আল্লাহ তা'আলা সূরা ফুরকানের ৬৩-৭৪ আয়াত পর্যন্ত তার বিশেষ ও প্রিয় বান্দাদের ১২টি গুণের কথা বলেছেন। এগুলোর মধ্যে বিশ্বাস, সংশোধন, দৈহিক ও আর্থিক যাবতীয় ব্যক্তিগত কর্মে আল্লাহ ও রাসূলের বিধান ও ইচ্ছার অনুসরণ, অপর মানুষের সাথে সামাজিকতা ও সম্পর্ক স্থাপনের প্রকারভেদ, দিবারাত্রি এবাদত পালনের সাথে আল্লাহভীতি যাবতীয় গুনাহ থেকে বেঁচে থাকার প্রয়াস, নিজের সাথে সন্তান সন্ততি ও স্ত্রীদের সংশোধন চিন্তা ইত্যাদি বিষয় বস্তু শামিল আছে।
প্রথম গুণঃ রহমানের প্রিয়বান্দা তারাই যারা পৃথিবীতে নম্রতা সহকারে চলাফেরা করে। (সূরা ফুরকান: ৬৩)
অর্থাৎ গর্বভরে অহংকারীর ন্যায় না চলে বরং স্থিরতা গাম্ভীর্য বিনয়ের সাথে চলাফেরা করে। উদ্দেশ্য এ নয় যে খুব ধীরে চলবে। কেননা বিনা প্রয়োজনে ধীরে চলা সুন্নত বিরোধী, শামায়েলের হাদীস থেকে জানা যায় যে রাসূল (সঃ) খুব ধীরে চলতেন না বরং কিছুটা দ্রুত গতিতে চলতেন। হযরত হাসান বসরী (রাঃ) উক্ত আয়াতের তফসীরে বলেন খাটি মুমিনের সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গ চক্ষু কর্ন হাত পা আল্লাহর সামনে হীন ও অক্ষম হয়ে থাকে। অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে দেখে অপারগ ও পঙ্গু মনে করে অথচ তারা রুগ্নও নয় পঙ্গুও নয় বরং সুস্থ ও সবল। তবে তাদের উপর আল্লাহভীতি প্রবল যা অন্যদের উপর নেই। তাদেরকে পার্থিব কাজকর্ম থেকে পরকালের চিন্তা নিবৃত রাখে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আল্লাহর উপর ভরসা করে না এবং তার সমস্ত চিন্তা দুনিয়ার কাজেই ব্যাপৃত, সে সর্বদা দুঃখ ভোগ করে। কারণ, সে তো দুনিয়া পুরোপুরি পায় না এবং পরকালের কাজেও অংশ গ্রহণ করে না। যে ব্যক্তি পানাহারের বস্তুর মধ্যেই আল্লাহর নে'য়ামত সীমিত মনে করে এবং উত্তম চরিত্রের প্রতি লক্ষ্য করে না তার জ্ঞান খুবই অল্প এবং তার জন্য শাস্তি তৈরী রয়েছে। (ইবনে কাসীর)
২য় গুণঃ যখন অজ্ঞতা সম্পন্ন লোক তাদের সাথে কথা বলে তখন তারা বলে সালাম। (সূরা ফুরকানের: ৬৩ নং আয়াতের শেষাংশ) অর্থাৎ মুর্খদের জবাবে তারা নিরাপত্তার কথাবার্তা বলে নিজের জন্য কোন প্রতিশোধ নেয় না। যাতে অন্যরা কষ্ট না পায় এবং তারা নিজেরাও গুনাগার না হয়।
৩য় গুণঃ তারা রাত্রি যাপন করে তাদের পালনকর্তার সামনে সেজদা করা অবস্থায় ও দন্ডায়মান অবস্থায়। (ফুরকান: ৬৪) এবাদতের জন্য রাত্রি জাগরণের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করার কারণ এই যে এ সময়টি নিদ্রা ও আরামের। এতে নামাজ ও এবাদতের জন্য দন্ডায়মান হওয়া যেমন বিশেষ কষ্টকর, তেমনি এতে লোক দেখানো ও নাম যশের আশংকাও নেই। উদ্দেশ্য এই যে তারা দিবা রাত্রি আল্লাহর এবাদতে মশগুল থাকে। দিবাভাগে শিক্ষাদান প্রচার জিহাদ ইত্যাদি কাজ করে এবং রাত্রিকালে আল্লাহর সামনে এবাদত করে। হাদীসে তাহাজ্জুদ নামাজের অনেক ফযীলত বর্ণিত হয়েছে। রাসূল (সঃ) এরশাদ করেন; নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়। কেননা এটা তোমাদের পূর্ববর্তী সব নেক বান্দার অভ্যাস ছিল। এটা তোমাদেরকে আল্লাহ তা'আলার নৈকট্য দানকারী, মন্দকাজের কাফ্ফারা এবং গুনা থেকে নিবৃতকারী। (তিরমিজী, মাযহারী)
হযরত ওসমান (রাঃ) থেকে বর্ণিত রাসূল (সঃ) এরশাদ করেন; যে ব্যক্তি এশার নামাজ জামাতের সাথে আদায় করে সে যেন অর্ধ রাত্রি এবাদতে অতিবাহিত করল এবং ফজরের নামাজ ও জামাতের সাথে আদায় করলে তাকে অবশিষ্ট অর্ধেক রাত্রিও এবাদতে অতিবাহিতকারী গণ্য করা হবে। (মুসলিম, আহমদ)
৪র্থ গুণঃ তারা বলে হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের হতে জাহান্নামের শাস্তি বিদূরিত করুন; এর শাস্তি তো নিশ্চিত বিনাশ। আর জাহান্নাম আশ্রয়স্থল ও বসতি হিসেবে কত নিকৃষ্ট! ( সূরা ফুরকান ৬৫,৬৬)
সুতরাং আমাদের সবার উচিত এবাদতের সাথে সাথে আল্লাহর কাছে জাহান্নাম থেকে মুক্তির জন্য দোয়া করা।
৫ম গুণঃ আল্লাহর প্রিয় বান্দারা ব্যয় করার সময় অপব্যয় করে না এবং কৃপনতা ও ত্রুটি করে না বরং উভয়ের মধ্যবর্তী সমতা বজায় রাখে। ( সূরা ফুরকান: ৬৭) আরবী ইসরাফ শব্দের অর্থ সীমা অতিক্রম করা, অপব্যয় করা অর্থাৎ আল্লাহর অবাধ্যতার কাজে ব্যয় করা যদিও তা এক পয়সা হয় এবং বৈধ ও অনুমোদিত কাজে প্রয়োজনাতিরিক্ত ব্যয় করাও অপব্যয়ের অন্তর্ভূক্ত। কেননা ‘তাবযীর’ তথা অনর্থক ব্যয় কুরআনের অন্য আয়াত দ্বারা হারাম ও গুনাহ । আল্লাহ তা'আলা বলেন; অনর্থক ব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই (সূরা আল ইসরা: ২৭)। সারমর্ম কথা হচ্ছে- গুনার কাজে যা-ই করা হয় তা অপব্যয় তথা হারাম। ইকতার অর্থ ব্যয়ে ত্রুটি ও কৃপনতা করা অর্থাৎ যে সব কাজে আল্লাহ ও রাসূল (সঃ) ব্যয় করার আদেশ দিয়েছেন তাতে কম ব্যয় করা সুতরাং মোটেই ব্যয় না করা আরো মারাত্বক। অতএব আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের গুণ হচ্ছে তারা ব্যয় করার ক্ষেত্রে অপব্যয় ও ত্রুটির মাঝখানে সততা ও মিতাচারের পথ অনুসরণ করে। রাসূল (সঃ) বলেন; ব্যয় করতে গিয়ে মধ্যবর্তীতা অবলম্বন করা মানুষের বুদ্ধিমত্তার পরিচায়ক (আহমদ)।
অপর এক হাদীসে রাসূল (সঃ) বলেন; যে ব্যক্তি ব্যয় কাজে মধ্যবর্তিতা ও সমতার উপর কায়েম থাকে সে কখনো দরিদ্র ও অভাবগ্রস্থ হয় না। (আহমদ)
৬ষ্ট গুণঃ আল্লাহর প্রিয় বান্দাগন এবাদতে আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করে না। (সূরা ফুরকানের ৬৮ নং আয়াতের প্রথমাংশ) এতে জানা গেল যে শিরক সর্ববৃহৎ গুনাহ।
৭ম ও ৮ম গুনঃ এখান থেকে কার্যগত গুনাসমূহের মধ্যে কতিপয় প্রধান ও কঠোর গুনাহ সম্পর্কে বর্ণনা করা হয়েছে, যে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা এসব গুনাহর কাছে যায় না। তারা কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে না এবং ব্যভিচারের নিকটবর্তী হয় না। (সূরা ফুরকান: ৬৮)
বিশ্বাস ও কর্মের এই তিনটি বড় গুনাহ (শিরক, হত্যা, যিনা) বর্ননা করার পর আল্লাহ তা'আলা বলেন; যে ব্যক্তি উল্লেখিত গুনাহসমূহ করবে সে তার শাস্তি ভোগ করবে, শাস্তি খুব কঠিন হবে। কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং সৎ কর্ম করবে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন। যাহা পরবর্তী আয়াত দ্বারা বুঝা যায়।
৯ম গুণঃ তারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং অর্থহীন কাজ কর্মকে ভদ্রভাবে এড়িয়ে যায়। আল্লাহপাক এরশাদ করেছেন:এবং যারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং যখন অর্থহীন ও অনর্থক কাজ কর্মের সম্মুখীন হয় তখন সম্মান মর্যাদা রক্ষা করে ভদ্রভাবে চলে যায়। (সূরা ফুরকান: ৭২)
আল্লাহর নেক বান্দাগণ মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না, কারণ এতে অন্যের ন্যায়সঙ্গত অধিকার খর্ব হয়। অপর দিকে অন্যায়কে সাহায্য করা হয়। অন্যায় ও মিথ্যার চর্চা হয় এমন কোন স্থানে তারা কখনো উপস্থিত হয় না। শিরক হয় এমন কোন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকে না। তারা গান-বাজনা ও নাচের অনুষ্ঠানে যায় না।
হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস উক্ত আয়াতে যূর শব্দের অর্থ করেছেন, মুশরিকদের ধর্মীয় উৎসবাদী। (কুরতুবী খ: ১৩ পৃ: ৭৯) তাঁর এ ব্যাখ্যা অনুযায়ী আয়াতের অর্থ হবে আল্লাহর নেক বান্দাগণ অমুসলিমদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে যায় না। তাঁরা যে মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না, অনৈতিক কোন কাজ করে না ও অশুভনীয় কোন আচার অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয় না শুধু তাই নয়, যদি কখনো এসবের কাছ দিয়ে যেতে হয় তাহলে তারা খুবই সতর্কতার সাথে এসব এড়িয়ে চলে।
আয়াতের শেষাভাগের অর্থ- যখন তাঁরা অর্থহীন কোন কাজের পাশ দিয়ে যায়, তখন সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করে তা অতিক্রম করে। মুমিন কোন ধরনের অর্থহীন কথা বলতে পারে না, অর্থহীন কাজ করতে পারে না। এটি সফল মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। মুমিন নিজকে কখনো অনর্থক ও গুরুত্বহীন কোন বিষয়ে জড়ায় না। মুমিন তো তার সময়ের শ্রেষ্ঠ ব্যবহার করবে। সময় নামক মূল্যবান পূঁজির সর্বোত্তম বিনিয়োগ করবে। এমন কথা ও কাজে সময় খরচ করবে যা তার জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে দুনিয়া ও আখেরাতে। সে অত্যন্ত দায়িত্বশীলতার সাথে তার সময় কাজে লাগাবে। (চলবে......)
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জানুয়ারি, ২০০৯ দুপুর ১২:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


