নিওলার্থানের গহীন জন্গলে জীবসত্তার অতীত বর্তমান নিয়ে চিন্তা করার আগে বহূ ঘাত প্রতিঘাত সইতে হয়েছে আমাকে। প্রথম শুরুটা হয়েছিল কোন এক দূর্ঘটনায়। চাওয়া পাওয়ার হিসেবে গন্ডগোল থেকে। কাংখিত প্রাপ্তির ঘাটতিই প্রথম আমাকে ঈশ্বরের স্বরুপ নিয়ে চিন্তা করতে শেখায়। প্রথাগত বিশ্বাস ধ্যান ধারনার বাইরে আসার পথ দেখায়। ধীরে ধীরে দর্শন বুঝতে চেষ্টা করি, আমার উৎপত্তি আর বিনাশ বুঝতে চেষ্টা করি। বই পত্র পড়ে আর নানা আলোচনার ধার ধরে এগোতে থাকি। মোটামুটি একটা পর্যায়ে এসে নিশ্চিত হই তথাকথিত ঈশ্বরের অস্তিত্ব আসলেই ভিত্তিহীন। সবগুলোতেই গাঁজাখুরি গল্প-কল্পকাহিনী, আদিরসে টুইটম্বুর। সেসবে ঈশ্বরের স্বত্তা খুজতে গিয়ে বেহাল অবস্থা। মাটি চাপা দিয়ে দিলাম পারিবারিক আস্থাগত ধর্ম, ঝেড়ে ফেললাম দীর্ঘদিনের বয়ে বেড়ানো রূপকথার কাথা বালিশ। তারপর থেকেই নিওলার্থানের জন্গলে চলল আমার উৎপত্তি আর পরিনতির ঠিকানা খোজা।কোথা থেকে আমরা এলাম, কোথায় যাবো, এভাবে বেচে থাকর উদ্দ্যেশ্যই বা কি? আসলেই কি কেউ আমাদের কোন উদ্দেশ্য নিয়ে এই সবুজ গ্রহে পাঠিয়েছেন? নাকি অন্য কিছু। যদি কোন উদ্দেশ্য নিয়েই পাঠিয়ে থাকেন তবে তিনি কে? একজন নাকি একাধিকজন? এইযে বিশাল মহাবিশ্ব, এত এট বিলিয়ন গ্রহ নক্ষত্র, এসবও নিশ্চই তিনি কোন উদ্দেশ্য নিয়ে সৃষ্টি করেছেন, সেই উদ্দেশ্যই বা কি? সেখানে কারাই বা থাকে?? চিন্তা ভাবনা দর্শন সবগুলো গুলিয়ে একটা কিছু করার চেষ্টা করছি, কিন্তু দিন দিন আমার ভাবনাগুলো জটিল হতে জটিল আকার ধারন করতে থাকে, একদিক থেকে উপসংহার টানার চেষ্টা করছি তো আরেকটা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। একজনে মনে মনে প্রকৃত ঈশ্বরের আসনে বসানোর চেষ্টা করছিতো বাকী ঈশ্বররা এসে মস্তিষ্কে হানা দিচ্ছে।
বেহাল অবস্থায় তেরদিন-তের রাত কাটানোর পর ডেন্গু মশার আক্রমনে আর চূল দাড়ির অসহনীয় চুলকানীতে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠছিল, ব্যাগে করে বয়ে নিয়ে যাওয়া খাবারের যখন অসংকুলান দেখাদিলো, স্থায়ীভাবে আসন পাতা কিছু ঈশ্বরও পালাতে শুরু করল। এমতাবস্থায় দ্রুত এই বিশ্ব জগৎে আমার অবস্থানের চিন্তা শেষ করার কাজ করতে লাগলাম। তের তম রাতে ঘুমের মধ্যেই স্বপ্নে দেখলাম, আসলে আমরা মানুষরা যেমন পৃথীবিতে একটা শ্রেনী, গরূ, ছাগল, হাস মুরগী, ভেড়া, পাখী, সবই আলাদা আলাদা। আমরা মানুষদের বুদ্ধি একটু বেশী, আমরা গরূ ছাগলদের গৃহপালিত পশু বানিয়ে রাখি, কারন গরূ ছাগলদের বুদ্ধি আমাদের চেয়ে কম, কুকুর বিড়াল আমরা পুষে থাকি, কারন তাদের বুদ্ধি আমাদের চেয়ে কম, আমরা যেভাবে তাদের যা করতে বলি, তারা সেভাবেই করে, হাস মুরগী আমরা জবাই করে খাই। আমরা কি একবারো চিন্তা করে দেখেছি, গরূ ছাগল, কুকুর বুড়াল, হাস মুরগীদেরও একটা জগৎ আছে, তাদের জগৎে তারাই সবচেয়ে বুদ্ধিমান, তাদের বাচ্চা আছে, থাকার জায়গা খুজে বেড়ায়, তাদেরও মস্তিষ্ক আছে, বৃষ্টি এলে আশ্রয় খোজে। যৌন চাহিদা আছে। তারা কিন্তু আমাদের খালি চোখে দেখছে, কিন্তু তাদের বুদ্ধি আমাদের চেয়ে কম বিধায় তারা আমাদের পরিকল্পনা বুঝতে পারছেনা, তারা তাদের মৃত্যুকে আর দশটা স্বাভাবিক মৃত্যুর মতই দেখছে, আর যেগুলো আমরা জবাই করে খাচ্ছি, তাদের কাছে সেসব দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মতই। তারা কখনো মানুষের পরিকল্পনা বুঝতে পারেনা, বুঝতে পারলে কখনোই আমাদের হাস মুরগী জবাই করে খাওয়ার স্বপ্ন দেখতে হতনা, গরু ছাগলদের গৃহপালিত করতে পারতাম না।
সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই দ্রুত স্বপ্ন মাফিক একটা সারমর্ম টেনে ফেললাম। আসলে আমাদের ঈশ্বর আমাদের আশেপাশেই আছে, সেটা এক বা একাধিক যেকোনটাই হতে পারে। আবার ঈশ্বর নাও থাকতে পারে, হয়ত আমাদের জন্ম মৃত্যু স্বাভাবিক প্রকৃয়াই হয়, কিন্তউ সেক্ষেত্রে আমাদের আশেপাশে এই মহাবিশ্বে বা মহাবিশ্বের বাইরে রয়েছে আমাদের পরিকল্পনা কারী। যাদের আমরা ঠিকই দেখছি, কিন্তু বুঝতে পারছিনা তাদের পরিকল্পনা, সেটা বোধহয় কোনদিনই বুঝতে পারবোনা, যেমনটি পারবেনা হাস মুরগী বা গরূ ছাগলের দল।
স্বপ্নমাফিক ধর্ম বানিয়ে অদৃশ্য কিন্তু আকার আছে, এমন ঈশ্বরের সংগা বানিয়ে কাসানিয়ার উপকূলে চলে গেলাম ধর্ম প্রচারে। মানুষতো প্রথমে কেউ লাঠি নিয়ে তেড়ে এল, ব্যাটা বলে কি?? মাথা খারাপ নাকি?? হাজার বছর ধরে লালন করা আদর্শ সংস্কৃতি ঐতিহ্য আমার এক কথাতেই ঝেড়ে ফেলতে হবে শুনে কারোরই মাথা ঠিক থাকার কথা নয়। সেটা বুঝে আমি একজন আদর্শ মানুষ হবার সর্বাত্মক চেষ্টা শুরু করলাম। নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে অনেক কাজ করে জনতার ভালবাসা নেয়ার চেষ্টা করলাম। অল্প কয়েক দিনের মধ্যেই কাসানিয়ার জনপ্রিয় হয়ে গেলাম। কাসানিয়ার লোকজন, অল্প শিক্ষিত বা অশিক্ষিতই বলা যায়। সর্বদা কুসংষ্কারে পরিপূর্ণ, যে কুষংষ্কার আমার প্রথম সফলতা এনে দেয়। রাস্তার পাশ্বে এক লোক মরে পড়ে ছিলো, হয়ত মাতালও হতে পারে। তবে নিশ্বাস পড়ছিলো না, সবাই ধরে নিয়েছিলো মৃত, কারন গালের উপর মাছি ভনভন করছিলো, পেট ফুলে ফেপে উঠেছিলো। পাশে মা-বোন বা আত্মীয় টাইপের কেউ একজন কাদছিলো। লোকজনও জটলা পাকিয়ে দেখছিলো। সেই জটলার একটা অংশ আমিও হয়েছিলাম। একজন চেচিয়ে উঠল, তুমিতো গুরু সাজতে চাচ্ছ, দাওতো একে বাচিয়ে। আমি বললাম, জন্ম-মৃত্যু স্বাভাবিক প্রকৃয়ারই অন্তর্গত, হা হুতাশ করলে চলবে না, তবে আমাদের নিয়ন্ত্রনকারী আশেপাশেই আছে, আমাদের দেখতে পাচ্ছে, ছেলেটির মৃত্যুতে যদি পাশে কাদতে থাকা মেয়েটির কোন বড় ক্ষতি হয়ে যায় তবে তারা নিশ্চই কোন না কোন ব্যাবস্থা নেবেন। সবাই আমার কথা বিশ্বাস করেছিলো কিনা যানিনা, তবে আমি সহ জটলার অর্ধশত লোককে অবাক করে দিয়ে ছেলেটি নড়েচড়ে উঠল। চোখের পাতা একটু কাপুনি দিয়ে দূর্বল হাতে মাছি তাড়াতে চেষ্টা করল। এ দৃশ্যে জটলার অর্ধশত লোক হতবাক হয়ে পরষ্পরকে চাওয়াচাওয়ি শুরু করল। কেউ কেউ একদৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রইল, এ যেন আমার ইশারায় মৃতটি জীবন ফিরে পেল। অন্য কে কি ভাবছে তা বুঝে ওঠার আগেই এতক্ষন কাদতে থেকে মেয়েটি সোজা এসে আমার পায়ে পড়ল, চেচিয়ে কেদে উঠে বলল, আপনি আমার স্বামীর জীবন দিয়েছেন, আজ থেকে আমি আপনার ধর্মেরই একজন, আমাকে গ্রহন করুন। আশে পাশের অদ্ৃশ্য নিয়ন্ত্রনকারীদের সাথে অদৃশ্য একটা যোগাযোগের চেষ্টা করলাম, কিন্তু কোন সাড়া না পেয়ে নিজে কিছু কৌশল বানিয়ে বরন করে নিলাম আমার প্রচারিত ধর্মে। সেই থেকে আর পিছু তাকাতে হয়নি, চেইন রিএকশানের মত এ ওকে, ও আরেকজনকে আমার ধর্মের অনুসারী বানাতে লাগল, সবাই আমার মৃত ব্যাক্তির জীবিতকরনের মশলাটা ব্যবহার করতে লাগল, আর সেই চমৎকার মশলায় সেদ্ধ হয়না এমন কোন কঠিন হ্রদয় কাসানিয়ায় ছিলনা। কাসানিয়ায় মানুষ আমাকে ভগবানসদৃশ করে জায়গা পেতে দিলো। আমি তখনো অদৃশ্য নিয়ন্ত্রনকারীদের সাথে যোগযোগের চেষ্টাই করে যাচ্ছি, কিন্তু সেটা কখনো অনুসারীদের বুঝতে দেইনি, পাছে আমার নিয়ন্ত্রনে কোন ঝামেলা বেধে যায় সেই ভয়ে।
আমার মহৎ উদ্দোগটা শুধু কাসানিয়ায় আবদ্ধ না রেখে সারা দেশে ছড়ি্যে ইচ্ছা হল, ভাবলাম সবাইকে ঘুম থেকে জাগানোর একটা চেষ্টাতো করা যাক। শহরের লোকগুলোকেই সবচেয়ে বেশী দরকার। তাই লিগাটার টাউনের দিকে ছুটলাম, সাথে নিলাম কিছু তাগড়া অনুসারী, বলাতো যায়না, যদি কোন শাররীক ভিতীর সম্মূখিন হই। আমার ধারনাটা সত্যি হয়েছিলো, তবে সাধারন জনতার হাতে নয়, লিগাটার পুললিশের কাছে, তাগড়া অফিসার ভুড়িতে হাত বুলিয়ে জিগ্গেস করলেন আমার ধর্মের কোন লাইসেন্স আছে কিনা, শুনেতো আকাশ থেকে সোজা মাটিতে, বলে কি? অফিসার সুন্দর ভাবে বুঝিয়ে বললেন এটা আদিকাল নয়, মধ্যযুগও নয়, এটা একেবারে খাটি আধুনিক কাল, এখন নতুন কিছু করতে চাইলেই যথাযথ কতৃপক্ষের পারমিশান লাগবে। আর আমার ধর্মটা যে মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয় সেটা প্রমান করেই কিনা লাইসেন্স নিতে হবে। আমি ঠিক ওসব বুঝে ওঠার আগেই আমার কয়েকজন অনুসারী সহ পুলিশরা আমাদের উঠিয়ে নিল ট্রাকে।
ছোট্র একটা কামরায় আমরা দশ বারো জন অসহনীয় জীবন যাপিত করছিলাম দুদিন ধরে। অসহনীয় একারনেই যে এখানকার মশা নিওলার্থানের জন্গলের মশার চাইতেও ভয়াবহ। আর দুর্ঘন্ধতো রয়েছেই। আমার অনুসারীরা অবশ্য বেশ উৎফুল্লই আছে, আর থবেনাইবা কেন? তাদের ধর্মগুরু যে তাদের অতি নিকটেই আছে। তাদের ভরষা রয়েছে। আর আমি তখনো সেই অদৃশ্য নিয়ন্ত্রনকারীদের খুজে যাচ্ছি, তাদের গুংগান করে চলেছি, তাদের কাছে সাহায্য চেয়ে চলেছি, আশায় আছি যদি কোন সাহায্য পাই।
অদৃশ্য নিয়ন্ত্রনকারীদের কোন ইংগিত পাওয়ার আগেই টাউন হলের মেয়র এসে উপস্থিত। পাশের কামরায় ডেকে নিলেন, বুঝিয়ে বললেন পুরো ঘটনা। আমি ধর্ম প্রচারের নামে যে জনসংজোগ করেছি, সেটা সমসাময়িক আইনের পরিপন্থি। রাষ্ট্র বিদ্রোহের সামিল বলা চলে, হয়ত সরকারের বিপক্ষে বিদ্রোহের পরিকল্পনাকরী হিসেবে বছর দশেকের জেলও হয়ে যেতে পারে। অশহায়ের মত আমি আর অন্য কোন রাস্তা দেখতে পেলাম না। করুন গলায় আবদার করলাম এইবারের মত আমায় বাচাতে। মেয়র সাহেব মুচকি হেসে বললেন সেটাটও আমার পক্ষে সম্ভব নয়, তবে হ্যা শুনেছি কাসানিয়ায় আপনার বেশ জনপ্রিয়তা আছে, আর আমার সেখানে কিনা ভরাডুবি, আপনি যদি কাসানিয়ায় আমার হয়ে কাজ করতে আগ্রহী হন তো আমি উপরে আরেকটা চেষ্টা করে দেখতে পারি। আমি হ্যা না কিছু বলার আগেই মেয়র চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়ালেন, বললেন আজকের রাতটা ভাবুন, কাল না হয় আবার দেখা হবে।
আমি রাত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করিনি, কারন আমি আমার নিয়ন্ত্রনকারীদের কাছ থেকে ইংগিত পেয়ে গেছি, আমাকে তার দলের হয়ে কাজ করতে হবে। আসলে এ সমাজের রাজনৈতীক নেতারা বা উপরোস্থ ব্যাক্তিরাই আমাদের নিয়ন্ত্রনকারী, বুঝে গেছি তাদের খুশী রাখতে পারলেই জীবনটা সুখে আর ছন্দে চলে যাবে। আর পরকাল?? হয়ত ওখানেও পাব কোন নেতা বা উপরোস্থ কর্তাব্যাক্তি। তখন নাহয় তাদেরই প্রার্থনা করব।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা মার্চ, ২০১১ বিকাল ৪:৪৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





