বিশ্ব মানবতার মুক্তি ও শান্তি এবং কল্যাণ একমাত্র আল্লাহ প্রদত্ত বিধান ও রাসূল প্রদর্শিত পথেই নিহিত রয়েছে। সুতরাং আমাদেরকে সেই পথেই চলতে হবে। এর বাইরে চলা মানে নিজেকে ধ্বংস করা। ধ্বংসের পথসমূহের মধ্য হতে একটি হলো নিজের নফসকে নিজেই হত্যা করা, যা আমরা অন্য ভাষায় আত্মহত্যা বলতে পারি। এই আত্মহত্যা মহাপাপ। এই পাপের একমাত্র শাস্তি হলো জাহান্নাম।
পাপের সংজ্ঞা
শরীয়তের পরিভাষায় মাসিয়াত বা পাপ হল, আল্লাহ তা'আলা যা করা বান্দার জন্য আবশ্যক করেছেন, তা পালনে বিরত থাকা, এবং যা হারাম করেছেন, তা পালন করা। শরীয়তের পরিভাষা ব্যবহারে পাপকে বুঝানোর জন্য বিভিন্ন শব্দের উলে−খ পাওয়া যায়, যেমন যান্ব, খাতীআ, ইসম, সাইয়্যিআ ইত্যাদি।
এর চুড়ান্ত বিপজ্জনক দিক হল, তা মানুষকে দূরে নিক্ষেপ করে আল−াহ ও তার রহমত হতে, টেনে নেয় আল্লাহর ক্রোধ ও জাহান্নামের ভয়ানক পরিণতির দিকে। পাপের ক্রম ও ধারাবাহিকতা মানুষকে মাওলার সান্নিধ্য হতে ক্রমে দূরে নিক্ষেপ করে। এ কারণে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে পূণ: পূণ: এ সম্পর্কে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন, পাপ থেকে দূরে অবস্থানের নির্দেশ দিয়েছেন ও পাপের কারণে অতীত জাতিগুলোর উপর যে সকল আযাব-গজব ও নিরন্তর দুর্যোগ নেমে এসেছিল তার বিবরণ তুলে ধরেছেন সবিস্তারে। সাবধান হতে বলেছেন এগুলো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে।
ইরশাদ হয়েছে : যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে জেনে রাখ, তাদের কিছু পাপের কারণে আল্লাহ তাদের শাস্তি দিতে চান। (সূরা মায়েদা : ৪৯)
অনুরূপভাবে, রাসূল (সঃ) উম্মতকে পাপ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন অসংখ্য হাদীসে। উদাহরণত: তিনি বলেছেন ‘তোমরা সাতটি ধ্বংসাত্মক পাপ থেকে দূরে থাকবে ... (বুখারী )
রাসূল (সঃ) উক্ত হাদীসে ‘ইজতিনাব’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। শব্দটি খুবই ইঙ্গিতবহ, কারণ, ‘ইজতিনাব’-এর মর্মার্থ হল, পাপ ও পাপের প্রতি মানুষের মনকে লালায়িত করে, এমন যে কোন কিছুকে সযত্নে এড়িয়ে চলা, কেবল পাপ বর্জনের মাধ্যমে রাসূলের উক্ত বাণীর সার্থক প্রতিফলন হবে না।
পাপের প্রকারভেদ :
পাপ দু'ভাগে বিভক্ত:
(১) কবীরা-মারাত্মক পাপ। (২) ছগীরা বা লঘুপাপ।
পাপ দু’ভাগে বিভক্ত হওয়ার ব্যাপারে কুরআন-হাদীসের দলীল ও প্রমাণাদি অসংখ্য, নিম্নে তার কয়েকটি উদ্ধৃত করা হল:
(ক) আল-কুরআনে এসেছে: ‘নিষিদ্ধ বিষয়গুলোর মাঝে যা গুরুতর, তা হতে যদি তোমরা বিরত থাক, তবে তোমাদের ছোট পাপগুলো ক্ষমা করে দিব।’ (সূরা নিসা : ৩১)
(খ) হাদীসে এসেছে, রাসূল (সঃ) বলেন : ‘পাঁচ ওয়াক্ত সালাত ও এক জুমা' হতে অপর জুমা’ হল এসবের মধ্যবর্তী সময়ে কৃত পাপের কাফফারা (প্রায়শ্চিত্ত) যদি কবীরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা হয়।’ (তিরমিযী )
কবীরা ও ছগীরা গুনাহের ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত বর্ণনা
প্রথমত : কবীরা গুনাহ
কিছু কিছু পাপকে কুরাআন ও হাদীসের স্পষ্ট প্রমাণের আলোকে কবীরা গুনাহ হিসেবে শনাক্ত করা যায়, যেমন, আল্লাহর সাথে অংশিদারিত্ব সাব্যস্ত করা, পিতা-মাতার অবাধ্যতা, অন্যায় হত্যা, যাদু, মিথ্যা সাক্ষ্য ইত্যাদি।
আর যে সব গুনাহ সম্পর্কে কবীরা হিসেবে স্পষ্ট ঘোষণা কুরআন বা হাদীসে আসেনি এরূপ পাপসমূহের কোনটি কবীরা তা নির্ণয় ও শনাক্তির জন্য আইনজ্ঞ উলামাগণ একটি মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন। কবীরা গুনাহের সংজ্ঞা নিরূপনে ইসলামী আইন বিশারদদের মতামত এই যে, যে পাপ কুরআন ও হাদীসের দলীল দ্বারা কঠোরভাবে হারাম হওয়া প্রমাণিত, যার ব্যাপারে লা’নত ও গজবের ঘোষণা এসেছে, কিংবা জাহান্নামের হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়েছে, অথবা দুনিয়াতে শাস্তির বিধান দেওয়া হয়েছে, তাকে ইসলামের পরিভাষায় কবীরা গুনাহ বলা হয়। আত্মহত্যার মত জঘন্য পাপও কবীরা গুনাহের অন্তর্ভূক্ত। নিম্নে আত্মহত্যা সম্পর্কে আলোচনা করা হলো;
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন; “আর তোমরা নিজেদেরকে হত্যা (আত্মহত্যা) করো না; নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি দয়াশীল।” (সূরা নিসা:২৯) আর বিশ্ব শান্তির অগ্রদূত মুহাম্মদ (সঃ) দয়ার নবী তিনি আত্মহত্যাকারীর জানাযার নামায আদায় করেন নি। জাবের বিন সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সঃ) এর নিকট এমন এক ব্যক্তির লাশ আনা হলো যে লোহার ফলা দ্বারা আত্মহত্যা করেছে, রাসূল (সঃ) তার জানাযার নামায পড়ান নি। (বুখারী ও মুসিলম) আত্মহত্যাকারী কত বড় হতভাগা যে, রাসূল (সঃ) তার জানাযার নামায পড়লেন না। যে কোন কারণেই আত্মহত্যা করা হোক না কেন? এটা জঘন্য পাপ। আত্মহত্যা সম্পর্কে রাসূলে কারীম (সঃ) কঠোর হুঁশিয়ারী বাণী উচ্চারণ করেগেছেন; নিুে তদসংক্রান্ত বাণীর বর্ণনা দেওয়া হলো।
আত্মহত্যাকারীর জন্য জান্নাত হারাম; জুন্দুব বিন আব্দুল্লাহ নবী (সঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন; একজন ব্যক্তি জখম হলে সে অধৈর্য হয়ে আত্মহত্যা করে, এরই প্রেক্ষিতে আল্লাহ তা’আলা বলেন; আমার বান্দাহ আমার নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই নিজের জীবনের ব্যাপার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমি তার উপর জান্নাত হারাম করে দিলাম। (বুখারী)
ব্যক্তি যে বস্তু দ্বারা আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামে তাকে সেই বস্তু দ্বারা শাস্তি দেওয়া হবে। কেউ বিষ পান করে মারা গেলে তাকে জাহান্নামে বিষ পানের মাধ্যমে শাস্তি দেওয়া হবে। অর্থাৎ উক্ত বস্তু তার হাতে দেওয়া হবে, ব্যক্তি বার বার ঐ বস্তু দ্বারা আত্মহত্যা করতে থাকবে। ছাবিত বিন যাহ্হাক (রাঃ) বর্ণনা করেন, রাসূলে কারীম (সঃ) বলেন; যে ব্যক্তি কোন লৌহ অস্ত্রাঘাতে আত্মহত্যা করবে তাকে সেই লৌহ অস্ত্র দিয়েই জাহান্নামে শাস্তি দেওয়া হবে। অর্থাৎ যেভাবে লৌহ অস্ত্র দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল, ঠিক সেভাবে সে জাহান্নামে আত্মহত্যা করতে থাকবে। ( বুখারী) হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন রাসূল (সঃ) বলেছেন; যে ব্যক্তি শ্বাসরোধ (গলায় ফাঁস দিয়ে) করে আত্মহত্যা করবে, যে জাহান্নামে এভাবেই আত্মহত্যা করতে থাকবে। আর যে ব্যক্তি অস্ত্রের আঘাতে আত্মহত্যা করবে সে জাহান্নামে এভাবেই আত্মহত্যা করতে থাকবে। (বুখারী)
কোন মুমিন ব্যক্তিকে অভিসম্পাত করা অথবা কোন মুমিনকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হত্যা কারার সমান পাপ।
ছাবিত বিন যাহ্হাক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (সঃ) বলেছেন; যে ব্যক্তি যে বস্তু দ্বারা দুনিয়ায় আত্মহত্যা করবে তাকে কিয়ামতের দিবসে সেই বস্তু দ্বারাই শাস্তি দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি কোন মুমিন ব্যক্তিকে অভিসম্পাদ করলো সে যেন তাকে হত্যা করে ফেললো, আর যে ব্যক্তি কোন মুমিন ব্যক্তিকে মিথ্যা অপবাদ দিলো সেও যেন তাকে হত্যা করে ফেললো। (বুখারী)
আত্মহত্যার কারণ:
আত্মহত্যার পশ্চাদে বিভিন্ন কারণ রয়েছে, যেমন সাংসারিক কলহ, দন্দ্বে পড়ে অতিরিক্ত রেগে যাওয়া। নিজের কাঙ্খিত কোন কিছু লাভ করতে যেয়ে নিরাশ বা বঞ্চিত হওয়া। লজ্জা ও মানহানীকর কোন কিছু ঘটে যাওয়া বিষয় অপ্রত্তাশিতভাবে প্রকাশ হওয়া। দরিদ্রতার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকার অসুখ বিসুখে জর্জিত হওয়া। এক্ষেত্রে দেখা যায় মহিলারাই অগ্রগামী। অর্থাৎ আত্মহত্যা জনিত পাপ তাদের মাঝেই বেশী সংঘটিত হয়। কারণ তাদের রয়েছে সীমাহীন রাগ আর ধৈর্যের অভাব।
প্রিয় পাঠক! ইতোপূর্বে আমরা উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা জানতে পেরেছি আত্মহত্যা মহাপাপ। সুতারং আমাদের উচিত হলো নিজেদের রাগকে সংবরণ করা। যাতে করে এহেন মহাপাপ থেকে আমরা মুক্ত থাকতে পারি।
আমরা কিভাবে পাপ থেকে মুক্ত হতে পারি ?
পাপকর্মের সাথে কমবেশী আমরা সবাই জড়িত। তবে পাপীদের মধ্যে তারাই উত্তম যারা তাওবা করে। আমাদের মধ্যে কেউ পাপকাজে জড়িয়ে পড়ল, আল−াহ যা পছন্দ করেন না এমন কাজ করে বসল, একবারের পর আবার করল। অবচেতন নয় বরং সম্পূর্ণ চেতনা নিয়েই করল। তবে পরবর্তীতে সে অনুতপ্ত হল। মানসিকভাবে ব্যাথা অনুভব করল। মনে মনে নিয়ত করল, যদি কাজটা ছেড়ে দিতে পারি তাহলে আর কখনো করব না। কিন্তু কয়েকদিন পর আবার পদস্খলন ঘটল। সে পাপটি আবার করল। আবার অনেকেই এমন আছেন যারা পাপ করেন সংগোপনে আর মনে মনে বলেন, যদি এই সমস্যাটি না থাকত তাহলে পাপকাজ করতাম না। সমস্যাটি দূর হয়ে গেলে পাপ ছেড়ে ভাল হয়ে যাব। পাপ করে এ ধরনের মানসিক অবস্থায় যে পড়ে, তার মানবাত্মা জাগ্রত। সে আল−াহর ইচ্ছায় একদিন পাপ থেকে বেরিয়ে আসবে, পাপাচারের অন্ধকার থেকে মুক্তি লাভ করতে সক্ষম হবে।
পাপাচার থেকে মুক্তি লাভের উপায়*
পাপকে বিপজ্জনক মনে করা তা ক্ষুদ্র হলেও, যে কোন পাপ পরিত্যাগে সচেষ্ট হওয়া। * পাপ ছোট হলেও তা তুচ্ছ জ্ঞান করতে নেই, তা হতে নিজেকে আত্মরক্ষা করা। * পাপ করে প্রকাশ না করা। * অনতিবিলম্বে খাঁটি তওবা করা। * যতবার পাপ ততবার তওবা। * যে সকল বিষয় পাপের দিকে নিয়ে যায় তা বর্জন করা। * সর্বদা আল্লাহর কাছে ইস্তেগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা করা। * পাপের পর সৎ-কর্ম করা যাতে সৎ-কর্ম পাপকে মিটিয়ে দেয়। * তাওহীদ বা আল্লাহর একাত্ববাদের যথার্থ বাস্তবায়ন। * সৎলোকের সাহচর্য অবলম্বন করা। * ধৈর্য্য ও অন্তরের দৃঢ়তা। * পাপের বিপদ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা। * অন্তরের প্রতারণা থেকে সতর্ক থাকা জরূরী। উল্লেখিত বিষয়গুলো স্মরণ রাখতে পারলে আশা করা যায় পাপ থেকে মুক্ত থাকা যাবে ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ আমাদের সকলকে পাপ থেকে মুক্ত থাকার তাওফীক দান করুন। আমীন
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৮ দুপুর ১২:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


