আজ ৮ই মার্চ, আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
১৯০৯ সালে এ দিবসের সূচনা হলেও প্রকৃতপক্ষে দিবসটি ব্যাপকতা লাভ করে ১৯১১ সালে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটির এক পোশাক শিল্প বা গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর অগ্নিকান্ডে প্রায় ১৪০ জন কর্মীর(যাঁদের অধিকাংশ ছিলেন নারী) প্রাণহানী ঘটার পর। মনে করা হয়, সেদিন প্রতিষ্ঠানটির নিয়মানুযায়ী পোশাকশ্রমিকদের তালাবদ্ধ কারখানায় কাজ করতে না হলে হয়তো অনেক কর্মীই সেদিন এই দুর্ঘটনা থেকে পালাবার সুযোগ পেতেন।
সেই থেকে এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা সহ যুক্তরাষ্ট্রে বিভন্নি ভাবে দিবসটি পালন করা হয়।
আমাদের ছোট্ট বাংলাদেশেও প্রায় প্রতি বছর ঘটা করে উদযাপন করা হয় এদিবস, আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষ্যে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ওয়ার্কশপ, মিছিল , মিটিং, ব্যানার আর রঙীন ফেস্টুনের আড়ম্বরে ঘেরা চারপাশ.. এতো সব আয়োজনের ভীড়ে আমাদের কথা শোনা যায়না, আড়াল হয়ে যায় আমাদের অস্তিত্ব! ...নারীদের অস্তিত্ব!!
পত্রিকার পাতায় যে সংবাদ অপ্রকাশিত, প্রচার নেই কোন মিডিয়ায়.. দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে থাকা গৃহবধুদের দৈনন্দিন নির্যাতনের চিত্র! সারাটি জীবন উৎসর্গ করে যে সংসার তাঁদের হাতে গড়া, সেখানেই মিলেনা কোন সন্মান, কোন স্বীকৃতি। প্রতিনিয়ত মানসিক আর শারিরিক লান্ছনার শিকার তাঁরা। বিষয়টি এমন অহরহ ঘটে যে এটিকে আর নির্যাতন হিসেবে অনেকে মনেই করেননা, এ যেনো খুব স্বাভাবিক ঘটনা।
এই নারীদের কান্না কারো কাছে পৌঁছেনা, চার দেয়ালে বন্দী এই নারীরা জীবিত লাশ হয়ে বেঁচে থাকেন, সমাজকর্মী বা এই নারী দিবস তাঁদের কোন উপকারে আসেনা!!
নারী আজ স্বাধীন, আত্মনির্ভরশীল। তাঁদের এই স্বাধীনতা আর অজর্নের আত্মবিশ্বাস প্রতিদিন পথে ঘাটে নির্মমভাবে হত্যা করে কিছু নোংরা কুৎসিত হাত। নিজের যোগ্যতায় সন্মানের সাথে কাজ করার অধিকারও যেনো এদেশে তাঁদের নেই!! পথ চলতে, কর্মক্ষেত্রে, পাবলিক পরিবহনে তাঁরা অপমান আর লান্ছনার শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত। শিক্ষিত, অশিক্ষিত, স্কুল শিক্ষিকা, ছাত্রী, গার্মেন্টস কর্মী, গৃহবধু- দিন মজুর... রেহাই পাচ্ছেননা কেউ। এই অন্যায়, এই অনাচারের কোন বিচার নেই, নেই কোন প্রতিকার!!! নারী দিবসে মানবাধিকার কর্মী বা নারী অধিকার সংস্থার হর্তা কর্তারা কি এগিয়ে আসবেন এই অসহনীয় সমস্যার সমাধানে?
বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদন্ডটি প্রায় একা হাতে ধরে আছে যে শিল্প, তা লক্ষ লক্ষ নারীর প্রতিদিনের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রমের বিনিময়ে। অমানুষিক পরিশ্রম করে এই কর্মীরা সংসারে দুমুঠো অন্ন যোগান। তাঁরা কেমন আছেন? কর্ম ক্ষেত্রে সুপারভাইজার, ম্যানেজার, পরিচালক মহাপরিচালকরা কি শুধু তাঁদের এই শ্রমেই সন্তোষ্ট থাকছেন! বেঁচে থাকার তাগিদে সন্মানজনক একটি কাজের আশায় এসে অবর্ণনীয়, অনাকাঙ্খিত ও অপমানকর অভিজ্ঞতা হয় তাঁদের অনেকের, বিশেষত সেই অসহায় শ্রমজীবি নারী যদি হন রূপবতী। শুধু কর্মক্ষেত্রেই তাঁদের এই দুর্ভোগের শেষ নয়, দুটো অতিরক্তি অর্থের জন্য, কখনও কারখানার অস্তিত্বের প্রয়োজনে অভারটাইম শেষে গভীর রাতে ঘরে ফেরার পথে রক্তাক্ত হন একদল হায়নার কালো থাবায়, এই হায়নারা কখনও বাসের হেল্পার কন্ডাক্টারের রূপে আর্বিভূত হয়, আবার কখনওবা আইনশৃংখলা রক্ষাকারীর বেশে। তাঁদের যেনো সম্ভ্রম থাকতে নেই, শ্রমজীবি হলেও তাঁরা যেনো ভোগ্যপণ্য মাত্র!! আজ নারী দিবস, কি দেবে এই শ্রমজীবি হতভাগ্য নারীদের!!! অথচ, বিশ্ব নারী দিবসটির ব্যাপকতা এই শিল্পের শ্রমজীবি নারীদের হাত ধরে!!!!!
প্রতিদিন ধর্ষিতা হচ্ছে নারী, আজ ধর্ষিতার কোন শ্রেনী নেই... নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থানে হবার প্রয়োজন নেই.. শিক্ষিতা, অশিক্ষিতা, কর্মজীবি-গৃহবধু, বালিকা-পৌঢ়া, বিবাহিতা-অবিবাহিতা, ধনী-দরিদ্র.....সকলেই এই নির্মমতার শিকার! ধর্ষনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার সাথে যোগ হয় সামাজিক অত্যাচার, শুধু নারীর সম্ভ্রম নয়, যেনো হত্যা করা হয় তাঁর পুরো অস্তিত্বকে! তিনি সমাজে অগ্রহনযোগ্য হয়ে উঠেন, ধর্ষিতা হয়ে তিনিই যেনো অপরাধী! আর কুলাঙ্গার ধর্ষকেরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বীরদর্পে স্বাধীন ও সুখী জীবন যাপন করছে!! সময়ে তারাই চোখ পাকিয়ে এই ধর্ষতিাদের নষ্টা মেয়ে অপবাদ দেবার ধৃষ্টতা দেখায়! ইদানীং কিছু নর্দমার কীট রাজনৈতিক কর্মীদের কাছে ধর্ষন করা যেনো ফ্যাশন আর ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ হয়ে দাঁড়িয়েছে!!!... এদের স্পর্শ করবে এমন আইন, এমন সমাজ এ দেশে নেই!! এই তো সেদিন এক নপুংসক কুলাঙ্গার কন্যার সামনে মা'কে ধর্ষন করায় কন্যাটি আত্মহত্যা করেন!! এমনই দুর্ভাগ্য এ জাতির, এই নরাধম আর তার দাপটে নত আইন রক্ষাকারী কাঁধ ঝাঁকিয়ে জানিয়ে দেয়, “ধর্ষকের সাথে ধর্ষিতার পরকীয়া সম্পর্ক ছিলো”- সুতরাং ধর্ষক (??)বেচারা নিরাপরাধ!!! এই পরকীয়ার মিথ্যা অপবাদটি যেনো ধর্ষণ কর্মটিকে যৌক্তিক ও ন্যায় সঙ্গত করে তুলে!! এ্মন মিথ্যা পরকীয়ার অপবাদে প্রতিদিন বৈধতা দেয়া হয় অনেক ধর্ষন এমনকি নারী হত্যাকে!!! পথ ঘাট, অফিস আদালত শুধু নয়, আজ নিজ গৃহ এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষন এক নৈমিত্তিক ব্যাপার!! কোন এক অজানা কারনে প্রশাসন, আইন রক্ষাকারী সংস্থা এ ব্যাপারে কেমন গা ছাড়া!!!!
আজ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে কি পাবে এই হতভাগী ধর্ষিতারা? সামাজিক স্বীকৃতি? তাঁদের নিপীড়ন নির্যাতনের সুবিচার?
আমাদের দেশে গণতন্ত্রের অপর নাম নারী, আপোষহীনতার আরেক নাম নারী, নেতৃত্বের নাম নারী, শাসকের নাম নারী!!!!!তার পরও........
প্রতিদিন আমরা ধর্ষিতা হই, অভাবের তাড়নায় প্রতিদিন আমরা বেছে নেই অন্ধকার গলি, সংসারে সয়ে যাই গন্জনা আর নির্যাতন, ঘর থেকে বের হলে মাথা হেঁট করে মেনে নিতে হয় লান্ছনা আর অপমান, দুমুঠো খাবারের অভাবে শরীরে এঁকে দেয় গরম খুন্তির ছ্যাঁকা কখনও বা গৃহকর্তার নখের আঁচড়, কর্মক্ষেত্রে পথে ঘাটে একপাল হায়নার কাছে নিত্য হারাই সম্ভ্রম, অপমানের জ্বালা সইতে না পেরে প্রতিদিন আমাকেই বেছে নিতে হয় আত্মহননের পথ!!!
এই দেশে... এই বাংলাদেশেই....
বাংলাদেশে নারীর প্রতি অন্যায় করা সহজ, তাঁদের নির্যাতন, নিপীড়ন সহজ কারন- খুব সহজে তাঁদের চরিত্রে কালিমা লেপন করা যায়!!! খুব সহজেই আঙ্গুল তুলে তাঁকে দুশ্চরিত্রা ডাকা যায়। বাংলাদেশে বারবণিতা থেকে প্রধানমন্ত্রী, কেউ রেহাই পাননা এমন ঘৃন্য অপবাদ থেকে! ধর্ষিতা হয়েছে কারন সে নষ্টা, মেয়েটি দুশ্চরিত্রা বলেই ইভটিজিং এর শিকার, মেয়েটির পরকীয়া সম্পর্ক ছিলো তাই তাকে হত্যা করা বৈধ!!!
এই যেনো আজকের বাংলাদেশের সামাজিক চিত্র।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা নিজেরা, নিজ পরিবারের কেউ, কোন প্রিয়জন এসব ঘৃন্য অন্যায়ের শিকার না হলে, এবিষয়ে আমাদের সমাজ ভীষণ রকম উদাসীন!!
আমরা ভুলে যাই, আজ না হোক কাল-- আমার কন্যা, আমার পরিবারের ছোট্ট মেয়েটি এই নোংরামী, এই অপরাধ, এই অন্যায়ের শিকার হবে যদি না এক্ষুনি এর প্রতিকারে আমি এগিয়ে আসি।
নারী... একজন মানবী নয়, নারী কোন বিশেষ লেখিকা, কলামিস্ট বা সেলিব্রিটি নয়। নারী আপনার মা, আপনার বোন, স্ত্রী, ভাগ্নী, আত্মীয়া.. নারী আপনার কোলে খেলে বেড়ানো ছোট্ট কন্যা, পরিবারের আদুরে ছোট্ট মেয়েটি।
সরকার বা কোন সংস্থা নয়.. আমাদের ভাগ্যের পরিবর্তন সম্ভব শুধুমাত্র আপনি সচেতন হলে.. শুধুমাত্র আপনিই পারেন আপনার পরিবারের,আপনার পরিচিতা নারীকে রক্ষা করতে এসব হায়েনাদের থাবা থেকে। কোন সংস্থা বা সরকার নয়, শুধুমাত্র আপনার, আমার সচেতনতা এর প্রতিকার এনে দিতে পারে- কারন আমাদের সচেতনতা এদের বাধ্য করবে নারীর প্রতি অন্যায় রোধে, তাঁদের নির্যাতনের সুবিচার এনে দিতে ।
এবারের বিশ্ব নারী দিবসে কিছু কিছু দেশের শ্লোগান, “নারীর সম অধিকার”!!! আমাদের দেশে যেখানে সন্মানজনক ভাবে বেঁচে থাকার নুন্যতম অধিকারটি নেই, সেখানে সম অধিকারের শ্লোগান কেমন প্রহসনের মতো শোনায়!!!
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০১০ রাত ২:৩৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


