর কথা। গত দশ বছরে সাহিত্যের বড় ঘটনা বলতে কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিকের চলে যাওয়া ছাড়া আর কিছু নাকি নাই। দশকের শুরুতে হুমায়ূন আজাদ হত্যা চেষ্ঠা ও তার মৃত্যুর ঘটনার মধ্য দিয়া সাহিত্যিকরা একটি নতুন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়া গেছে। ঘটনাটা বেদনদীর্ণ ও প্রতিবাদী করছে। গভীরভাবে চিন্তাশীল মানুষের মনে রেখাপাত করছে।
আহমদ ছফার মৃত্যুর মধ্য দিয়া বাংলাদেশের চিন্তাজগতে তার নতুন জন্ম ঘটছে। আর এই নবজন্মের আবাহনে ভূমিকা নিয়েছেন ফরহাদ মজহার। বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীতার জগতে ট্রু ইন্টারভেনশন গত দশবছরে আহমদ ছফার মৃত্যু ও ফরহাদ মজহারের দৌত্যেই যা হওয়ার হইছে। তবে এই ঘটনার প্রভাব সাহিত্যে ও চিন্তায় কী পড়ছে তা স্পষ্ট না।
শামসুর রাহমানের মৃত্যুর মধ্য দিয়া প্রগতিশীল সাহিত্যের প্রধান কবির পদটি চিরতরে খালি হয়ে গেছে। সেলিম আল দীনের মৃত্যুর মধ্য দিয়া নাটকের ক্ষেত্রে সৃজনশীল ধারাটা স্তিমিত হইছে। শাহ আবদুল করিম, মাহমুদুল হক, শহীদুল জহিরের মৃত্যুও সাহিত্যের বড় ঘটনা।
একজন অভাজন ওইদিন কইলেন, এই সাহিত্যিকদের মৃত্যুর ঘটনা ছাড়া সাহিত্যে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা গত দশবছরে ঘটে নাই। এই নিয়া তর্ক চলতে পারে। প্রকাশনার নামও কেউ উল্লেখ করতে পারেন। কিন্তু এসেন্সের দিক থেকে কথাটা আমি সমর্থন করি। সাহিত্যে বড় ঘটনা খুব কমই ঘটছে দশ বছরে।
কর্পোরেট কোম্পানির স্পন্সর জুটছে সাহিত্য-শিল্পের দুনিয়ায়। বাউল উৎসব থেকে কবি সম্মেলন পর্যন্ত স্পন্সরের প্রকোপ প্রসারিত হইছে। রাষ্ট্রীয় ও আঞ্চলিক নানা গুরুত্বহীন পুরস্কারের জায়গায়, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলা আগায়ে আসছে। লেখকদের কানেকটিভি বাড়ছে। বাংলাদেশের তিনজন লেখক দেশের বাইরে আলোচনায় এসেছেন। তসলিমা নাসরিন আগে থেকে ছিলেন। প্রসংশিত হয়েছেন মনিকা আলি ও তাহমিমা আনাম। প্রথম আলোর মারফত অনেক সাহিত্যিক এই দশবছরে পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছে, প্রথম আলোর দৌলতে চলেও গেছেন। কিন্তু সার্বিকভাবে সাহিত্য ও বুদ্ধিজীবীতায় প্রভাববিস্তার করার মতো কোনো তরুণ সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী এই কয় বছরে তৈরি হয় নাই। বলতে গেলে, আজফার হোসেন ও সলিমুল্লাহ খানের পর আর কোনো বুদ্ধিজীবী আসেন নাই।
নব্বই দশকে যে শয়ে শয়ে সাহিত্য করতে আসা লেখকরা শয়ে শয়ে হারিয়ে গেছেন। খুব অল্পসংখ্যক লেখক এখনও সাহিত্য ও চিন্তাচর্চার মতো ক্লান্তিকর কাজ করে চলেছেন। আশার কথা যে, শূন্য দশকের লেখকরা হাজারে হাজারে এসেছেন। সাহিত্যের যে নিয়ম তাতে চিন্তায় চর্চায় এ দশকের তরুণদের লিড নেওয়ার কথা। কিন্তু শূন্য দশকের তরুণরা দশকের শেষেও কোনো আলাদা কণ্ঠস্বর হিসাবে নিজেদের চেনাবার কাজটি করতে পারেন নাই। আশির দশকে বাংলাদেশের তরুণ সাহিত্যের যে নবযাত্রা তৈরি হইছিল নব্বইয়ে তারা অনুসৃতি লক্ষ্ করা গেছলো। কারো কারো ক্ষেত্রে নতুন ও থিতু বিকাশের সম্ভাবনাও দেখা গেছলো। কিন্তু শূন্য দশকে এসে এক ধরনের প্রবণতা দেখা গেল যাতে মতে হইতে পারে তারা আগের সাহিত্যের সঙ্গে লিঙ্ক মিস করেছেন। স্বতন্ত্র হওয়ার প্রচণ্ড তাগিদ থাকা সত্ত্বেও তারা স্বতন্ত্র বইলা নিজেদের প্রবণতা জাহির করতে পারেন নাই। এমনকি প্রত্যেক দশকে যা হয়, তেমনও হয়নাই শূন্যে। উজ্জ্বতর প্রতিভা বইলা শূন্যে শেষ দিনেও কাউরে চিনা গেল না।
সম্ভবত, আড্ডা, পাঠচক্র, যোগাযোগ, লিটল ম্যাগাজিনকেন্দ্রিক পুরনো সংঘগুলা ভেঙে যাওয়ার কারণে শূন্য দশকের তরুণরা একটা আলাদাভাবে বেশি সময় নিয়ে বিকশিত হচ্ছেন। অথবা যাদের শূন্য বলে ট্রাডিশনালি আমরা চিনতেছি তারা এর প্রকৃত প্রতিনিধি না। হয়তো অনলাইনের অচেনা দুনিয়াতে আর আজগুবি প্রকাশ মাধ্যমেই শূণ্যের মূলস্রোত বিকশিত হইতেছে।
অন্যদিকে প্রথম আলো ও অন্য মিডিয়াগুলা শূন্য দশককে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে যে কার্পণ্য করছে তা অন্য দশকগুলার ক্ষেত্রে ঘটে নাই। সেই অর্থে শূন্য দশকে প্রকাশিত বইগুলা নিয়া আলোচনা একদম হয় নাই। তারা কী বলতে চায়, কী করতে চায় সেইটা শোনার প্রয়োজন কেউ বোধ করে নাই।
এর অন্যতম কারণ বুদ্ধিজীবীতা ও চিন্তা চর্চার ক্ষেত্রে শূন্য দশকের পিছিয়ে থাকা। শূন্য দশকে কবি আসছে কবি আসছেন হাজার হাজার কিন্তু গল্পকার আসছে ছয়সাত জন। আর প্রাবন্ধিক বা আলোচক খুঁজলে দেখা যাবে ত্রাহি ত্রাহি রব উঠছে।
শূন্য দশককে মিডিয়ার দিক থিকা প্রথম আলোর একক আধিপত্যের দশক বলা যায়। অন্য দিক থিকা এই দশকটা তরুণ প্রজন্মের চিন্তাহীনতা ও অসচেতনতার দশকও। বলতে গেলে, এই কারণেই এই দশকের সাহিত্য এখনও কারো নজর কাড়তে পারে নাই।
সংক্ষেপে এই অশ্বডিম্ব প্রসব করিলাম। ইতি।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে ডিসেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৫:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



