somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

উত্তর আধুনিক শিল্প/ অশিল্প (প্রথম ভাগ)

০৭ ই মে, ২০০৯ সকাল ১০:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


-------
শিল্পের একটা চিন্থ আছে- তা মানুষকে তথা মানুষের অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলে- তা সে যেভাবেই হোক। হতে পারে মোহাবিষ্ট করে, হাসিয়ে, কাঁদিয়ে, ঘা মেরে, লজ্জা দিয়ে, স্তম্ভিত করে, ভয় দেখিয়ে -জাগায়। এই অনুভূতি যেখানে নেই সেখানে শিল্প নেই। অশিল্প হল অনুভূতিহীন প্রতিক্রিয়াহীন ভাবলেশহীন অনুকরণচর্চা অথবা এমনি কোন কিছু।পরবর্তি অনুচ্ছেদ্গুলোতে আমি চেষ্টা করব আমার সমকালীন শিল্পকলাকারগণের শিল্প-অশিল্পের চিন্থ অনুসন্ধানে প্রবণতা নির্ধারণে তথ্য-সত্য-প্রপঞ্চ অন্বেষনে। বন্ধুরা আমাকে ক্লাসিকপন্থি-প্রাচীনপন্থি বলেন, তাদের চাপানো দায় মাথায় নিয়েই বলছি আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব সরস্বতী ও বৃহষ্পতির নিকট সৎ থাকবার। মোহিতলাল মজুমদার কল্লোলোত্তর কালের বাংলা ভাষার ও সাহিত্যের গতি পরিবর্তনের চিহ্ন লক্ষ্য করে বলেছিলেন "ভাষার আদর্শ ক্ষুণ্ণ করার প্রয়োজন দুই কারণে হইতে পারে –প্রথম, ভাষার আদর্শ সম্পর্কে অজ্ঞতা, বিশুদ্ধ বাক্যরচনার অক্ষমতা; দ্বিতীয়, ভাষাকে সম্পুর্ণ আয়ত্ত করিয়াও লেখকের নিজের খেয়াল খুশি চরিতার্থ করিবার আগ্রহ....কিন্তু অজ্ঞতা ও অক্ষমতার প্রমাণ এতই স্পষ্ট যে, দ্বিতীয় কারণটির উল্লেখ বা আলোচনা অনাবশ্যক মনে হইতে পারে।" আজ প্রায় পোনে শতাব্দি পর মোহিতলালের বিদ্রুপ প্রবল আক্রোশে আপতিত আমাদের প্রজন্মে।প্রথম মহাযুদ্ধত্তরকালে পরাবাস্তববাদ, অধিবাস্তববাদ,যাদুবাস্তববাদ, প্রতিষ্ঠানবিরোধীতা , বীট বংশ ইত্যাকার নানা ধারণার অবতারনা ঘটে প্রাতীচ্যে।আধুনিকতাবাদ যে-বিশ্বভিক্ষা আমাদের শিখিয়েছিল তার পূর্বশর্ত ছিল বিশ্ববীক্ষা, উত্তরসাধক উত্তরআধুনিকতার চর্চাকারীগণ সে পথ না মাড়িয়ে যান্ত্রিক অনুকরণ প্রবনতার বসতবর্তি হয়ে কর্ষণ করছেন আমন এক ভূমি যা তার নিজের নয় যার সাথে নেই তার নাড়ীর টান আত্মিক সম্পর্ক, ব্যাক্তিগত বোঝাপড়া। তাই উত্তর আধুনিকতার মূল সুরটি ধরতে না পেরে কেবল হাতড়ে ফিরছেন তার আধারগত বৈশিষ্টের মাঝে-ফলাফলঃ অশিল্প। শামসুর রাহমান-আখতারুজ্জামান ইলিয়াস-শহিদুল জহির প্রমূখ ব্যাতিক্রম বিবেচনা না করে কলাকারযশোপ্রার্থিগণের প্রবণতাগুল নিম্নোক্ত উপায়ে শ্রেণীবদ্ধ করা যায়ঃ

• *হুট করে বিখ্যাত হবার প্রবণতা-৬০ এর নায়কেরা যেমন হেলায় সহজ সুন্দরীর মন জয় করত তেমনি তারা চায় বাংলা জয় করতে।এ জন্য তারা নানা উদ্ভটত্বের আবির্ভাব ঘটায়, - শব্দে-বাক্যে-বিন্যাসে-গঠনে-পরিকল্পনায়-পরিকল্পনাহীনতায়।শিল্প কখনো উদ্ভট হতে পারে কিন্তু উদ্ভট হলেই তা শিল্প নয় এ সহজ সত্যটা তারা জানে এবং ভুলে যায়।
• *উত্তর আধুনিক হারমনি বুঝতে না পেরে কেবল অসংলগ্নতা {শব্দ চয়নে,বাক্য গঠনে,বাকের পরমপার্য্য বিন্যাসে} চর্চা করা তাকেই আর্ট সমঝে নেয়া
• *বিচ্ছিন্ন হবার-নতুন হবার-ব্যাতিক্রম হবার-উত্তরাধুনিক হবার চেষ্টা পরিণত বাতিকে
• *নিম্ন-মাঝারি প্লট-চিত্রকল্প-আধেয়
• *প্রতীক-চাবি শব্দ-থিম ও সূচন উপসংহার এ অন্বয়হীনতা
• *পশ্চিমে এদের দাদা-গুরু-গডফাদার আছে,এরা স্বিকার করুক বা না করুক,আছে। এরা যদি মার্ক্সকে স্বিকার করে তবে ঐ দাদারা স্বিকার করে বলেই তারা স্বিকার করে যদি অস্বিকার করে তবে ঐ দাদারা অস্বিকার করে বলেই তারা মার্ক্সকে অস্বিকার করার সাহস পায়।দাদারা এত জ্ঞানি,তাঁরা নিশ্চয় ভুল করবেন না,আমরা অজ্ঞান তো কি হয়েছে...এরা রিকার্ডো-স্মিথ-আর্করাইট ও জানে না, মার্ক্স এঙ্গেলস মাও ও জানে না। যাদের পশ্চিমা গুরু নেই তাদের স্বজাতীয় গুরু আছে, তাদের অবস্থা কিঞ্চিত অধিক ভয়াবহ।গুরুরা জ্ঞান সাধনায় বৈতরনী পার করলেও শিষ্যদের তিনি ত্যাগ করেছেন।



উত্তর-আধুনিক আন্দোলন প্রস্তুতির সামাজিক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রক্ষাপট ও মানুষের চিন্তা চেতনার বিবর্তিনধারার সংক্ষিপ্ত আলোচনা দিয়ে শুরু করা যাক। সেইসাথে সে সময় প্রচলিত সাহিত্যিক নিদর্শন সহযোগে যুগমানস উপলব্ধি করার চেষ্টা করব।রেনেসাঁ থেকে এনলাইটমেন্ট পর্যন্ত সময় প্রতীচ্যের মানুষের মহত্বের পর্যায়, অতীমানবীয় কর্মস্পৃহা, অতীমানবীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের পর্যায়। মানুষ শব্দের সংজ্ঞার্থ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এ সময়ঃ- বলা হয়েছে মানুষ সামাজিক জীব-মানুষ প্রকৃতির নির্বাচিত নায়ক-তার সম্ভাবনা অসীম- সে গঠন করবে সমাজ, সমাজের সামগ্রিকতায় থেকে সে উচ্চ থেকে উচ্চতর স্তরে, জয় করবে সবকিছু, যৌথ ব্যবস্থাপনায় সে শিখর স্পর্শি হবে, এমনিতর অনেক কিছু। ভিঞ্চি, রেনে দেকার্ত, ভলত্যার, রুশো, কান্ট, হেগেল, নিউটন, লুথার সে সমাজ গঠনেরই কারিগর। এ-আত্মবিশ্বাস রত্নগর্ভা, ফলাফল হিসেবে জন্ম নিয়েছে চতুর্দশ লুইয়ের অ্যাবসলিউটিজম, ঔপনিবেশিকতা, আমেরিকার প্রজাতন্ত্র, ফরাসী বিপ্লব, শিল্প বিপ্লব, রোমান্টিকতা, আধুনিকতাবাদ অনেক কিছু।প্রচন্ড প্রেরণায় মানুষ অসম্ভবের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। বুর্বঁ অ্যাবসুলেটিজমকে অপসারণ করে নতুন সমাজ রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষায় ফরাসী বিপ্লব করেছে। উদ্বুদ্ধ মানুষ নতুন বিশ্বে সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র গঠন করেছে- আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্র, এই নতুন সমাজের জন্য সপ্নের বাস্তবায়ন। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য দিকে দিকে উপনিবেশ বিস্তার করেছে। প্রত্যন্ত ছায়াচ্ছন্ন আফ্রিকায় ছড়িয়ে পড়েছে অভিযাত্রী। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির হয়েছে অভাবনীয় উন্নতি। সাধিত করেছে শ্রমশিল্পবিপ্লব। অ্যাডাম স্মিথ,রিকার্ডো বিধিবদ্ধ করেছে অর্থনীতি।

বিঘটনের পূর্বাভাসও এসেছে উনবিংশ শতকে। ঊনবিংশ শতকে এসে ঐ চরম উৎকর্ষের নঞর্থকতা স্পষ্ট হতে শুরু করল। যন্ত্র-অর্থ-পন্যের দাপটে মানুষ খর্বিত হয়ে গেল।রাষ্ট্রের কর্তিত্ব, সমাজের বৈষম্য,অর্থের টানাপোড়েন তাকে গ্রাস করতে শুরু করল, পুঁজির ভারে চাপা পরে গেল অসংখ্য মানবাত্মা [*কাফকা দ্রষ্টব্য]। এই ঊনিশ শতকেই ডারুইন ঘোষনা করলেন মানুষ ইশ্বরের নর্বাচিত নয়, নেহায়েতই প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফল। মার্ক্স বললেন ব্যক্তি মানুষ স্বাধীন নয়, সমাজ ও অর্থনৈতিক শ্রেণীর হাতে বন্দি। নিৎশে রটিয়ে দিলেন ইশ্বরের মৃত্যু সংবাদ।এরা সবাই পতনের পূর্বাভাষ ঘোষনাকারি যাদের ইশতেহার রূপ লাভ করে বিশ শতকে। বিশ শতকে, মানুষ পরিনত হল ব্যক্তি মানুষে, ব্যক্তি হয়ে পরল বন্দি প্রমিথিউস, বিচ্ছিন্ন, একাকি, নিঃসঙ্গ,বঞ্চিত, অবহেলিত এবং নিষ্পেষিত। সমন্বিত মানবজাতীর মহত্বর বিকাশ ব্যাক্তি সত্বার ইমানসিপেশনের যে-প্রক্রিয়া শুরু করেছিল তা ব্যক্তিস্বান্ত্রবাদের উন্নিত হয়ে ব্যাক্তির কাছে প্রকাশিত হয়ে গেল যে তার স্বাধীনতা নেই বা বিপন্ন। রেনেসাঁ এনলাইটমেন্টএর সুর্য যখন দ্বিপ্রহরে তখন অকষ্মাত নেমে এল গ্রহণ কাল। দু-দুটা মহাযুদ্ধ, অন্তর্বর্তিকালীন গ্রেটডিপ্রেশন,আণবিক সমরাস্ত্র,উগ্র জাতীয়তাবাদের উত্থান, ইহুদিনিধনবাদ তথা অ্যান্টিসেমিটিজম প্রভৃতি জাত মানবতার চরম অবমূল্যায়ন মানুষের আত্মবিশ্বাসের ভিত নাড়িয়ে দিল।বোধোদয় হল যে মানুষকে যতটা মহৎ মনে করা হয়েছিল সে আসলে ততটা মহৎ নয়।


জেমস জয়েস প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর হতাশা আর অর্থনৈতিক গ্রেট ডিপ্রেশনের প্রতিভু। আরেকজন খুব সম্মানিত হন উত্তরাধুনিক অবধারণে,
ফ্রানৎজ কাফকা, তাঁর লেখায় আমরা সেই চাপা পড়া আর্তনাদ দীর্ঘশ্বাস শুনি, প্রথমবারের মত, গত শতকের কুঁড়ির দশকে। তার অধিকাংশ রচনাই রূপকের আড়ালে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে- পুঁজিবাদী ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে, রাষ্ট্রযন্ত্রের যথেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে। সামাজিক কর্তব্যবোধ থেকে উতসারিত নয় তার লেখা- তার চে'ও বেশি কিছু, ব্যাক্তিক চেতনার একটা নতুন মাত্রা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিলেন তিনি। এই চেতনা আমাদের মনে এক ধরনের বিষ্ফোড়ন ঘটায় আমাদের চিত্তে, আঘাত করে না কিন্তু আহত করে। এর হাত থেকে আমাদের যেন পরিত্রান নেই- জলের মত ঘুরে ঘুরে প্রতিধ্বণিত হয় আমাদের মাথায়।কিন্তু কাফকা নির্লিপ্ত। তার প্রকৃতিই নিঃশব্দ। তিনি কেবল উপলব্ধি করেন ও উপলব্ধি করান, দুলতে থাকেন আশা ও নিরাশার মাঝখানে, বিরোধিতা আর বিশ্বাসের মাঝামাঝি কোন জায়গা থেকে সমান্তরাল কিছু প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলতে থাকেন এবং বিলীন হয়ে যান। কেবলত থাকে বিষধর দংশনোদ্যত সভ্যতার মুখোস। মেটামরফোসিস এ দেখি এমনি একজন জাঁতাকলে পিষ্ট মানুষের ছবি। আর ক্যাসলে পাই আমন একজনকে যে ক্ষমতার সুউচ্চ কেন্দ্রের বৃথা অন্বেষনে নিবিষ্ট।

যুদ্ধত্তোর কালের মানবসত্বার সংকট প্রতিফলিত হয়েছে প্রতীচ্যের বহু লেখকের লেখায়, তাদের অধিকার করে নিয়েছে তাদের প্রচন্ড সময়। এ সময় ঔপন্যাসিকেরা নিযুক্ত থেকেছেন যুদ্ধের ভয়াবহতা বর্ণনায়, সর্বগ্রাসী-অসিহিষ্ণু-নিয়ন্ত্রনমূলক ব্যাবস্থা, রাষ্ট্র, সমাজ, শাসনতন্ত্র চিত্রায়নে। এসব বিষয় উত্তর ৪০ ইউরোপের বাস্তবতা, ২০০৮-এ আমার দেশ কালের বাস্তুবতা নয়। মার্কিন মুল্লুকের জোসেফ হেলার তার ক্যাচ-২২(১৯৬১) তে নির্মম বাস্তবতায় দেখিয়েছেন সামরীক জীবনের রুক্ষতা, হিংস্রতা, নৃশংসতা। জার্মান গুন্টার গ্রাস ৩০-এর নাৎসি জার্মানির পঙ্কিল রুগ্ন রাজনীতির কথা বলেছেন 'টিন ড্রাম',১৯৫৯-এ। জাঁ-পল সার্ত্র তার উপন্যাস,নাটক ও অন্যান্য লেখায় তুলে ধরেছেন তার নিজের ও স্বভূমের যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতা। প্রাগযুদ্ধ অস্তিত্ববাদের প্রবক্তা সার্ত্রের 'ব্যাক্তিক অস্তিত্বের সংকট ও মুক্তি'র ধারণা উত্তরযুদ্ধকালে পরিণত হল 'মার্ক্সিয় শ্রেণীসাম্যের' বিশ্বাসে। অন্যদিকে আলবের কামু সেকুলারিজমে আশ্রয় পেলেন না,মার্ক্সিজম কে সমাধান মানলেন না, আরও জটিল আবর্তে পাঁক খেতে লাগলেন,অসম্ভব যন্ত্রনা নিয়ে তার উপন্যাসগুলিতে দেখাতে লাগলেন মানুষের এ-চরম সংকটের কারণ তার নিজেরই দ্বায়িত্বহীনতা, আত্মোপকারে অসামর্থ। মহাযুদ্ধ মানবতার চরম আধোঃগতি, অবমুল্যায়ন তীব্র হতাশ করেছিল দার্শনিক শিল্পি লেখকদের- এ ব্যার্থতা তাদেরই, তারা আলোকবর্তিকা ধরতে পারেন নি মানুষের সামনে।মহাযুদ্ধ একটি সমাপ্তি বিন্দু, এটি চিন্তাবিদদের পূর্ববর্তি ধ্যান ধারণা পরিত্যাগ করতে বাধ্য করেছে। নিরাশ্রয় এই ঋত্বিকেরা কেউ আশ্রয় খুজেছেন সমাজতন্ত্রে কেউ ধর্মে কেউ নৈরাজ্যে, কেউ পুঁজিবাদে,কেউবা হতাশায়।

মার্ক্সবাদ দ্রুত মনযোগ আকর্ষন করল পশ্চিমা বুদ্ধিজীবিদের। ভবিষ্যতের পথনির্দেশ আর সমসাময়িকের গতিপ্রকৃতি ব্যাখ্যা উভয়ই সম্ভব এ তরিকায়, সমাজের শ্রেণী বিশ্লেষন ইতিহাসের বিবর্তন এমনি ধারা কয়টি পদ্ধতি প্রয়োগ করলেই হল।অবধারিত ফলাফল, ইতিহাসবিদ, অর্থনীতিবিদ, সমাজতাত্বিক, দার্শনিক, রাজনীতিবিদ সবাই অহরহ নানা বিষয়ের অবধারনে মার্ক্সিয় ব্যাখ্যা অবলম্বন করতে লাগলেন। পরিহাস এই, তাঁরা মার্ক্সের অর্থনৈতিক তত্বকে যথেষ্ট গুরূত্ব না দিয়ে তাঁর সমাজবৈজ্ঞানিক সূত্রসমূহ নিয়েই ব্যস্ত রইলেন। শ্রেণীস্বার্থকে তারা অতিক্রম করতে পারেন নি, ব্যক্তিমালিকানার উচ্ছেদ, পুঁজির বিকাশ রোধ, মেহেনতি শ্রেণীর একনায়কতন্ত্র তাদের কাছে ভীতিপ্রদ। হাঙ্গেরির জর্জ লুকাস ও আরো অনেকে শ্রেণী সংগ্রামের আলোকে বিশ্লেষন করতে থাকেন নানাবিধ বিষয় ও সমস্যা। আরো আছেন ফরাসী সমাজতাত্বিক ক্লদ লেভি-স্ট্রস, যিনি নিজেকে 'প্রচলিত বিষয়গুলিতে মার্ক্সবাদী'(Marxist in contemporary issues) বলে দাবি করতেন। কিন্তু তিনি যে পদ্ধতিতে সমাজকে ব্যাখ্যা করেছিলেন তা একেবারেই মার্ক্সিয় সমাজতত্ব থেকে ভিন্নতর, মার্ক্সিয় আদর্শ, মূল্যসচেতনতা, শ্রেণী বৈশিষ্ট, দ্বান্ধিকতা কিছুই নেই স্ট্রাকচারালিস্ট স্কুল নামে প্রচলিত এই সমাজসংগঠন প্রকল্প বা মডেলে। লেভি-স্ট্রস প্রাথমিক পর্যায়ের যেসব সমাজ আছে তাদের নিয়ন্ত্রক বৈশিষ্ট গুলি বিধিবদ্ধ ও সংজ্ঞায়িত করেন, যেমন জ্ঞাতিত্ব,আচার অনুষ্ঠান, ঐতিহ্য প্রভৃতি এবং পরিণত সমাজগঠনে এগুলোর প্রভাব পর্যালোচনার মাধ্যমে সে সমাজকে ব্যাখ্যা করেন। তার মতে এসব বৈশিষ্টই নিরূপণ করে সমাজের গাঠনিক বৈশিষ্ট- যেখানে মার্ক্স বলেছিলেন শ্রেণী বৈষম্য, শ্রেণী চরিত্র, সামাজিক দ্বন্ধই সমাজগঠনের নিয়ন্ত্রক নির্ধারক বৈশিষ্ট। সোভিয়েত ইউনিয়নের বাইরে মার্ক্সবাদের এমনি নানা রকম ভিন্নতর উপজাত তৈরী হচ্ছিল সারা প্রতীচ্য জুড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন সবসময় আদর্শ তথা ধ্রুপদী মার্ক্সবাদ চর্চা করে গেছে, অন্তত বৌদ্ধিক ক্ষেত্রে। মুক্ত জগতের এই বুদ্ধিজীবিদের গূঢ়েষাটি লক্ষ্যনিয়, শ্রেণীচরিত্রের কারণে তারা মার্ক্সকে পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারছেন না, কিন্তু তাকে অস্বিকার ও করা যাচ্ছেনা- অতপরঃ উভয়ের মধ্যবর্তি ধুসর অঞ্চলটিই তাদের অন্বিষ্ট, মার্ক্সবাদ কে অভিশ্রুত করা,পরিশ্রুত করা। একাডেমিক গুরুত্ব বাদ দিলে এসব তত্ব-দর্শনের না আছে কোন অর্থদ্যোতকতা না আছে বাস্তবিক প্রয়োগ। মার্ক্স একটি দর্শন থেকে গড়ে ছিলেন একটি সমাজ কাঠামো,সমাজ কাঠামো থেকে একটি রাষ্ট্র কাঠামো, নতুন বিশ্ব বিনির্মানের জন্য তত্ব থেকে ব্যাবহারিক প্রয়োগ পর্যন্ত সব কছু এবং আরো বেশি কিছু ছিল মার্ক্সবাদে। যুদ্ধত্তোর বুদ্ধিজীবিরা কেবল স্ব-স্বক্ষেত্র থেকে বিকৃত করতে চেয়েছেন মার্ক্সবাদকে- সার্ত্র দর্শন কে, লেভি-স্ট্রস সমাজবিদ্যা কে, মাও রাজনীতিকে।

১৯৬০-৭০-এর দশকে লেখকের সিদ্ধান্তে উপনিত হলেন যে রাষ্ট্রের প্রতিকারহীন,নিরঙ্কুস ক্ষমতা বৃদ্ধিই হল ব্যাক্তির বিচ্ছিন্নতা আর উপায়হীনতার কারণ। সমাগতান্ত্রিক রাশিয়ার বিরুদ্ধে উদ্যত হল নানা অভিযোগ। ড. জিভাগো তে বরিস পাস্তারনাক অভিযোগ করলেন সমাজতান্ত্রিক সমাজ যান্ত্রিক, কৃত্রিম, সবাইকে একই ছাঁচে ঢালাই করতে উদ্যোগী, ব্যাক্তি স্বাধিনতা-ব্যাক্তি স্বাতন্ত্র সেখানে সুদূর পরাহত। আলেকজান্দার সোলঝেনেতসিন তার গুলাগ আর্কিপেলাগো তে বললেন সোভিয়েত রাশিয়ার দ্রুত উন্নতির পেছনে কী বর্বর, পাশবিক, বিচার-বুদ্ধিহীন পদ্ধতি ক্রিয়াশীল। সাইবেরিয়ার লেবার ক্যাম্পের কথা আমরা তার মারফতই জানতে পারি। ব্যাক্তির ইচ্ছা সোভিয়েত "প্রগতী"র মুখোমুখি হলে তার কি হাল হয় তা আমাদের দেখান সোলঝেনেতসিন। পুঁজিবাদী দুনিয়া অবশ্য এ দুজনকেই নোবেল দিয়ে বাধিত করেছে- সে অন্য রাজনীতির গল্প,নষ্ট রাজনীতির গল্প। পাস্তারনাক-সোলঝেনেতসিন দের অভিযোগ মিথ্যা নয়, যান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের চর্চা সোভিয়েত রাশিয়া অবশ্যি করেছে, কিন্তু ঐ বুদ্ধিজীবিদের প্রতিবাদের ফসল ঘরে তুলেছে মার্কিন মুল্লুক। কিন্তু অপর বিশ্ব,আমেরিকায় হার্বার্ট মারকোস অভিযোগ করলেন ব্যক্তিস্বাধীনতার বিপরীতে নিয়ন্ত্রনবাদ,কর্তৃপক্ষের বশ্যতা স্বিকারে বাধ্য হওয়া পুঁজিবাদি তথা মুক্ত সমাজেও বিদ্যমান, কেবল তার প্রকরণ ভিন্ন, প্রয়োগ ভিন্ন, ফলাফল একই। ব্যাক্তির মুক্তি নেই।

প্রচলিত সমাজ সভ্যতার বিরুদ্ধে প্রচন্ড বিক্ষোভ সত্বেও কেউকেউ হয়ে পরেন প্রচন্ড হতাস যে প্রতিবাদ জানাবার স্পৃহটুকুও হারিয়ে ফেলেন, বিপ্লব বিদ্রোহ তাদের মনে হয় অর্থহীন অরন্যে রোদন। প্যান্ডোরার বাক্সে পতিত বস্তু হাওয়ায় মিলিয়ে যায়, অসংলগ্নতা ছাড়া কিছুই তার ভাব প্রকাশের জন্য থাকে না। রাষ্ট্র-সমাজ-শ্রমশিল্পযোজন-পুঁজি-পন্য-বানিজ্য-বিজ্ঞাপন গঠিত বিশাল মিথস্ক্রিয় গঠনতন্ত্র বা সিস্টেমের বিরূদ্ধে কী করার আছে তার, এ হতাশা তাকে সভ্যতার বিরুদ্ধে আক্রমনের পরওয়ানা জারি করা থেকে বিরত রাখে। সিস্টেম বিশাল,ব্যক্তি ক্ষুদ্র- এ বোধ তাকে করে তোলে মৃয়মান, পলায়ন প্রবন ও অন্তর্মূখী। স্যামুয়েল বেকেটের নাটক "ওয়েটিং ফর গডো",১৯৫৩, এই অসংলগ্ন পলায়ন প্রবণতার নিদর্শন। এ বিশেষ ধরনের মানসিক প্রপঞ্চ প্রকাশিত হয় অসমঞ্জস অযৌক্তিক অদ্ভুত সপ্নবিলসী কল্পনায়, চরিত্রগুলির অর্থহীন কথাবার্তায়। সংলাপের তুচ্ছতা তার চরম উৎকর্ষে পৌছে গেছে এ যুগের নাটকে এবং বিপরীতক্রমে এসব নাটকের
উৎকর্ষই হল অভাবিত সংলাপ পরিকল্পনা। কারণ এই আপাতঃ অর্থহীনতার অভ্যন্তরে ক্রিয়াশীল আছে একধরনের যুক্তিবোধ। প্রতিটি চরিত্রের অবস্থান ও গঠনের উপর ভিত্তি করে তাদের নিজস্ব যুক্তিবোধ-অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে এখানে। তবে কেবলই বহিঃপ্রকাশ- তাদের কোন বিশ্লেষণ নেই, কোন আকাঙ্ক্ষা নেই, বিদ্রোহের বাসনা নেই, কেবল নির্মোহ বহিঃপ্রকাশ।


এইতো গেল সাহিত্য বিচারের আলোকে উত্তরাধুনিক আন্দোলন তৈরীর সমাজতাত্বিক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। এবার মানুষের চিন্তা চেতনার বিবর্তনধারার উপর আলক সম্পাত করা যাক, প্রস্তুত রংগমঞ্চে মানুষ কিরূপ আচরণ করে থাকে তাই লক্ষ করব পরবর্তি ভাগে।

(প্রথম ভাগ সমাপ্ত)
টিকাঃ
বানান ভুল হতে পারে দয়া করে ধরিয়ে দেবেন

৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×