আমরা তখন বেকার পাবলিক লাইব্রেরির বারান্দায় বসে থাকি। বসে থাকি কারণ আর কিছু করার নেই। কেউ কেউ ট্যুইশনি পেয়েছে। যেমন জি. এইচ. হাবীব। বাকিরা চা কেউ খাওয়াবে এই ভরসায় বসে থাকি।
ঢাকায় তখন গজলের ধুম। প্রতি সপ্তাহেই কেউ না কেউ গজল গাইতে থাকে। অবশ্য গজল গায় কিনা সেটা আন্দাজেই বললাম। আমরা কেবল পোস্টার দেখি। কাঁধে একটা শাল ফেলে একটা ত্যারছা ধরনের ছবি। বিরাট মাপের। তাতে লেখা গজল সন্ধ্যা। এরপর কোথায় গাইবে কবে গাইবে এসব খবর থাকত। একটার পর একটা পোস্টার দেখে গা গিরগির করত আমাদের। কখনো এসব গজল শুনতে যে কারো উৎসাহ হয়েছিল আমাদের মধ্যে এরকম মনে পড়ে না।
ফলে আমাদের ওরকম আর্থিক দিনকালের মধ্যেই একটা কিছু করার বুদ্ধি এল। আমাদের মধ্যে মামুনের চেহারাটাই কেবল পোস্টারে দেবার মতো। ফলে মামুনকে আমি রাজি করানোর চেষ্টা করলাম। ওরকম একটা ব্রিলিয়ান্ট আইডিয়া মামুন, নেহায়েৎ নার্ভাস হয়ে, খারিজ করে দিল। পরিকল্পনা অবশ্য বেশ পাকা ছিল। ঢা.বি.র আশপাশে, আজিজ মার্কেটে এবং নিউমার্কেট এলাকায় কাঁধে-শাল মামুনের হাসি-হাসি একটা ছবি থাকবে। পোস্টারে বড় করে, যত বড় করে পারা যায়, লেখা থাকবে -- গজল সন্ধ্যা। আর নিচের দিকে ছোট করে লেখা থাকবে -- আগামী ২২, ২৩ কিংবা ২৪ তারিখ পাবলিক লাইব্রেরি কিংবা যাদুঘর কিংবা শিল্পকলা মিলনায়তন কোথাওই মামুন গজল গাইতে রাজি হন নাই। মামুনকে আমরা অনেক করে বোঝালাম যে এতে একেবারেই সত্যি কথাই বলা হচ্ছে এবং কেউই ওর কাছে এসে গজল গাইবার বায়না করবে না। বরং দর্শকেরা পোস্টারটা দেখে বড়জোর দুঃখ পাবে যে মামুন গাইতে রাজি হলো না। কিন্তু মামুনের মনে সন্দেহটা থেকেই গেল যে পোস্টার দর্শকদের কেউ কেউ ওর সঙ্গে দেখা করে এক দুই লাইন শুনতে চাইতে পারে। ফলে ওকে কিছুতেই রাজি করানো গেল না। আমাদের গাঁটের পয়সা ওর জন্য আমরা যে মহৎভাবে খরচ করতে চাইলাম এই ত্যাগস্বীকারের কোনো দামই ছিল না মামুনের কাছে। বরং আমরা যখন বেশি পীড়াপিড়ি করলাম মামুন রেগে গেল।
আজ এত বছর পর মামুন কোথায় তা আর আমি জানি না। কিন্তু হয়তো ঢাকায় কয়েক শ' গুণ পোস্টারের রাজ্যে মামুন হাঁটাচলার সময়ে ১৬ বছর আগের সেই লোভনীয় অফারটার কথা ভাবে। এখন যদি ও গজল গাইতে না-চাইবার জন্য কান্নাকাটিও করে আমাদের পক্ষে সেটার বিজ্ঞাপন করা আর সম্ভব না। প্রতি দিন ১০ জন করে নতুন গাইয়ে সিন্থেটিক হোর্ডিং-এ বিজ্ঞাপন দিচ্ছেন। এর মধ্যে মামুনের গজল না-গাইবার ছবি কীভাবে দেখবে মানুষজন?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



