
একেকটা রাতে ডিউটি পড়লে বেরিয়ে পড়ি কাঁধে মোমের ঝোলাটা চাপিয়ে।
আমি তখন দিব্যি উড়তে পারি। সুতীব্র বেদনা যদিওবা টনিকের মত। একেকটা রাতে খুব কাজে দেয়। ইচ্ছে হলেই বেরিয়ে পড়ি। উড়ে ঘুরে বেড়িয়ে আসি, পালকের মদ ছড়িয়ে আসি। নেশায় হেলে পড়ে ঘাড় মরদের। সে দিন সে রাতে মন খারাপের ছাতাটা না ফুটিয়ে ঝোলার ভেতর পুরে রাখলাম । ইচ্ছে ছিল শহরের পরিচিত কিছু অনুভূতিকে কাছ থেকে নেড়ে চেড়ে দেখার। বহুদিন হল আস্বাদনের ক্ষমতা আমি হারিয়ে ফেলেছি। তখন আমার ধারাবাহিকতা ধরা আর গৎবাঁধা উৎসবের। উড়তে উড়তে কখন এক মফস্বলে ঢুকে পড়েছি, টের পাইনি। এখনো রাস্তা গুলোতে পোড়া মাটির আস্তর বিছানোর কাজ শেষ হয়নি। লাল মাটির ধুলো তাই রাতের আঁধারকে ঝাপসা করে দেয়। তখনো চোখ আমার দিব্যি দেখে, সাহস করে রাত আমার চোখের আলো নিতে পারেনা। নিয়ম নেই। দুয়েকটি রিকশার মত খোলা যান এগিয়ে চলেছে, কিছু লাশ তার যাত্রীর মত। টুং টুং নীলাম্বরে জোছনা কেটে কেটে ছড়িয়ে পড়ে দিগন্তে। রাস্তার দু ধারে খাদ। লাশের উপর লাশ । লম্বা- বেঁটে- খাটো- উথাল- পাথাল- জড়ানো- ছড়ানো। কাগজের ঝি ঝি ডেকে চলেছে অনবরত। একেকটা ফানুস উড়ে উড়ে চলে যেন পরিচিত মেজবান।
দূর্গন্ধে নাক মুখ উল্টে আসে হয়ত। বেঁচে থাকা মানুষের গায়ে ঘামের গন্ধ থাকে, মরে যাওয়া মানুষের গায়ে আগরের গন্ধ। পচে যাওয়া লাশের গায়ে গন্ধ থাকবে স্বাভাবিক। আমি গন্ধ পাইনা। বহুদিন ধরে এসব অনুভবের বেলুন আমার মুখবন্ধ। অথচ অভ্যেশবশত নাক চেপে ধরি। মুখ কুঁচকে বিরক্ত হই। এক হাতে নাক চেপে ধরায় ওড়ার গতি বাধাপ্রাপ্ত হয়। একটা হাত যখন নাক ধরতে ব্যস্ত বলাবাহুল্য কষ্ট হতে থাকে। এ কষ্টটা উচ্চতায় উঠতে না পারার কষ্ট। দু একটা যন্ত্রচালিত আধামনবের ঘোরাফেরায় আমি তো বাধা সৃষ্টির কারন হতে পারিনা। বিষন্ন এক দালানের ছাদ তাই বেছে নিই ইচ্ছে করেই।
ফুলে ফেঁপে ক্লান্ত দেয়ালের মাথার উপর যেন কেউ চাপিয়ে দিয়েছে হাজার কাজের বোঝা। নিচের দিকে তাকিয়ে মাথা ঘোরেনা তবু মাথা ঝাঁকিয়ে আমি অনুভূতিটা নেয়ার চেষ্টা করি কয়েকবার। ছাই রঙের পৃথিবীর মাটি পায়ে মেখে আছে অরন্য। পাতায় পোকাদের বসতির জন্য ছেড়ে দিয়েছে নির্দিষ্ট স্থান। দুর্বোধ্য এক ফুলের গন্ধ জননীর স্যাঁৎসেঁতে জঠরের মত। ঝিমঝিম করা সুগন্ধও হতে পারে। কি জানি! গন্ধ আমি অনেকদিন নিতে পারিনা।
বুক উঁচিয়ে গভীর একটা শ্বাস নিই। তারপর অভ্যাসে পড়ে চোখ মুখে আনন্দের দীপ্তি ফুটিয়ে তুলি। গোল চত্তরে পরচর্চায় অভ্যস্ত কয়েক রমনীকে দেখে আমার দারুন আনন্দ হয়। মনে হয় সব স্বাভাবিক তবে। পাশের খড়ের কোঠার তলে এক উনুনে চিড়চিড় করে ফুটতে থাকে কড়াই এর তেল। গভীর রাতে যখন সমস্ত পুরুষ অকাজ শেষ করে ফিরবে, পিঠায় দাঁত ডুবিয়ে সমস্ত ক্লেদ ভুলে যাবে। মাঝে মাঝে দু একটা আঙ্গুলে কামড় পড়লে ঠোঁট বেয়ে রক্তের ধারা গড়াবে। নোনতা পানীয়ের কাজ করবে ওসব।
পেট মোটা মুরগী গুলো গম্ভীর হয়ে উঠোনে ঘোরাফেরা করছে। যেন সমস্ত চিন্তার ভার তুলে দেয়া হয়েছে টোপরের নিচে ছোট্ট মগজটায়। জিবে পানি এসে যায় এক মুহূর্তে। বহুদিন আগে একবার মুরগীর মগজ ভাজি যে তারিয়ে তারিয়ে খেয়েছিলাম মনে পড়ে যায় আমার। পুরুষের খাবারে প্রতিদিন আমিষ প্রয়োজন। নিত্য বীর্য ঝরানোর সুখের মত। আর কিছুক্ষন বসে বসে ঝিমুতে থাকি ছাদের কোনায় এসে আরেকটু বিনোদনের আশায়। মনে হতে থাকে আনন্দময় কিছু ঘটলেও ঘটতে পারে। আনন্দের অনুভূতি মরে গেছে তবু অভ্যাস! পুরুষগুলোর অপেক্ষা থাকে আমার। জানি ফিরলেই রমনীরা ব্যস্ত হয়ে পড়বে।
গুনগুন বন্ধ হয়ে গেছে। ফিরছে। ওরা ফিরছে। মুরগির পায়চারী থেমে গেছে। উত্তরে জ্বেলে রাখা আগুনে নিজে থেকে গিঁয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে হোমরা চোমরা মুরগী ব্যক্তিত্বটি। পটপট করে পালক পুড়তে থাকলে অভ্যাসবশত নাক চেপে ধরে থাকি কিছুক্ষন। হ্যা যা ভেবেছিলাম তাই। নারীরা তাদের নিজস্ব পুরুষের খাবার সার্ভ করে। ব্লাউজের বোতাম খুলে ধবল পানীয় আর পোড়া কাবাবের ডিশ! মুহূর্তে ক্লান্তি দূর হয়ে যায় ওদের। ওরা মেতে ওঠে ভোরকালীন আড্ডায়।
ন্যাড়া মাথার সূর্যটা রোজ এ সময়েই ওঠে। একটুও সময়ের গন্ডগোল সহ্য হবেনা প্রকৃতির। শত শত হাত রশ্মির মত ছড়িয়ে পড়ে প্রথমে। আগুনের প্রথম আঁচ। পাখিদের ঘুম ভাংতে শুরু করে। আমি শরীর টাকে টেনে টেনে এগুতে থাকি। আজকের মত ভ্রমন শেষ করে রিপোর্ট জমা দিতে হবে আমার!
অ:ট: এরকম অন্য জগতের অনুভূতি নিয়ে লেখাগুলোর একচ্ছত্র সম্রাট হাসান মাহবুব। লিখতে গিয়ে বারবার ওনাকে স্মরন করেছি। ঠারে ঠারে টের পেয়েছি এসব আমার কর্ম না।
ছেঁড়েঁ দেঁ মাঁ কেঁদেঁ বাঁচিঁ অবঁস্থা!!
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই নভেম্বর, ২০১১ সকাল ১০:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


