সুর কি কখনও হারিয়ে যেতে পারে!
বিশেষ করে যে সুর লক্ষ লক্ষ মানুষের মনে গভীর ভাবে দাগ কেটে যায়!
যে সুর, যে গান গভীর ভাবে ছুঁয়ে যায় অগুনিত মানুষের প্রাণ তা কখনও কালের গর্ভে বা আধুনিকতার ভীড়ে বিলীন হতে পারে বলে মনে হয়না!!
নিজের ভালোলাগার মাঝে গান একটি বড় স্থান দখল করে আছে। দেশ বিদেশের বিভিন্ন ধরনের গানের আমেজ ভিন্ন ভিন্ন হলেও মন ছুঁয়ে যাওয়া সেসব সঙ্গীত আমাদের হৃদয়ের গভীরে ঠাঁই করে নেয়!
গান ভালোবাসি এবং অবাক হয়ে লক্ষ্য করি সেই ভালোবাসার মাঝে বড় একটি অংশ জুড়ে আছে পল্লীগীতি!
আমি গাঁয়ে বড় হয়েছি, অথবা জীবনের উল্লেখযোগ্য একটি সময় কাটিয়েছি গ্রামান্চলে-এমন দাবী সত্যের অপলাপ হবে মাত্র। সশরীরে গ্রামে উপস্থিত না থেকেও খুব অদ্ভুত ভাবে গাঁয়ের সাথে এক আত্মিক যোগাযোগ গড়ে উঠেছে!
শৈশবে বাসার বড়দের গান শুনতে দেখেছি তবে সেসব গানের মাঝে পল্লীগীতি ছিলো বলে মনে পড়েনা। শুধু মাত্র আমার মা পছন্দ করতেন ফরিদা পারভীনের কন্ঠে লালনগীতি; সেও ঘটা করে ক্যাসেট, এলপি, সিডি কিনে শোনা নয়.. টিভিতে প্রচারিত হলে আগ্রহ ভরে শোনা! অথচ আমার মাঝে কিভাবে যেন পল্লীগীতি বিশাল এক আসন করে নিয়েছে সেই ছেলেবেলা থেকেই!
ছোটবেলায় যে হোস্টেলে পড়েছি তার গা ঘেঁষে ছিলো একটি গ্রাম, সেখানেই হয়তো পল্লীগীতির প্রতি এই ভালোবাসার বীজ বপিত হয়। খাঁ খাঁ উদাস দুপুরে গ্রামের মেঠোপথে নাম না জানা কারো বাঁশীর সুর শুনেছি বহুবার! আর তাই হয়তো বহু বিলাসী আয়োজন করে বাজানো চৌরাসিয়ার বাঁশীর সুর আমায় সেভাবে ছুঁতে পারেনা, যেভাবে ছুঁয়ে যায় নিতান্তই আপন মনে মেলায় বাজিয়ে যাওয়া অথবা পথে হেঁটে যাওয়া কোন বাঁশীওয়ালার সুর...
অনেকেই মনে করেন, পল্লীগীতি শুধুমাত্র গাঁয়ের মানুষ বা আমাদের পূর্বপ্রজন্মের মানুষের প্রাণে ঠাঁই পেয়েছে, বর্তমান প্রজন্ম ভেসে গেছে চটুল গানের স্রোতে! শুধু নিজেকে দিয়ে নয়, চারপাশে ভালো করে লক্ষ্য করলে বুঝতে পারি এই ধারনা সঠিক নয়।
ব্যক্তিগত ভাবে আমি দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্বাদের সঙ্গীত পছন্দ করি। একজন সেলিন ডিওনের "বিকজ ইউ লাভড্ মি..." আমায় যেভাবে ছুঁয়ে যায় সেভাবেই আপ্লুত করে ফরিদা পারভীনের কন্ঠে "আমি অপার হয়ে বসে আছি..." অথবা "মিলন হবে কতোদিনে..."। আমি একজন এন্ড্রুকিশোরের গানের চেয়ে একজন রথিন্দ্রনাথ রায়েরর গান শুনতে বেশি আগ্রহী হবো। একজন হাবিবের বিপুল জনপ্রিয়তার পিছে লুকিয়ে থাকে অজপাড়াগাঁয়ের "আব্দুল করিম" নামের কোন এক বাউল!
পল্লীগানের মাঝে এমন কিছু আছে যা শতশত বছর ধরে সমান ভাবে আপ্লুত করে আসছে বাঙালীদের। দেশ বিদেশের আধুনিক সঙ্গীত, পাশ্চাত্য সঙ্গীত কোন কিছুই এতোটুকু ম্লান করতে পারেনি পল্লীগীতির আবেদন। সেকারনেই হয়তো আজও কোন সঙ্গীত প্রতিযোগিতা হলে দেখা যায় অর্ধেকের বেশি প্রতিযোগী গাইছে পল্লীগীতি, শ্রোতারাও বেশি ভালোবাসছেন গাঁয়ের সারল্যে ভরা এই সুরকে..
অত্যাধুনিক তরুন-তরুনী, কিশোর কিশোরী আবেগ ভরা কন্ঠে গেয়ে চলেছে লালনের গান, আব্বাস উদ্দীন, আব্দুল আলীম, আব্দুল করিম শাহের গান। আজন্ম রাজধানীর কোলাহলে লালিত কন্ঠে ভেসে আসছে দূর পাহাড়ের কোন আদিবাসীর পাগল করা সুর! আধুনিক সঙ্গীতের কারিগরেরা ছুটে যায় পল্লীগীতির কাছে, গীটার আর কিবোর্ডে ঝংকার তুলে গেয়ে চলে গাঁয়ের মেঠো পথের কোন বাউলের কন্ঠের গান। শত আধুনিকতা, ভীনদেশির সংস্কৃতির আগ্রাসনের মাঝেও অতি সন্তপর্নে পল্লীর গান ঠাঁই করে নেয় আমাদের প্রাণে।
আমাদের অনেকের হয়তো ঘটা করে ক্যাসেট সিডি কিনে পল্লীগীতি শোনা হয়না, তবে হঠাৎ কানে সেই সুর পৌঁছুলে মুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হই! শহুরে কিশোর কিশোরীদের সৌখিন কন্ঠে বেজে উঠা সুর শুনেও হারিয়ে যাই- কখনো গাঁয়ের মেঠোপথে, কখনও সিলেটের চা বাগান আবার কখনোও বা রাঙ্গামাটির পাহাড়ে। নিজের অজান্তেই এসব গান আমাদের চোখে নদীতে ছুটে চলা জেলে মাঝিদের গলা ছেড়ে গেয়ে উঠা সঙ্গীতের দৃশ্যকল্প তৈরী করে!
কোন সিনেমা বা নাটকের সিকোয়েন্স ডিমান্ড নয়, নয় কোন নতুন এ্যালবামের জন্য উপযোগী গানের তাড়না.. মানুষের একান্ত সুখ দুঃখের কথা, পল্লীজীবনের হাসি কান্না, আনন্দ উৎসব আর প্রাণের কথা নিয়ে আমাদের জারি, সারি, ভাটিয়ালী, মুর্শিদী, ভাওয়াইয়া, লালনগীতি, আদিবাসী সঙ্গীত সহ পল্লীগানের আর সকল শাখার জন্ম বলেই হয়তো হাজার বছরেও এর আবদেন এতোটুকু কমেনি।
সততা আর শুদ্ধতা দিয়ে গড়া- তাই হয়তো আধুনিকতার হাজারো বাদ্যের মাঝে পল্লীগীতি আজও দোর্দন্ড্য প্রতাপের সাথে বেঁচে আছে।
গাঁয়ের জীবন আর মানুষের কথা বুকে নিয়ে পল্লীগীতি নামের সুরের নদীটি আপণ মনে ছুটে চলে নিরবধি। তৃষ্ণার্ত আমরা সে নদীর সুরধারা আঁজলা ভরে তুলে নিজেদের সুরের পিপাসা মিটিয়ে চলেছি যুগ যুগ ধরে...
শত প্রতিকুলতার মাঝেও পল্লীগীতি ধ্বনিত হয়ে যাবে আগামী সহস্র বছর... অনুরিত হবে মানুষের প্রাণে, নতুন প্রজন্মের কন্ঠে...
*** (!)ঝড়ের বেগে রচিত এই লেখাটি ব্লগার রেটিং এবং ফয়সল নোইয়ের(যাঁরা আমার অতি সাধারন এলেবেলে ব্লগে নতুন লেখা খুঁজতে এসে হতাশ হয়েছেন) সন্মানে পোস্ট করছি :-) ***
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই সেপ্টেম্বর, ২০১০ দুপুর ১:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



