সুরা বাকারার ৪৩ আয়াতে আল্লাহর নির্দেশ হচ্ছে, ‘আর নামাজে অবনত হও তাদের সঙ্গে যারা অবনত হয়। অন্যত্র এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহর মসজিদগুলো আবাদ করে তারা যারা আল্লাহর ওপর ইমান এনেছে, শেষ দিনের ওপর ইমান এনেছে এবং নামাজ কায়েম করেছে।’ আয়াত দুটিতে জামাতে নামাজ আদয়ের তাগিদ দেয়া হয়েছে। পক্ষান্তরে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আমার প্রাণ যাঁর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে তাঁর শপথ করে বলছি, আমি সংকল্প করেছি কাঠ সংগ্রহ করার নির্দেশ দেবো, তারপর আমি নামাজের হুকুম দেবো এবং এজন্য আজান দেয়া হবে তারপর আমি এক ব্যক্তিকে হুকুম করবো, সে লোকদের নামাজ পড়াবে। এরপর আমি সেই লোকদের দিকে যাবো (যারা নামাজের জামাতে হাজির হয়নি) এবং তাদের বাড়ি তাদের সামনেই জ্বালিয়ে দেবো।’ আবু দাউদ শরিফে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুয়াজ্জিনের আজান শুনলো এবং তার আহ্বানে সাড়া দিতে তার কোনো ওজরও নেই, তথাপি সে জামাতে নামাজের জন্য গেল না, একাকী নামাজ পড়লো, তার নামাজ আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করলেন ‘ওজর’ কি? রাসুল (সা.) উত্তর করলেন, রোগ ও ভয়ভীতি।’ কোনো কোনো সাহাবি (রাদি.) তো শরিয়তসম্মত ওজর ব্যতীত জামাতবিহীন নামাজ জায়েজ নয় বলেও মন্তব্য করেছেন। কোরআন-হাদিসের আলোকে এটুকু সুস্পষ্ট যে, ফরজ নামাজ জামাতে আদায়ের জন্যই নির্দেশ রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এ নির্দেশ কোন ধরনের? ফরজ, ওয়াজিব না সুন্নত? এ ব্যাপারে ওলামা ও ফকিহদের কেউ ফরজে আইন, কেউ ফরজে কেফায়া, কেউ ওয়াজিব আবার কেউ সুন্নতে মুফাক্কাদা (তবে ফজরের সুন্নতের মতো সর্বাধিক তাগিদপূর্ণ সুন্নত) হিসেবে উল্লেখ করেছেন। মোদ্দাকথা নামাজ পড়া যেমন আল্লাহর আদেশÑ জামাতের সঙ্গে নামাজ পড়াও আল্লাহর আদেশ এবং ইসলামের বিধান জামাতে অনুপস্থিত থাকা বড় ধরনের গোনাহ।
অন্ধ সাহাবিকেও জামাতে নামাজ আদায়ের নির্দেশ রাসুল (সা.)-এর
মুসলিম শরিফের হাদিসে আছে, ‘এক অন্ধ ব্যক্তি রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে বললো, হে রাসুল! আমাকে মসজিদে নিয়ে যেতে পারে এমন কেউ নেই। আমাকে বাড়িতে নামাজ পড়ার অনুমতি দিন। রাসুল (সা.) তাকে অনুমতি দিলেন। সে চলে যেতে উদ্যত হলে তাকে ডেকে বললেন, তুমি কি আজান শুনতে পাও? সে বললো হ্যাঁ। রাসুল (সা.) বললেন, তাহলে মসজিদে যাবে (জামাতে নামাজ আদায় করবে)।’ এ হাদিসটি আবু দাউদ শরিফে এভাবে এসেছে, ‘আমর ইবনে উম্মে মাকতুম রাসুল (সা.)-এর কাছে এলেন। তিনি বললেন, হে রাসুল! মদিনা অনেক হিংস্র জীবজন্তুতে পূর্ণ শহর। আমি চোখে দেখি না। আমাকে মসজিদে নিয়ে যেতে পারে এমন একজন আছে বটে, তবে সে আমার উপযুক্ত নয়। আমি কি বাড়িতে নামাজ পড়তে পারি? রাসুল (সা.) বললেন, তুমি কি আজান শুনতে পাও? তিনি বললেন, হ্যাঁ পাই। রাসুল (সা.) বললেন, তাহলে তুমি মসজিদে যাবে। আমি তোমাকে বাড়িতে নামাজ পড়ার অনুমতি দিতে পারি না।’ একজন অন্ধ ব্যক্তিকে রাসুল (সা.) বাড়িতে নামাজ পড়ার অনুমতি দেননি, আমরা যারা সুস্থ ও চোখওয়ালা তারা কি করে বাসা-বাড়িতে একাকী নামাজ আদায় করি? আমরা কী পারি না ওই হাদিস থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজের বিবেককে কাজে লাগাতে? জামায়াতে নামাজ করতে? দুটি নামাজ জামায়াতে আদায় যাদের জন্য কঠিন আমরা অনেকে ব্যবসা, বাণিজ্য, চাকরির কর্মের সুবাদে জোহর, আসর ও মাগরিব জামায়াতে আদায় করলেও ফজর এবং এশা জামাতে আদায়ের চেষ্টা করি না। কোনো রকম চেষ্টা ও ফিকির ছাড়া এভাবে ফজর ও এশার জামাত ত্যাগ করা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত দোষণীয়। কেননা রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘এশার ও ফজরের নামাজের মতো আর কোনো নামাজ মুনাফিকদের কাছে বেশি ভারি বোঝা বলে মনে হয় না। তবে যদি তারা জানতো এই দুই নামাজের মধ্যে কি আছে তাহলে তারা হামাগুড়ি দিয়ে এই দুই নামাজে (জামাতে) শামিল হতো’ (বুখারি ও মুসলিম)। ইবনে ওমর (রা.) বলেন, যখন কেউ ফজর ও এশার জামাতে অনুপস্থিত থাকতো, তখন আমরা মনে করতাম সে মুনাফিক হয়ে গেছে। হজরত ইবনে আব্বাছ (রা.)-কে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, এক ব্যক্তি সব সময় দিনে রোজা রাখে ও রাতে নামাজ পড়ে, কিন্তু জামাতে নামাজ পড়ে না, তার কি হবে? তিনি বললেন, এরূপ করা অবস্থায় মারা গেলে সে জাহান্নামে যাবে (তিরমিজি)। হাসরের মাঠে যারা সিজদা করতে সক্ষম হবে না পবিত্র কোরআনের সুরা আল কলমের ৪২ ও ৪৩ আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যেদিন কঠিন সময় উপস্থিত হবে এবং লোকদের সিজদা করার জন্য ডাকা হবে, তখন তারা সিজদা করতে পারবে না। তাদের দৃষ্টি হবে নিচু, লাঞ্ছনা-অপমান তাদের ওপর চেপে বসবে। তারা যখন সুস্থ ও নিরাপদ ছিল (দুনিয়াতে) তখন তাদের সিজদা করার জন্য (জামাতে নামাজ আদায়ের জন্য) ডাকা হতো (কিন্তু তারা তাতে সাড়া দিতো না)’। আয়াত দুটিতে কেয়ামতের চিত্র বর্ণিত হয়েছে। হজরত ক্বাব আল আহ্বার (রা.) বলেন, এ আয়াতে কেবলমাত্র নামাজের জামাতে অনুপস্থিত থাকা লোকদের প্রসঙ্গে নাজিল হয়েছিল। তাবেয়িনদের ইমাম সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব (রহ.) বলেন, তারা আজান শুনতো অথচ সুস্থ-সবল থাকা সত্ত্বেও জামাতে হাজির হতো না। মহিলাদেরও করণীয় আছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিবাররূপী ছোট সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব থাকে নারীদের হাতে। মুসলিম নারীদের কাজকর্মে ইসলামী আদর্শ ফুটে উঠতে হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘মোমিন নারী ও মোমিন পুরুষরা পরস্পর সহযোগী। তারা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে’। রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘স্ত্রী তার স্বামীর ঘরের জিম্মাদার, তাকে সে জিম্মা সম্পর্কে পরকালে জবাবদিহি করতে হবে’ (মিশকাত)। ছেলে, স্বামীসহ পরিবারের পুরুষ সদস্যদের জামাতে নামাজ আদায়ের জন্য মসজিদমুখী করে দেয়া, জামাতে নামাজ আদায় নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একজন আদর্শ মুসলিম নারীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাগতিক সব ব্যাপারে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি স্বামী, সন্তানসহ পুরুষদের ধর্মমুখী করার ব্যাপারে ভূমিকা না রাখলে নারীদের আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। ইচ্ছা ও প্রার্থনাই যথেষ্ট জামাতে নামাজ আদায়ের জন্য ইচ্ছা, আকাক্সক্ষা, চেষ্টা, সাধনা থাকতে হবে এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে। ইচ্ছা করলে উপায় হয় আর আল্লাহও সহায় হন। জামায়াতে নামাজ আদায়ের গুরুত্বকে মনেপ্রাণে উপলব্ধি করে আপনি যদি ইচ্ছা করেন যে আমি এখন থেকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে আদায় করবো ইনশাআল্লাহ। দেখবেন আল্লাহর রহমতে তা আদায়ে আপনি সক্ষম হচ্ছেন। ফজরের কথা চিন্তা করছেন? যত রাতেই আপনি ঘুমাতে যান না কেন, কায়মনোবাক্যে যদি আল্লাহকে বলেন, আল্লাহ দয়া করে আমাকে ফজরের সময় জাগার তওফিক দিও, দেখবেন ঠিকই কোনো না কোনোভাবে আপনি জেগে গেছেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


