(৩য় পর্ব)
এসব তথ্য প্রমাণ সামনে রেখেই মাকর্সবাদীরা দাবী করেন, অর্থাৎ নৈতিক কারণই হচ্ছে একমাত্র বাস্তব কারণ যা নিয়ন্ত্রণ করে জীবনের গতিধারাকে। তাদের মতে ইউরোপীয় নারীর সমস্যাও এ অর্থ নৈতিক কার্যকারণেরই ফল। জীবনে অর্থনৈতিক ঘটনাক্রমের গুরুত্ব রয়েছে একথা আমরা স্বীকার করি। কিন্তু একই সংগে আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, ইসলামের মত আদর্শ এবং জীবন ব্যবস্থা থাকলে ইউরোপের চেহারা অন্য রকম হতো। কেননা ইসলাম পুরুষকে বাধ্য করেছে সর্বক্ষেত্রে নারীর পৃষ্ঠপোষকতা করতে। কোনো পরিস্তিতে নারী যদি আদৌ দৈহিক শ্রমের কাজ বেছে নেয়, সে ক্ষেত্রে সমমর্যাদা হিসেবে পুরুষের সমান মজুরী পাবে সে। যুদ্ধের মতো জরুরী পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটলে সংকটের সঠিক, সফল এবং নিষ্কলুষ সমাধানের জন্যে একাধিক বিষয়ে ব্যবস্থা রেখেছে ইসলাম। ফলে যুদ্ধ বিধস্ত অবস্থায় শিকার হয়েও নারীকে নিতে হয় না কাঠোর পরিশ্রমের কাজ। স্বাভাবিক যৌন চাহিদা পুরণের জন্যে আশ্রয় নিতে হয় না নোংরা পথের।
এতকিছু সত্ত্বেও অনেক অসমতার আজো কিন্তু অবসান ঘটেনি। পাঠকরা জেনে অবাক হবেন, গণতন্ত্রের জন্মস্থান খোদ ইংল্যান্ডেই টিকে আছে পুরাতন ও বৈষম্য। সেখানে সরকারী দফতরগুলোতে কাজ করেন যেসব মহিলা তারা অনেক ক্ষেত্রে কম মাইনে পান পুরুষ চাকুরেদের চেয়ে। অথচ বৃটিশ পার্লামেন্টে সম্মানিতা মহিলা-সদস্যের সংখ্যা এখন অনেক।
এর প্রেক্ষিতে ইসলামে নারীর স্থান কোথায়, তার একটা তুলনামূলক বিশ্লেষণ করে দেখতে চাই আমরা। দেখতে চাই ইসলামে এমন কোনো ঐতিহাসিক, ভৌগলিক, অর্থনৈতিক কিংবা আদর্শগত বা আইনগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে যার ফলে নারী বাধ্য হতে পারে তার পাশ্চাত্য সহগামিনীর মতো অধিকার আদায়ের জন্যে সংগ্রামের ময়দানে নামতে। অথবা এটা কি কোন হীনমন্যতা কিংবা পাশ্চাত্যের অনুকরণের ফল যার দরুন নারী মুক্তির প্রতীচ্য প্রবক্তারা তার অধিকারের জন্যে গলা উচিঁয়ে সরগম করে তুলছে বাতাস? ঝড় তুলেছে সভা মঞ্চে?
মৌল আদর্শ হিসেবেই ইসলাম পুরুষের মতোই নারীকে গণ্য করে মর্যাবান মানবিক সত্তা হিসেবে। তফাৎ করে না পুরুষের আত্মায় আর নারীর আত্মায়। মহাগ্রন্থ কুরআনে ঘোষণা করা হয়েছে; হে মানবগণ! তোমাদের স্রষ্টা প্রভুর বিষয়ে (তার প্রতি তোমাদের কর্তব্যের ব্যাপারে) সতর্ক থাকো। যিনি একক অস্তিত্ব থেকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের সবাইকে। একই সত্ত্বা থেকে সৃষ্টি করেছেন তার সহচরকে এবং এ দু'থেকে বি¯তৃত করেছেন অসংখ্য পুরুষ আর নারীকে। (সূরা নিসা:১)
এভাবে জন্মগতভাবেই ইসলামে নারী এবং পুরুষের মর্যাদা সমান। ইহলোকে এবং পরলোকেও তাদের মর্যাদা অভিন্ন। সুতরাং একই এবং সমান অধিকারের দাবীদার তারা। ইসলাম নারীকে দিয়েছে জীবনযাত্রার পুরিপূর্ণ অধিকার আর সম্মান। দিয়েছে সম্পত্তিতে পুরুষের মতো অধিকার। সমাজে সর্বোচ্চ তার আসন। সবার শ্রদ্ধার পাত্রী সে। তাকে অপমানিত করার কিংবা তার বিরুদ্ধে কুৎসা রটনার অধিকার দেয়া হয়নি কাউকেই। নারী-ধর্ম পালনের জন্যে তাকে খাটো করে দেখারও অধিকার নেই অন্য কারো। এ অধিকারগুলো সমানভাবে ভোগ করবে নারী পুরুষ উভয়েই সামাজিক মর্যাদা এবং অধিকারের প্রশ্নে কোন পার্থক্য নেই তাদের মধ্যে। এ ব্যাপারে যে আইন রয়েছে তা উভয়ের জন্যে প্রযুক্ত। উভয়কে অবশ্য কর্তব্য হিসেবে পালন করতে হবে এ আইনোর বিধান। আল-কুরআনের ভাষায়; হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের মধ্যে কেউ যেন অন্যের প্রতি কটাক্ষ না করে। কেননা হয়তো সেই শ্রেষ্ঠ আগের জনের চাইতে। তোমরা এক-অপরের নিন্দা করো না, ছদ্ম নামে একে-অপরকে বিদ্রুপ করো না। কেউ কাউকে ঘৃণার চোখে দেখো না আড়ালে অন্যের বদনাম করো না। (সূরা হুজুরাত: ১১-১২) হে বিশ্বাসীগণ! আগে অনুমতি না নিয়ে এবং গৃহবাসীদের অভিবাদন (সালাম) না জানিয়ে তোমাদের নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারো ঘরে প্রবেশ করো না। (সূরা আন নূর ২৭) মহানবী (সঃ) বলেছেন; একজন মুসলমানের প্রাণ সম্মান এবং সম্পদ হরণ অন্য মুসলমানের পক্ষে হারাম। (বুখারী ও মুসলিম)
সৎ কাজের পুরস্কার তথা প্রতিদান নারী-পুরুষের জন্যে সমান। আর কুরআনের ঘোষণা; এবং তাদের প্রতিপালক শুনেছেন তাদের কথা। (এবং বলেছেন) দেখ! আমি কোন কর্মীরই, সে পুরুষ হোক কিংবা নারী হোক, কোন কাজ নিরর্থক যেতে দেই না। আমরা একটি থেকে উৎপাদন করি অন্যটি। (অর্থাৎ ভালো কাজের সুফল প্রদান করি) ( সূরা আল-ইমরান: ১৯৫)
ইহজগতে বস্তুগত চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রেও অভিন্ন নারী-পুরুষের অধিকার। সম্পত্তির ভোগদখল করতে পারে তারা ইচ্ছা মতো। সম্পত্তি হস্তান্তরও করতে পারে যখন খুশী। পারে নির্বাধে সম্পত্তি বন্ধক দিতে, ইজারা দিতে কিংবা কাউকে দান করতে। নিজেদের স্বার্থে তারা সম্পত্তি কেনা-বেচা করতে এবং তার থেকে ফায়দাও ওটাতে পারে সমান অধিকার নিয়ে। ঐশী গ্রন্থে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে; পিতা-মাতা এবং নিকট স্বজনরা যা কিছু রেখে যায় তার একটা হিস্সা পাবে নারীরা যা কিছু রেখে যায় তাদের পিতা-মাতা আর নিকট স্বজনরা। (সূরা আন নিসা: ৭) পুরুষরা যা অর্জন করেছে তার একটা অংশ তাদের প্রাপ্য এবং নারীরা যা অর্জন করেছে তার একটা অংশ তাদের প্রাপ্য। (সূরা আন নিসা: ৩২)
সম্পত্তির মালিকানা এবং ইচ্ছামতো সম্পত্তি ভোগ কিংবা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ইসলামের স্বীকৃতি নারীর অধিকার আমাদের দৃষ্টিকে নিবদ্ধ করে দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসংগের দিকে। প্রথমে আসা যাক ইউরোপের প্রসংগে। এ সে দিনও ‘সভ্য’ ইউরোপের বিধিবদ্ধ আইন সম্পত্তির ক্ষেত্রে এ ধরণের কোন একটি অধিকার দেয়নি নারীকে। বড়জোর একজন পুরুসের মাধ্যমে কেবল পরোক্ষভাবেই সে পারতো এসব অধিকার ব্যবহার করতে। সে পুরুষ হলো তার স্বামী, পিতা কিংবা অভিভাবক এরাই ছিল তার ইচ্ছার নিয়ামক। এ থেকে প্রমাণিত হয়, ইসলামে নারীর এসব অধিকার স্বীকৃতি হওয়ার এগারো শ' বছর পরও ইউরোপের নারী বঞ্চিত ছিল এ প্রাপ্য অধিকার এবং মর্যাদা থেকে, শেষ অবধি অধিকার আদায় করে নিলেও সহজে তা আসেনি নাগালে। আবার অধিকার অর্জনের কঠিন লড়াইতে নামতে গিয়ে চরম মূল্য দিতে হলো তাকে। খুইয়েছে সে তার নারীসূলভ চরিত্র এবং কমনীয়তা। হারিয়েছে সম্মান এবং ব্যক্তিগত মহত্ম। এতকিছু হারানোর পরও আরো মূল্য দিতে হলো তাকে। কঠোর শ্রমের শৃঙ্খলে বন্দী হতে হলো। শিকার হতে হলো চরম দুর্গতির, দৈহিক ক্লেশের এবং মৃত্যুর। ইসলাম নারীকে যা দিয়েছে, এত সংগ্রাম এবং ভোগান্তির পরও সে পেলো তার তুলনার অতি সামান্যই। অথচ ইসলাম কোনো অর্থ নৈতিক অবস্থার চাপে পড়েনি কিংবা কোনো সামাজিক শ্রেণী-সংঘাতেরও মুখোমুখি হয়নি নারীর অধিকারের প্রশ্ন। মৌলিক মানবিক অধিকার হিসেবেই নারীকে সমতার এ গৌরব দিয়েছে ইসলাম। মানবিকতায় দুটি প্রাণবন্ত হলো সত্য এবং ন্যায়। স্বপ্নের রাজ্য নয়। বাস্তবেই ইসলাম এ দুই আদর্শকে রূপ দিয়েছে নারীকে পুরুষের সমমর্যাদা দিয়ে।
এবার আসা যাক, সাম্যবাদী দর্শন এবং সাধারণ পাশ্চাত্য দৃষ্টিভংগীর প্রসংগে। এ প্রশ্নে এ দু’দৃষ্টিভংগীতে তেমন একটা তফাৎ নেই। এদের ধারণা পুরুষের অর্থনৈতিক অস্তিত্বের সংগে অচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত মানব জীবন। সুতরাং সম্পত্তির মালিকানা এবং ইচ্ছামতো সম্পত্তির ভোগ দখল ও ব্যবহারের অধিকার অর্জন না করা পর্যন্ত আদৌ নারীর কোন স্বাধীন অস্তিত্ব ছিল না। স্বাধীন অর্থনৈতিক অস্তিত্বে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই কেবল নারী অর্জন করলো মানবিক মর্যাদা। অর্থাৎ শেষ পর্যন্ত যখন সে সম্পত্তি ভোগদখলের অধিকার আদায় করতে পারলো এবং কোনো পুরুষের ওপর নির্ভর না করে নিজের ইচ্ছামতো প্রতক্ষ্যভাবে সম্পত্তি ব্যবহারের সুযোগ পেলো, তখন কেবল স্বীকার করে নেয়া হলো তার মানবিক মর্যাদা।
মানব জীবন সম্পর্কে এ ধরনের সংকীর্ণ দৃষ্টিভংগী সমর্থন যোগ্য নয়। আমরা মেনে নিতে পারি না শুধুমাত্র অর্থনৈতিক অস্তিত্বের স্বার্থে মানব-জীবনে এমন অবনায়ন এবং অবমাননাকে। কিন্তু তা হলেও নীতিগতভাবে আমরা একটি বিষয়ে একমত এ মার্কসবাদী এবং পাশ্চাত্য চিন্তাবিদদের সংগে। অর্থনৈতিক সচ্ছলতা মানুষের মধ্যে আত্মচেতনা এবং আত্ম মর্যাদাবোধ সঞ্চারে সহায়তা করে, একথা আমরা স্বীকার করি। আর এ ক্ষেত্রটি ইসলামের অবদান অসামান্য। কেনন, ইসলামই প্রথম নারীর স্বাধীন অর্থনৈতিক সত্তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। সম্পত্তির মালিকানার এবং ভোগদখলের অখন্ড অধিকার দিয়েছে নারীকে। কোনো মধ্যবর্তী ছাড়াই নারী পারে নিজের এ অধিকার ভোগ করতে, প্রয়োগ করতে। এর জন্যে কোনো অছি মধ্যস্থ কিংবা অভিভাবকের প্রয়োজন নেই তার। শুধু তাকে অর্থনৈতিক অধিকার দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি ইসলাম। নারী জীবনে সব থেকে বড় যে সমস্যা সেই বৈবাহিক প্রশ্নেও ইসলাম দিয়েছে তার স্বাধীন সত্তার স্বীকৃতি। দিয়েছে তাকে স্বাধীন মতামতের নিরংকুশ অধিকার। বিয়েতে কনের অনুমোদন একটি অপরিহার্য শর্ত। বিয়ে বৈধ কিংবা আইন সিদ্ধ হয় না তার মত ছাড়া। (চলবে......)
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০০৯ রাত ১১:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


