আজকের প্রথম আলোর ছোট একটি খবর। দ্বিতীয় পাতায় ছাপা হইছে।
ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
বাংলাদেশ ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে। গতকাল শনিবার সরকারের একজন মন্ত্রী এ কথা জানিয়েছেন। খবর এএফপির।
বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘চলচ্চিত্রশিল্প চাঙা করতে ভারতীয় চলচ্চিত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে।’
স্থানীয় চলচ্চিত্রশিল্প রক্ষা ও বিকাশের স্বার্থে ১৯৭২ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। প্রায় চার দশকের এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশি অভিনেতা ও পরিচালকেরা। তবে এতে খুশি হয়েছেন সিনেমা হলের মালিকেরা। তাঁরা আশা করছেন, শিগগিরই ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন শুরু করতে পারবেন।
প্রথম আলো পত্রিকায় ২২ তারিখের আনন্দ পাতায় ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানী নিয়া একটা তর্ক ছাপা হইছিল। সেইটা পড়তেছিলাম। এঁরা বলেন তাঁরা বলেন নামে দুইটা লেখায় সিনেমা করা ও দেখানোর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা তাদের মতামত দিছেন। পইড়া একটু রসবোধ হইলো। লেখতে চাইছিলাম ওইদিনই। কিন্তু লেখতে লেখতে বাণিজ্যমন্ত্রী নিষেধাজ্ঞা তুইলা নিলেন। বলতে গেলে একটু গোপনেই, নিষেধাজ্ঞা উঠলো। এখন আর দেশে বইসা বড় পর্দায় সিনেমা দেখার আর কোনো বাধা থাকলো না।
কথাটা কয়দিন ধইরাই শুনতেছিলাম। ভারতীয় সিনেমা আমদানী নিয়া পত্রপত্রিকা দুইটা পক্ষরে তু্ইলা ধরতেছে। একপক্ষ হইলো, অভিনেতা, নির্মাতা, প্রযোজক ইত্যাদি। অন্যপক্ষে হল মালিক, ছবি আমদানী ব্যবসার সঙ্গে জড়িত লোকজন। দেশে ছবি তৈরি সঙ্গে জড়িত লোকজনের যুক্তি হইলো, ভারতীয় ছবি আমদানী করে হলে দেখানো শুরু হইলে লোকে আর দেশি সিনেমা দেখবে না। দেশের সিনেমা শিল্প ধ্বংস হয়া যাবে। আর হল মালিক আমদানীকারকরা বলতেছে, দেশে সিনেমা দেখানো বাণিজ্য এখন রুগ্ন। একের পর হল বন্ধ হয়া যাইতেছে। ফলে, আমদানীর বিকল্প নাই।
বলাবাহুল্য, এই দুইপক্ষের লোকই সিনেমা দেখানো ও বানানোর সঙ্গে জড়িত। যারা দেখে তারা এইখানে কোনো পক্ষ না। যারা এইসব নিয়া ভাবে, বলে তারাও কোনো পক্ষ না। অন্তত পত্রিকা পড়লে মনে হয়, এই দুইপক্ষের বাইরে মতামত দেওয়ার আর কোনো পক্ষ নাই। পক্ষ আছে কি নাই, সেই পক্ষের কথায় কিছু যায় আসে কি না সেইটা গবেষণার বিষয়। আপতত দুইপক্ষ ধইরাই আলোচনা করতে চাই। এই দুই পক্ষ পত্রিকার দুই পক্ষ না। ভারতীয় সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ও বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার। সরকার ও মুম্বাই ইন্ডাস্ট্রির মধ্যে আপোষের ফল হইলো সিনেমা আমদানী। সরকার এইখানে মুম্বাইয়ের স্বার্থ রক্ষা করার ব্যাপারে মরিয়া। কিন্তু বাস্তবে দেখবেন মাঠে সরকারও নাই, মুম্বাইও নাই। আছে বানানো ও দেখানো লোকেরা। বানানো ও দেখানো লোকদের মতামত বিচার করলে আমরা কী পাই?
ভারতীয় সিনেমার প্রদর্শনী পূর্ব পাকিস্তান ও স্বাধীন বাংলাদেশে কেন বন্ধ রাখা হইছিল? ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের পর দুই দেশের সম্পর্কের চরম অবনতি হইলে এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভারতীয় সিনেমা আমদানী ও দেখানো বন্ধ হয়। স্বাধীন বাংলাদেশে ওই ধারাবাহিকতাই বহাল থাকলো। ১৯৭২ সালে দেশীয় সিনেমার বিকাশের স্বার্থে ভারতীয় সিনেমার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপিত হয়। দেশীয় সিনেমার বিকাশের স্বার্থে আমরা ভারতীয় সিনেমার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিছি। নিষেধাজ্ঞা শব্দটা খুব খারাপ। প্রশ্ন উঠতেছে, নিষেধাজ্ঞা দিয়া ইন্ডাস্ট্রির বিকাশ হয়তো সম্ভব কিন্তু আর্টের বিকাশ কি সম্ভব? এ প্রশ্নও উঠতেছে যে, ৪০ বছর ধইরা ভারতীয় সিনেমা আমরা ঠেকাইলাম দেশীয় সিনেমার বিকাশের জন্য। তাতে আমাদের দেশীয় সিনেমা কতটা বিকশিত হইলো?
গত ৪০ বছরে আমাদের সিনেমার ইতিহাস বুঝতে হইলে, এফডিসিতে যাইতে হবে। খেয়াল করতে হবে, সিনেমা বানানো, সিনেমায় বিনিয়োগ, ও সিনেমা দেখানোর পুরা ব্যাপারটা এই সময়ের মধ্যে কেমনে অশিক্ষিত, অপ্রশিক্ষিত, গুণ্ডা-পাণ্ডা, অপগণ্ডদের হাতে চইলা গেছে। বাজারের ধারণা মাথায় রাখলে সিনেমা এমন একটা পণ্য যার ভোক্তা মধ্যবিত্ত শ্রেণী। শহর গ্রামের মধ্যবিত্ত সিনেমা দেখে। কিন্তু আমাদের সিনেমা ক্রমে নিম্নবর্গের সংস্কৃতিতে পরিণত হইছে। মধ্যবিত্ত বড় হইছে আর মার্কেট বড় হইছে। আর সিনেমা নিজ থেকে মধ্যবিত্তের কাছ থিকা সইরা গেছে। এফডিসির সিনেমা কালক্রমে কালোটাকা, গুণ্ডাপাণ্ডা আর চর্বিতচর্বন নির্মাতাদের নির্মিত নিম্নবর্গের সংস্কৃতি হিসাবে নৃতাত্ত্বিক গবেষণার বিষয়ে পরিণত হইছে। বাংলা সিনেমা হলগুলাতে এনারাই খাইতেছে। ফাঁকে মধ্যবিত্ত অন্য কিছুর ভোক্তা হয়া গেছে।
এখানকার বিশাল মধ্যবিত্ত খায় এমন সিনেমা এফডিসি ও এফডিসির বাইরে তৈরি হয় বছরে গড়ে ৩ থেকে ৭টা। নতুন নির্মাতারা জনপ্রিয়তায়, বাণিজ্যে, বিপণনে আগায়া আসলেও এফডিসির সিন্ডিকেট ভেঙে তারা এই অচলায়তনের ভেতর ঢুকতে পারে নাই। অদূর ভবিষ্যতেও ঢুকার সম্ভাবনা নাই। ফলে, এফডিসির বানানো, বিপনন ও বিতরণের এই ব্যবস্থা চলতে থাকলে ইন্ডাস্ট্রি ও আর্ট কোনোটা হিসাবেই বাংলা সিনেমার দাঁড়ানোর সম্ভাবনা নাই।
আমাদের মধ্যবিত্তের বিনোদন ভবিষ্যত দেশে অন্ধকার। ফলে, তারা ভারতীয় টিভি চ্যানেলের ভক্ত। ভারতীয় সিনেমার পাইরেটেড নন পাইরেটেড সিডি-ডিভিডির ক্রেতা। বাসায় বইসা মুম্বাইয়ের সিনেমা দেইখা তারা বিনোদনের ঘোল খান। হলিউডের সিনেমা দেখেন। ভারতীয় শিল্পীরা এইখানে হাজারে হাজরে লাইভ শো করেন। উচ্চ ও উচ্চমধ্যবিত্ত এইগুলা বেশি দামের টিকিট কাইটা দেখে। ভেতরে ভেতরে মুম্বাই সংস্কৃতি সয়লাব হয়ে গেছে। খবর নাই কারো। উপরে দিয়া খালি বাকী আছে। সিনেমা হলে বড় হোর্ডিং বসায়ে মুম্বাই সিনেমা দেখানো বাকী আছে খালি। প্রশ্ন হইলো, সেইটা বাকী থাকবে কেন?
আমাদের দেশে মিডিয়া উত্থান ঘটছে গত একদশকে। ঢাকা থেকে ১০-১২টা টিভি চ্যানেল সম্প্রচার হয়। ভাল-মন্দ মিলায়ে এইগুলাতে ইনভেস্টমেন্টও কম না। কিন্তু টিভিগুলা সবই একরকম। কোনো ক্রিয়েটিভিটির ছাপ এইগুলাতে দেখা যায় না। এইগুলার কোনো বিশেষত্ব নাই। জনপ্রিয়তাও নাই। নাটক দেখতে মানুষ ইন্ডিয়া ছোটে। সিনেমা, গান, কার্টুন, এনিমাল সব কিছু ইন্ডিয়ার দখলে। দেশের চ্যানেলে জ্ঞানী লোকেরা খালি টক শো আর খবর শুনে। এমনকি কলকাতার জি বাংলা-ইটিভি বাংলার মতো পসারও দেশের টিভিগুলার নাই। আপাত দৃষ্টিতে মতে হইতে পারে এইটা আমাদের ক্রিয়েটিভিটির সমস্যা। কিন্তু ভিতরে ঢুকলে বুঝা যায়, ক্রিয়েটিভির চাইতেও বড় সমস্যা এইখানে আছে। এক তো আছে, জাতিগত উদ্যমহীনতা ও কর্মহীনতা। আর আছে কিছু লোকের সবকিছু দখল কইরা রাখার প্রবণতা।
টিভির কথা কইলাম, কারণ এইখানে সংরক্ষণ নাই। টিভি বাঁচাইতে সংরক্ষণ আরোপ করা হয় নাই। তাতে টিভিগুলা বাস্তবে কোনো প্রতিযোগিতা অনুভব করে কি না বুঝা যায় না। অন্তত তাদের কর্মকাণ্ডে সেইটা সামনে আসে না। তবু টিভিগুলা এফডিসির চেয়ে ভাল করতেছে।
এফডিসির সিনেমার চাইতে তাদের পসার ভাল।
এখন নিষেধাজ্ঞা দিয়া খারাপ সিনেমা বাঁচানোর চেষ্টা আমি মনে করি খারাপ। আমাদের সিনেমা-সংস্কৃতিতে বাঁচানোর কিছু নাই। এই সর্বহারারে লাখেরাজ সম্পত্তি ঘোষণা করাই ভাল। তাছাড়া দেশ হিসাবে আমরা কোনো আদর্শে গইড়া উঠবো বইলা চীন ইরানের মতো দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নাই। আমাদের বাণিজ্য নীতিতে আমরা দেশীয় শিল্পের বিকাশে সংরক্ষণশীল থাকবো এমন কোনো নীতি নাই। বাণিজ্যে অপরকে গোয়া মারা দেওয়াই যখন আমাদের সংস্কৃতি, তখন সিনেমা কী দোষ করলো?
আমার মতে, সিনেমার নিষেধাজ্ঞা উঠায়া দেওয়াই ভাল।
ভারতের সিনেমা গত কয়েক দশকে যে বৈচিত্র ও বৈভবে উজ্জ্বল হইছে। যেমনে সে আমেরিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এশিয়ার বড় বাজার তৈরি করছে। যেমনে, সে বাজারে সফল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শিল্পমূল্য তৈরি করছে। তেমনে যদি আমরা সিনেমা নিয়া পরিকল্পনা করি, আগায়া যাইতে চাই, তাইলে প্রথমে সকল নিষেধাজ্ঞা, সেন্সরশিপ উঠায়া দিতে হবে। এফডিসিকে যদি বাজারে ফিরায়া আনতে চাই, তাইলে এইখান থিকা গুণ্ডারাজ দূর করে সেইখানে প্রতিভাবান তরুণদের জায়গা কইরা দিতে হবে। মধ্যবিত্তের জন্য মাল্টিপ্লেক্স গইড়া সেইখানে তাদের প্রবেশাধিকার ফিরায়া দিতে হবে। নিম্নবিত্তের বিনোদনের কী হবে তখন, সেইটা নিয়া বিশেষ গবেষণা করা যাইতে পারে।
তবে আপাতত, ভারতীয় সিনেমা আসা কোনোভাবে ঠেকানো উচিত হবে না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


