পর্ব : ৩
কাকরাইল জনকল্যাণ ভবনে কুরআন শিক্ষা সোসাইটি আয়োজিত একটি সেমিনারে গিয়েছিলাম। প্রতি মাসেই হাজির থাকার চেষ্টা করি। অসম্ভব ভালো লাগে এই সেমিনারটা আমার। আজকের বিষয় ছিল ‘ইসলামে নারীর অর্থনৈতিক অধিকার।’
উপস্থাপিত প্রবন্ধ এবং আলোচনা এতো চমৎকার আর জ্ঞানগর্ভ ছিল যে অভিভুত হয়ে শুধু শুনেছি -সেই কথা ভাবতে ভাবতেই আসছিলাম। সি.এন.জির ড্রাইভার ছেলেটির কথায় ধ্যান ভাঙ্গল যেন আমার। ‘দেখেন খালাম্মা এরাও মুসলমান।’ সামনে তাকাতেই দেখলাম অর্ধ উলঙ্গ এক বৃদ্ধ। শরীরে যা একটু পোশাক আছে তা ময়লা নোংরা। চুল দাড়ীতে জটা ধরে গেছে। ধীরে ধীরে রাস্তার পাশ দিয়ে হেটে যাচ্ছে আর একদল নারী পুরুষ তার পিছনে পিছনে হাটছে। এই দৃশ্য আমি আগেও দেখেছি। মোহাম্মাদপুর আমার বাসার কাছেই নুরজাহান রোডে- এর আস্তানা। শুনেছি এ লোকের নাকি আরো দুই তিনটা আস্তানা আছে। এ লোকের নাম হায়দার জুলফিকার আলী। তার অনেক ভক্ত। ভক্তরা সবাই তাকে হায়দার বাবা বলে ডাকে। হায়দার বাবা গোটা ঢাকা শহরে হেটে বেড়ায়। খুব ধীরে ধীরে হাটে। তার ভক্তরাও ধীরে ধীরে তার পেছনে হাটে। সে যখন তার আস্তানায় বসে থাকে, ভক্তরা খাদ্য দ্রব্য এনে তার কাছে স্তুপ করে রাখে। আর তার সামনে চুপচাপ বসে থাকে। ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস হায়দার বাবা যার দিকে একবার করুনার দৃষ্টিতে তাকাবে তার ভাগ্য খুলে যাবে। সে সফলকাম হবে। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী-গরীব অনেকেই তার ভক্ত। সেদিন আমার ছেলেকে পাঠিয়ে ছিলাম হায়াদার বাবা সম্পর্কে কিছু তথ্য এনে দেওয়ার জন্য। আমার ছেলে এসে বল, “মা! আমি হায়দার বাবার আস্তানার পাশেই এক হোমিও চেম্বারে গিয়ে বসলাম। হায়দার বাবা তখন দলবল নিয়ে বেরিয়েছে। তার কাফেলায় আরো দুই তিন জন উঠতি হায়দার বাবাও আছে। চুল দাড়ী পোশাক পরিচ্ছদে হায়দার বাবার অনুসরণ করছে। যা-হোক আমি হোমিও ডাক্তার সাহেবকে বললাম, ‘এই হায়দার বাবা সম্পর্কে কিছু জানেন কি? হোমিও ডাক্তার সাহেব বলেন, ‘শুনেছি তার নাকি অনেক অলৌকিক ক্ষমতা আছে!’
বললাম,‘আপনি বিশ্বাস করেন?’ ‘আমি ঠিক বিশ্বাস করি না তবে তার বিরুদ্ধে কিছু বলতেও চাইনা।’ ‘কেন? বলতে ভয় পান?’
আমি এখানে পনের বছর থেকে আছি। এই পনের বছরে হায়দার বাবাকে আমি একদিনও অসুস্থ্য হতে দেখিনি। আর তার কোনো পরিবর্তনও দেখিনা।’
‘তার মানে আপনি তাকে মনে মনে সমীহ করেন।’
ডাক্তার সাহেব আমতা আমতা করে বললেন, ‘আল্লাহ কার মধ্যে কি রেখেছেন ভাই... এলাকার অনেকেরই এই ধারণা। অনেকে তাকে পীর, দরবেশ, আল্লাহর অলী মনে করে। অথচ এই লোকটির সাথে ইসলামের দুরতম সম্পর্কও নেই।
হায়দার বাবা আর তার কার্যক্রমকে একটু কোরআন হাদিস দিয়ে যাচাই করে দেখি।
এই হায়দার বাবা এক ওয়াক্ত নামাজও পড়ে না আর পবিত্রতার সামান্যতম জ্ঞানও তার নেই। সে নিজে যেমন গোমরাহ তার সম্পর্কে যারা উচ্চ ধারণা পোষণ করে তার আরও বেশি গোমরাহ।
রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহপাক বান্দার সব ধরনের গুনাহ-ই মাফ করেন কিন্তু শির্কের গুনাহ মাফ করেন না।’
আর সব চেয়ে বড় শির্ক হলো কারো সম্পর্কে এমন ধারণা পোষণ করা যে, সে আমার উপকার ও ক্ষতি করার ক্ষমতা রাখে। তার করুনা দৃষ্টিতে সকল প্রকার সমস্যা সংকট বিপদ মুসিবত দুর হয়ে যেতে পারে।
নোংরা অপরিচ্ছন্ন থাকাকে রাসূল (সা.) ‘শয়তানের মতো থাকা’ বলেছেন। একবার এক সাহাবীকে উসকো, খুশকো চুল আর ময়লা অপরিচ্ছন্ন পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখে তাকে গোসল করে, ভালো পোশাক পরে, চুল আঁচড়িয়ে আসতে বলেন। সাহবী রাসূল (সা.) এর নির্দেশ অনুযায়ী সেই ভাবে পরিচ্ছন্ন হয়ে এলেন। রাসূল (সা.) তাকে দেখে খুশি হলেন। বললেন, দেখতো তোমাকে কতো সুন্দর লাগছে। এর আগে তো তোমাকে লাগছিল শয়তানের মতো।’
রাসূল (সা.) নিজে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকতেন, উম্মতকে পরিচ্ছন্ন থাকার শিক্ষা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘আল্লাহ নিজে সুন্দর তাই সুন্দরকে পছন্দ করেন।’ বলেছেন, ‘পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ।’ তাহলে আমরা কেমন মুসলমান? যে নোংরা অপরিচ্ছন্নতাকে রাসূল (সা.) ঘৃণা করতেন আমরা সেই অপরিচ্ছন্নতাকে মনে করি বুজুর্গি বা দরবেশী। রাসূল (সা.) এর যুগে, সাহাবীদের যুগে এমন কি তার পরবর্তী যুগেও নামাজ ত্যাগ করার কথা কোনো মুসলমান কল্পনাও করতে পারতনা। মোনাফিকরাও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ত। কারণ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ না পড়লে তাকে কিছুতেই মিল্লাতে রাসূলুল্লাহ বা মুসলিম সমাজের সদস্য বলে গণ্য করা হতো না। আমরা প্রকাশ্যে দেখছি এ সব হায়দার বাবারা এক ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে না। ইসলামী নিয়ম নীতির কোনো ধারই ধারে না। এদের তো মুসলমান থাকার কোনো অবকাশই নেই। আর এদের পেছনে যারা ঘুরে কল্যাণের আশায়, বিপদ মুক্তির আশায় তারা পুরোপুরি শির্কে লিপ্ত। আল্লাহ পাকের ভাষায় ‘আখেরাতের কঠিন যন্ত্রণাদায়ক আজাবে নিক্ষিপ্ত হবে এই সব শির্ককারীরা। যদি এখনও তওবা করে সমস্ত শির্কী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকে তো ভিন্ন কথা। ’ আর যারা হায়দার বাবাদের পেছনে পেছনে ঘুরে না কিন্তু মনে মনে এই সব নোংরা বাবাদের ভয় পায়। সমীহ করে, তারাই বা কেমন মুসলমান?
১. মুসলমানের অন্তরে কোনো কুস্কার থাকবে না।
২. কোনো তেলেসমাতি কারবারে বিশ্বাস করে না ।
৩. কুরআন হাদীস বহির্ভূত সব ধরনের আমল তারা পরিত্যাগ করবে ।
৪. তাদের সকল প্রকার চাওয়া হবে একমাত্র আল্লাহ সুবহানাহু তা‘য়ালর কাছে ।
৫. পোশাক পরিচ্ছদ এবং দেহ হবে পরিচ্ছন্ন ঝকঝকে তক তকে। আল্লাহ পাক বলেন ,‘হে কম্বল মুড়ি দিয়ে শয়নকারী ওঠো তোমার রবের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো। তোমার পোশাক পবিত্র রাখো এবং অপবিত্রতা থেকে দুরে থাকো। ’ (সূরা মুদ্দাসসির, আয়াত:১-৪)
৬. মুসলমান অশিক্ষা কুশিক্ষা ও অপ্সানতার অন্ধকার থেকে দুরে থাকবে।
৭. জ্ঞান বিজ্ঞানের আলোতে আলোকিত থাকবে মুসলমানের জিন্দেগী ও চিন্তা চেতনা।
ইসলামের নামে অনেক অনৈসলামিক বিষয় ও কর্মকান্ডের বিষবাষ্পে জর্জরিত হয়ে পড়েছে মুসলিম সমাজ। আমাদের চোখে সামনে যদি এসব চলতে থাকে আর আমরা জেনে শুনে তার কোনো প্রতিবাদ না করি - তাহলে আমরাই বা কেমন মুসলমান?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



