একটা সময়,(খুব বেশিদিন হয়নি)বন্ধুদের তুমুল উৎসাহে পড়ে বেশ কিছু ছোটগল্প লিখে ফেলেছিলাম।মজার কথা হল,রেসপন্স ভাল ছিল বলেই হয়ত খুব দ্রুত প্রত্যাশা পূরন হওয়ায়,এখন আর কিছুতেই আগ্রহ পাইনা।মে,২০১০ এ প্রকাশিত একটি ম্যাগাজিনে আমার এই গল্পটি প্রকাশিত হয়......
''আজকাল হাতে নতুন কাজ আসলে কাশেমের খুব অস্থির লাগে।বামচোখের পাতাটা তিরতির করে কাঁপে,গলা শুকিয়ে আসে কিছুক্ষন পরপরই।বুকের ভেতর ধড়ফড় করে।কাজের খবরটা পাওয়ার পরপরই সে তার ছোট চারকোনা বেড়ার ঘরে অস্থির হয়ে পায়চারী করতে থাকে।ঘরে অবশ্য খুব বেশি জায়গা নেই।একটা চৌকি দখলদারী মনোভাব নিয়ে ঘরের অর্ধেকেরও বেশি জায়গা নিয়ে জাঁকিয়ে শুয়ে আছে।যেন হাত পা ছড়িয়ে ঘরটায় রাজত্ব স্থাপনের অপচেষ্টায় মত্ত কাঠের চৌকিটা।
ঘরের একপাশে বেড়ীর উপর পানি ভর্তি মাটির কলস।কিছুক্ষন আগে পানি ঢালার চিহ্ন বহন করছে মেঝের ক্ষতক্ষতে ঘা টা।একটা ভাঙাচোরা আলনা অবহেলায় পড়ে আছে বহুদিন,তাতে হলুদ শার্টটা রাজসাক্ষীর মত তাকিয়ে থাকে কাশেমের দিকে।হলুদ শার্টে লাল চোখের মত মাংসের ঝোল পড়া জায়গাটা,ধুয়ে উঠাতে গিয়ে যা আরও কটকটে লাল হয়ে গেঁড়ে বসেছে নিজের আসন পাকাপোক্ত করতে।প্রথম ঐ শার্টটা পরেই তো কাজীহাটার এক নব্যধনীর ভবলীলা সাঙ্গ করতে গিয়েছিল।
ব্যাটা কয়দিনেই রড-সিমেন্টের ব্যবসা করে ফুলে ফেঁপে উঠছিল,বাড়ও বেড়েছির টাকার গরমে,দুইবার ভাল ভাবে চেয়ে আসার পরও টাকা দিতে গা করেনি।রগচটা কাশেম তৃতীয়বার আর ধৈর্য ধরতে পারেনি।সেই থকে শুরু।ঠান্ডা মাথার এসব কাজের জন্য লোকে আজকাল ভাড়াও করে তাকে।কয়েকটা সফল কাজই তাকে এমন উপরে উঠিয়েছে।এখন এক নামেই চেনে সবাই।কিছু কিছু লোকের জাত সাহস থাকে,কাশেমের অনেকটা সেইরকম।ক্যরিয়ারের উঠতি বয়সের এই চরম সময়েই কিনা কাপুরুষের মত বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল!খুব করে নিজেকে ধমকায়,ভেতরে ভেতরে চোখ রাঙায় নিজেকে।
তবু কিছুতেই কিছু হয়না।বুকের ভেতর হাতুড়ির ঘা পড়ছে অনেকক্ষন।চৌকিটায় চিৎ হয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে নিজেকে বিশ্রাম দেয় কিছুসময়।হয়ত এর মাঝেই প্ল্যানটা গুছিয়ে ফেলে সামনের কাজটার সুরাহা করে দিতে।
আজকাল লোকে খুব ভরসা রাখে তার উপর।এসব কাজে একবার সুনাম রটলে আর পিছু তাকাতে হয়না।কোনোক্রমে যদি বিফল হয় একটা কাজেও তাহলে আর দেখতে হবেনা,অন্য কেউ দখল করে নেবে জায়গা।প্রানপন নিজেকে টিকিয়ে রাখার জেদ মনে মনে একটু সাহসও দেয় হয়ত।
ক'দিন থেকেই ঘুসঘুসে জ্বর।আসে চলে যায়।পুরোপুরি ছাড়েনা,শরীরটাকে কাহিল করে দিয়েছে বড্ড।তবু পাত্তা দেয় না কাশেম।সেতো আর বাচ্চা কিমবা পুতুপুতু নারীদের মত নয় যে একটু জ্বরেই কাতর হবে!তবে আজ আর থাকতে পারেনা,সামনের কাজটা ঠিকমত সারতে গেলে তার সুস্থ্য থাকা খুব জরুরী।একবার ডাক্তারের কাছে গিয়ে দেখিয়ে আসবে ভেবে আলনা থেকে মোটামুটি ভদ্র একটা শার্ট গায়ে চড়িয়ে বের হয়ে যায় ঘর থেকে।
ডাক্তার তার স্বভাবমত একগাদা টেস্ট করতে দিলে রাগে মুখে থুথু জমতে থাকে কাশেমের।এতগুলা পয়সা!বেড়ার ঘরে থাকলেও এখন তার অনেক পয়সা,রক্ত জল করা,জান এক হাতে নিয়ে আরেক হাতে উপার্জিত এতগুলা টাকার শ্রাদ্ধ হয়ে যাবে ভেবেও শেষ পর্যন্ত পরীক্ষাগুলো করায় সে।রিপোর্ট হাতে নিয়ে ডাক্তার মুখ গম্ভীর করে ফেলে।কখনো রক্ত দিয়েছে কিমবা নিয়েছে কিনা জিজ্ঞেস করে কাশেমকে।উত্তরে না শুনে একটু থেমে বলে,এখন থেকে আর দিবেন না আর নারী সঙ্গমে সাবধান থাকবেন।আপনি এইচ আইভি পজেটিভ।
ধ্বক করে ওঠে কাশেমের বুকের ভেতরটা।দু'মাস আগে বেশ্যাপড়ায় আসা অদ্ভুত ছটফটে আর তারকাটা সুন্দরী মেয়েটার মুখ চোখের সামনে ভেসে ওঠে হঠাৎ করেই।এসব জায়গার নিয়মিত খদ্দের সে।তাই মাসী তাকে হাত কচলে ভালই সম্মান করে।ওদের নিরাপত্তার ভারও খুশি মনে নিয়েছে কাশেমই।আর তাই নতুন মেয়ে আসলে আগেই খবর পায় সে।তবে কি.....
সৌন্দর্যের ওপারটা যে কি কুৎসিত,কি ভয়ঙ্কর!দু মাস থেকে মেয়েটির কাছেই যায় সে,ভালবাসাও বুঝি জমতে শুরু করেছিল খা খা বুকটার কোন এক কোনে।এমন ভাবে জীবনের কাছে পরাজয়ের কথা তো কখনো ভাবেনি সে!
অস্থিরতা বাড়তে থাকে।ফিরে আসে ঘরে।নিজেকে বোঝায়,এমন তো কতই আছে।কিন্তু মনে জোর পায়না একদম।ঘরে বাইরে নিজেকে আগের মত প্রকাশ করতে পারেনা আগের মত।তেজের ছটা যেন মিইয়ে আসছে দিনকে দিন।ঘুমে জেগে সে শুধু তার পতনের ঘন্টাধ্বনি শোনে।নিজেকে পতোনোন্মুখ পতঙ্গের মত আগুনে সঁপে দেয়া যার নিত্যদিনের দায়সারা কাজ ছিল,আজ সেসব তাকে একদমই টানেনা।নিস্পৃহতা নিত্যসঙ্গী হয়ে গেল বুঝি!
বাবা-মা ছাড়া বড় হওয়া কাশেম আদরের কাঙ্গাল হয়ে পড়ছে দিনদিন।একটা পরিবারের স্বপ্ন সে প্রায় রাতেই দেখছে কদিন ধরে।আজও স্বপ্ন(!) আসে তবে।প্রকৃতির কি নিষ্ঠুরতা,কি অদ্ভুত নিয়তি তার!একটা হ্যাঁ যখন কোন নারীকে পায়ের কাছে এনে ফেলতে পারত তখন ওসব ঝামেলা মনে হতো।আর আজ বড় ইচ্ছে করে তার জ্বরতপ্ত কপালে নরম হাতের ছোঁয়া পেতে।লাফিয়ে লাফিয়ে, গড়িয়ে গড়িয়ে স্বপ্ন আসে তার দিকে।আর সে প্রানপনে দু'হাতে ঠেলে অর্ধমৃত স্বপ্নকে।কি হবে আর এসবে!''
গল্পটি এখানেই শেষ।এখন যে কথাটি বলার জন্য বসলাম তা হল,গল্পের সাথে আমার সুপ্রিয় ভ্রাতার ফোন নাম্বার দেয়া ছিল।গতকাল ভাইয়া বাসায় এসে বলল,লেখালেখি কর ভাল কথা,কিন্তু এর চারিদিকটা যে কত নোংরা তোর জানা দরকার।সেই সম্পাদক এর আগেও তিনবার ফোন দিয়ে তোকে চাইসে।আমি তারে বুঝায়া বলসি যে তার নাম্বার তো ভাইয়া দেয়া যাবেনা একটু সমস্যা আছে।তারপর সে কয় যে ভাই আপনার বোনতো লেখালেখি করে,তাইলে এমন বেয়াদব কেন বলেন তো?এমন অভদ্র মেয়ে মানুষ তো জীবনেও দেখি নাই।
স্বভাবতই ভাইয়ার মাথায় রক্ত উঠে গেছে,সে বলসে,আরে আপনিও তো লেখালেখি করেন,আপনি এইটা কি ভদ্রতার পরিচয় দিলেন সেটা বলেন আগে শুনি।
সম্পাদক কয় ভাই আগে শোনেন কি বলি তারপর কথা বইলেন,আমি এই সংখ্যার ৩০০ টা কপি পাঠাইসি বিভিন্ন জনের কাছে,সবাই আমারে ফোন দিয়া জানাইসে,একমাত্র আপনার বোন ভদ্রতার পরিচয় দিয়া একটা ফোন ও করে নাই।
ভাইয়া বলল,আমি আপনারে নিজে ফোন দিয়া জানাইসি,আপনারে ধন্যবাদ কইসি,আপনারে এনসিওর করসি যে সে পত্রিকা পাইসে।তারপরও আপনি এই কথা বলেন ক্যামনে?
সম্পাদকে কয়......(সেন্সরড)।
এই হইল ঘটনা।কাল আমিও ঝাড়ি খাইসি ভাইয়ের কাছে।
এখন আপনারাই কন আমি কি কমু?
কেমনে ঐ ব্যাটারে গদাম দিয়া আমার জাতের হারানো ইজ্জত ফিরায়া আনুম?
জুতাটা কেমুন?

সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৮:৪৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



