আমি যুদ্ধ দেখেছি।সেটা খুব একটা বড় ব্যাপার না। স্বাধীনতার এত দীর্ঘদিন পরও এমন অনেক কাওকে পাওয়া যাবে যারা যুদ্ধ দেখেছে।এখন যখন দেখি যুদ্ধঅপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে টালবাহানা হয় আর কেউ কেউ রাজনীতিও করে আমার শুধু মুখটা ভরে যায় থুতুতে।
বাদল কাকা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেলেন।তার ছোট ছোট বাচ্চাগুলো নিয়ে চাচি কি বিপদেই না পড়েছিলেন।কোথায় গেল কি হল ফিরছেনা কেন ! তারপর চতুর্দিকে যখন মৃত্যু খুব সাধারন একটা ব্যাপার।গাদা ধরে থাকা লাশের ভেতর বাদল কাকার লাল চুনির আংটিটি দেখা গেল।একটি কংকাল।
চাচা যখন বাবার সাথে আড্ডা দিতে বসতেন ,চা জলখাবার দিতে গিয়ে রক্তাভ আঙ্গুলে কতবার চুনির ঝিলিক দেখেছি।
আমি তখন স্বামীর সাথে যশোরে পুরাতন কসবায় থাকি।যুদ্ধ শুরুর আগেই আব্বা টেলিগ্রাম করলেন।রাজশাহীতে সন্তানদের নিয়ে চলে আসার জন্য।তখন ওখানে আমার স্বামীর ভাল পসার।হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করেন।বড় বড় টিন ভরে কেরোসিন,বস্তা ভরা চাল, টিন ভরা ডাল,বাড়ির সামনে টুকরো জমিতে নিজ হাতে ফলানো গাছে বেগুন,ঢেড়শ। কেন আসব বাপের বাড়ি!আব্বা হয়ত চিন্তা করছে খাবার দাবারের কষ্ট হবে ভেবে।
আমার বড় মেয়েটাকে ওর বাবা ছোট বেলা থেকেই ভাত খাওয়ার অভ্যাস করিয়েছিল।যখনই খেতে বসত দুনলা মুখে তুলে দিত।কোর্ট থেকে ফিরলেও মেয়েকে পাশে বসিয়ে নিয়ে খেত।আর ছোট মেয়েটা একদমই ছোট।ওর জন্মের নয় মাস পরেই রিকেট হয়েছিল বলে শরীর বেশ দূর্বল।আর আমার বুকেও দুধ হতনা।ছোট মেয়েটা শুধু ফিডারে গরুর অথবা কৌটোর দুধ খেত।
বাড়ি ছেড়ে পালাতে হল আমাদেরও।কখনো চিন্তাও করিনি।আমার ছোট মেয়েটা দিনের পর দিন শুকনো মাই চুষতো।এক ফোঁটা দুধ জোগাড় করতে ওর বাবা তিন মাইল হেঁটে যেত।কচুরিপানার মধ্যে নিজে ডুবে থেকে দুধের বোতল নিয়ে ফিরেছে কতদিন।
পায়খানা হতনা শুধু রক্ত বেরুত মেয়েটার।
পালিয়ে শশুর বাড়ি যাওয়ার পথে এক ঘরে আমরা বারোটি পরিবার ছিলাম।যখন যেখানে বিপদের আশঙ্কা দেখেছি হয়ত লুকিয়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে সম্পূর্ণ অপরিচিত কোনো বাড়িতে।মর্টারের শেল পড়ছে কাছেই কোথাও,মৃত্যুভয়ে কাতর আমরা ।একদিন সকালে রওনা দিলাম সার বেঁধে হাটছি প্রায় আঠাশটি পরিবার।কোথাকার কে বা কারা আর কোথায় যাচ্ছে আমরা কেউ কাউকে জিজ্ঞেস করিনি।আমরা শুধু জানি আরো গভীরে যেতে হবে।আরও নিরাপদে পালিয়ে যেতে হবে কোথাও।যে কয়টি পরিবার এক ঘরে কাটিয়েছিলাম দুইদিন,তাদের মধ্যে রাশেদ সাহেবও ছিলেন। রাশেদ সাহেবের স্ত্রীর কোলে আট মাস বয়সি পুত্র।হাঁটতে হাঁটতে কখন তার কোলের কাঁথার ফাঁক দিয়ে বাচ্চাটি পড়ে গেছে।তিনি হেঁটে পার হয়ে গেছেন কত ক্রোশ পথ,একটি বাচ্চার শরীরের উপর পা দিয়ে আমিও হয়ত চলে এসেছি এত দূর।আমি আর কখনো দেখিনি রশীদ সাহেবের স্ত্র্র্রীকে।শুধু কান্নার আওয়াজে একবার বিরক্ত হয়েছিলাম মনে আছে।আমার সন্তানের বাবা নির্বিকার মুখে শুনিয়েছিলেন ওই মহিলার কান্নার কারন।
কোনো ভাবে পৌঁছানো গেল নিরাপদ আশ্রয়টিতে।সারা পা ভর্তি ঘা।ডুব দেয়ার জন্য পুকুরে গেলে মাছেরা ঠুকরে ধরতো ঘায়ের জায়গাটিতে।চোখে প্রচন্ড জ্বালা পোড়া।অল্প ক'দিনেই বাঁ চোখটি আমার প্রায় অন্ধ,সারাদিন পানি পড়ে।ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কোনো উপায় নেই।শশুর বাড়িতে পৌঁছাতে পেরেছি।কিন্তু মিলিটারীর ভয় কোথায় না ছিল।আমি আমার জা ননদ এবং আর যে ক'জন জোয়ান মেয়ে ছিলাম আমাদের প্রত্যেকের কাছে হোমিওপ্যাথির কাঁচের বোতলে বিষ থাকতো।তখন হর হামেশায় বাড়ি থেকে জোয়ান মেয়েদের তুলে নিয়ে যেত।আমরাও বিষ নিয়ে প্রতিটা মুহূর্ত আশঙ্কায় কাটিয়েছি তিল তিল করে একেকটা দিন।অসহনীয় উদ্বেগে প্রহর।
আমার সন্তানরা এখন অনেক বড়।যুদ্ধ শেষে বাড়িতে ফিরতে পেরেছিলাম আমরা।আমার কোনো কিছু হারায়নি।বারো ভরি স্বর্ন সব সময় হাত ব্যাগেই থাকতো।তার একটুও খোয়া যায়নি।যে বাড়ি ফেলে পালিয়েছিলাম তাতে লুটপাট হয়নি।যুদ্ধের পরেও আমার আরো এক মেয়ে এবং এক ছেলের মা হই আমি।
বড় দাদা '''আমি রাসেল বলছি '' বইটা খবরের কাগজে মুড়ে সপ্তআশি সালের দিকে গোপনে আমার হাতে এনে দিয়েছিল পড়ার জন্য।জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি বালিশের নিচে রেখেই পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়তাম।খুব গোপনে ...
কাওকে বলা যাবেনা,কাওকে দেখানো যাবেনা যে এসব বই আছে আমাদের কাছে।কেউ জানলেই সর্বনাশ।স্বাধীনতা সত্যিই দেশে এসেছে তারপরও।
সেই নটা মাস আর তার স্মৃতি একটু একটু ধুলো পড়তে শুরু করেছে অবশ্য।আলতাফ চাচাকে বুদ্ধিজীবী হিসেবে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।আমার দেবর যুদ্ধে গিয়েছিল এবং যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে ঘর সংসার করছে।যদিও মর্টারের শেলে তার বাম হাতটি উড়ে যায়।
আমার নানা শান্তি কমিটির মেম্বার ছিলেন একাত্তরে।নানার আরেক ভাই এবং তার সন্তানেরা ছিলেন কট্টর আওয়ামী পন্থি।যুদ্ধ শেষে যখন রাজাকার আলবদর দের ধরে নিয়ে যাচ্ছিল মুক্তিযোদ্ধারা তখনো আমার নানার কোনো ক্ষতি হয়নি।এমন কি যুদ্ধের সময় আমার এক বোন যখন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া এক দল যাত্রীর সাথে মিশে গিয়ে হারিয়ে যাচ্ছিল।পরিচিত একলোক তাকে ধমক দিয়ে ফিরিয়ে আনে বাড়িতে।
এই যে আমি এখন শেষ বয়সে এসে লিখছি আমার স্মৃতিকাতরতার সঙ্গী করতে এই লেখাগুলোকে।আমি জানি কেউ হয়ত আমার মৃত্যুর পর আমার ব্যাক্তিগত সম্পত্তির খোঁজ করতে গিয়ে ডায়রিটি পেয়ে যেতেও পারে।এখানেই আমি লুকিয়ে রেখেছি দীর্ঘ চৌষট্টি বছরের কয়েকটি মুহূর্ত।কিছুটা ভুলে গেছি।কিছুটা বাড়িয়ে বলেছি হয়ত।কিন্তু এতো সত্যি যে আমি সেই দিনগুলো দেখার পরও এত দীর্ঘদিন পৃথিবীকে উপভোগ করছি।এর চেয়ে সৌভাগ্য আর কি থাকতে পারে ! কোনো প্রতিদান ছাড়ায় রক্তের দাগে কালি ঝুলি মাখিয়ে এখনো রসিয়ে রসিয়ে দিনযাপন করছি আমি এবং আমরা।
আমার আসলে কিছু বলার নেই।আমি শুধু বলছি আমি যুদ্ধ দেখেছি।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ৮:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


