রাত এখন অনেক। দুইটা পয়ত্রিশ।
বাচ্চাকে বুকে নিয়ে নাকডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে স্ত্রী। কিন্তু আমার রাত্রি জাগতে ভালো লাগে। সেই বিশ্ববিদ্যালয় লাইফের অভ্যেস। কিন্তু একটু আগে যে ঘটনাটি ঘটে গেলো তার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। এই এতো রাতেও একটা ফোন এলো। রিংটোনের শব্দটা পুলিসের হু্ইসেল, রাতের নীরবতা ভেঙে সেটি এমন চিৎকার শুরু করল তাড়াতাড়ি ধরতে না পারলে বাবুর ঘুম ভেঙে যাবে। তাই পড়িমরি করে ফোনটা হাতে নিলাম কিন্তু কানে না বসাতেই ফোনটা পড়ে গেলো হাত থেকে। কয়েক টুকরা হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকল। সবগুলোকে এক করে জোড়া দিয়ে ফোনটা চালু করা গেছে কিন্তু ফোনটা করেছিল কে তা আর বের করা গেল না।...
মনটা তখন থেকেই বিষণ্ন। কে ফোন করেছিল এতো রাতে?
কারও কি কোনও বিপদাপদ হয়েছে?
ঢাকার বাসায় থাকি তিনভাই। বোন বাবা মা সবইতো দৃষ্টির বাইরে। তাদেরকে কি ফোন দিয়ে দেখবো? মাকে ফোন দেয়া যাবে না। মা খুবই ঘুমকাতুরে। বাবাকে দেবো? বাবা যে একটু অসুস্থ। খুব সম্প্রতি বড় একটা অসুস্থতা থেকে উঠলেন এখনও পুরোপুরি দুর্বলতা কাটেনি। তারও কি বুকটা ধড়ফর করে কেঁপে উঠবে না? আপুকে দেবো? ওর স্বামী হয়ত বিরক্ত হবে।
কী যে করি!
প্রায় আধাঘণ্টা পর ফোনটা আবার বাজলো।
এবার আর তাড়াহুড়ো করিনি কারণ এবার পুলিশী সাইরেন নেই বরং সাইলেন্ট মুডে।
আপুরই ফোন।
তুইই কি একটু আগে ফোন দিছিলি আপা?
হ্যাঁ
কী হয়েছে? এতো রাতে ফোন আমি তো দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছি।
ও শুনিসনি? রাইহানের দাদা মারা গেছে।
কখন?
রাত দেড়টার দিকে
হাসপাতালে না বাসায়?
হাসপাতালেই। অবস্থা বেশি ভালো না দেখে দুইতিনদিন আগেই হাসপাতালে নেয়া হয়েছিল।
কী হয়েছিল?
তেমন কিছু না, ওই যে অপারেশন করা হলো তারপর থেকেতো আর পুরোপুরি সুস্থই হলো না।
আপুর কণ্ঠ ভাঙা ভাঙা কিন্তু কান্না নেই। হয়ত কাল অনেক কাঁদতে হবে তাই জমা রাখছে। আর হাতেতো এখন অনেক কাজ। সবাইকে বলতে হবে কালকের প্ল্যান সাজাতে হবে।...
আমি খুব একটা দু:খ টের পেলাম না। ছোটবেলায় এই মানুষটার জন্য খাবার বয়ে নিতে হতো, টাইমলি। তখন থেকেই একটু বিরক্ত ছিলাম। বড় হয়ে বোনের সঙ্গে কী কী বৈষম্যমূলক আচরণ করেছে, কীরকম খারাপ জেনেছে এসব শুনেছি, নিজের চোখে দেখেছি বড় ছেলের বড় ছেলে রাইহানের সঙ্গে কেমন খেউ খেউ আচরণ করতো।....অথচ বাইরের মানুষ তাকে কতো শ্রদ্ধা করতো।...
মাকে ফোন দিলাম। আম্মু বলল আপা নাকি তার ফোনে ভ্যা ভ্যা করে কাঁদছে।
আপুর নিশ্চই শ্বশুরের খারাপ কিছু মনে নেই। থাকবে না। তবে শ্বশুর ওকে যতোটা না জ্বালিয়েছে শাশুড়ী জ্বালিয়েছে অনেক বেশি। খেতে পড়তে অনেক তালবাহানা পারশিয়ালটি করতো অথচ সেই বুড়ি যখন জীবন সায়াহ্নে এসে ওর কাছে থাকল তখন নিজের হাতে গু-মুত পরিষ্কার থেকে শুরু করে সব সেবাই করেছে আপা। মৃত্যুর পর কোনও দিন শাশুড়ীর কোনও বদনাম শুনিনি। আমরা কিছুটা স্মরণ করিয়ে দিলে বলতো শেষদিকে একদম অন্যরকম হয়ে গেছিল। ঠিক শ্বশুরের বেলায়ও ও তাই বলবে। ও কারও দুর্ব্যাবহারই বেশিদিন মনে রাখতে পারে না। আমরা আপন ভাইরা কতো খারাপ আচরণ করি, এরপর অসুস্থতা বা কোনও বিপদের কথা শুনলে ঠিকই নির্লজ্জের মতো ফোন করে। কীরে কী অবস্থা।...
দুলাভাইকে ফোন দেয়া উচিৎ, কিন্তু কী বলা উচিৎ! সান্ত্বনা দেবো? কী বলবো? সেসবতো গৎবাধা কথা সবাই জানে। তবু ফোন দিলাম। ফোনে ব্যালেন্স ছিল না। বাংলারিংক থেকে ধার নিলাম ৫টাকা। দুলাভাই এখন লাশবাহী গাড়িতে। লাশ গ্রামের বাড়ি নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
আমার কেবলই মনে হচ্ছিল আমি লোকটার প্রতি কিছুটা ক্ষুব্ধ। কেন সেটা বুঝতে পারছিলাম না। তবে একটা স্মৃতি মনে আছে । মানুষটা বড় আলেম বলে চারিদিকে সমাদৃত অথচ একদিন বোনের বাড়ি আসার পথে মাগরিবের নামাজের সময় হলো তিনি নামাজ পড়লেন না দেখে আমার ভীষণ অশ্রদ্ধা হয়েছিল। অথচ ভোলার পাবলিক বাসগুলোতেও নামাজের সময় বাস থামিয়ে নামাজের বিরতি দেওয়ার রেওয়াজ আছে। তবে তিনি যা করেছেন তা অন্যায় করেননি বরং এরকম নাকি বিধান আছে সফরে দুই ওয়াক্ত নামাজ একত্রে পড়া যায়। বিধান থাকলে শুধু শুধু অন্যকে কেন কষ্ট দিতে যাবেন। ধীরে ধীরে লোকটার প্রতি আমার কোনও ক্ষোভই আর থাকল না। বরং তার হাসি হাসি মুখটা মনে পড়ছিল। কী সুন্দর ছিল দেখতে। কথা বরতেন কম কিন্তু ইয়ার্কিও করতেন মাঝে মাঝে। আমরা খুব ভয় পেতাম বলে কাছে যেতাম না। মনে পড়লো আপুর একবার খুব অসুখ হলো কোনও ডাক্তার কবিরাজেই সুস্থ হচ্ছিল না তখন এই মানুষটিই কতোরকমের দোয়াকালাম করে আপুকে সুস্থ করে তুললেন!
এখন আমার সত্যিই খুব খারাপ লাগছে। আমি কি মনের অজান্তেই তার সঙ্গে কোনও দুর্ব্যবহার বা বেয়াদবি করেছিলাম? আমারতো ক্ষমা চাওয়া উচিৎ ছিল। সেই ছোটবেলা থেকে পরিচয়, হতেওতো পারে আমার কোনও আচরণে তিনি মনে কষ্ট রেখেছেন!
রাত বেরেই চলেছে। জানি না কাল অতো দূরের গ্রামের বাড়িতে যেতে পারবো কি না। তবু ঘুমানো উচিৎ। কিন্তু যাদের ঘরে আজ লাশ পড়ে আছে কেমন আছে তারা?
একদিন এমনকরেইতো সবাইকে চলে যেতে হবে। যখন তখন যে কোনও মুহূর্তে।
মৃত্যুর আগে বড় নাতির ব্যাপারে তার আগ্রহের কথা বলে গেছে। ওকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াবি। নাতিও সারাক্ষণ হাসপাতালে দাদার সেবায় নিবেদিত ছিল।
শত হোক দাদাতো!
আমিই আসলে অনেক সংকীর্ণমনা।
আল্লাহ আমায় ক্ষমা করো। আর আমিও যেন মানুষকে ক্ষমা করতে পারি সেই উদারতা তুমি আমায় দান করো। এই গভীর রাতে এইই আমার প্রার্থনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


