হজ হল ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম। যাদের আর্থিক, শারীরিক, মানসিক ও অন্যান্য সার্বিক সামর্থ্য আছে তাদের জন্য জীবনে একবার হলেও হজ করা ফরজ। হজের সীমাহীন পুণ্যের কথা বলা হয়েছে। রাসুল (সা.) বলেছেন, কবুল হজের মর্যাদা হল এই যে, এতে মানুষ নবজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ হয়ে যায়। অর্থাৎ জীবনের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। এখন প্রশ্ন যে, এটা এমন কি ইবাদত যার এত মর্যাদা ও মর্তবা রয়েছে? আমরা জানি হজের মধ্যে বিশেষ কয়েকটি আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে, তার অন্তর্ভুক্ত হল ইহরাম, আরাফায় অবস্থান, কাবা শরিফ তাওয়াফ করা, কংকর মারা, কোরবানি দেয়া, মিনায় অবস্থান ইত্যাদি। বাহ্যত এগুলোকে নিছক কিছু আনুষ্ঠানিকতা বলে মনে হয়, কিন্তু তারপরও এ হজের মধ্যে এত পুণ্য ও মর্যাদা ঘোষণার কি তাৎপর্য রয়েছে?
আসলে হজের প্রত্যেকটি আনুষ্ঠানিকতা ও অনুষ্ঠানই একেকটা প্রতীকী কর্ম বা মহড়া। যার অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এ তাৎপর্যগুলো উপলব্ধি করে আত্মস্থ করার মনোবৃত্তি ছাড়া নিছক অনুষ্ঠানগুলো উদযাপন করলে হজ হবে একটা নিষপ্রাণ দেহের মতো, যেখানে দেহ আছে প্রাণ নেই, আর সে দেহের কোনো মূল্য থাকে না।
হজের একটা অনুষ্ঠান হল কংকর মারা
মিনা থেকে কিছু দূরে একের পর এক ৩টি স্থান রয়েছে সেখানে পাথরের প্রশস্ত ৩টি খাম্বা দাঁড় করানো আছে। হাজিরা পাথরের কংকর নিয়ে একেকটায় ৭ বার করে কংকর ছুড়ে মারে। ছোট ছোট পাথর দিয়ে সে প্রশস্ত পাথরের খাম্বায় ঢিল ছোড়ে। এটাকে বলা হয় জামারাত বা কংকর মারা। হজের জন্য এ অনুষ্ঠানটি হলো ওয়াজিব। হজের অন্যান্য অনুষ্ঠান বিবেচনা না করে আমরা শুধু এ কংকর মারার তাৎপর্য নিয়ে চিন্তা করতে পারি। যার বাহ্যিক কোনো অর্থ হয় না, পাথর দিয়ে পাথরের ওপর মারা, এতে এমন কি আছে? যার জন্য এটাকে ওয়াজিব করা হয়েছে?
আসলে এ কংকর মারা হল একটা প্রতীকী মহড়া। এ ৩টি স্থানে শয়তানকে কল্পনা করে পাথর দিয়ে শয়তানকে আঘাত করা হয়। এর তাৎপর্য বুঝতে হলে এর ঐতিহাসিক উৎস ও তাৎপর্য সম্পর্কে চিন্তা করা দরকার। মহান নবী হজরত ইব্রাহীম (আ.) ও তার কিশোর পুত্র ইসমাঈল (আ.)-এর কথা : অতি বৃদ্ধ বয়সে ইব্রাহীম (আ.) এক শিশু সন্তান পেলেন। তার নাম রাখলেন ইসমাঈল। তিনি আল্লাহর নির্দেশে পুত্র ইসমাঈল (আ.) ও তার মা হাজেরাকে কাবার পাশে প্রস্তরময় স্থানে একাকী রেখে যান। এতে আল্লাহর এক মহাপরিকল্পনা ছিল যা বাস্তবায়িত হয়েছে। সেদিকে আমরা যাচ্ছি না। শুধু কংকর নিক্ষেপ সংক্রান্ত ঘটনাটি উপস্থাপন করা হচ্ছে। ইব্রাহীম (আ.) মাঝে মাঝে ফিলিস্তিন থেকে এসে তার নির্বাসিত স্ত্রী ও পুত্র সন্তানকে দেখে যেতেন। ইসমাঈল (আ.) যখন কৈশোর বয়সে উপনীত হলেন তখন ইব্রাহীম (আ.) স্বপ্নে আদিষ্ট হলেন তার পুত্রকে আল্লাহর নামে জবাই করার জন্য। তিনি এ আদেশের কথা তার স্ত্রীকে না বলে তার কিশোর পুত্র ইসমাঈলকে (আ.) বললেন। ইসমাঈল (আ.) জবাব দিলেন, 'হে পিতা, এটা যদি আল্লাহরই নির্দেশ হয়ে থাকে, তা হলে আপনাকে যে আদেশ দেয়া হয়েছে তাই করুন, আমাকে জবাই করুন, আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।'
পৃথিবীর মানবতার ইতিহাসে এ ঘটনার দ্বিতীয় কোনো দৃষ্টান্ত নেই। যে শিশু-কিশোররা অল্প কিছুতে ভয় পেয়ে যায়, সে বয়সেই শিশু ইসমাঈলই তার পিতাকে বলছেন, আমাকে জবাই করুন, আমার গলায় ছুরি চালান। যা হোক, পিতা ও পুত্র চিন্তা করলেন, মায়ের চোখের সামনে পুত্রকে হত্যা করা কঠিন, কাজেই তারা সেখান থেকে মিনা নামক স্থানে চলে যাবেন এবং সেখানেই পিতা তার পুত্রের গলায় ছুরি চালাবেন।
ছুরি হাতে পিতা ও পুত্র চলছেন মিনার দিকে। পথিমধ্যে শয়তান এসে ইসমাঈলরকে (আ.) বললো, বোকা ছেলে! তুমি তো তোমার পিতার সঙ্গে যাচ্ছো, তোমার গলায় ছুরি চালানো হবে, তোমাকে হত্যা করা হবে, কাজেই তুমি ফিরে যাও। তখন ইসমাঈল (আ.) নিচে থেকে পাথর হাতে নিলেন এবং শয়তানের ওপর ছুড়ে মারলেন। বললেন, যা শয়তান এখান থেকে চলে যা। আমাকে কুপ্ররোচনা দেবে না, আমি আল্লাহর পথে জীবন দিতে যাচ্ছি। কিছু দূর যাওয়ার পর আবার শয়তান এসে সেই কুপ্ররোচনা দিতে চেষ্টা করল, ইসমাঈল (আ.) আবার তাকে পাথর ছুড়ে মারলেন। আবার কিছ দূর যাওয়ার পর শয়তান এসে উপস্থিত। আবার কুমন্ত্রণা, এবারও ইসমাঈল (আ.) তার ওপর পাথর ছুড়লেন। শেষ পর্যন্ত পিতা ও পুত্র নির্দিষ্ট স্থানে গিয়ে পেঁৗছলেন। পিতা তার পুত্রের গলায় ছুরি চালালেন, কিন্তু এ ছুরি দিয়ে পুত্রের গলা কাটছে না। তারা বিভিন্ন স্টাইলে ও বিভিন্ন অবস্থানে চেষ্টা করলেন, শেষ পর্যন্ত ইব্রাহীম (আ.) কামিয়াব হলেন। ইসমাঈল (আ.)-এর গলায় ছুরি চালানো গেল।
এভাবে ইসমাঈলকে (আ.) জবাই করার পর তিনি দাঁড়ালেন। দাঁড়িয়ে দেখেন ইসমাঈল (আ.) সামনে দাঁড়ানো, আর সেখানে একটা পশু কোরবানি হয়ে আছে। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দেয়া, এর চেয়ে বড় আর কোনো উদাহরণ মানব ইতিহাসে নেই।
চলুন আমরা কংকর নিক্ষেপ বা শয়তানের ওপর পাথর নিক্ষেপের বিষয়টির দিকে ফিরে যাই। ইসমাঈল (আ.) শয়তানকে উদ্দেশ্য করে তিন তিনটি স্থানে যে পাথর মেরেছিলেন তারই একটা প্রতীকী মহড়া হিসেবে প্রত্যেক হাজিকে সেই ৩টি স্থানে কংকর মারতে হয়, পাথর মারতে হয়। এ পাথর মারার জন্য ইতিপূর্বে ৩টি স্থানে ৩টি সরু খাম্বা ছিল। সেখানে পাথর মারতে গিয়ে মানুষের ভিড়ে প্রত্যেক বছরই বেশ কিছু লোক হতাহত হতো। এখন সে স্থানে শয়তানের সেই প্রতীকী খাম্বাকে অনেক প্রশস্ত করে দেয়া হয়েছে এবং কয়েক তলার ওপর সেই প্রশস্ত প্রতীকী স্তম্ভ রাখা হয়েছে। হাজিরা বিভিন্ন তলায় গিয়ে সেই স্তম্ভের ওপর কংকর মারেন, যেন তারা হজরত ইসমাঈল (আ.)-এর মতো শয়তানকে কংকর মারছেন। কাজেই হজের মধ্যে ৩ স্থানে ৩টি পাথরের প্রতীকী খাম্বায় কংকর মারা শুধু পাথরকে কংকর মারা নয়, বরং তার প্রবৃত্তি ও শয়তানকে কংকর মারা, শয়তানকে ঘৃণা, বর্জন ও ত্যাগ করার বহিঃপ্রকাশ। তার অঙ্গীকার, প্রত্যয় ও প্রতিশ্রুতি। এখানেই পাওয়া যায় এ কংকর মারার মধ্যে নৈতিকতা ও মূল্যবোধের গভীর সম্পর্ক।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


