somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মহিমান্বিত রজনী লাইলাতুল কদর

১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৩২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ক্বদর শব্দের অর্থ : মহাত্ম বা সম্মান, এই মহাত্ম ও সম্মানের কারণে একে লাইলাতুল ক্বদর, তথা মহিমান্বিত রাত বলা হয়। বারটি মাসের মধ্যে ফযিলতপূর্ণ মাস হল রমযান মাস। এই মাসের একটি রাত্র হচ্ছে লাইলাতুল ক্বদর। যা হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। ক্বদরের রাত্রের ফযিলত ও মহাত্ম সম্পর্কে কুরআনুল করিমে সূরাতুল ক্বদর নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরা নাযিল হয়েছে। অর্থঃ (১) নিশ্চয়ই আমি একে (পবিত্র কুরআনকে) নাযিল করেছি শবে ক্বদরে। (২) শবে ক্বদর সম্বন্ধে আপনি কী জানেন? (৩) শবে ক্বদর হল এক হাজার মাস অপেক্ষা উত্তম। (৪) এই রাত্রিতে প্রত্যেক কাজের জন্যে ফেরেশতাগণ ও রূহ অবতীর্ণ হয় তাদের পালনকর্তার নির্দেশক্রমে। (৫) এটা নিরাপত্তা যা ফজরের উদয় পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। (সুরা ক্বদর)
মহান আল্লাহ আরও বলেন, অবশ্যই আমি কুরআন নাযিল করেছি একটি বরকতপূর্ণ রাতে।” (সুরা দুখান: ৩)
ব্যাখ্যা : বরকতপূর্ণ রাতের দ্বারা বিভিন্ন তাফসিরবিদগণ শবে ক্বদরকে বুঝিয়েছেন। শবে ক্বদরের ফযিলত ও মহাত্ম সম্পর্কে কুরআন পাকের এই বর্ণনাই যথেষ্ট। এ কারণে নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্বদর রজনীর ফযিলত সম্পর্কে তেমন কিছু বলেন নাই। তবে উহা কোন মাসে কোন তারিখে হতে পারে এবং উহা কারও নসীব হলে সে তখন আল্লাহর নিকট কি চাইবে সে সম্পর্কে তিনি উপদেশ দিয়েছেন।
* আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে ও সওয়াব হাসিলের উদ্দেশ্যে ক্বদরের রাতে ইবাদত করে তার অতীতের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (বুখারী ও মুসলিম)
* আয়েশা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা শবে ক্বদর তালাশ কর। রমযানের শেষ দশকের বে-জোড় রাত্রিতে। (বুখারী)
* আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রমযানের শেষ দশক শুরু হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সারা রাত জাগতেন, নিজের পরিবারবর্গকেও জাগাতেন এবং (আল্লাহর ইবাদতে) খুব বেশি সাধনা ও পরিশ্রম করতেন। (বুখারী ও মুসলিম)
* আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের শেষ দশ দিন এতেকাফ করতেন এবং বলতেন, তোমরা রমযানের শেষ দশ রাতে শবে ক্বদর সন্ধান কর। (বুখারী ও মুসলিম)
* আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের প্রথম দশদিন এতেকাফ করলেন। এ সময় একবার মাথা বের করে বললেন, আমি ক্বদরের রাত্রি তালাশ করতে গিয়ে প্রথম দশকে এতেকাফ করেছি, অতঃপর মধ্যম দশকেও এতেকাফ করেছি। অতঃপর স্বপ্নে আমার নিকট কেউ এসে বলল ক্বদর রজনী শেষ দশকে। অতএব যে ব্যক্তি আমার সাথে প্রথম দশকে এতেকাফ করেছে, সে যেন শেষ দশকেও এতেকাফ করে। নিশ্চয় উহা আমাকে স্বপ্নে দেখান হয়েছিল। কিন্তু পরে উহা আমাকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে মনে পড়ে আমি ঐ রাত্রির ফজরে নিজেকে পানি আর কাদার মধ্যে সিজদা করতে দেখেছি। অতএব, তোমরা উহা শেষ দশকের বেজোড় রাত্রিতেই তালাশ করবে।
* আবু সাঈদ (রাঃ) বলেন, সেই রাতেই আকাশ ভারিবর্ষণ করল। মসজিদ তখন ছাপরা ছিল, অতএব, ছাদ থেকে পানি পড়ল। তখন আমার দুচোখ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দেখল, যে তাঁর কপালে পানি ও কাদার দাগ লেগেছে। আর তা ছিল একুশ তারিখের সকাল, তবে আবদুল্লাহ ইবনে উনাইসের বর্ণনায় রয়েছে- তেইশ তারিখের সকাল। (বুখারী ও মুসলিম)
ব্যাখ্যা : উপরোক্ত হাদিসের দ্বারা বুঝা গেল শবে ক্বদর প্রত্যেক বৎসর একই তারিখে হয় না। তবে সকল বর্ণনাকারীর একমত রমযানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে হয়।
* আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমি যদি ক্বদরের রাত খুঁজে পাই, তাহলে আমি ওই রাতে কী বলবো? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, তুমি বলবে- (আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুব্বুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নী) অর্থ: হে আল্লাহ তুমি অবশ্যই ক্ষমাশীল, তুমি ক্ষমা পছন্দ করো, কাজেই আমাকে ক্ষমা করো। (তিরমিযী)
মহিমান্বিত রজনীর নিদর্শনসমূহ : ১. কদরের রাত্রি তিমিরাচ্ছন্ন হবে না। ২. নাতিশীতোষ্ণ হবে। ( না গরম না শীত এমন ) ৩. মৃদু বায়ু প্রবাহিত হবে। ৪. উক্ত রাতে মু'মিনগণ কিয়ামুল লাইল বা ইবাদত করে অন্যান্য রাত অপেক্ষা অধিক তৃপ্তি বোধ করবে। ৫. হয়তো বা আল্লাহ তা'আলা কোন ঈমানদার ব্যক্তিকে উহা স্বপ্নে দেখাবেন। (দেখুন : ইবনে খুযায়মা, ইবনে হিব্বান, মুসনাদে আহমদ) ৬. ঐ রাতে বৃষ্টি বর্ষণ হতে পারে। (বুখারী) ৭. সকালে হালকা আলোক রশ্নিসহ সূর্যোদয় হবে, পূর্ণিমার চাঁদের ন্যায়। (মুসলিম)
লাইলাতুল কদর বা কদরের রাতে আমাদের কি কি করণীয় ? :
কুরআন ও হাদীসের আলোকে এ রাতে আমাদের করণীয় হলো :- (১) মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের ভিত্তিতে প্রত্যেক অভিভাবক নিজে রাত জাগবেন এবং পরিবার-পরিজনকে জাগরণে উদ্বুদ্ধ করবেন। (২) সাধ্যানুপাতে তারাবীহ বা তাহাজ্জুদ নামায লম্বা কিরাআত ও লম্বা রুকু সিজদা দ্বারা দীর্ঘক্ষণ যাবৎ আদায় করবেন। সিজদায় তিন বা ততোধিক বার সিজদার তাসবীহ পাঠ করে কুরআন ও হাদীসে উল্লেখিত দু'আসমূহ পাঠ করবেন। এ মর্মে বিশুদ্ধ হাদীসও রয়েছে। অনেকে আবার খুব পেরেশান থাকেন যে, কদরের নামাযের নিয়্যাত কি হবে ? কোন-কোন সূরা দিয়ে নামায পড়তে হবে ? আমাদের ভালভাবে জানা থাকা প্রয়োজন যে, ইশার নামাযের পর থেকে নিয়ে ফযর পর্যন্ত যে নফল নামায পড়া হয়, তাকে বলা হয় কিয়ামুল-লাইল বা তাহাজ্জুদ। অতএব কদরের রাতে ইশার পর থেকে ফযর পর্যন্ত যত নামায পড়া হবে সে গুলোকে নফলও বলা যাবে অথবা তাহাজ্জুদও বলা যাবে। লাইলাতুল কদর উপলক্ষে নামাযের জন্য বিশেষ কোন নিয়্যাত নেই বা অমুক-অমুক সূরা দিয়ে পড়তে হবে এমনও কোন বাধাধরা নিয়ম নেই। (৩) অতীতের করীরা গুনাহ বা বড় পাপের জন্য একনিষ্ঠভাবে তাওবা করবেন ও অধিকরূপে ইস্তেগফার করবেন। (৪) কুরআন মাজীদ পাঠ করবেন। শরীয়াত সম্মত পদ্ধতিতে তথা চুপিসারে, একাকী, রিয়ামুক্ত অবস্থায় যিকির-আযকার করবেন। (৫) পাপ মোচনসহ পার্থিব ও পরকালীন সার্বিক মুক্তি ও কল্যাণের জন্যে বিনয়ী ভাবে একাগ্রচিত্তে দু'আ কবুলের প্রত্যাশা নিয়ে দু'আ করবেন। নিম্নের দু'আ বিশেষভাবে পাঠ করবেন, "আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউয়ুন তুহিব্বুল আফওয়া ফা'ফু আন্নী " নিঃসন্দেহে ঐ বরকতপূর্ণ রাতটি যে ব্যক্তি অবহেলায় বা অলসতায় অবমূল্যায়ন করল, এর যথার্থ গুরুত্বারোপ করল না, সে সমূহকল্যাণ থেকে নিজকে বিরত রাখল। প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির উচিত যে, ঐ রাতের যথাযথভাবে হক আদায় করে মহান আল্লাহর পক্ষথেকে কল্যাণ, ফযীলত, বরকত ও আশাতীত সওয়াব লাভে ধন্য হওয়া। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সবাইকে বেশি-বেশি করে ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমে লাইলাতুল কদরের ফযীলত অর্জন করে তার নৈকট্য লাভের তাওফীক দান করুন। আমীন ইয়া রাব্বাল আলামীন
اللهم تقبل صيامنا و قيامنا و سائر أعمالنا يا رب العالمين







সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৩৫
৫টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×