আমার অনেক অক্ষমতা আর সীমাবদ্ধতার মাঝে অন্যতম নিজের পরশ্রীকাতরতা আর কল্পনাপ্রবণতাকে বশে আনতে না পারা....
আমি জানিনা- পরশ্রীকাতরতা আমার অংশ না আমি পরশ্রীকাতরতার!
বিখ্যাত সাহিত্যিক উইলিয়াম শেক্সপীয়ারের ক্ষমতালো্ভী ম্যাকবেথ চরিত্রটি নৃশংস হত্যাকান্ডে মেতে উঠার পর হাজারবার ধুয়েও হাতের রক্তের দাগ মুছতে পারেনা, অগুনিত বার ধোয়ার পরও মনে হয় তার হাত থেকে রাজার রক্তের দাগ কখনও মুছবেনা! আমার অতৃপ্তি, আমার অন্যায় তৃষ্ণা আর লোভ ও যেন তেমন- --- আমার বাবার নামের কথাটাই বিবেচনা করে দেখি..
হাজার ইমারত, রাস্তা ঘাট, খেলার মাঠ, প্রতিষ্ঠানের নাম করণ করেও তৃপ্তি নেই, শুধু মনে হয়- এই বুঝি তার নাম মুছে গেলো.. এই বুঝি নামখানা বিস্মৃত হলো। এই নামকে পাহারা দিতেই যেনো চারপাশ ঘিরে পরিবারের আতপাতি সকলের নামে অন্যায় ভাবে জাতীয় প্রতিষ্ঠানের নামকরণের মতো ঘৃণ্য কাজ করি, তারপরও যেন ম্যাকবেথের হাতের রক্তের দাগের সেই হ্যালুসিনেশনের মতো মনে হয়.. নামকরণ যথেষ্ট হলোনা।
শেষে আমার উদ্ভ্রান্ত মন জানালো, সমস্যার মূল ভীষণ জনপ্রিয় কারো নাম সকলের মনযোগ কেড়ে নিয়েছে, তার ঈর্ষনীয় জনপ্রিয়তা বাবার নামটি মুছে দেবার মূল কারন। নাহ্! তাঁর নামে হাজার শত প্রতিষ্ঠান নয়, দু একটি আছে... সেই দুই একটিই আমার নামারকনকৃত শতাধিক প্রতষ্ঠিানের চেয়ে অনেক অনেক শক্তিধর যেন! আমি সেই নামটিও মুছে দিতে চেষ্টা করি... আমার আশেপাশের মানুষেরা অনহারে, অর্থাভাবে দিনাতিপাত করছে, আমি তাদের তোয়াক্কা না করে রাজকোষ থেকে হাজার কোটি অর্থ লুট করে নিজের উদভ্রান্ত মনের স্বান্তনা খুঁজি। আমি পুরোপুরি ম্যাকবেথে পরিনত হই, যখন দেখি এভাব সব নাম মুছে ফেলার পরও মানুষের হৃদয়ে তাঁর নাম কি ভীষণ প্রগাঢ়ভাবে লেখা!!
আমার উন্মাদনা, ঈষাকাতর অন্ধ মন আমায় অনুধাবনে অক্ষম করে, বাবার নামটিই এমনি ভাবে মানুষের মনে আঁকা তাঁর নাম প্রতীষ্ঠায় পথ, ঘাট মাঠে তাঁর নামফলক ঝুলাবার প্রয়োজন নেই।
নিজের এই বিকৃত মানসিকতা আমায় প্রতিনিয়ত নিত্য নতুন প্যারানয়ায় ব্যস্ত করে রাখে।
আমি প্রতিহিংসার নেশায় অস্থির হয়ে থাকি। কখনও ঈর্ষাকাতর আমি প্রতিপক্ষকে চুলের মুঠি ধরে ভিটে ছাড়া করে নিজের বিজয়ে ভেবে অট্ট হাসিতে ফেটে পরি, মুহুর্তের জন্য অনুধাবন করিনা এ আমার নৈতিকতা ও মানসিকতার কি করুণ পরাজয়।
আমার পরিবার যখন বিপদগ্রস্থ হয়েছিলো সেসময় এদেশের মানুষ আরামে নিদ্রা গেছে, এই ভাবনা প্রতিনিয়ত আমায় এক অন্ধকার কূপে নিমজ্জিত করে রাখে। প্রতিশোধের নেশায় পশুর চেয়ে হিংস্র হয়ে উঠি আমি। আমার রক্তপিপাসু প্রতিবন্ধি মন মেতে উঠে রক্তের হোলি খেলায়.. একদল নিবোর্ধ নপুংসককে কিছু অন্যায় ক্ষমতা, কিছু অবৈধ অর্থ দিয়ে নিজের পালিত কুকুর বানিয়ে ছেড়ে দেই এদেশের মানুষের মাঝে। পাগল কুকুরের মতো তারা ঝাঁপিয়ে পরে নিরীহ জনতার উপর- ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, মারামারি, লুন্ঠন, সম্পদ দখল এমনকি নির্বিচারে হত্যাকান্ড চালিয়ে যায় তারা। মগজধোলাইকৃত আমার ক্রীতদাসের এই পাল বুঝতে অক্ষম আমি তাদের কলম কেড়ে হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে কি ভয়ংকর সর্বনাশ করেছি! আমি শুধু এদের বিচার হতে দেইনা, এদের লাইসেন্স দিয়ে রাখি অনাচার আর সন্ত্রাসের বিনিময়ে এই নির্বোধের পাল আমায়, আমার পুরো পরিবারকে অন্ধ ভক্তি দিয়ে উপাসনা করে, আমার বিরুদ্ধে কেউ “টুঁ” শব্দটি করলে এরা তাকে ছিঁড়ে খেতে পিছপা হয়না, আমি আবারও এক বিকৃত আনন্দ লাভ করি.. তবু সুন্দর একটি হাসি ফুটেনা।
আমার আরেকটি মজার স্ট্র্যাটেজি, আমি মুক্তিযুদ্ধ কে মনের খেয়ালে এপাশ ওপাশ করে গড়ে পিটে নেই। এ শুধুই আমার ব্যক্তিগত সম্পদ.. আমি যাকে মুক্তিযোদ্ধা বলবো সেই শুধু মুক্তিযোদ্ধা.. হোকনা সে ৩০ অথবা ৪০ বছরের কোন কুলাঙ্গার সন্ত্রাসী, আর আমার পছন্দের ৪৫ বছরের উপরের সকলকে সম্ভব হলে বীর প্রতিক ঘোষণা দিতাম.. সময়এ হয়তো এমনও সম্ভব হবে। শুধু কি মুক্তিযোদ্ধা? অতিঘৃণ্য যুদ্ধাপরাধীও আমার কাছের মানুষ হয়ে উঠলে তার সাত খুন মাফ, তিনি তখন দেশের মহান নাগরিক, আর আমার দলে যোগ দিলে সে মুক্তিযোদ্ধা..প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা তা দেখে যতোই অভিযোগ আর কান্নাকাটি করুক... আমার আত্মীয় হলে, দলীয় লোক হলে তার যুদ্ধাপরাধের সকল পাপ স্খলিত হয়ে যায়...!!
কারো সাধ্য নেই আমার এই খেলার প্রতিবাদ জানাবে, প্রতিবাদ করলেই আমার ক্রীতদাস বাহিনী চেঁচিয়ে বলবে “তুই রাজাকার”!
আমার এক মনিব দেশ আছে, সেই দেশের স্বার্থে সবকিছু করতে পারি আমি। প্রয়োজনে ১৯৭১ এ হানাদার পাকবাহীনির চেয়ে নৃশংস হয়ে উঠতে পারি, একটু ভুলে বলেছি.. হয়ে উঠতে পারিনা, হয়ে উঠে দেখিয়েছি। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে যা সম্ভব হয়নি, আমার প্রভুদেশক তুষ্ট করতে আমি তেমন করে দেখিয়েছি। কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে এদেশের ৫৬জন বীর সেনানীকে নির্মমভাবে হত্যা করতে দিয়েছি, আমার প্রভূদেশের জন্য এরা বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলো। .... আমার শহরেই শুধু না ঘরের প্রায় পাশেই.. একেকটি গুলির শব্দ আমার হৃদয়ে যে বিকৃত আনন্দের, অর্জনের ঢেউ তুলেছে সেসময় তা বর্ণনাতীত.. তারপরও.... একটু তৃপ্তির হাসি হাসতে পারিনা!
আমার মানসিক দৈন্যতা আমায় শান্তি পেতে দেয়না। হতদরিদ্র জনগণের টাকা চুরি করে একটু শান্তির অন্বেষণে আমি ডক্টরেট ডিগ্রী কেনার এক বিকৃত নেশায় মেতে উঠি। আমার পালিত কুকুরের দল ছুটাছুটি করে একের পর এক ডিগ্রীর মালা এনে আমার গলায় পরিয়ে দেয়, তবু এতোটুকু সন্মান বৃদ্ধি পায়না... আমার তৃপ্তি মেলেনা!
আমার মনের ভারসাম্যহীণতা বেড়েই চলে, হঠাৎ মোসাহেবের পাল পরামর্শ দেয় নোবেল পুরুস্কার কেনার!! আমার জ্ঞান বিজ্ঞানের কোন শাখায় অবদান দূরের কথা এতোটুকু ধারনাও নেই। এই গুনবর্জিত হলেও নোবেলের একমাত্র আশা “শান্তি পুরুস্কার”! এমনই দুর্ভাগ্য.. হত্যা, ধর্ষন, ষড়যন্ত্রের কোন পুরস্কারের ব্যবস্থা নেই, ব্যবস্থা নেই “অশান্তি পুরুস্কারের”!! আমি হতাশ হয়ে পড়ি, আমার বিকৃতমন আরো লাগামছাড়া, ভারসাম্যহীণ হয়ে পড়ে... আমি নোবেল না পেলে এই দেশে কেউ একারণে সন্মানিত হতে পারেনা। আমার বাবা নয়, আমার এত্তো ডক্টরেট নয়, ভীনদেশীরা আমায় চেনে নোবেল বিজয়ীর দেশী হিসেবে!!! আমার বাবার নামটি পর্যন্ত তারা শুনেনি, আর এই সুদখোরমহাজনের বৃত্তান্ত জানে!! পথঘাট, দোকান পাট, অফিস আদালত এমনকি সবচেয়ে বড় স্টেডিয়ামে বাবার নামের ফলক লাগানোর পরে ভীনদেশীরা তার নাম জানেনা, জানে এই সুদখোর মহাজনের নাম! কি ভীষণ ধৃষ্টতা!
এমনটি সহ্য করতে আমার উদভ্রান্ত মন অক্ষম .. নোবেল ছিনিয়ে নেবার ক্ষমতা নেই তবে তাকে হেনস্থা করার ক্ষমতা আমার আছে!!!!!!!
আমি সেই ক্ষমতার প্রয়োগ করি। আমার অন্য সকল অন্যায়ের মতো এই অন্যায়ের সমর্থক জুটানো কঠিন নয়, নির্বোধের এই দেশে। আমার অতি কাছের কেউ কেউ ক্ষুদ্রৃঋণের নামে ঘৃন্য সুদের মহাজনি চালিয়ে গেলেও, এই অজুহাতে নোবেলজয়ীকে ঘায়েলের সমর্থক পেতে সমস্যা হয়না আমার। ঠিক যেমন, নিজের ঘরে যুদ্ধাপরাধীও লালন করেও আজ আমি নিজেকে যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধ শক্তি হিসেবে একদল বোধশক্তিহীনের মনে প্রতীষ্ঠা পেয়েছি। আমার যেকোন সদ্ধিান্তের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুললেই, একান্ত অনুগত এই নির্বোধের পাল “তুই রাজাকার” ধ্বনিতে তাদের কোনঠাসা করে রাখবে.. হোকনা তিনি কোন দুর্ধর্ষ মুক্তিযোদ্ধা অথব সত্যিকারের ঘৃণ্য রাজাকার!
মুক্তিযোদ্ধা আর রাজাকারের সার্টিফিকেট আজ শ্বাপদের থাবায়! আমার পদলেহী এই কুকুরের পাল সদা তৎপর!
এমন বিশ্বস্ত শ্বাপদ বাহীনি নিয়েও স্বস্তি নেই, পরিতৃপ্তি নেই আমার!
তৃপ্তির হাসি হাসার চেষ্টায় অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ি আমি, বরাবরের মতোই তা হায়নার হাসির মতো শোনায়!!
নিজের বিকারগ্রস্থতা আর অন্ধকারাচ্ছন্ন মানসিক বিকলাঙ্গতার কারনে আমি স্বাভাবিক ভাবে হাসতে পারিনা, তৃপ্তিভরা সুন্দর হাসি হাসতে পারিনা।
তাই আমি হাসি না।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই মার্চ, ২০১১ দুপুর ১:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



