somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কোরবানীর ছাগু, এবং রবীন্দ্রনাথের মহানুভবতা

০২ রা নভেম্বর, ২০১১ দুপুর ২:৫৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কোরবানীর গরুর হাটে গেলাম গরু কিনতে। পকেটের অবস্থা ভালো ছিলোনা তাই আস্তে আস্তে হাটছি, আর গরুর সাইজ দেখছি। দেশী বিদেশী হরেক রকমের গরু। একেকটার দাম দেখে হার্টফেল হওয়ার মত অবস্থা। আমার পকেটের যে দশা, তাতে করে আ্স্ত গরু কেনা সম্ভব হবেনা ভেবে ছুটলাম ছাগলের বাজারে। আশা, একটা মাঝারী সাইজের ছাগল কিনে এবারের কোরবানীটা চালিয়ে দেব। প্রায় দু-তি ঘন্টা দেখাদেখির পর একটা তাগড়া ছাগল চোখে পড়ল। দরদাম করে কিনে নিলাম সেটা। ফেরার পথে সদ্য কেনা ছাগলটা খুব ধীর গতিতে হাটছিলো। আমি রশি ধরে যতই টানি সে টানে পেছনে। বাধ্য হয়ে হাতে থাকা বেতটা দিয়ে ছাগলের পেছনে লাগালাম এক বাড়ি। বাড়ি লাগাবার পর দেখি গায়েবী আওয়াজ,
ভাই ভাই ভাই োয়ায় মাইরেন না
আমি তো হতভম্ব। আশে পাশে তাকিয়ে দেখলাম, লোকজন কেউ নেই। মনের ভূল ভেবে আবার রশি টান দিলাম, দেখি এবারো ছাগলটা হাটছে ধীর পায়ে, আবার লাগালাম বাড়ী, আবার সেই আওয়াজ
ভাই ভাই োয়ায় মাইরেন না, ব্যাথা লাগে
আমি যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আশে পাশে কোন লোক নেই, খানিক দূরেও কাউকে দেখা যায় না, পূরো রাস্তা এপাশ হতে ওপাশ খালি, তবে কি আমার সদ্য কেনা ছাগলটাই কথা বলছে? নাকি নিতান্তই মনের ভূল। যাক, পরীক্ষা করার জন্য হাটু গেড়ে বসে ছাগলের মাথার কাছাকাছি মুখ নিয়ে জিগ্যেস করলাম
কথা কি তুই বলছিস?
ছাগলটা মাথা তুলে বলল
জ্বী ভাই, আমিই বলতাসি।
ছাগলের মুখে মানুষের কথা শুনে আমি ছিটকে দুহাত পিছনে চলে গেলাম। কতক্ষন ঝিম মেরে ছিলাম জানা নেই, যখন সম্ভিত ফিরে পেলাম, তখন ভাবলাম ব্যাটা ছাগলের বিক্রেতাকে গিয়ে ধরি।
এবার ছাগল নিয়ে ছুটলাম হাটে। গিয়ে দেখি ছাগলের মালিক নিরস মুখে পান চিবুচ্ছে। আমায় দেখে বলল
ভাই কি আরেকটা নিবেন নাকি?
আমি বেশ ক্ষিপ্ত গলায় বললাম
ওই মিয়া, ফাইজলামি পাইসেন? কি ছাগল দিলেন এটা? এ দেখি মানুষের মত কথা কয়। আমি চাইলাম একটা ব্ল্যক বেন্গল ছাগল আর আপনি এটা কি দিলেন?
লোকটা মুচকি হেসে বলল
ভাই জিনিস আপনারে অরিজিনালটাই দিসি, তয় মাফ চাইতাসি এইটা ব্ল্যক বেন্গল না, এইটা ওয়েস্ট বেন্গল ছাগল। মানে পশ্চিম পাকিস্তানি যাতের উন্নত মানের যাত। এইগুলারে দেশী ভাষায় বলে ছাগু। নিয়া কোরবানী দেন, গ্যারান্টি দিলাম খাইয়া মজা না পাইলে যত ট্যাকা দিয়া কিনসেন, ততগুলা জুতার বাড়ী দিয়েন।
ছাগূ নামটার সাথে পূর্ব পরিচয় এই সামুতেই হয়েছিল, তাই তেমন একটা অবাক হইনি, তবো মনের ক্ষোভ ছিলো, সেটা বলেও ফেললাম
আরে ভাই ছাগু যখন খাবো তো একটা দেশী ছাগুই দিন না ভাই।
ব্যাপারী হাত ঘড়ি দেখিয়ে বলল কয়টা বাজে দেখসেন ভাই, বিকাল হইয়া গেসে না
আমিও হাত ঘড়িটা দেখলাম, বিকাল ৫ টার মত বাজে। বললাম
হ্যা, বিকাল ৫ টা বাজে, তো কি হয়েছে
ব্যাপারী মুখে একটা ভেটকি দিয়ে বলল
ভাই আপনে যা চাইসেন তা ছিলো, দেশী মগবাজারী ছাগু। তয় সকাল দশটার আগে সবাই আইস্যা কিনা নিয়া গেসে। এখন যা পাইবেন সবই শিয়ালকোট আর বিহারী ছাগু।
আমি বিরক্ত মুখে বললাম
ঠিক আছে ভাই, তাহলে আমার টাকা টা ফেরত দিন, আমার যদি ছাগূ খেতেই হয় আমি দু এক দিন পর মগবাজার হাটে গিয়ে দেশী ছাগু নিয়ে আসব একটা
ব্যপারী এবার নরম সুরে বলল
ভাই, রাগ করেন ক্যান? এিটা এক সময় মগবাজারী ছাগু ছিলো। কি একটা ছামু না কি যেন আছে, ওইখানে গদাম খাইয়া খাইয়া পরে ফাকিস্তান চইল্যা গেসে। আমরা ডবল দাম দিয়া এইগুলারে আবার আনসি।
ডবল দামের কথা শুনে আমার ভালো লাগল। কোন বস্তু ডবল দাম দিয়ে কেনার মানে তার গুনগত মান নিশ্চই উন্নত। বললাম
কেন ভাই ডবল দাম দিয়ে এই ছাগূ আনার উদ্দেশ্য কি
ব্যাপারী এইবার ফিক করে পানের চাবানো রসটা ফেলে দিয়ে বৃদ্দান্গুল দিয়ে ঠোটের কোনাটা মুছতে মুছতে বলল
ভাই, আপনে যেই ছাগূটা নিলেন, সেইটা লাখের মইদ্যে এক। শিক্ষা দিক্ষা ভালো। কলিকালে দেশী এক আমিরের গেলমান ছিলো। লেখালেখিও করত। এনার বাপ চাচারা সবে ৭১ এ বড় মাপের রাজাকার ছিলো। শ্যাষ বিকালে আইসেন বইলা এইদামে পাইলেন, নইলে এর পাচগূন দাম দিলেও এই মাল আমি আপনের কাছে বেচতাম না, আর বেশী বুঝাইতে পারুম না, নিলে নেন, না নিলে ট্যাকা নিয়া যান।
এই ছাগূর জীবন বৃতান্ত শুনে অতিশয় একটা বিদ্বান ছাগূ লাভের তৃপ্ত হাসি দেয়ে সেখান থেকে বিদায় নিলাম। তবে বাড়ী নিয়ে একে কোনভাবেই পরিচয় করিয়ে দেয়া যাবেনা। কারন আমার ঘরের অনেকেরই ছাগূর মাংশ খাওয়ার এলার্জী আছে। সবাই হয়ত বলবে এই ঈদে দরকার হলে কোরবানীর মাংশই খাবনা, কিন্তু তাই বলে ছাগূ খাবনা। এসব ভাবতে ভাবতে ছাগুটাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলাম বাড়ী।
অনেকদূর পথ, ভাবলাম যেহেতু ছাগূটা কথা বলতে পারে, আবার ব্যাপারীও বলল বিদ্বান ছাগু, লেখালেখিও করত এককালে, তো কিছুক্ষন গল্প করা যাক তার সাথে বললাম
কিরে ব্যাটা ছাগু, আর তো কয়েকটাদিন বাকী, তারপর তো কোরবানী হবি, ভয় লাগছেনা
ছাগুটা কানদুটো ঝেড়ে বলল
আপত্তি নাই। কট যখন খাইয়াই গেসি, তখন কি আর করা। এরেই বুঝি কয় মাইনকার চিপা।
আমি বললাম
কিরে, কি বলিস এসব? তোরা তো শুনেছি মরনের আগ পর্যন্ত তালগাছ বগলদাবা করে রাখিস। শুকনো-ভেজা সবরকমের যুক্তি তোদের কাছে থাকে। এমন কি তোরা যুক্তি দিয়ে ৭১ এর পাকি নৃশংসতাকেও হালা করিয়ে ছাড়িস। এখন এমন বলছিস যে।
ছাগলটা এবার দম করে দাড়িয়ে গেল। ক্ষিপ্ত শুরে বলল
আর কইয়েন না ভাই, ওই ছালা নিজামী আর গো.আ র যদি োয়া মারতে পারতাম তাইলে আপনাগো বাড়ীতে শহীদ হইয়াও শান্তি পাইতাম। স্লারা সারা জীবন আমাগো োয়া মাইরা পুরা জায়গা ক্ষত বানাইয়া রাখসে, ২০ বছর ধইরা হেগো গেলমানগিরি করলাম, আর যখন এখন আমাগো এই অবস্থা হ্যারা এখন ঢাকা-চিটাং হাইওয়েতে বইসা রাজকীয় আহার করে। অগো আসলে কোন পাওয়ারই নাই, অরা নিজেরাই বাচতে মুশকিল আমাগো কথা চিন্তা করার সময় কই? এর চেয়ে যদি কোন পীর বাবার গেলমানী করতাম, তাইলে হয়ত আইজ আরো ভালো থাকতাম।
আমি বললাম
তা এখন এসব বলে কোন লাভ নাই ভায়া, তোমাকে পকেটের পয়সা খরচ করে কিনেছি, কোরবানী হতেই হবে।
ছাগূ বলে
কোরবানী দিনেন দ্যান, ভালা কথা, কিন্তু আপনি রবীন্দ্রনাথের সেই কবিতাটা পড়েন নাই? ঐযে, 'দিদি ঘাটে ঘটি ফেলে ছুটে চলে আসে, এক বক্ষে ভাই লয় অন্য বক্ষে ছাগ, দুজনেরে বাটি দিলো সমান সোহাগ। পশু শিশু নর শিশু দিদি মাঝে পড়ে, দোহারে বাধিয়া দিলো পরিচয় ডোরে' সয়ং রবি ঠাকুরের কথাও কি আপনে ফেলে দিবেন?
রবি ঠাকুরের কবিতা শুনে আমি ভেতরে অনেকটা নরম হয়ে উঠলাম, তার মত একটা বড় মাপের মানুষের তুলনায় আমিতো কিছুই না। সে যেখানে ছাগূদের প্রতি এতটা মমত্ব দেখিয়েছে, আমিতো কোন নচ্ছার? আর এই ছাগূটার ভাবোদয় হয়েছে, সে নিজের কৃতকর্মের ফল বুঝতে পেরেছে, তাকে ছেরে দেয়া যায়। ভাবলাম কাল হাটে গিয়ে পয়সা দিয়ে একটা ব্ল্যাক বেন্গল গোট কিনব, আর ওয়েস্ট বেন্গল গোট নয়। আমি ছাগুর গলায় বাধা রশিটা ছেড়ে দিলাম। ছাগুটা উল্টোদিকে দৌড় দিলো। আমি পেছন থেকে ডাকলাম
ছাগূ ভাই, ছাড়া পেয়ে আবার কি মগবাজারের দিকে যাচ্ছ নাকি?
ছাগুর উত্তর শুনে আমি হতবাক, সে দৌড়াতে দৌড়াতেই বলছে,
নারে ভাই, আর মগবাজার না, এবার সোজা যাব টুন্গিপাড়া, সময় আর বেশী নাই।
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা নভেম্বর, ২০১১ বিকাল ৩:০০
৫টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×