
-কি! ফোন ধরনা কেন?
-আর বলোনা ফোন সাইলেন্ট ছিল।
-খেয়েছো?
- না রেডি করছিলাম। এখন খেতে বসব।
-আচ্ছা যাও খেয়ে নাও। সুখবরটা এখন দিব? নাকি খাওয়ার পরে শুনবা?
-কি খবর? এখনি দাও।
-হু! ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়ার সব ঠিক ঠাক। কাল রাতের টিকিট কাটবে সোহান। হোটেল ম্যানেজ করার দ্বায়িত্ব পেয়েছে নয়ন।
বুকের ভেতর ধ্বক করে ওঠে আলোর। সারাদিন এখন তার পাগলের মত কাজ। দুপুরের খাওয়া শেষ হলে বাধ্য মেয়ের মত ঘুমুতে হবে। রাতে ডিউটি আছে। ইন্টার্নী যে করে সেই বোঝে এর কষ্ট। শুভ কে বলে লাভ নেই। বন্ধু বান্ধব আড্ডা আনন্দ এই সব তার সময় কাটানোর অস্ত্র।
শুক্র শনি ছুটির সাথে বাড়তি একদিন বন্ধ থাকায় বন্ধুরা মিলে দ্বীপে যাচ্ছে ওরা। প্রায়ই এমন ট্যুর প্ল্যান করে। এই তো কদিন আগে পুরোনো অফিসের কলিগরা মিলে রাজকান্দির ঝরনা দেখে আসলো। এখনো ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুলে মরা নখ নিয়ে ঘুরছে। পাথরে লেগেছিল।
আলো জানে কোনো আপত্তি তার ধোপে টিকবেনা। শুধু ধীরে শ্বাস নিয়ে বলে শুভ আমার অস্থির লাগছে।
-আরে তিনটা বাজে নাও নাও খেতে বসো। আমি ফোন রাখছি। খেয়ে লক্ষী মেয়ের মত ঘুমাবে। কয়টায় উঠবে বলো আমি জাগিয়ে দেব।
-না ।
-কি না? বোকা মেয়ে কিসের ভয় এত?
-শুভ!
-উম? যান খেতে বসেন। রাখছি।
ভেতর ছটফট করছে শুভর। কখনো তো এমন হয়না। ব্যাগ গুছাতে গিয়ে কেমন যেন পিপাসা পেতে থাকে। পানির বোতলটা হাতের কাছে নিয়ে বসে থাকে। মুখে ঢালা হয়না। কাল সারাদিন অনেক কাজ। দুটো স্পোর্টস ট্রাউজার নিতে হবে। থ্রি কোয়ার্টার। ম্যাগি হাতা গেঞ্জি নিতে হবে। কেডসটা পুরোনো হয়ে গেছে। এপেক্স থেকে একটা স্নিপার নিলেই হবে। ওহ রেজার লাগবেতো। ভাবতেই বাম হাত টা বুলিয়ে দেখে গালে।
থাকুক! যাবার আগে শেভ করে নিলেই হবে। রবিন কে গিটার টা নেবার কথা স্মরন করিয়ে দিতে হবে। দারুন সময় পাওয়া গেছে। আর দুরাত পরেই পূর্নিমা। সমুদ্রের জলে ফিনিক ফোটা জোছনা দেখা হবে এর চেয়ে থ্রিল আর কিছুতে কাজ করছেনা।
মাথায় একটা লাইন ওড়াওড়ি করছে। ঠিক ধরা দিতে চাচ্ছেনা।
বড় পাখি তোমাকে আর না দেখি ততদিন
তুমি অবেলার নীল!
তুমি কুসুম সমুদ্র!
না ভাল লাগছেনা।এভাবে হয়না। দেখা করার সুযোগ নেই। রাতে ডিউটি। এখন ঘুম থেকে ওঠানো যাবেনা। কাল একবার জিনিসপত্র কিনে ফেরার পথে দেখা করার একটা চান্স নিতে হবে। সারাদিন ডিউটি আছে অবশ্য। তবু গেটের কাছে দাঁড়ালে কি একবার বের হতে পারবেনা! এত হুট করে সব ঠিক হয়ে গেল। সোহানের একটা বিল আটকে ছিল। আজ পেয়েই সাথে সাথে কনফার্ম করলো। দোস্ত রেডি হইতে থাক।আমি টিকিট কনফার্ম করে ফেলতেছি। বিবাহ একবার করে ফেললে আর ট্যুর দিয়া মজা পাবনা। আম্মা যে লাগছে পেছনে। মাইয়া বড়লোকের। সাদা চামড়া। কেমনে আম্মারে বোঝাই আমার খালি বিল আটকায়া যায়। বৌ ল্যাদানী দিলে কার কাছে হাত পাতুম! খিকখিক। শুভ ও হেসে ফেলেছিল। তোর ফাজলামি কমবেনা।
-ওঠো কটা বাজে দেখেছো?
- উমম! হু! উঠছি। আর পাঁচ মিনিট।
-না সোনামনি। একদম সময় নেই। উঠে মুখ হাত ধুয়ে নাও। ফ্রেশ লাগবে। সময় নেই আলোমনি। ওঠো।
-হু। তোমার গোছানো কমপ্লিট?
-এইতো। কাল টুকিটাকি কিছু কেনাকাটা আছে। ওঠো। রবিন আসবে। প্ল্যান জমাট করতে। রাখছি হু?
শুভ সমুদ্র থেকে আর ফেরেনি। একদিন আলো তূর্ণা নিশিথার একটা টিকিট কেটে ট্রেনে উঠে বসে। এখন তার একলা একায় ঘুম ভেঙে যায়।
সমুদ্রের উপর কোনো অভিমান সেই আলোর। শুভ তার প্রিয় মানুষ। আছে প্রিয় সমুদ্রের কাছে। নাকি এ যাত্রা তার অভিমানের কাছেই। কে জানে!
***
তখন মন ভাল ছিলনা। আলোকে ইচ্ছে করে কষ্ট দিতে মন চাইল। মনে হল। দেখো প্রিয় মানুষ হারানোর কষ্ট কেমন! আমাদের কাছে প্রিয় মানুষ কে ধরে রাখার মত ক্ষমতা থাকেনা। কিন্তু এতো ঠিক। শূণ্যস্থান পূরণ হয়ে যায়। শুভ নিশিদিন হৃদয়ের গভীরে থাকে। তবু আলোর জীবন টাতে আলো এনে দেয় অন্য কেউ অন্য কিছু।
আমি আলোর জন্য মন খারাপ করে ঘুরি। আমার খাওয়ার রুচি নেই। হাত দিয়ে ভাতগুলোকে নাড়াচাড়া করি। তারপর উঠে পড়ি। আমি রাস্তায় চলতে চলতে শুভর চলে যাবার কথা ভাবি। মনে হয় আলোর সাথে দেখা হলে কি বলে সান্তনা দেব। উপশহরের সেই ছেলেটা গেল! আর এলোনা বলে তো তোমার জীবন থেমে থাকতে পারেনা। তুমি তাকে মনের ভেতর রাখো। তুমি তার জন্য কষ্ট পাও কিন্তু তাই বলে থেমে যেওনা। আরও কত কি ভাবি।
একদিন দু হাতে দুটো আইসক্রিম নিয়ে আমি আলোর মেসে ছোট্ট রুমটাতে যাই। আলো আমাকে জড়িয়ে ধরে। চকলেট ফ্লেভারের আইসক্রিমটার জড়ানো কাগজ খুলতে খুলতে আলো আমাকে তার একটা ক্লিনিকে পার্ট টাইম জব হওয়ার কথা জানায়। আমি তার চোখে মুখে উজ্জলতা দেখি। আমার খুব ভাল লাগতে থাকে। আলো হাত পা নেড়ে চোখ ঘুরিয়ে ঠিক ছেলেবেলার মত গল্প করতে থাকে। কোথাও বেড়াতে গেলে ফিরে এসে সে এভাবেই গল্প করত। যেন যা ঘটে জীবনে সব কিছু থেকেই সে আনন্দ খুঁজে নিতে পারে।
আমার ভেতরে দারুন আনন্দ। সান্তনা দেবার জন্য যে কথা গুলো দিনের পর দিন রিহার্সাল দিয়েছি, আলো কাঁদলে কি করে বুকে জড়িয়ে নেব ভেবেছি, সব কথা কে আমি চুলোয় ছুঁড়ে আগুন জ্বালিয়ে দিলাম।
তারপর মিশে গেলাম তার গল্পের সাথে।
জীবন চলতে থাকে। আলোর যাত্রা তাই থামেনা আর। আমি ফিরে আসি আলোর অনাগত ভবিষ্যত কে ভাবতে ভাবতে।। আনন্দময় হোক আলোর ভুবন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

