ছোট ভাগ্নি নাবিলা সেদিন স্কুল থেকে এসে কানের সামনে চিৎকার করে বলল- ” মামা, ‘ মহাভারত’ শব্দটি কলম না তুলে একবারে লিখতে পারো?” ওর কথা বুঝবো কি, চিৎকার শুনেই কান ঝালাপালা হবার যোগার। যা ই বা কিছুটা বুঝলাম, তা চিন্তা করতে করতে আবারো চিৎকার-” তুমি কেন যে আমাদের পড়াতে আসো, কিছুই ত পারো না” এটুকু বলে ঝটপট কলম বের করে লিখে ফেলল-

আমি একটু ভেবে বললাম, এভাবেও ত লেখা যায়-

“এই ভাবে হবে না, তোমারটা ভুল”- ভাগ্নির কন্ঠে প্রতিবাদের সুর। আমি অবশ্য পাত্তা দিলাম না। ঝটপট আরেকটা চিত্র একে বললাম, একই রেখায় একাধিকবার না গিয়ে কলম না তুলে এটা আঁকো দেখি।

সে কিছুক্ষন কলম কামড়া কামড়ি করে না পেরে মুখ বাঁকিয়ে বলল-” এরকম বিশ্রী ছবি কে আঁকতে যায়, তোমার ইচ্ছা হলে তুমি আঁকো, আমার সময় নাই।” আমার মুখে এতক্ষনে লাগাম ছাড়া হাসি। ভাগ্নির চোখে চোখ পড়তেই দেখি ওর বড় বড় চোখে হুমকি। আমি হাসি থামিয়ে শান্ত ভাবে বললাম,” আসলে এটা কখনোই কলম না তুলে আঁকা যাবে না।”
-”সে তও বোঝাই যায়, আমি পারি নাই, আর কে পারবে? যেটা সম্ভব না সেই প্রশ্ন করো কেন?”- নাবিলার চিন্তাপ্রসূত মতামত।
আমি বললাম-” এটা আসলে খুব বিখ্যাত একটা সমস্যা, বলতে পারো এই সমস্যার সমাধান করতে গিয়েই জ্যামিতিতে টপোলজি নামের শাখার উৎপত্তি।”
-”সেটা কিভাবে?”
আমি বললাম-” প্রাচীন কানিসবার্গ শহরে প্রেগেল নদীর তীরের ভূখন্ড গুলোর সাথে যোগাযোগ রক্ষার জন্য সাতটি সেতু তৈরি করা হয়।

লিওনার্দ অয়লারের সময়কালে কানিসবার্গ শহরের ম্যাপ।
এখন তোমাকে যদি বলা হয়, কোনো সেতু একাধিক বার অতিক্রম না করে সবগুলো সেতু দিয়ে যেতে পারবে?”
নাবিলা চিন্তা করে বললো,” পারবো না মনে হয়”। আমি বললম,” এই সমস্যাটাই হচ্ছে বিখ্যাত কানিসবার্গ সপ্তসেতু সমস্যা। এই একই প্রশ্ন যখন সুইস গণিতবিদ লিউনার্দ অয়লার ( Leonard Euler) কে করা হয়েছিল, তখন তিনি চমৎকার একটা কাজ করেন, গোটা সমস্যাটাকে আগের চিত্রটার মত a,b,c,d দ্বারা সহজ করে একে ফেলেন।”
-” শহরের ম্যাপের সাথে উপরের চিত্রের তো কোনো মিলই নাই, তাহলে এটা আঁকার মানে কি?”নাবিলার প্রশ্ন।
আমি বললাম,” এটাই হচ্ছে টপোলজির গোড়ার কথা। আগে বুঝতে হবে টপোলজির চোখে দুটি ছবি কখন একই ধরা যাবে বা একই টপোলজিক ফিগার বলা যাবে।এই জন্য আগে নোড(node) নামের একটা ব্যাপার বুঝতে হবে।কোনো বিন্দুতে কতগুলো রেখা এসে মিলিত হলেই ঐ বিন্দুকে টপোলজির ভাষায় বলা হয় নোড।ডান পাশের চিত্রে দেখো, a,b,c,d চারটি বিন্দুই এক একটি নোড। কিন্তু একটা ব্যাপার আছে, যে সব বিন্দুতে জোড় সংখ্যক রেখা থাকে তাকে বলে ইভেন নোড( even node), আর বিজোড় সংখ্যক রেখা থাকলে বলা হয় অড নোড( odd node)। দুইটি ছবির মাঝে যদি নোড গুলো একই থাকে তাহলে টপোলজির ভাষায় তাদের একই ছবি বলা যায়। এখন কানিসবার্গের সেতুগুলোর সাথে অয়লারের ছবিটা মিলিয়ে দেখ তো, নোড গুলো একই হয় কি না”


“B,C,ও D অংশে মোট ৩ টা করে সেতু, A অংশে ৫টা। তাহলে তো অয়লার ঠিকই একেছেন”- নাবিলার মতামত।
-”হ্যাঁ, আরেকটা ব্যাপার খেয়াল করো, এখানে সবগুলোই কিন্তু অড নোড। নোড গুলো ঠিক রেখে এই ছবিটা আরোও বিভিন্ন ভাবে আকা যায়, যেমন-


এই সবগুলোই কিন্তু টপোলজির ভাষায় একই ছবি। আরেকটা ব্যাপার দেখো, ত্রিভুজের দুই কোণায় আমি দুইটি ইভেন নোড ধার করে এনেছি। তারপরেও এইটা আর আগেরটা একই ছবি। কারণটা একটু পরেই দেখবে। তার আগে খেয়াল কর, কোনো ছবি কলম না তুলে আঁকা যাবে কি যাবে না তা পুরোপুরি নির্ভর করে এই নোড গুলোর উপরে।”
-”কিভাবে?”
-”সেটাই বলছি,কোনো বিন্দুতে জোড় সংখ্যক রেখা থাকলে তাকে ইভেন নোড বলে সেটা ত আগেই বলেছি, এর মানে হচ্ছে, কোনো ইভেন নোডে একটা রেখা যদি ঐ নোডে আসার জন্য থাকে, তাহলে নোড থেকে যাওয়ার জন্যও একটা রেখা থাকবে।কিন্তু অড নোডে যেহেতু বিজোড় সংখ্যক রেখা থাকে,তাই এতে একটি রেখা যদি নোডে আসার জন্য হয় তাহলে আরোও দুইটি রেখা থাকবে বের হবার জন্য, অথবা, দুইটি রেখা আসার জন্য হলে একটি রেখা থাকবে বের হবার জন্য। নিচের ইভেন আর অড নোড গুলো দেখলেই বুঝে যাবে”
- “বুঝবই তো, আমার মাথার প্রসেসর তোমার মত পেনটিয়াম 1 নাকি?”- ভাগ্নির জবাব।

- “তো, কোর আই 7 প্রসেসর সম্পন্ন পিচ্চি রোবট, এখন বলো, কোনো ছবি কলম না তুলে আঁকা যাবে কিনা তা কোন ধরনের নোডের উপর নির্ভর করে?”
-” অবশই অড নোডের উপর,কারণ আমাকে কলম না তুলে এক নোড থেকে অন্য নোডে যেতে হলে অবশ্যই একটা বাড়তি বের হবার পথ লাগবে যেটা শুধু অড নোডেই আছে”
-” তাহলে ইভেন নোডের উপরে কলম না তুলে কোনো ছবি আকতে পারা না পারা নির্ভর করে না। এই জন্যই আমি ত্রিভুজের মাঝে দুইটি বাড়তি ইভেন নোড আমদানি করেছিলাম।এখন খেয়াল করো, কোনো ছবি কলম না তুলে আঁকতে হলে আমাকে এক জায়গা থেকে শুরু করতে হবে, এবং আঁকা শেষে বের হয়ে আসার জন্য একটি বের হবার পথও লাগবে।আবার দেখ, প্রতিটি অড নোডে শুধুমাত্র একটা পথ বাড়তি থাকবে যেটাকে ঢুকার পথ অথবা বের হবার পথ যে কোনো একটা ধরতে পারো”
-”দাড়াও,দাড়াও,এত কথা একবারে বললে কি বুঝা যায় নাকি? তাও যদি ঠিক মত বলতে পারতা, কথা শুনে মনে হয় হিব্রু নাইলে স্প্যনিশ ভাষায় কথা বলছো। মনে করো, একটা ছবিতে একটাই অড নোড আছে, তাহলে কি সেটা কি একটানে আঁকা যাবে? ” নাবিলার প্রশ্ন।
-” এটাই তো বলতে চাচ্ছিলাম, একটা অড নোড থাকার মানে হচ্ছে হয় ছবিটা আঁকা শুরু করা জন্য একটা পথ আছে অথবা শেষ করার জন্য একটা পথ আছে। একই সাথে শুরু এবং শেষ করার পথ নাই। তুমি শুরু আছে কিন্তু শেষ নাই অথবা শেষ আছে কন্তু শুরু নাই এমন ছবি আঁকার চেষ্টা করে দেখতে পারো”
-” আমি পাগল নাকি?”
-”এটা একটা ভাল গবেষণার বিষয় হতে পারে”,মুচকি হেসে উত্তর দিলাম
-” তাহলে কি কোনো ছবিতে ২ টা অড নোড থাকলে আঁকা যাবে?”
-” অবশ্যই আঁকা যাবে। আগেই বলেছি আমাদের একটা ঢুকার পথ লাগবে এবং একটা এর হওয়ার পথ লাগবে।২ টা অড নোড থাকলে ১ম টার থেকে আমরা যদি ঢুকার পথ পাই, তাহলে ২য় টা থেকে বের হবার পথ পেয়ে যাব, তাই ছবিটাও একটানে আঁকা যাবে যেমন তোমার ‘মহাভারত’ শব্দটা একটানে লিখা যায়”
-”যদি ২টার বেশি অড নোড থাকলে কি হবে?”
-” সেটাই এখন চিন্তার বিষয়।একটা ব্যাপার খেয়াল করো, প্রতি ২ টা অড নোডের আঁকার জন্য আমাদের একবারোও কলম তুলতে হচ্ছে না,১ টা টানেই আঁকা যাচ্ছে। ৪ টা অড নোড থাকলে প্রথম ২ টা আকার পর একবার কলম তুলে পরে ২ টা আকতে হবে,টান দিতে হবে ২ টা। ৬টা থাকলে কমপক্ষে ২ বার কলম তুলতে হবে,টান লাগবে ৩টা। গাণিতিক ভাবে বলতে গেলে- ‘ কোনো ছবিতে অড নোডের সংখ্যা n হলে সেটা আঁকতে কমপক্ষে n/2 বার আলাদা ভাবে টান দিতে হবে এবং কলম তুলতে হবে (n/2)-1 বার”
-” তাহলে কানিসবার্গ সেতুতে ৪ টা অড নোড থাকায়, টান দিতে হবে ২ বার, কলম তুলতে হবে একবার। এই জন্যই কানিসবার্গের সবগুলা সেতু একেবারে অতিক্রম করা যাবে না”
-” গুড, তোমার RAM ও দেখি ভাল, একেবারে ২ GB”
-”সেটা তোমাকে বলতে হবে না,সবাই জানে”
-”তাহলে বলো দেখি, একটা বৃত্তের ছবিতে তো কোনো নোড নাই, তবুও এটা কলম না তুলে একবারে আঁকা যায় কেনো?”
- কিছুক্ষন চিন্তা করে ভাগ্নি বলে-” আমার RAM এখন অন্য কাজে ব্যস্ত”
- আবারোও প্রাণ খুলে হাসার সুযোগ পেলাম, হুমকি উপেক্ষা করে কিছুক্ষন হেসে বললাম,”বৃত্ত আঁকার সময় আমরা এক যায়গা থেকে শুরু করি, আবার সেখানেই শেষ করি। তার মানে এখানে একটা শুরুর বিন্দু থাকে, আরেকটা শেষ হবার বিন্দু। তার মানে এখানেও ২টা অড নোড আছে”
-”বোঝলাম। এখন বলো, যদি কোনো ছবিতে বিজোড় সংখ্যক অড নোড থাকলে কি হবে?”
-”সেটা তোমাকে রাতে বলবো, এখন আরেকটা মজার বিষয় দেখ, লুইস ক্যারল(Lewis Carroll) এর নাম শুনেছো?”
-”না”
-”তুমি যে পড়,Alice in wonderland এর লেখক। তিনি ছিলেন গণিতবিদ। তিনি একটা সমস্যা দেন। সেটা হল, এই ছবিটা কি কলম না তুলে আঁকা যাবে?”

-” এখানে তো কোনো অড নোডই নাই, তাহলে আঁকা যাবে না” নাবিলার উত্তর
-” কিন্তু তুমি চেষ্টা করে দেখো, আকা যাবে। কেনো আঁকা যাবে সেটাই হল প্রশ্ন। তুমি চিন্তা কর। রাতে আমাকে উত্তর দিবে”
-” সমস্য নাই, রাতে উত্তর পেয়ে যাবা, আমার RAM তখন ফ্রি থাকবে”-মুচকি হাসির সাথে উত্তর।
এই লেখাটি প্রথম গণিত পাঠশালা.কম এ প্রকাশিত।
এছারাও দ্রুত গুন করার জন্য আরও মজার কিছু কৌশল যেমনঃ কিভাবে ৬ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে যেকোনো ডিজিট এর সংখ্যার সাথে ১১ এর গুনফল বের করা যায়,কিভাবে ১২,১৩,১৪,১৫,১৬,.........সংখ্যা গুলোর সাথে সকল সংখ্যার গুন করা যায়।. দেখতে এখানে ক্লিক করুন
***দ্রুত গণনা শেখার কৌশল পর্ব-১
------------------------------------------------------------------------
========================================
গণিতের মজার বিষয়গুলো সুন্দর ভাবে সবার কাছে উপস্থাপন করা এবং সবাইকে গণিতে আগ্রহী করে তোলার জন্যই গণিত পাঠশালা.কম ।গণিত পাঠশালা.কম বাংলা ভাষায় প্রথম এবং একমাত্র গণিত বিষয়ক পূর্নাঙ্গ ব্লগ সাইট।আমাদের প্রচেষ্টা টা হয়ত অনেক বড় কিছু না, তবুও এটাই হচ্ছে শুরু।একজন মানুষকেও যদি আমরা গণিতে আগ্রহী করে তুলতে পারি তাহলে সেখানেই আমাদের সার্থকতা। আপনার চিন্তাগুলোও যদি একই হয়, তবে আজই চলে আসুন না আমাদের সাথে , নতুন একটি সংস্কৃতির শুরু করার আন্দোলনে, গণিত চর্চার সংস্কৃতি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

