somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নেতারা জিতে নিলো সাতচল্লিশ, হেরে গেল মানুষ

১৪ ই আগস্ট, ২০১০ রাত ৮:২৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাতচল্লিশের দেশ বিভাগ আজকের বাস্তবতায় প্রায় অপ্রাসঙ্গিক একটি বিষয়।এমনিতেই এই অভিযোগটা আমার নিজের, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো গত ছয় দশকে কিছুই করেনি, ইতিহাসের চর্বিত চর্বনে সময় নষ্ট করেছে। সব কিছুর পিছেই অন্যের শত্রুতা খুঁজে আমরা এড়িয়ে যাই আজ এবং আগামীকাল। নীরোদ সি চৌধুরী প্রায়ই বিভিন্ন আড্ডায় বলেছেন আমরা অতীত নিয়ে কেঁদে আর ভবিষ্যত নিয়ে আশংকা করে বর্তমানটা হারিয়ে ফেলি।পরীক্ষার দুশ্চিন্তায় পড়ায় মনোযোগ না দিতে পারার মতোই। আবার অনেক অভিভাবক আছেন যারা তাদের সন্তানের পরীক্ষায় খারাপ ফলাফলের জন্য শিক্ষককে দায়ী করেন। দক্ষিণ এশিয়ার মানুষেরাও ঐ সিরিয়াস গার্জেনের মতোই।

আমি নিজেই সমুদয় জাতিগত ব্যর্থ তার জন্য বৃটিশদের টেনে আনি।নিজেরা কিছুই না করে অন্যকে দোষারোপ করে ভালই সময় কাটে।বৃটিশেরা আমাদের প্রিয় পিনকুশান বা ডোর ম্যাট।

অধিকাংশ মেল শভিনিস্ট যেমন কন্যাসন্তান জন্মানোর জন্য স্ত্রীকে দায়ী করে থাকে।

সাতচল্লিশ সম্পর্কে বই-পুস্তক বেশ বিভ্রান্ত করে থাকে। কেউ গান্ধীকে নায়ক বানায়, কেউ নেহেরুকে, কেউ বা জিন্নাহকে।ঢাকায় বা কলকাতায় আমার বন্ধুরা অনেকে গান্ধীরোমান্টিকতায় , দিল্লীতে নেহেরুর গুণগান, করাচীতে জিন্নাহ। সবাই তাদের ভাবনার পক্ষে বই সরবরাহ করে আমার কনফিউশন তৈরি করেছেন।অভ্যাসবশত নিজের কনফিউশনের জন্য অন্যদের দায়ী করলাম। তবে এই কনফিউশন থেকে বের হবার কাজটা তাই জরুরী হয়ে পড়েছে।

৪৭এর অডিও ভিজুয়াল ফুটেজ আর স্থির চিত্র সম্বল করে চেষ্টা করলাম ঐ স্পেস এবং টাইমকে কিছুটা অনুধাবন করতে। তবে ইতিহাস সম্পর্কে রায় ঘোষণার নির্বুদ্ধিতাকে আমি খুব আউটডেটেড মনে করি।সেটা সবজান্তা শমশের সিনড্রোম।অডিও-ভিজুয়াল ফুটেজ আর ছবির সুবিধা হলো তা প্রামাণিক অথচ ওকালতি করেনা কারো পক্ষে।

যে গান্ধীকে নিয়ে ব্লগে কিছুদিন আগে আদিখ্যেতা করলাম, তার কর্মকান্ডকে ফুটেজে অবাস্তব নাটক মনে হলো।দুই হাতে দুই তরুণী যষ্ঠী খুব থিয়েটার বান্ধব, কিন্তু রাজনীতিতে তার প্রভাব নেতিবাচক মনে হয়েছে। রক্ষণশীল মুসলমান জনগোষ্ঠীর জন্য সেটা ছিলো কালচারাল শক।বিশেষ করে নোয়াখালীতে যেখানে ওয়ালীউল্লাহ শস্যের চেয়ে টুপি বেশী-ধর্মের আগাছা বেশী দেখেছেন।অথবা মাউন্ট ব্যাটেনের সামনে মৌনব্রত, কাগজে লিখে প্রশ্ন করা,কথার রোজা রেখে অনেক জরুরী মুহূর্তকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া।৪৭এ গান্ধী যা ক্ষতি করেছেন, তার চেয়ে বেশী ক্ষতি হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার কিছু বুদ্ধিজীবী আজ অব্দি গান্ধী থিয়েটার চালিয়ে যাওয়ায়।গান্ধীর সত্যাগ্রহ বা অহিংসনীতি ঐসময় ইতিহাসের অলংকার হিসেবে রয়ে গেছে। ভূমিতে এর কোন চর্চা দেখিনি। তাই গান্ধীকে প্রত্যাখান করে আজকের হিংস্র-ক্যানিবাল সমাজের নরখাদকতাকে প্রতিহিংস্রতা দিয়ে মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সুতরাং গান্ধীর কাছ থেকে এইটুকু শেখা গেলো, ঈর্ষাপ্রবণ সমাজে অহিংসনীতি বেমানান।

নেহেরুকে সবচেয়ে ঝানু রাজনীতিবিদ মনে হয়েছে। সম্ভবত একমাত্র বাস্তব বুদ্ধি সম্পন্ন লোক ওই সময়ের।তবে ক্ষমতার লোভ বা আত্মকেন্দ্রিকতা তার সহজাত চরিত্র ছিল, যেটাকে তিনি শিল্পে পরিণত করেছিলেন। যে সময় তার মাউন্ট ব্যাটেনের প্রতিটি পদক্ষেপ আর ভাবনা জানার দরকার, তখন লেডী মাউন্ট ব্যাডেনসূত্রে পারিবারিক বন্ধু হয়ে গেলেন তিনি, এর চেয়ে স্মার্ট মুভ আর কী হতে পারে। রাজনীতিতে নিসঙ্গ জিন্নাহ ভারতকে হিন্দুস্থান বলে অপমান করেছেন নেহেরুকে, কিন্তু তিনি মাথা ঠান্ডা রেখে লক্ষ্যে এগিয়ে গেছেন।জিন্নাহ কনফেডারেশনের রোড ম্যাপে রাজী থাকলেও নেহেরু তা নাকচ করেছেন, কারণ তাতে পরবর্তীতে একান্নবর্তী পরিবারের স্টার প্লাস ড্রামা শুরু হয়ে যেতো। তাই কষ্ট হলেও জিন্নাহর পাকিস্তান বানানোর রোডম্যাপ মেনে নিয়েছেন।

মুসলমানেরা ভারতবর্ষে বিচ্ছিন্নভাবে ছড়িয়ে থাকায় ভবিষ্যতে নির্বাচনী সাফল্য তাদের আসবেনা, মুসলমানদের এই অনিশ্চয়তার কারণে জিন্নাহ পশ্চিমা পোশাক খুলে টুপি মাথায় পরলেন।নোয়াখালী-কলকাতার মুসলমানেরা লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান শ্লোগানে দাঙ্গার শুভসূচনা করে। পাঞ্জাবেও শিখদের সঙ্গে দাঙ্গার শুরুটা মুসলমানদের হাতে। গর্বে বুকটা ভরে গেল। শিক্ষায়-পরিশ্রমে-রাজনৈতিক বুদ্ধিতে পিছিয়ে থাকলেও আল্লাহ আমাদের ক্রোধ এবং প্রতিহিংসা দিয়েছেন।তাই দিয়ে করে কম্মে খাচ্ছি এতোকাল।শিখদের কিছু রিচুয়াল মুসলমানদের কাছ থেকে পাওয়া। সুতরাং ট্রেন টু পাকিস্তানে তার শো-ডাউন দেখা গেল। হিন্দুরা কিন্তু আলোচনার টেবিলে সমাধান খুঁজেছিল।দাঙ্গায় বাধ্য না করলে যায়নি।তবে উচ্চবর্ণের হিন্দুরা মুসলমানদের সঙ্গে দলিতদের মতো আচরণ করে ঐতিহাসিক শত্রুতাকে বেগবান করেছিল বরাবরি।

মাউন্ট ব্যাটেন খুব তাড়াহুড়ার মধ্যে কাজ করেছেন।টাকাপয়সা হাতে তেমন ছিলনা। তাড়াহুড়া করে বৃটিশ সেনা পাঠিয়ে দিয়েছিলেন আগে ভাগেই। তাই দাঙ্গা থামানোর জন্য প্রশাসনের হাতে কিছুই ছিলনা, উপদেশ ছাড়া।র‌্যাডক্লিফ সাহেব জীবনে প্রথম ভারতে এলেন পেন্সিল দিয়ে ভারতের হার্ট অপারেশনে।উনি জানতেন সবাই তাকে ঘৃণা করবে।টিপিক্যাল ব্যুরোক্র্যাট,ভারত-পাকিস্তান পতাকা ওড়ানোর আগে পর্যন্ত গোপন রেখেছিলেন ভারত বিভাজনের মানচিত্রটি।এই ঢাক ঢাক গুড় গুড় ছিল, নিরাপদে বৃটিশ পলায়ন নিশ্চিত করতে।

সবচেয়ে অবাক ব্যাপার মাউন্টব্যাটেন-নেহেরু বিমান থেকে শরণার্থীদের বেহাল অবস্থা দেখে প্রথম সম্বিত ফিরে পেলেন, কী ভয়াবহ অব্যবস্থাপনার শিকার ভারত-পাকিস্তান গামী আমজনতার উদবাস্তু মিছিল।মাউন্টব্যাটেনের এই অদক্ষতা খুবই ক্ষুব্ধ করেছে আমজনতাকে। আর জিন্নাহ তখন রাষ্ট্রপ্রধান হবার ইউফোরিয়ায় মৃত্যুউপত্যকার ট্র্যাজেডীকে পায় দেখতেই পাননি। এতো অভিজ্ঞ নেতাদের দেশ বিভাগ পরিকল্পনার পরী ডানা মেলে উড়ে গিয়েছিলো সম্ভবত। আর নেটিভ সৈনিকেরা যেসময় নিজেদের পোস্টিং নিয়ে, নতুন জায়গায় যোগদানের ছুটিতে, তখন লাহোরে মাত্র শখানেক সেনা নিয়ে এক বৃটিশ সার্জেন্ট চার্লিচ্যাপলিন হয়ে ঘুরছিলেন। সুতরাং দেশ বিভাগের ব্যবস্থাপনায় নেহেরু জিন্নাহ পাশ মার্কস পান বলে মনে হয়না। আর গান্ধী তার অনশন আর মৌনব্রত নিয়ে সাক্ষী গোপাল হয়ে রইলেন। ফলে তিনি পরীক্ষাকে ভয় পেয়ে ঘরে বসে দর্শন চর্চা করলেন।

বৃটিশেরা রুয়ান্ডা-বুরুন্ডিতে হুতুদের কাছ থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে তুতসিদের যেমন ক্ষমতায়িত করেছিলেন, ভারতে তেমনি মুসলমানদের হাত থেকে ক্ষমতা নিয়ে হিন্দুদের এগিয়ে দিয়েছেন। বুশ ইরাকে যেমন সুন্নীদের ক্ষমতাচ্যুত করে শিয়াদের দিয়েছিলেন, যুদ্ধ এবং দেশ দখলের এটা সনাতন কৌশল। এটা আজো সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। কিন্তু ভারতের মানুষ বিভাজনের জন্য উন্মুখ ছিলো।আমরা বৌদ্ধ-হিন্দু-মুসলমান-বৃটিশ-পাকিস্তান সব দখলদার শত্রুর কাছে আত্মসমর্পণ করে দক্ষিণ এশিয়াকে লাল বাতি এলাকা করেছি।আমাদের একটি অংশ সবসময় দখলদারদের চাটুকার হয়েছে।বাড়ি-জমিদখল-ঠিকাদারি-চাকরী-ব্যবসা-ইগো-ঈর্ষা আমাদের মজ্জাগত। ধর্ম ৪৭ এর অজুহাত। আবেগে নীতিহীন (ইমোশনালি ডিজ অনেস্ট) আত্মকেন্দ্রিক দক্ষিণ এশীয়রা আজো সম্পদ এবং আদিম ইগোর কারণে যে কোন বিভাজনে রাজী।ভারত-পাকিস্তান কামড়া কামড়ি চলছেই। বিএনপির পাকিস্তান তোষণ, আওয়ামীলীগের ভারত তোষণ আমাদের দখলদার তোষণের জীনসঞ্জাত কু অভ্যাস।আর বিভাজন আমাদের অস্থিগত।বাংলাদেশের ভেতরেই যে রাজনৈতিক বিভাজন তা দেখে ঠাহর করা যায়। আমরা টাকাপয়সার জন্য মায়ের কিডনীও বেচে দিতে পারি।যেখানে ছাত্রদল নেই সেখানে ছাত্রলীগের দুই পক্ষই যথেষ্ট ভাগ-বাটোয়ারার দাঙ্গায়।তাই নিজেকে হুতু বা তুতসি ভাবতে আজ আর আমি আড়ষ্ঠ নই।

(কপিপেষ্ট)
লেখকঃ Maskwaith Ahsan
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×