ফুলে বুঝি ভালবাসা থাকে! ফুল বুঝি চকমকি মেঘের আরেক নাম?
নাফিসের সাথে যতবার দেখা হয়েছে ঠিক ততবার ই কোন না কোন ঘটনা ঘটেছে। যেমন শেষবার পানির ট্যাঙ্কির কাছটাতে দেখা হল সাদিয়ার। হুট করে স্যন্ডেলের পাতলা স্ট্রিপ খুলে গেল। নাফিস ছিলো রিকশায়। সাদিয়াকে দেখেই নেমে এসে রিকশা ছেড়ে দিলো। বিশাল ক্যাম্পাস। সাদিয়ার ডিপার্টমেন্টে যেতে মিনিমাম পনেরো মিনিটের হাঁটা পথ। হাতে একদম সময় নেই। স্যান্ডেল টা ছেঁড়া জরুরী ছিল? আরে বাবা রিকশাটা না ছেড়ে তো সাদিয়াকেই রিকশায় উঠার কথা বলতে পারতো। স্যন্ডেলটা ছেঁড়াতে এত মেজাজ খারাপ হচ্ছিল সাদিয়ার। দেড়শো টাকার স্যান্ডেল গুলোর এরকমই অবস্থা হয়। কখন কোথায় ছিঁড়তে হবে মান ইজ্জতের কোন চিন্তা যেন মাথায় নাই। ধুর স্যান্ডেলের আবার মাথা!
কি যে সব ভাবছে সাদিয়া!
ভাগ্যিস বইয়ের দোকানগুলোর পাশেই মুচিটা বসে ছিল। অন্যদিন সাদিয়া খেয়াল করেই দেখেনি এখানে মুচি বসে। ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে সাদিয়াকে আসতে দেখে নিশ্চয় ঐ মুচি ব্যাটা মুচকি মুচকি হাসছিলো! এইরকম ই হয়। সবসময় সাদিয়ার সাথেই এমন হয়। তার কান্না এসে যাচ্ছে। কেন নাফিস যখন থাকে তখন ই তার স্যান্ডেলের ফিতা খুলতে হবে। সুন্দর কিছু হতে পারেনা। চারপাশে প্রজাপতি উড়বে। বাতাসে ফুলের ফ্রেগরেন্স ভাসবে। সূর্য মেঘে ঢেকে যাবে মানে রোদ নাই হয়ে যাবে। তা নয়! নির্ঘাত এই গরমে সাদিয়ার চোখের কাজল থ্যাবড়া খেয়ে ছড়িয়ে গেছে। কি লজ্জা কি লজ্জা! আজকের ক্লাসটা মিস দিলে কেমন হয়?
নাফিসটা কেমন অদ্ভুত করে যে তাকায়। চোখের চশমাটা আঙ্গুল দিয়ে ভেতরে ঠেলে দিয়ে সাদিয়াকে বললো এক কাপ চা খাবেন আমার সাথে?
মুচিকে স্যান্ডেল ঠিক করতে দিয়ে সাদিয়া খালি পায়েই এগিয়ে গেল। সবুজ ঘাসের উপর হাঁটতে ভাল ই লাগছে। খলিল মামার টং এ ঢুকতেই কোনার দিকে একটা বাঁশের বেঞ্চ খালি পাওয়া গেল। মামা মুচকি হাসলো।
-মামা রং চা খাইবেন নাকি মালাই চা?
সাদিয়া তাকালো নাফিসের দিকে। তারপর মাথা দুলিয়ে বললো একটা রং চা,একটা দুধ চা,একটা মালাই চা! মামা আমারে তিনকাপ চা দিবেন। নাফিস আপনি কি চা খাবেন জলদি মামারে বলেন?
নাফিস অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। নাহ টং এর বেঞ্চটায় বসে খালি পা দোলাতে তো বেশ লাগে! নাফিসের অবাক দৃষ্টি গায়ে মেখে থাকতে সাদিয়ার কি যে ভাল লাগছে! সে ঠিক করে ফেললো। যতদিন এ ক্যাম্পাসে আছে রোজ তিনকাপ করেই চা খাবে। একেকবারেই তিনকাপ। যদি নাফিস সারাদিনে দু বার চা খাবার অফার করে,যদি তিনবার অফার করে কিছুতেই তিনকাপের হেরফের হবেনা। কিছুতেই না। না হোক সে রাতে ঘুম।
দরকার হলে রুমমেট তিন্নীকে জোর করে জাগিয়ে রাখবে। কানের কাছে ক্যাক ক্যাক করবে ঘুমানোর জন্য। করুক। মটুটা দিনদিন মটুই হচ্ছে তাও ঘুম কমায় না। গত রাতেই তো। সাদিয়ার খুব ভয় করছিলো। প্র্যাকটিক্যাল খাতা রেডি করছে এরকম সময় মনে হল জানালার পাশে যেন কার ঘন নিঃশ্বাস। হলের দোতলায় মানুষ ওঠার অবস্থা নাই। এখানকার একেক তলা দোতলার সমান। মানে সাদিয়ার দোতলার এই রুমের উচ্চতা অবশ্যই চারতলার মত হবে। যুক্তি যত যাই বলুক তার তো ঠিকই ভয় করছিলো। আর তিন্নী? ভোঁস ভোঁস করে ঘুমাচ্ছে আর ঘুমাচ্ছে। কি যে অসহ্য লাগছিলো সাদিয়ার!
নাফিস আপনার দেশের বাড়ি কোথায়? নাহ এটা কোন প্রশ্ন হল? নাফিসের দেশের বাড়ি ময়মনসিংহ। এটাতো সে জানেই।তাহলে কি কথা বলা যায়?
-উম খলিল মামা চা টা খুব বেশি ভাল বানায় তাইনা?
স্যান্ডেল ঠিক হয়ে গেছে। পায়ে গলাতে গলাতে সাদিয়া আপনমনে বলে,
কাঁধে হাত রেখে ফিসফিস করে বলো
তোমার প্রেমের কথা তোমার যন্ত্রনা,
তুমি ভালবাসো আমাকেই যেন ভালবাসো তাই সান্তনা!
-আমাকে কিছু বলছেন?
-হ্যা বলছি। বলছি যে অনেক আগে একবার সিঁড়ির কাছে একটা ছেলে আমাকে জোর করে চেপে ধরেছিলো। কি করেছিলো বলবোনা। আপনি বুঝে নিন। সেই ছেলেটার নাম ছিল নাফিস। আপনার নামও নাফিস!
নাফিস থতমত খেয়ে যায়। কি বলবে বুঝে উঠতে পারেনা। সেই নাফিসের জন্য কি তার স্যরি বলা উচিত? এই মেয়েটা এমন পাগল কেন! নাফিসের খুব মন খারাপ হতে থাকে। যেন সেই ছেলেটার সমস্ত অপরাধ তাকে লজ্জায় নুইয়ে দিতে থাকে মাটিতে। বহুদিন আগে ঘটে যাওয়া সে ঘটনার জন্য যদি মাধবীলতার মত মেয়েটি তাকে কোনদিন বন্ধু হিসেবেও কাছে আসতে না দেয়। কষ্টের ব্যাপার হবে। খুব কষ্টের ব্যাপার হবে। নাফিস গত তিনরাত টানা এই মেয়েটাকে স্বপ্নে দেখেছে। এটা এত অস্বাভাবিক! সে নিজেই বিশ্বাস করতে পারেনা। তার কাছে মনে হয় সে জেগে জেগে কল্পনা করেছে বোধহয়। হালকা তন্দ্রার মত ছিলো আর হয়ত ভেবেছে স্বপ্ন! আজকের ক্লাসটা জরুরী ছিল বলেই তাড়াহুড়ো করে রিকশা নিয়ে ছুটে এসেছে।সারারাত ঘুম হয়না। সকালের দিকে চোখ লেগে আসে। ঘুম ভাঙতে চায়না। অথচ মাঝপথে সাদিয়াকে দেখে সব এলোমেলো হয়ে গেলো। রিকশা ছেড়ে তার হঠাৎ মনে হল চা খাওয়া দরকার। ভীষণ দরকার। সব চে বেশি দরকার এই মেয়েটাকে।
নাফিস? আমাকে তুমি বলবেন? সাদিয়া সাদিয়া সাদিয়া আরেকটু প্র্যাকটিকাল হও। এভাবে যদি কোন ছেলেকে তুমি বলতে বলো সে তোমার ঘাড়ে চেপে বসবে। তুমি ক্লাসনোটের সুবিধা পাবে তা ঠিক কিন্তু তোমার বিকেলের ঘোরা, বন্ধু বান্ধব সব নিয়ন্ত্রিত হয়ে যাবে। তোমার ফোন সবসময় বিজি পাবে তোমার কাছের মানুষজন। তুমি কি পরবে। কি খাবে সব সেই ছেলের ইচ্ছের হাতে চলে যাবে। সাদিয়া আরেকটু বুঝে শুনে পা ফেলো প্লিজ!
-হাসছেন যে?
-হু হাসছি। আমার রাজহাঁস অনেক ভাল লাগেতো। তাই!
কি কথার কি উত্তর! নাফিসের মাথা আরো এলোমেলো হয়ে যেতে থাকে। বোটলগ্রাসে ঝুমকোর মত লাল ফুল এসেছে। বায়োলজি ডিপার্টমেন্টের পাশ দিয়ে যাবার সময় আলতো করে একটা ঝুমকো ফুল ছিঁড়ে নিলো নাফিস।
-আচ্ছা শুনুন, আমার কাজল কি লেপ্টে গেছে? ওমা! ফুল ছিঁড়লেন কেন? ফুল ছিঁড়লে কি হয় জানেন?
নাফিস আমতা আমতা করে বললো কি হয়?
-কি আবার হবে। যা হবার তাতো এতক্ষনে হয়েই গেছে। গাছের একটা ফুল কমে যায়। দিন আমার হাতে দিয়ে দিন।
সেদিন ফিরে এসে সাদিয়া ফুলটাকে গোপন কাপড়ের মত বইয়ের ভাঁজে রাখলো। পাতা খুলে কতবার যে দেখলো। তারপর গভীর রাতে সে খাতা খুলে এই লাইনটা লিখেছিলো-
আমাদের ভুলগুলো এতদিনে বোটলগ্রাসের মাথায় এসে নেমেছে। গাছটি হয়েছে ঋতুবতী। আর সব ঘাস মেঘ বিদ্যুতের তারে বসা কাক আমাদের ভুল গুলো জেনেছে!
..........
পৃথিবীর সব গল্পের শুরুটা এরকম মিষ্টি হলেও হতে পারতো। হয়ত হয় ও। অথচ একটা সময় কখন যে বিরহ আসে! তখন সাদিয়া নিজেই হয়ত খাতা খুলে কাঁদতে কাঁদতে লেখে-
কেন তার হাতে পাখিদের সুখ কেন তার বুকে ঠান্ডা একটা হাত
কেন সেই হাত আগুন হলোনা তুহিনের মত ঝরে গেলো সারারাত!
অথবা বিরহ আসেইনা! শুধু সুখ আর অনন্ত সুখ!
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা সেপ্টেম্বর, ২০১২ সন্ধ্যা ৬:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



