
ছোটবেলা থেকেই গান গাওয়া মানুষদের আমার অন্য জগতের মনে হয়। কি সুন্দর মিষ্টি করে একেকটা লাইন গায়।

বড় আপুর একটা গানের খাতা ছিল। সূর্যদয়ে তুমি সূর্যাস্তেও তুমি... তারপর এসো হে বৈশাখ,এই পদ্মা এই মেঘনা এমন সব গান। আর একটা গান আমার মনে পড়ছেনা শুধু মনে পড়ছে '' আয় তবে সহচরী হাতে হাতে ধরি ধরি , নাচিবে গিরি গিরি গাহিবে গান। গানের শুরু কি এটাই কিনা কে জানে।

তবে আমার ভাল লাগতো। কিন্তু আমাদের বাসায় কোনো হারমোনিয়াম ছিলনা।

কলেজের ফাংশানে গাইত আপু। দলীয় সংগীত। তাই হয়ত কলেজেই রিহার্সাল করতো। আমি তাকে চুপি চুপি গুনগুন করে গান গাইতে শুনেছি, কখনোই গলা ছেড়ে নয়। আলমগীর স্যার মুখ ভর্তি পান নিয়ে হারমোনিয়াম বাজাতেন। পানের রস গড়িয়ে পড়তো ঠোঁটের পাশ দিয়ে। নিচের ঠোঁট শক্ত করে চেপে তিনি আধা করে বলতেন,হুম হুম এবার গাও..।
ছোটভাই একটু বড় হলে তাকে গান শেখানোর চেষ্টার অংশবিশেষ হিসেবে স্কুলে দেয়া হল। প্রথম দিনই স্যার বললেন তার গলায় সুর আছে,শুধু পরিশ্রম করতে হবে।

পরেরদিন গানের খাতা না নিয়ে যাওয়ায় স্যার খুব কঠিন করে বলেছে।

ভাইয়া শিস দিতে দিতে বলল গান শিখতে আমার বয়ে গেছে। আধাঘন্টা ধরে শুধু সা বলায়। তার চেয়ে আমার ক্রিকেট ভাল। আমি ও খুব মাথা ঝাকালাম,যেন সব বুঝেছি।
আমার গানের গলা যে ভাল না সেটা আর না বলি।

তারপরও আম্মুর ইচ্ছায় আমাকেও গানের স্কুলে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু স্যার ছাত্রী হিসেবে আমাকে মোটেও পছন্দ করলেননা।

মোটামুটি ধমকের উপরেই রাখতেন। আম্মুকে বললাম আমাকে দিয়ে হবেনা।

স্কুলে দলীয় সংগীতের রিহার্সাল চলছে। এই মেয়ে তুমি আস্তে গাও,তোমার গলা কানে বাজে।

দুচোখ ফেটে জল আসছে।

তার একটু পর বললাম,স্যার বাইরে যাবো। তারপর একছুটে ক্লাসরুমে। একটু পর স্যার আরেক মেয়েকে দিয়ে ডেকে পাঠালেন। আমি যাইনি।
গানের প্রতি আগ্রহ কখনোই কমেনি। গুনগুন করে গান গাওয়ার সময় ভাবতাম সামনে কেউ আছে। আর খুব আগ্রহ নিয়ে শুনছে আমাকে। খুব আবেগ দিয়ে গাইছি, জীবনানন্দের কবিতার উপমায় একটু মিথ্যে নেই,পৃথিবীকে তোমারই জন্যে ছাড়তে কোনো আপত্তি নেই।তোমাকে ছাড়া যে বাঁচবোনা,এর চেয়ে বড় কোন সত্যি নেই...
প্রাইমারী তে পড়ার সময় শামসুল নামে আমাদের এক বন্ধু ছিল। তিনকোনা মুখ আর মুখের বেশ কয়েক জায়গা সাদা আঁচিল। পাতলা প্যাকাটি। গান গাইত চমৎকার।

আমরা ক্লাস শেষ হলেই তাকে দিয়ে আসর বসাতাম। সে ছিল আমাদের মানে মেয়ে বন্ধুদের বাধ্যগত।

তাকে অন্য ছেলেরা ডাকলেও যেতনা। এই নে এইবার গান শুরু কর!

অমনি শুরু করত। আমরাও তালি দিয়ে মহা উৎসবে মেতে যেতাম। সে দুলে দুলে গাইত,'' শুধু গান গেয়েই পরিচয়। চলার পথে ক্ষনিক দেখা একি শুধু অভিনয়..।''
বেশ কদিন এ গান শোনার পর বিরক্ত হয়ে বললাম, তুই নতুন গান যদি না শিখতে পারিস তোকে আর আমাদের সাথে ঘুরতে হবেনা।

রোজ এই এক গান কত আর শোনা যায়। বুড়ি ছোয়া কি গোল্লাছুট সে আছেই আমাদের সাথে!
তখন ক্লাস সেভেনে, খোজ পাওয়া গেল সিক্সের এক মেয়ে অনেক সুন্দর গান করে।

এবার ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে তারে ডেকে আমাদের আসর। মেয়েটি যোতিন্দ্রমোহনের কবিতাটি বাঁশবাগানের মাথার উপর চাঁদ উঠেছে ওই এত সুন্দর করে গাইত। প্রথম দিন শোনার পর আমরা সবাই কাঁদছিলাম।

এত বিষন্নতা এত বিষাদ ছিল তার কন্ঠে!
নাইন টেনে ওঠার পর আরেক মেয়েকে পাওয়া গেল ভাল গান করে! তখন আমরা বেশ বিরহে আছি।

আমাদের ক্লাসের বন্যা যে কিনা গান শোনাতো যখন তখন, তার বাবা বদলি হয়ে গেল।

সেই মেয়েকে পেয়ে আমাদের আনন্দ আর ধরেনা। কদিন পর পর তাকে ডেকে পাঠাতাম।এত সুন্দর করে সে গাইতো!'' আমারো পরানো যাহা চায়,তুমি তাই তুমি তাই গো...''
আর বড় আপু ছিল রিপা,বর্ষা । চমৎকার গাইত। রিপা আপুর দামাদাম মাস্ত ক্যালেন্ডার তো যে কোনো ফাংশানের জন্য বিখ্যাত।
গান গান গান! গান নিয়ে কত কথা হয়ে গেল। একেক সময় একেক গানের ভক্ত হয়ে যাই। সবাই হয়। কদিন আরেফিন রুমির গান শুনতে ভীষন ভাল লাগছিল। :#> এখন শুনছি ''সোনা দিয়া বান্ধাইয়াছি ঘর, ও মনরে ঘুনে করল জরোজর। আমি কি করে বাস করিব এই ঘরে রে, তুই সে আমার মন। মন তোরে পারলাম না বুঝাইতে....'' মারফতি টাইপের গান। বাঙলা ব্যান্ডের সম্ভবত! :-<
কে কোন গানটা ইদানীং শুনছেন বলুন তো!
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই নভেম্বর, ২০১১ দুপুর ১:১৯