somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মহানবী সা: এবং আমরা মুসলমানেরা

০৪ ঠা জুলাই, ২০০৮ দুপুর ১২:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রায়শ: আমরা নিজেদেরকে মুসলমান বলে দাবী করলেও আমাদের চরিত্রে তার প্রতিফলন ঘটে খুব সামান্যই।

আমরা যদি নবীজি সা: এর শিক্ষা অনুসরন করতাম তাহলে মুসলমানদের সুন্দর চেহারাটি সবার সামনে সমুজ্জল থাকত। তাই নবীজি সা: চারিত্রিক বৈশিষ্টের কিছু দিক তুলে ধরা হল যাতে করে তাকে অনুসরন করে আমরা যাতে পরিশুদ্ধ চরিত্রের দিকে ধাবিত হতে পারি।

মহানবী সা: পৃথিবীর উদারতম মানুষ ছিলেন।
তিনি তার সমগ্র জীবনে তার কাছে সাহায্য চাইতে আসা কাউকে কখনো না বলেননি। ধারকর্য্য করে হলেও সাহায্যপ্রার্থীকে সাহায্য করেছেন। তিনি এতই উদার ছিলেন যে তার জন্য বাড়তি কিছুই থাকত না। একদা তিনি বলেছিলেন, বিশ্বাসীরা সহজ সরল এবং উদার। আরেকবার বলেছিলেন, যে পেট পুরে খায় আর তার প্রতিবেশি অনাহারে থাকে সে বিস্বাসীদের অনর্ভুক্ত নয়। অথচ পাশেই দরিদ্র শিশুটিকে অনাহারী রেখে বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদি পালন কিংবা ভুরিভোজনের আয়োজনে আমরা অর্থ এবং খাদ্যসামগ্রীর অপচয় ঘটাই অহরহই। আজকাল হুজুর মওলানাদের চেহারায় তেল চিকচিকে হয় বেশি, অধিকহারে আমিষ গ্রহনের ফলস্বরূপ হয়ত।

হযরত মুহাম্মদ সা: যেমন দয়ালু তেমনি বিনয়ী ছিলেন।
তার চরম শত্রুরা যারা তাকে ঢিল ছুড়ে রক্তাক্ত করেছে, যারা তার রক্ত পানে তৃষ্নার্ত ছিল সবসময় তিনি তাদেরকে দয়া প্রদর্শন করেছেন। নবীজি সা: তার চরমতম শত্রুকেও ক্ষমা করে দিয়েছেন, ব্যাক্তি প্রতিশোধ নেওয়ার চিন্তা করেননি কখনো। কুরাইশরা তাকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে, তাকে আঘাত করেছে, অপদস্থ করার কিছুই বাকি রাখেনি, মেরে ফেলারও পরিকল্পনা করেছিল। মক্কা বিজয়ের পর তার সুযোগ এসেছিল প্রতিশোধের, কিন্তু সবাইকে এমনকি তার পরম শত্রু আবু শুফিয়ানকেও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। চাচা হামজা রা: হত্যাকারি দাসটি এবং আবু সুফিয়ানের স্ত্রী (যে কিনা হামজা রা: বুক চিড়ে তার কলিজা চিবিয়ে খেয়েছিল) যখন নবীজি সা: এর কাছে আসে ইসলাম ধর্ম গ্রহন করার জন্য তিনি তাদের চিনতে পেরেও ক্ষমা করে দিয়েছিলেন।
হাবির ইবনে আল আসওয়াদ নবীজি সা: একজন ঘোরতর শত্রু ছিল। যে কিনা নবী কন্যা জয়নব রা: আনহাকে মারাত্মক ভাবে আহত করে।
জয়নব রা: অন্তসত্বা অবস্থায় যখন মদীনায় হিজরতে যান তখন হাবির ইবনে আল আসওয়াদ উনাকে উটের পিঠ থেকে ছুড়ে ফেলে, যার ফলে তার পেটের সন্তানটি নষ্ট হয়ে যায়। দয়ার নবী সা: এই পাষন্ড হাবির ইবনে আল আসওয়াদকেও ক্ষমা করে দেন।
তিনি পাপকে পুন্যের দ্বারা জয় করেছেন, ঘৃনাকে ভালবাসা দিয়ে হটিয়ে দিয়েছেন, আর ক্ষমার দ্বারা মুর্খ শত্রুকে বন্ধু বানিয়েছেন। ইসলামের আলোকে সকল অন্ধকারকে দুর করে মানুষকে দেখিয়েছেন সত্যের পথ, কল্যানের পথ।

অথচ আমরা ব্যক্তি লাভলোকসানের হিসাব নিকেশ করতে গিয়ে ইসলামের দোহাই দিয়ে প্রতিপক্ষকে কোনঠাসা করতে গিয়ে সর্বোচ্চ কঠোরতা প্রদর্শন করি।

সামান্যতম অমানবিক আচরনে তার চোখ অশ্রুসজল হত।
এমনকি পশুদের প্রতি দয়া প্রদর্শনের তাগিদে মহানবী সা: তার সাহাবীদের একটি ঘটনার বৃতান্ত দেন এইভাবে যে, একলোক তার যাত্রাকালে তৃষ্নার্ত হলে কুয়ায় নামে পানি পানের জন্য। পানি পানের পর কুয়ার উপর উঠে দেখে যে একটি কুকুর তৃষ্না নিবারনের জন্য কাদামাটি চাটছে। লোকটি আবার কুয়াতে নেমে কুকুরটির জন্য পানি নিয়ে এসে তার তৃষ্না নিবারন করে। মহান আল্লাহ লোকটির এই দয়া দেখে তার পুর্ববর্তী সব পাপ ক্ষমা করে দেন।

অথচ পশুপাখি ত দুরের কথা মানুষের প্রতিও আমাদের আচরন অশালীন হয়ে উঠে।

দাসদের প্রতি অতীব দয়ালু ছিলেন। একবার এক আরব তার কাছে এসে প্রশ্ন করে আমি আমার দাসকে প্রতিদিন কতবার ক্ষমা করতে পারি। তিনি উত্তর দেন, দিনে ৭০ বার।
আনাস রা: বলেন আমি তার কাছে ১০ খেটেছি, তিনি একটিবারের জন্য আমাকে ওটা কেন করোনি এটা কেন করোনি বলেননি। তিনি বলতেন দাসেরা তোমাদের ভাইয়ের মত। তুমি যা খাও তাকে তাই খেতে দাও, তুমি যা পরিধান কর তাকে তাই পরিধান করতে দাও। যখনই তিনি দাস পেতেন তখনই তাকে মুক্তি দিতেন। কিন্তু তারা নবীজির সা: ভালবাসায় আবদ্ধ হয়ে আর মুক্তি চাইত না।
যায়িদ বিন হারতাকে মুক্ত করে দিয়ে তার পিতার সাথে যাবার অনুমতি দিলেও তিনি নবীজি সা: সাথেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নবীজি সা: সান্নিধ্য তার পিতৃস্নেহ চাইতেও শ্রেয়তর মনে হয়েছিল। দাসদের যাতে মনক্ষুন্ন না হয় তাই তিনি আদেশ করেছিলেন আমার দাস সম্বোধন না করে আমার ছেলে আমার মেয়ে সম্বোধন করার জন্য। মৃত্যুর আগে তার সাবধান বানী ছিল দাসদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর।

অথচ কাজের মানুষের সাথে আমাদের আচরন মাঝে মাঝে মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়ে দেয়। কয়দিন আগেই দুটি ছোট্ট কাজের মেয়েকে আগুন ছ্যাকা দেয়া সামান্য অজুহাতে দেখিয়ে।

অত্যন্ত লাজুক স্বভাবের ছিলেন আমাদের মহানবী সা:। তাকে কেউ কখনো উচ্চস্বরে কথা বলতে শুনেনি। রাস্তায় হাটতেন খুবই ধীরে সুস্থে, কাউকে পাশ কাটানোর সময় তার মুখে মুচকি হাসি লেগেই থাকত। কোনকিছুতে অসন্তুস্টি ঘটলে মুখে প্রকাশ করতেন, তার চেহারা দেখেই সবাই বুঝে নিত। গৃহাস্থলীর সব কাজই সারতেন তিনি, নিজের হাতে কাপড় কিংবা জুতা সেলাই করা। একবার কেউ একজন বসার জন্য তাকে গদি এগিয়ে দিলে তিনি তা সরিয়ে দিয়ে মেঝেতেই বসে পরেন। তিনি বলেন আমি আল্লাহর দাস, আমি দাসের মত আহার করি এবং দাসের মতই বসি।

অথচ কোনকিছুতে অসন্ত্তষ্টি ঘটলে তার আমরা তার চুড়ান্ত প্রকাশ ঘটাই কুৎসিত সব আচরনের মাধ্যমে। অধীনস্হকে যথেচ্ছ খাটিয়ে নেই, স্ত্রী সাথে আচরন করি কেনা গোলামের মত। গদীনসীন পীরদের সত্য সত্যি গদি ছাড়া চলে না। কিছুদিন আগে শুনলাম এক কর্মকর্তার দুপুরের খাবারের আয়োজনে অধীনস্হ তিন জনকে হাতে লাগাতে হয়।

নবীজি সা: অসুস্থদের দেখতে যেতেন, জানাজায় অংশ নিতেন, গাধায় চড়তেন এমনকি দাসদের দাওয়াতও গ্রহন করতেন।
জীবন যাপন এবং ধর্মকর্মের ব্যাপারেও মধ্যপন্হা অবলম্বনের উপদেশ দিয়েছেন তিনি। অতিরিক্ত কোনকিছুই তিনি পছন্দ করতেন না। একবার এক সাহাবী মাত্রাতিরিক্ত এবাদতে মশগুল হলে তিনি বলেছিলেন, তোমার পরিবার পরিজন এমনকি তোমার অংগপ্রত্যংগেরও তোমার উপর হক আছে। নিজেকে কষ্ট দিয়োনা। ততক্ষনই এবাদত কর যতক্ষন না তা তোমার জন্য বোঝা না বনে যায়। শিশুদের তিনি অত্যন্ত ভালবাসতেন। কাছে পেলেই কোলে তুলে চুমু দিতেন। এটি তার অভ্যাস ছিল যে তিনি যাত্রা শেষে ফেরার পথে শিশুদের তার উটের পিঠে তুলে নিতেন।

অথচ ইবাদত নিয়ে বাড়াবাড়িতে আমরা বড় গলায় কথা বললেও ব্যক্তিজীবনে আমরা অনেক দায়িত্বপালনে শৈথল্য দেখাই, দায়িত্বহীন হই। গরীব অনাহারী শিশুরা রাস্তায় গড়াগড়ি খেলেও ফিরেও তাকাই না।

মহানবী সা: খুব হাসিখুশি একজন মানুষ ছিলেন। একবার এক সাহাবা বলেছিলেন আমি তার মত হাসিখুশি মানুষ কখনো দেখিনি। তিনি মাঝে মাঝে ঠাট্টা কৌতুকও করতেন। একবার এক বুড়ি মহিলা তার কাছে এসে বলল, আমার জন্য বেহেশতের দোয়া করুন। তিনি তখন বললেন কোন বুড়ি মহিলা বেহেশত যেতে পারবে না। মহিলা ত কেদে কেটে সারা। পরে নবীজি সা: তাকে আস্বস্থ করে বললেন, তুমি যখন বেহেশত যাবে তখনই তুমি যৌবনবতী হয়ে যাবে।

অথচ আজকালকার হুজুর মাওলানারা যে গাম্ভীর্য্য দেখান তাতে করে ওনাদেরকে অন্য এক স্তরের মানুষ বলে মনে হয়।

পৃথিবীর শুদ্ধতম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন আমাদের নবীজি সা:। এই উপলব্ধিটি আমাদের প্রতিটি মুসলমানদের ঘটুক এবং ব্যক্তিজীবনে তার প্রতিফলন ঘটুক এটিই কামনা হোক।
১৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×