আমাদের প্রখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদের একটা লেখা পড়তেছিলাম কালের কণ্ঠ পত্রিকায় (Click This Link)। ১৯ জানুয়ারি ২০১০ তারিখে। লেখাটা পড়তে গিয়া একটু আহত বোধ করলাম। এমনিতে হুমায়ুন আহমেদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ওপর আমার আস্থা নাই। যখন যে সরকার তখন তার দিকে ছাতা ধইরা হুমায়ূন আহমেদ নিজেকে বাঁচান অথবা সরকারটির পক্ষে গুনগান করেন। তার মতো জনপ্রিয় লেখকের এইগুলা কোন কামে লাগে বুঝি না। তবে এইটুকু বুঝি, তার বিপুল জনপ্রিয়তার লেখকের দিকে সবার কুদৃষ্টি থাকে। সবাই চায় তাদের পক্ষে হুমায়ূন আহমেদ দু কলম লিখুন। উনি লেখেনও। শুনছি, জেনারেল মইন উ আহমেদকেও মহাপুরুষ আখ্যায়িত করছিলেন উনি। এইরকম সুবিধাবাদী যার রাজনৈতিক বিবেচনা তার রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বা বক্তব্য নিয়া আশাবাদী হওয়া কঠিন। অবশ্য হুমায়ূন আহমেদ যা কিছু লেখেন তা নিয়া আমার বিশেষ আগ্রহ থাকে। এই কারণে না যে দেশের লাখ লাখ মানুষ ওনার লেখা লাইক করে। এই কারণে যে, লাখ লাখ মাইনষের লগে আমিও ওনার লেখা লাইক করি। ওনার গদ্য আমার অনুসরণীয় মনে হয়। গল্প বলায় ওনার ক্ষমতা আমারে আপ্লুত করে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়া হুমায়ূন আহমেদ লিখছেন। লেখাটা রাজনৈতিক, ফলে পইড়া একটা হাসি দিয়া ভুইলা যাওয়া উচিত আছিল। কিন্তু হাসি দিতে পারলাম না। জুলিয়াস সিজার নাটকের সেই ডায়লগ মনে আইলো, তুমিও ব্রুটাস!
হুমায়ূন আহমেদ লিখছেন, 'বলা হয়ে থাকে, একটি দেশের লেখকরা সেই দেশের আত্মা। এটা অনেক বড় কথা, আমি নিজে তা মনে করি না। অনেক দুষ্ট লেখক আছেন, দেশের আত্মা হবার তাঁদের যোগ্যতা নেই। দেশের সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি_বন্ধুত্বের যে পথে আমরা এগুচ্ছি সেটাই শুদ্ধ পথ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন। কেউ যেন আবার ভেবে না বসেন আওয়ামী লীগের কাছে আমার কোনো দায়বদ্ধতা আছে। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা নেই। আমি দায়বদ্ধ আমার দেশের কাছে।'
কিন্তু এই মোক্ষম সময়ে ভারতীয় জুজু তাড়াবার জন্য হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখকের কলাম ধরাটায় আমার মনে হইছে, ওনার দায়বদ্ধতা তার দেশের প্রতি না। এবং ওনার মতো লেখক এই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পাইলেও এই দেশের আত্মা হিসেবে পরিগণিত হইতে পারেন নাই। উনি মানুষের ভাষা ও গল্প আবিষ্কার করতে পারলেও মানুষের আত্মার খবর নিতে পারেন নাই।
আমাদের জনপ্রিয় লেখক বলছেন, ভারতীয় জুজু হইলো একটা বানানো ব্যাপার। এইটা অনেক কাল চইলা আসছে। ফলে এইটা গুরুত্ব নাই। ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য শেখ হাসিনার উদ্যোগ ঠিক আছে। এই পথে আগাইলে ভাল হবে।
ওনার মূল যুক্তি কী? লেখা খুঁইজা যা পাইলাম তা হইলো- 'ক্ষমতাধর যে রাষ্ট্রটি আমাদের পাশে, তার সাহায্য আমাদের ক্ষমতাবান হবার জন্য প্রয়োজন।' রাজনীতি ও কূটনীতির শিশুপাঠ্যেও লেখা আছে- ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রতিবেশী ছোট দেশ সেই ক্ষমতাধারের সাহায্যে কোনোদিন ক্ষমতাধর হইতে পারে নাই। দুনিয়ায় এইরাম কোনো উদাহরণ নাই।
তাই বলতে হচ্ছে, হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখক যে ক্ষমতাবান হওয়ার জুজু দেখাইলেন, এইটা কি ঠিক করলেন?
দোষ অবশ্য শুধু হুমায়ূন আহমেদের না। প্রধানমন্ত্রী ভারত থেকে ঘুরে আসার পর নানা জনের সঙ্গে আলাপ কইরা আমি বুঝছি, শিক্ষিত, টিভি দেখা মধ্যবিত্ত বিষয়টাকে এই বইলা মাইনা নিছে যে, এ ছাড়া আর উপায় কী? ভারত বড় দেশ, মহান ক্ষমতাধর। আমরা কি তাদের সঙ্গে পারবো? আমাদের নাকি আলাপ-আলোচনা দরকষাকষিও করা উচিত না। ভারত যা বলে তা মেনে নিয়ে শান্তি স্থিতিশীলতা আর গণতন্ত্র নিশ্চিত করা দরকার।
কথাটায় সত্য আছে। কিন্তু সত্যের চেয়ে বেশি যে জিনিশটা আছে তা হলো পরাজয়ের মানসিকতা। কইতেছি না যে, ভারতের সঙ্গে আমাদের লাইগা থাকা উচিত। ভারতকে অশান্ত করার জন্য চেষ্টা করা উচিত। কিন্তু ব্যবসা, বাণিজ্য, শিক্ষা, আলাপ আলোচনা, কূটনীতিতে আগেই যদি পরাজিত হয়ে বসে থাকি তাইলে তো আর কথা থাকে না। আধুনিক দুনিয়ায় সম্মান নিয়া জাতি হিসাবে টিকে থাকার কোনো অধিকার আমাদের থাকে না।
একটা দুগ্ধপোষ্য শিশুও বুঝে, প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে গিয়া বাংলাদেশের জ্বাজল্যমান সমস্যা- সীমান্তে মানুষের মৃত্যু, নদীর পানি, ছিটমহল, বাণিজ্য ঘাটতি, সমতাভিত্তিক মিডিয়া ও সাংস্কৃতিক বিনিময় ইত্যাদির কোনো সুরাহা করতে পারেন নাই। বরং, ভারতের দাবি সব পূরণ করছেন। আমি দেশ বিক্রির দাবি তুলতেছি না। বলতেছি না যা দিয়া আসছেন সেইসব দেওয়া উচিত হয় নাই। আমি বলতেছি, এইসব দিয়া আমরা কী পাইলাম? আমরা শুধু দিয়ে যাবো আর এর বিনিময়ে শুকনা বন্ধুত্ব নিয়া সন্তুষ্ট থাকবো, এইটা আমার কাছে বন্ধুত্ব স্থাপনের সম্মানজনক কোনো পদ্ধতি মনে হইতেছে না।
হুমায়ূন আহমেদের কেন মনে হইতেছে সেইটা নিয়া গবেষণা হওয়া দরকার। শুধু হুমায়ূন আহমেদ না। ভারতের সঙ্গে একপাক্ষিক ভালোবাসার সমর্থক এইদেশে অনেক। টিভি দেখেন, পত্রিকা পড়েন- দেখবেন সুশীল পন্থী বুদ্ধিজীবী, সামরিক পন্থী নৃত্যনায়িকা, রাজনীতি পন্থী লেখক, জমি দখল পন্থী পত্রিকা, জমি বেদখল পন্থী সম্পাদক সবার মধ্যে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হইছে। নিম থেকে বিশাল প্রগতিশীলদের এই ঐক্য কেন স্থাপিত হইলো? ভারতের স্বার্থে বাংলাদেশের প্রগতিশীলদের এই জাতীয় ঐক্য বোধহয় আর অতীতে দেখা যায় নাই। দেশের কোনো জটিল সমস্যায় যাদের এক টেবিলে দেখা যায় না, তারা এখন এ বিছানায় শুয়ে ভারতের পক্ষে বক্তব্য দিয়া টিভি গরম করে ফেলতেছেন। কেন এই ঐক্য? ভারতের বন্ধুত্ব অর্জনই কি আমাদের ৩৮ বছরের স্বাধীন দেশের একমাত্র লক্ষ্য আছিল? আমরা জানি না। তবে, এইটুকু বুঝা যাইতেছে, বাংলাদেশের কয়েকটি প্রজন্ম বর্তমানে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির দেউয়াত্বে ভুগতেছে। এই পরজীবীতা আমাদের কোথাও নিয়া যাবে না। এদের কথা আর একদিন শুনলেও আমরা পিছায়ে যাইতে থাকবো। জাতি হিসাবে মাথা হেলিয়ে থাকতে হবে আমাদের।
এইবার বলি আমার প্রিয় সম্পাদক মতিউর রহমানের কথা। উনি ২২ তারিখে লিখছেন মনের বাঘ তাড়াতে হবে। ভাগ্যের কী পরিহাস! পরের দিন বনের একটা মূল্যবান বাঘ মাইরা ফেললো গ্রামবাসী। প্রথম আলো জনপ্রিয়তম পত্রিকা। প্রথম আলোর কথা মানুষ শুনে। কিন্তু শুনতে ভুল করলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে। মনের বাঘ না মাইরা মানুষ বনের বাঘ মারতে পারে।
বাঘ যে মারা উচিত না, এইটা আমরা সবাই জানি। এই নিয়া আমাদের মধ্যে একটা জাতীয় ঐক্য আছে। বন থেকে অনেক দূরে ঢাকার শহরে বসে গোলটেবিল বৈঠক করে আমরা বলি, বাঘ মারা উচিত না। কিন্তু তারপরও লোকে বাঘ মারে। কারণ, বাঘের ভয় আছে। আপনি যতই পত্রিকা বের করে মনের বাঘ মারেন না কেন, বনের পাশে থাকা মানুষ ভয় পাবেই। বাঘকে অজ্ঞান করার লোক যথাসময়ে না পৌঁছাইলে মানুষ বাঘও মারবে নির্মমভাবে।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়া প্রথম আলোর নানা আয়োজন দেইখা মনে হইতেছে, বাঘের ভয় দূর করার জন্য বাঘটাকে চেতনানাশক দেওয়ার বদলে তারা জনগণকে চেতনানাশক দেওয়ার দিকে বেশি মনোযোগী। জনপ্রিয়তম পত্রিকাটি এইভাবে কি মনের বাঘ দূর করতে পারবে? পারবে সীমান্তের বাঘের ভয় তাড়াইতে?
একটা প্রশ্নের জবাব আমি পাই না। প্রথম আলো বাংলাদেশের লোকে পড়ে। বাংলাদেশের স্বাধীন শিল্পপতির পত্রিকা এইটা। তারপরও বাংলাদেশের স্বার্থের চাইতে ভারতের স্বার্থের দিকে এই পত্রিকার এত ঝোঁক কেন?
কেন মনে হয়, ভারতের দাবিগুলা বাংলাদেশ পূরণ করলে প্রথম আলোর চূড়ান্ত লক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত হবে? কেন মনে হয়, প্রথম আলো ভারতের স্বার্থে যতটা সোচ্চার ততোটা সোচ্চার আর কোনো বিষয়ে এ যাবত হয় নাই?
আমার প্রশ্নগুলা ভুল হইলে ভাল। কেউ আমার ভুল ভাঙায়ে দিবেন?
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জানুয়ারি, ২০১০ দুপুর ২:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


