২৪ শে ডিসেম্বর। পরদিন ক্রিসমাস। আমরা দুইজন (আমি আর আমার এক বন্ধু) ঠিক করলাম সেন্টমার্টিন যাব। কিন্তু এমন একটা ব্যস্ত সময় টিকেট ম্যানেজ করা যাবে কিনা সন্দেহে পরে গেলাম। যাই হোক বিকেল বেলা খবর পেলাম যে মেহেদি ভাই কক্সবাজারের দুটি টিকেট ম্যানেজ করে ফেলেছেন। হাতে সময় খুব অল্প। অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে চলে গেলাম এ্যালিফেন্ট রোড। ওখানে একজনের সাথে ছোট একটা কাজ ছিল। ওটা শেষ করে গেলাম নিউমার্কেট। প্রচন্ড শীত পড়েছে কাজেই বাড়তি কিছু ব্যবস্থা তো নিতেই হবে। বেশ মোটা কাপড়ের একটা সোয়েটার কিনলাম। মেহেদি ভাইও কিনতে চাচ্ছেন কিন্তু পছন্দমত পাচ্ছেন না, তাই সময় কম দেখে কেনার ইচ্ছা বাদ দিলেন। তাড়াতাড়ি বাসে উঠে পড়লাম বাসার উদ্দেশ্যে।
বাসায় যখন পৌঁছলাম তখন রাত আটটা বাজে বাজে। তাড়াহুড়া করে গোসল, খাওয়া দাওয়া এবং গোছগাছ সারলাম। বাস ছাড়বে এগারটায় কিন্তু রাস্তাঘাটের যা অবস্থা একটু সময় হাতে না নিয়ে বের হলে সমস্যা হয়ে যেতে পারে, তাই একটু আগে ভাগেই বের হওয়ার প্রচেষ্টা। নয়টায় বের হয়ে পড়লাম। কপাল ভাল ছিল সাথে সাথে সিএনজি পেয়ে গেলাম। তাছাড়া রাস্তায়ও তেমন জ্যাম ছিলনা, তাই ঘন্টাখানেকের মধ্যেই পৌঁছে গেলাম সায়দাবাদ।
রাত সাড়ে এগারটায় বাস ছাড়ল। কাঁচপুর পার হয়ে চট্টগ্রাম মহাসড়ক ধরে বাস এগিয়ে যাচ্ছে। বাইরে প্রচন্ড ঠান্ডা। পায়ে মোজা পড়ে নিলাম এবং ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু প্রথম থেকেই ড্রাইভারটাকে তেমন সুবিধার মনে হচ্ছিলনা। যাত্রিরা খুবই বিরক্ত ড্রাইভারের উপর। কারন কিছুক্ষণ পর পর সে হার্ড ব্রেক করছিল এতে ঘুমের খুব ডিসটার্ব হচ্ছিল। আমিও মনে মনে মহা বিরক্ত।
কিন্তু কে জানত সামনে আরও ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করে আছে?
তখন রাত প্রায় ৩টা বাজে। বেশির ভাগ যাত্রির মত আমিও ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎ মহিলা যাত্রিদের চিৎকারে ঘুম ভাঙল। চেয়ে দেখি বাস ডান থেকে বায়ে খুব শার্প টার্ণ নিচ্ছে এবং ঠিক পরক্ষনেই আবার ডানদিকে আর একটা শার্প টার্ণ নিল। আর সাথে সাথে বাস বা দিকে কাত হয়ে গেল। আমি সামনের সিট খুব শক্ত করে ধরলাম। মুহুর্তের মধ্যে বিকট একটা আওয়াজ করে বাস বা দিকে উল্টে পড়ে গেল। আমি আর আমার বন্ধু ছিলাম ডানদিকের সিটে। আমরা ছিটকে গিয়ে পড়লাম বা পাশের যাত্রিদের উপর। ঘটনার পর কয়েক মুহুর্ত আমি ঠিক মনে করতে পারছিনা কি ঘটেছিল। যখন থেকে আমার মনে আছে তখন আমি ও আমার বন্ধু দাঁড়িয়ে আছি। মহিলারা, বাচ্চারা কান্নাকাটি করছে। আমি অসম্ভব রকম ভয় পাচ্ছিলাম। চারদিক ভাল করে দেখছিলাম এবং বোঝার চেষ্টা করছিলাম বাসটি কোথায় পড়েছে। পানিতে পড়েনি তো? পানিতে পড়লে বের হওয়া কঠিন হয়ে যাবে। কিছুক্ষণ পর দেখলাম বাইরে থেকে কেউ একজন পেছনের গ্লাস ভাঙার চেষ্টা করছে। মনে মনে সাহস পেলাম, যাক তাহলে পানিতে পড়েনি এবং উদ্ধার করার মত লোকজন আছে। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করে গ্লাস ভাঙতে না পেরে লোকটি চলে গেল। ব্যাপার বুঝলাম না। একটু পর লোকটি আবার ফিরে এল। এবার ভাঙতে সক্ষম হচ্ছে। বুঝতে পারলাম আগের বার কাঠ বা এ জাতীয় কিছু দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করে বিফল হয়ে ফিরে গিয়ে হাতুরি নিয়ে এসেছে। গ্লাস বেশ খানিকটা ভাঙার পর আমার বন্ধুও ভেতর থেকে লাথি দিয়ে ভাঙার চেষ্টা চালাল এবং ভেঙ্গে ফেলল। একে একে আমরা কয়েকজন বের হয়ে এলাম।
বের হয়ে দেখলাম বাসটা রাস্তার উপরই উল্টে পড়ে আছে। আর আমাদের উদ্ধারকারী আর কেউ না টহল পুলিশ। ওদের কাছ থেকে জানতে পারলাম আমরা ফেনীতে আছি। কাছেই সদর হাসপাতাল। আমার বন্ধুর নাক দিয়ে দেখলাম রক্ত পরছে। আমার চশমা ভেঙ্গে গেছে, ওটা ফেলে দিলাম। তখনও বেশির ভাগ লোক ভেতরে আটকা পড়ে আছে। আমি আবার ভেতরে ঢুকলাম। একজন পুরুষ বের হতে পারছেনা। পায়ে খুব বেশি আঘাত পেয়েছে। তার ওপর পা আটকে গেছে সিটের সাথে। পা বের করতে পারছেনা। লোকটার সাথে মহিলা আর বাচ্চা আছে। ওরা কান্নাকাটি করছে এবং ওনাকে ওঠানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা। আমি গিয়ে লোকটার পা ছাড়ালাম এবং বের করে আনতে সাহায্য করলাম। আরো কয়েকজন নারী-পুরুষকে বের করে এনে যারা খুব বেশি আঘাত প্রাপ্ত তাদের নিয়ে পুলিশের টেম্পোতে উঠলাম। সদর হাসপালে যাওয়া দরকার। কারন সবারই কম বেশি চিকিৎসা দরকার, তাছাড়া এত রাতে অন্য কোথাও যাওয়া ঠিক হবেনা। যে লোকটার পা সিট থেকে বের করেছিলাম সেই লোকটা একটু পর পর জিজ্ঞেস করছে “আমার স্যান্ডেল কই?” আর তার স্ত্রী প্রতিবারই তাকে তিরষ্কার করছে। হাসপাতাল পৌঁছতে প্রায় পনের মিনিট লাগল। লোকজন ভালই ইনজুরড হয়েছে। একটা মহিলা পায়ে খুব আঘাত পেয়েছে। টেম্পো থেকে নেমে হাটতে পারছিলনা। ওনাকে ধরে হাসপাতালের ভেতর নিয়ে গেলাম। দু-তিনটা বাচ্চাও আঘাত পেয়েছে। কিন্তু ওরা একটুও কান্নাকাটি করছেনা। ডাক্তারও সময়মত পাওয়া গেল। অন্যদের চিকিৎসা নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে নিজের কথা ভুলে গিয়েছিলাম। বা কাধে কিছু একটার সাথে বাড়ি খেয়েছি, ব্যথা করছে। কিন্তু সোয়েটার খুলে দেখতে ইচ্ছে করছেনা, কারন মনে হচ্ছে তেমন কিছু হয়নি। তবে কোমরে একটু চোট পেয়েছি, সেটা বুঝতে পেরেছি টেম্পো থেকে নামার সময়। তাই ডাক্তারের কাছ থেকে পরামর্শ নিলাম। ডাক্তার দুটো পেইন কিলার লিখে দিল। আর রাত কাটানোর জন্য ভর্তি করে নিল। ভালই হল অন্ততঃ ঘুমানোর জন্য বিছানা তো পাওয়া যাবে। আমরা দোতলার একটা ওয়ার্ডে চলে গেলাম। বিছনা করে দিল আর সাথে সাথে আমরা ঘুমিয়ে পড়লাম।
খুব সকালে ঘুম ভাঙল। আমরা তাড়াতাড়ি উঠে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে আসলাম। এমন একটা দুর্ঘটনার পর ঢাকা ফিরে আসাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু আমরা চিন্তা করে দেখলাম কষ্ট যখন করেছিই আর যেহেতু বড় ধরনের কোন ইনজুরি হয়নি কাজেই ফিরে গেলে এ কষ্টটাই বৃথা যাবে। তাই আমরা ঠিক করলাম সেন্টমার্টিন আমরা যাবই। যেমন ভাবা তেমন কাজ। ফেনী থেকে কক্সবাজারের সরাসরি কোন বাস নেই। তাই আমরা চট্টগ্রামের বাসে উঠলাম। চট্টগ্রাম পৌঁছতে পৌঁছতে সকাল দশটা বেজে গেল। চট্টগ্রাম নেমে আমরা নাস্তা সেরে নিলাম। তারপর আবার কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। কক্সবাজার যখন পৌছলাম তখন বিকেল পাঁচটা বাজে। কক্সবাজার এসে আরেক বিপত্তি হল হোটেল পাওয়া নিয়ে। কোন হোটেলে রুম নেই। খুজে খুজে টায়ার্ড হয়ে শেষমেষ লালদিঘির পারে খুব সস্তা একটা হোটেলে উঠলাম। গোসল সেরে খাওয়া দাওয়া করে যখন বীচে গেলাম তখন সন্ধ্যা হয়ে গেছে। অন্ধকার বীচে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আমরা সেন্টমার্টিন যাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য ছুটলাম। কয়েকটা টুরিস্ট এজেন্টে ঘুরে পরের দিনের কোন টিকেট পেলামনা। ব্যর্থ হয়ে যখন হোটেলে ফিরলাম তখন হোটেলের ম্যানেজারকে জিজ্ঞেস করলাম কিভাবে যাওয়া যায় সেন্টমার্টিন। সে একটা দারুন খবর দিল। ২৭ জনের একটা দল আগামীকাল সেন্টমার্টিন যাবে এবং ওরা এই হোটেলেই উঠেছে। ওদের ২জন শর্ট। কাজেই আমরা দুজন অনায়াসেই ওদের সাথে যেতে পারব। ওদের সাথে যাওয়া কনফার্ম করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম বার্মিজ মার্কেটে কিছু কেনাকাটা করার জন্য। কেনাকাটা সেরে মনে হল ঢাকা ফেরার টিকেটও এখনই করে ফেলা ভাল। কারন সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে যদি টিকেট না পাই। গাড়ীর টিকেট করতে গিয়ে দেখলাম এখানেও বিপত্তি। এসি কোন গাড়ীর টিকেট নেই। শেষে বাধ্য হয়ে নন-এসিরই টিকেট করে ফেললাম, পাছে এটাও হারাই।
পরদিন খুব ভোরে আমরা ওই টিমের সাথে রওয়ানা হলাম। ওদের সাথে আমরা কেবল টেকনাফ পর্যন্ত যাব। তারপর যে যার পথে যাবে, ওরা ওদের মত আর আমরা আলাদা হয়ে যাব। টেকনাফ পৌছে প্রথমেই আমরা গেট পাশ নিয়ে নিলাম। তারপর হালকা নাস্তা সেরে উঠে পড়লাম আমাদের নির্ধারিত শিপে (কুতুবদিয়া)। সকাল সাড়ে দশটায় শিপ টেকনাফ ত্যাগ করল এবং নাফ নদী ধরে এগিয়ে চলল আমাদের স্বপ্নের গন্তব্য সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে। আমি সেন্টমার্টিন এবারই প্রথম যাচ্ছি। তাই উত্তেজনাটা খুব বেশিই ছিল। কেবলই মুগ্ধ হচ্ছিলাম যতই এগিয়ে যাচ্ছি। নাফ নদী পেরিয়ে শিপ যখন সাগরে পড়ল তখন ঢেউ গুলো বড় হতে লাগল আর তাতে শিপ এদিক ওদিক দুলছিল। খানিকটা ভয়ও পাচ্ছিলাম। শুরু থেকেই আমাদের পিছু নেয় একঝাঁক গাঙচিল। প্রায় তিনঘন্টা সমূদ্রযাত্রার পর আমরা পৌছলাম আমাদের গন্তব্যে। প্রথম দেখাতেই আমি সেন্টমার্টিনের প্রেমে পড়ে গেছি। সেন্টমার্টিন আমার জীবনে দেখা সবচেয়ে সুন্দর জায়গা। সেন্টমার্টিন পৌছে কি করলাম সেটা এখন বলব না। ক্যামেরায় ধরে রেখেছি সেখানকার অসাধারন সব মুহুর্তকে। সেটা বলতে নয় আপনাদের দেখাতে চাই। কাজেই চলুন ছবিতে ছবিতে আপানাদের ঘুরিয়ে আনি সেন্টমার্টিন থেকে।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই জানুয়ারি, ২০১০ রাত ৯:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



