বিসর্জন,রবী ঠাকুরের এই নাটকটি আমরা অনেকেই পড়েছি,আবার হয়ত অনেকেরই পড়া হয়ে ওঠেনি ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও।শেষ দলের জন্যই আমার এই লেখা।
বিসর্জন রচিত হয়েছিল ১৮৯১ সালে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শেষ পর্যন্ত নতুন নতুন ধাঁচ ও ছাঁচ সৃষ্টি করেছেন,পুনরাবৃত্তি তাঁর কাছে রুচিকর মনে হতনা হয়ত।বিসর্জনের ক্ষেত্রেও তাই তিনি নিজস্বতা বজায় রেখেছেন।
নাটকটির কাহিনী মূলত বলী প্রথা বন্ধের জন্য রাজার পদক্ষেপ,ও তার আনুসঙ্গিক ঘটনাবলি নিয়ে রচিত।
নাটকটি পড়তে গিয়ে ক্রমশ মুগ্ধ হয়েছি।ত্রিপুরার রাজা গোবিন্দমানিক্যের স্ত্রী গুনবতী সন্তান হীনা। একটি সন্তানের জন্য দেবীর কাছে তার আকুল মিনতি।ভিখারী যে সন্তান বিক্রী করে উদরের দায় মেটায়,পাপীষ্ঠা যে লোকলাজে ভ্রুন হত্যা করে তাকেও দেবী সন্তান দেন অথচ গুনবতীর মা হওয়ার আকাঙ্খা কোন লীলায় এখনও পূরণ হয়না!
রঘুপতি মন্দিরের সেবক,রানীকে সান্তনা দেয়,রানীর নামে পূজা হবে।
গুনবতী সন্তানের জন্য মানত করে।মা যদি সন্তান দেন প্রতি বছর একশত মহিষ আর তিনশত ছাগ মা'র নামে বলী দেয়া হবে।
মাতাপিতাহীন জয়সিংহ রঘুপতির আশ্রয়ে মানুষ হয়েছে দেবীর মন্দিরেই।ব্রক্ষচারী রঘুপতিকে অবলম্বন করে তার জগৎ,একটু বড় হলে দেবী তার মন অধিকার করে,তারপরেই গোবিন্দমানিক্যের চরিত্র মাধুর্য তার মনের শ্রদ্ধা ও প্রীতি আকর্ষন করে।নিজেকে সে এই তিন দেবতার দাস ভাবে।
অপর্ণা ভিখারিনী বালিকা,বলির জন্য তার একমাত্র সম্বল ছাগশিশুটিকে ধরে এনে বলি দিলে সে রাজার কাছে বিচার জানায়।রাজা জয়সিংহের কাছে কৈফিয়ত চাইলে,জয়সিংহ বালিকার দুঃখে দুঃখিত হয়।কিন্তু মা যাকে নিয়েছে,তাকে কি করে ফিরানো যায়!এ কথা শুনেই বালিকা রোষে বলে,
''মা তাহারে নিয়েছেন?
মিছে কথা,রাক্ষসী নিয়েছে তারে।''
রাজা বুঝতে পারে বলি প্রথায় যে রক্তের বন্যা বয়ে যায়,তাতে অশ্রুর জল মিশলে মা আর কিভাবে সন্তুষ্ট হবে?মা হবে স্নেহের ঘর,অশ্রু অস্থিরতায় সান্তনার আশ্রয়।অথচ সেই মা বলি গ্রহন করে কিভাবে!
রাজা যখন রাজ্যে বলি প্রথাকে নিষিদ্ধ করল,এবং যে কেউ তা অমান্য করলে তাকে নির্বাসিত করা হবে বলে ঘোষনা দিল ,তখন মায়ের সেবক হিসেবে রঘুপতি স্বভাবতই দুঃখ পান।এবং তা রাগে পরিনত হয়।
অপর্ণার প্রতি এক ধরনের ভাল লাগা,মমতা জাগে জয়সিংহের হৃদয়ে,অপর্ণার মর্মবেদনার ঢেউ তার ভেতরে চেতনা জাগ্রত করে।জয়সিংহ উপলব্ধি করে দেবতার উপস্থিতি,
''শুধু ধরা দেও তুমি মানবের মাঝে,
মন্দিরের মাঝে নয়।''
রঘুপতি গোবিন্দমানিক্যের ছোট ভাই নক্ষত্ররায়কে রাজা হওয়ার কথা বলে লোভ দেখায়,মা রাজরক্ত চান বলে ভাইকে ভাতৃহত্যার জন্য প্ররোচিত করে।জয়সিংহ তাতে প্রচন্ড ভেঙে পড়ে।তার মনে সংস্কার আর সদ্ বুদ্ধির দ্বন্দ্ব বাঁধে।রঘুপতির উপর আস্থা তার নিজের জীবনের ভিত্তি বলে রঘুপতিকে ভাতৃহত্যা পাপের দায় সে নিতে দিতে চায়না।
অপর্নার গান তার হৃদয়ে আনন্দ আবেশ জাগায,কিন্তু সে আবেশ রঘুপতির হস্তক্ষেপে ভেঙে যায়।অপর্ণা শাপ দেয়,
''নিষ্ঠুর ব্রাক্ষণ!ধিক্
থাক ব্রাক্ষণত্বে তব!আমি ক্ষুদ্র নারী
অভিশাপ দিয়ে গেনু তোরে,এ বন্ধনে
জয়সিংহে পারিবি না বাঁধিয়া রাখিতে।''
অপরদিকে গুনবতী তার পশুর বলি ফিরে আসতে দেখে রাজার উপর অভিমান করে।রাগ করে।নারীত্বের সমস্ত ছলাকলা দিয়াও যখন রাজার মন ফেরাতে পারেনা তখন নক্ষত্র রায় কে লেলিয়ে দেয় ধ্রুব নামের বালকটিকে মায়ের পায়ে বলি দিতে।ধ্রুব রাজপালিত বালক।
রাতের আঁধারে বলি দিতে নিয়ে গেলেও রঘুপতির সাথে মদ্যপানে মেতে সকাল হলে রাজা খবর পেয়ে যায়,তারপর রঘুপতির এবং নক্ষত্ররায়ের আট বছরের নির্বাসনদন্ড দেন।কিন্তু রঘুপতি দু'দিন সময় চেযে নেন রাজার কাছে।আসলে এই সেবক মানতে পারছিলেন না তার পরাজয়।এ জন্য যখন রাজা দেবীর স্বপ্নে প্রাপ্ত আদেশের কথা বলে বলি নিষিদ্ধ করে তখন সে বলে উঠেছিল,
''একে ভ্রান্তি,তাহে অহংকার!অজ্ঞ নর,
তুমি শুধু শুনিয়াছো দেবীর আদেশ,
আমি শুনি নাই,''
গোবিন্দমানিক্যের সঙ্গে রঘুপতির দ্বন্দ্ব এক হিসেবে জাত শক্তির দ্বন্দ্ব বলা যায়।জাতীতে ব্রাক্ষ্মণ রঘুপতি নিজেকে শ্রেষ্ঠ ভাবে ক্ষত্রিয় রাজার কাছে।তাই তার মেনে নিতে কষ্ট হয় রাজার নির্দেশ।সে তাই রাজহত্যার মত পাপের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
কিন্তু তার সবচেয়ে আপন স্নেহের জয়সিংহ যখন দেবীর রক্তলিপ্সা মেটাতে আত্মত্যাগ করে,নিজের রক্তে ভাসিয়ে দেয় মন্দির,রঘুপতি বুঝতে পারে তার নিজের ভুল।
নিজেকে ধিক্কার দিতে গিয়ে সে দেবীরূপী মাকেও ধিক্কার দেয়া শুরু করে।
''শুনিতে কি
পাস?আছে কর্ণ?জানিস কি করেছিস?
কার রক্ত করেছিস পান?কোন পুণ্য
জীবনের?কোন স্নেহদয়াপ্রীতি ভরা
মহাহৃদয়ের?''
অবশেষে রঘুপতি জগতের বুক হালকা করতে গোমতীর জলে প্রতিমা নিক্ষেপ করে।
গুনবতী পূজা নিয়ে আসে,সে তার রাজা,রাজ্য সব ছেড়েছে শুধু প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে।কিন্তু রঘুপতির মুখে তখন নতুন বুলি,দেবী কোথায় এর উত্তরে বলে,
''কোথাও সে
নাই।ঊর্ধ্বে নাই,নিম্নে নাই,কোথাও সে
নাই,কোথাও সে ছিলনা কখনো।''
দেবী নাই!দেবী নাই?দেবী নাই!তবে কে রয়েছে?কেহ নাই কিছু নাই!
''দেবী বল তারে?
পুণ্যরক্ত পান করে সে মহারাক্ষসী
ফেটে মরে গেছে। ''
সব শেষে যে অপর্ণাকে রঘুপতি দু'চোখে দেখতে পারতোনা,জয়সিংহের মন ভোলাচ্ছে ভেবে,তার মুখে পিতা ডাক শুনে তার অশ্রু বয়ে যায়।জয়সিংহ তার নিজ রক্ত দিয়ে নিভিয়ে গেছে হিংসারক্তশিখা।
বিসর্জন নাটকে শুধু আত্মবিসর্জন আছে,কিন্তু শুধু তাতেই সমস্যার সমাধান মিলেনি,আরো কঠোর ত্যাগের মধ্যদিয়ে গোবিন্দমানিক্যের সাথে স্ত্রী গুনবতীর বিরোধের অবসান ঘটেছে।সুতরাং প্রতিমা বিসর্জন এই নাটকের শেষ কথা নয়।তার চেয়েও বড় কথা হল জয়সিংহের আত্মত্যাগ।কারন তখনই রঘুপতি সুষ্পষ্ট ভাবে বুঝলো যে প্রেম হিংসার পথে চলেনা।
![]()
শেষ কথাঃ-
কোনো এক সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দেওঘর থেকে কলকাতায় ফিরে আসার পথে ঘুমে থাকা অবস্থায় স্বপ্ন দেখেন,
''এক মন্দিরের সিঁড়ির উপর বলির রক্ত চিহ্ন দেখে একটি বালিকা ব্যাকুলভাবে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করছে,বাবা একি!এ যে রক্ত!বালিকার কাতরতায় তার বাবা অন্তরে অত্যন্ত কাতর এবং ব্যাথাতুর হলেও কৃত্রিম রাগের ভান করে প্রসঙ্গ টিকে চাপা দিতে চেষ্টা করলেন।''
এ পর্যন্ত দেখেই কবি জেগে ওঠেন এবং স্বপ্নলব্ধ গল্পের সঙ্গে ত্রিপুরার রাজা গোবিন্দমানিক্যের ইতিহাস মিশিয়ে রাজর্ষি উপন্যাসটি রচনা করেন।তারপর এই বিসর্জন নাটকটি রাজর্ষির কাহিনী অবলম্বনে রচনা করেছিলেন তিনি।
বিসর্জন অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৮:৪৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


