মকবুল ফিদা হুসেনের গজগামিনী হয়তো অনেকেই দেখছেন। মাধুরী দীক্ষিতকে নিয়া বানানো সিনেমাটার কথা ভুললে সিনেমার ফ্রেমগুলার কথা ভুলা কঠিন। ফিদা হুসেন অবশ্য আরও সিনেমা বানাইছেন। মিনাক্ষী : আ টেল অব থ্রি সিটিজ। বলা ভাল, লোকে ফিদাকে চিনে তার সিনেমা আর নানা স্ক্যান্ডাল আর কন্ট্রোভার্সির কারণে। তিনি খালি পায়ে থাকতেন। জীবনযাপন করতেন সাধারণ। কিন্তু ছবি তার লাখ টাকা দামের। প্রথম ফিদা হুসেনের আঁকা শরৎচন্দ্রের একটা প্রোর্ট্রেইট দেখে মুগ্ধ হইছিলাম। পরে একদিন দেখলাম, মাদার তেরেসা। ধীরে ধীরে আরও কত ছবি। ফিদার ছবি মানে একটা ঘটনা। একটা আলোড়ন। আলোচনা। ফিদা চিত্রশিল্পী হিসাবে পপুলার? পপুলার এবং দামী। উনি ছবির মাধ্যমে কমিউনিকেট করতে পারেন। সাধারণ বিষয় ও মাধ্যমকে অসাধারণভাবে ব্যবহার করতে পারেন। ভারতের সবচেয়ে দামি শিল্পী ফিদা হুসেন। তাকে মিডিয়া বলে ভারতের পিকাসো। হয়তো বুঝার সুবিধার জন্য কয়। কিছু তো বুঝা যায়।
ধর্মের সঙ্গে ফিদা হুসেনের সংঘাত বাঁধে মিনাক্ষী : আ টেল অব থ্রি সিটিজ বানানোর সময় থিকা। সিনেমায় একটা গান ছিল। তাতে একটা কথা ছিল : নূর উন আলা নূর। নায়িকার রূপ বর্ণনার জন্য ব্যবহার করা হইছিল কুরআনের আয়াত। তখন অল ইন্ডিয়া উলেমা কাউন্সিল এইটারে ধর্মদ্রোহ হিসাবে বর্ণনা করছিল। যাই হোক সে যাত্রা অল্পের ওপর দিয়া বাঁইচা গেছেন হুসেন।
কিন্তু দেব-দেবীর ছবি আঁকা শুরু করার পর আর বাঁচতে পারলেন না। প্রথমে স্বরস্বতী দেবী নগ্নমূর্তি আঁকলেন। পরে আরও নানা দেবদেবীর। ভারতজুড়ে তর্ক বিতর্ক শুরু হইলো। হুসেনের প্রদর্শনীতে আগুন জ্বললো। নানা হেনস্তার শিকার হইলেন প্রথম পর্বে। দ্বিতীয় পর্বে তার বিরুদ্ধে ভারতের নানা জায়গায় ধর্মদ্রোহের মামলা হইলো। কিছু স্থানে হাজিরা দেওয়ার পর হুসেন কইলেন, এমনে তো সম্ভব না। সশরীরে হাজিরা দেওয়া থিকা তারে রেয়াত দেওয়া হউক। কিন্তু তখন রেয়াত দেওয়া হইলো না। এর মধ্যে ইন্ডিয়ার এক আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলো। সো ফার আই ক্যান রিকল গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়া হুসেন পালাইলেন দুবাই। ইদানিং কাতার তারে নাগরিকত্ব দেওয়ার প্রস্তাব করার পর তারে দোহায় দেখা গেল। ইন্ডিয়ার পাসপোর্ট জমা দিয়া এখন তিনি কাতারের নাগরিকত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত।
শিল্পীর অভিমান আছে। শিল্পীর সংগ্রাম আছে। এখন ভারত বলতেছে, হুসেনের বিরুদ্ধে মামলা আর নাই। তিনি ফিরে আসুক। কিন্তু হুসেন বলছেন, আর ফিরবেন না। কালকে ইন্ডিয়ার এক পত্রিকায় হুসেনের খবর নিয়া পাঠকদের মন্তব্য পড়তেছিলাম। ওনারা মধ্যপ্রাচ্যের এক দেশে হুসেনের যাওয়া নিয়া তীর্যক মন্তব্য করছেন। কিন্তু রাজনীতির মর্ম যে কী? মধ্য প্রাচ্যের এক পশ্চাৎপদ দেশই এখন হুসেনকে আশ্রয় দেওয়ার গর্বে গর্বিত আর যে ভারত তসলিমাকে আশ্রয় দিয়ে গর্ব অনুভব করেছিল সেখানেই থাকতে পারলেন না হুসেন।
যে আশ্রয় দেয় সে মহান। আশ্রয় দাতার মতো মহান জাতি বোধহয় পৃথিবীতে কম আছে। আর যে জাতির শিল্পী কবি লেখকরা অন্যের দ্বারে আশ্রয় প্রার্থনা করে তার মতো হতভাগা জাতি আর নাই। কিন্তু তারপরও আশ্রয়দানের রাজনীতি আছে। ভারত দালাইলামাকে আশ্রয় দিছে। চীনকে স্থায়ী মনস্তাত্বিক সংকটে রাখতে দশকের পর দশক। আমাদের তসলিমাকে আশ্রয় দিছে। তসলিমা ভারতের এদিক থেকে ওদিন গেলে আমাদের লজ্জা বাড়ে। আমাদের অপমান বাড়ে। তসলিমার পরদেশ গমন আমাদের জন্য স্থায়ী অশান্তি হিসাবে দাঁড় হয়ে গেছে। আমাদের মোল্লা-মুসল্লিরা খুশী তসলিমাকে বাইরে পাঠায়ে দিতে পেরে। কিন্তু এতে দেশের কী ক্ষতি হয়, জাতি হিসেবে আমাদের অবস্থান কোথায় থাকে সেইটা তারা বুঝে না।
ভিন্নমতাবলম্বীরা সমাজের অঙ্গ। দুনিয়ার সবাই একমতে আসবে না কোনোদিনও। তাই বলে কি আমরা দুনিয়া থিকা চইলা যাবো? নাকি ভিন্ন মতাবলম্বীদের তাড়ায়ে দিব। মামলা দিয়া, মাথার দাম ঘোষণা কইরা তার পালানোর ব্যবস্থা করবো। ইসলামের নামে মাথায় দাম ঘোষণা কইরা, রাজনীতি করার যে প্রচলন হয়েছিল এককালে তাতে ইসলামের কত ক্ষতি হইছে সেই হিসাবও নিশ্চয় একদিন মানুষ করবে। কিন্তু সমাজ বলে, কারো মত ভিন্ন হলে, তাকে হত্যা করতে নাই। তাকে তাড়িয়ে দিতে নাই। কোটি মানুষ বিশ্বাস করে, একজন মানুষের অবিশ্বাস যদি কোটি মানুষের বিশ্বাসকে টলাইতে পারে তাইলে সেই কোটি মানুষের বিশ্বাসের শক্তিটা কোথায়?
তসলিমাকে নিয়ে ভারত একটা রাজনীতি করতে চাইছে। করছে। আমাদের পশ্চাৎপদ, অগণতান্ত্রিক সমাজ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। আমরা ভিন্নমতের মানুষকে থাকতে দেই না। মারতে চাই এইটা তারা প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। কিন্তু ভারত এতদিনে এসে বুঝছে ধর্ম নিয়া ভিন্নমতাবলম্বীদের আশ্রয় দানের গৌরব গ্রহণ করতে তারও অনেক সময় লাগবে। ভারতীয় সমাজ তো আমাদের সমাজেরই সমান্তরাল। ফলে, সেখানে তসলিমাকে নিয়ে ফ্যাসাদ লাইগা রইছে। ভারত এখন না পারতেছে গিলতে না পারতেছে উগরাইতে। এখন আমাদের মোল্লা মুসল্লীদের উচিত তসলিমাকে ফিরায়ে আনার গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া। উনি দেশে আইসা থাকুক, দেখুক। দেশ কি আর তেমন আছে? তসলিমা আইলে আর তেমন থাকতে পারবেন না। ফাঁকে ভারত একটা চপেটাঘাত খাবে।
ফিদা হুসেন ভারত ছেড়ে যাওয়ায় ভারত একটা চড় খাইলো। তার আশ্রয়দানের রাজনীতি একটা প্রশ্নের মুখে পড়লো। একটা দূরবর্তী কথা মনের মধ্যে উঁকি দিতেছে। ভারতে বইসা, ইসলামের বিরুদ্ধে কথা কওয়া যত সহজ, হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলা ততোটাই কঠিন।
হুসেন দেবদেবীর ছবি আঁইকা ভাল করছে কি খারাপ করছেন। তসলিমা লিখে খারাপ করছে না ভাল করছে সেইটা আমার আলোচনার বিষয় না। বিষয় হইলো, ধর্ম না মানলে, ধর্মকে কোনোভাবে সমালোচনা করলে, নাস্তিক কাফের হইলে তারে কেন দেশ থেকে বের করে দেওয়া হবে? কেন এমন একটা সমাজ হবে না যেখানে ভিন্নমতাবলম্বীদের নিয়া আমরা একসঙ্গে থাকতে পারবো। তাদের সঙ্গে বাহাস করবো। তাকে সমালোচনা করবো, কিন্তু তাকে দেশ থেকে বের করে দিবো না বা মারবো না।
আর আমাদের শিল্পী, কবি, সাহিত্যিকরা- তারা কি আমাদের ধর্ম, ধর্মীয় মূল্যবোধকে আক্রমণ না করে সৃজনশীল হতে পারেন না? ধর্মকে আক্রমণ করা যে প্রগতিশীলতার লক্ষণ তার দিন তো ফুরায়ে গেছে। তারপরও কেন এমন না-বুঝ ফ্যাশন?
সব কথার শেষ কথা, ফিদা হুসেনের দেশত্যাগের দুঃখ বুইঝা এখন আমাদের উচিত তসলিমাকে দেশে ফিরিয়ে আনা। এই বুঝ যদি আজকে আমাদের হয় তাইলে ভবিষ্যত ভাল হবে।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০১০ বিকাল ৪:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




